এতিমের ঈদ

ঈদের দিন সারাবেলা, আকাশটা ছিল মেঘলা। কেন জানি মেঘ আর সূর্য লুকোচুরি খেলছিল। এই রোদ, এই বৃষ্টি। প্রকৃতির রূপ ছিল কালচে। কৃত্রিম বৈদ্যুতিক আলোতে সেদিনের অন্ধকার হয়তো দূর করা সম্ভব হয়েছে। হয়তো চন্দ্রের আলোতে রাতের কালো মুছে গেছে। কিংবা আগামীর সূর্যের আলোকজ্জ্বল আভা গতদিনের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছিল। সেদিন আমার মনের আকাশটাও ছিল ঘনমেঘে আচ্ছন্ন! ঘোর তিমিরে ঢাকা ছিল আমার পৃথিবী। দুনিয়ার সূর্যকিরণ নিত্য আসা-যাওয়া করলেও আমার অন্তরাত্মা জুড়ে যে সূর্যের বাস, সে সূর্যটা অস্ত গিয়েছিল দেড় যুগ আগে। ফের সূর্যোদয় হয়নি অবধি। হূদয় গহীনে যে চাঁদ বিরাজমান ছিল সেও ভোর না নামতেই হটাৎ একদশক আগে মেঘের কোলে হারিয়ে গেছে। আমার দুনিয়ায় আর কোন আলোকরেখা রইলনা। আমার পৃথিবীতে হয়তো আলোর কোন ঝলকানি বিধাতা কর্তৃক গৃহীত হয়নি। জীবন নামের সুবিশাল পাঠ্যতে আনন্দের কোন অধ্যায়ের সন্নিবেশ ঘটেনি। আমার কৃষ্ণবর্ণ চেহারায় যে হাসি তোমরা দেখতে পাও, সে হাসির মাঝে লুকিয়ে আছে জমাটবাঁধা কষ্টের চাপ। মনের গহীনে লালন করা তিব্র বেদনা হাসির ছলে উড়িয়ে দিতে চাই।  বিচ্ছেদ বেদনায় ক্ষতবিক্ষত আমার হূদ। প্রতিনিয়ত নয়নের ভারীতে ভাসতে ভাসতে অশ্রুমিতা বনেছি নিজের অজান্তে। প্রতিটি ঈদ সবার জন্য বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ। ঈদ উপলক্ষে শপিং সেন্টারগুলোতে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। নতুন পোশাক ছাড়া কি ঈদ হয়! শুধু তাই নয়, পোশাক কিনেই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে ছোট শিশুরা। কেউ দেখলে
পুরনো হয়ে যাবে তাই। কিন্তু আমাদের চারপাশে এমন অনেক এতিম, অনাথ,  সুবিধাবঞ্চিত শিশু আছে যাদের ঈদ কাটে জরাজীর্ণ পোশাকেই। আমরা তাদের নিয়ে ভাবি না। অনেকেই তাদের দেখেও না দেখার ভান করে বিরক্তি নিয়ে পাশ কেটে যাই। অথচ এরাও সমাজের একটা অংশ। এদেরও নতুন কাপড় পাওয়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু সামর্থ্য নেই। তাদেরও আছে স্নেহযুক্ত ভালবাসা পাওয়ার অধিকার। অন্য আর আট দশজনের মতো এদেরও আছে পিঠা মাংস খাওয়ার সাধ। আমিও তাদের একজন। ঈদুল আযহার প্রধান কাজ ঈদ গাঁ হতে ফিরে সবাই যখন আনন্দভরা মনে আল্লাহ রাহে পশু কোরবানীতে ব্যস্ত তখন আমার হূদয়ে রক্তহরণ চলছে বিরামহীন। খুশিতে যখন দুনিয়াবাসী আত্মহারা। আমি হতভাগা তখন পুকুর পাড়ের গোরস্থানে। কবরের পাড়ে ঈদ আনন্দের খুজেঁ। আমার ঈদ আনন্দ যে অনেক আগেই ভূগর্ভে গুঁজে এসেছি। জানি সব রোপণ করা বীজ একদিন বটবৃক্ষে রূপ নেয়। কিন্তু সারে তিন হাত উর্বর মাটির নিচে স্বযত্নে রোপণ করা আমার আনন্দের কোন বৃক্ষরাজি এযাবৎ দেখা মিলেনি। আমার সূর্য (বাবা) ও তিমির রাতে শেষ অবলম্বন চাঁদ (মা) যে দূর আকাশের তাঁরায় মিলে গেছে বহুকাল আগেই।  আলোকে আরো আলোকিত করতে বাবা-মা’র এই অন্তিম যাত্রা। না ফেরার দেশে জান্নাতী বেশে মালিকে খায়েনাতের ডাকে সাড়া দিয়েছেন তাঁরা। জানি বাবা স্বর্গীয় সুধা পানে তোমরা ব্যস্ত। প্রিয় রসূলের নুরাণী ভালবাসায় মা তোমরা সিক্ত। কিন্ত তোমাদের রেখে যাওয়া এতিম সন্তানটা যে দিকে দিকে করুনার পাত্র! ঘনবর্ষায় কাটে তার জীবন, বসন্তের কোন দেখা নেই। সেই ছেলেটাকে দেখা দেওয়ার সাধ কী একবারও জাগেনি কখনো? সর্বমহলে এতিম, অবলা, অনাথের সনদপত্র অবহেলিত, বঞ্চিত সন্তানটাকে কী একটুও মনে পরেনা? ইচ্ছে করেনা ঈদের দিনেও একটু মমতার চাদরে বাঁধতে? স্নেহাস্পর্শে রাখতে? মায়াবী কণ্ঠে স্নেহভরে ডেকে বলতে, “সাইফুল বাব আমার, একটি পিঠা খেয়ে বের হ; বাচাধন আরেকটি খা, বাবা আরেকটি”। খাওয়া শেষে মুখ মুছতে শাড়ির আচঁল টেনে দেওয়ার দৃশ্য অদৃশ্য হয়েগেছে অনেক আগেই। ইচ্ছে করেনা, শাড়ির আঁচলে মাথা মুছে দিতে? মাংস থেকে খুজেঁ খুজেঁ কলিজার টুকরো তো মা কেউ আর মুখে তুলে দেয়না। মা একদশক আগের স্নেহযুক্ত শব্দগুলো এখনো কানে লাগে। এই স্নেহময়ী শব্দগুলো শুনতে কত ঘুরেছি মা।   কেউতো ভালবাসা দেয়নি বরং প্রয়োজন ফুরাতেই দূর দূর করে তাড়িয়েই দিয়েছে বারে বারে। চোখের সামনে অন্যের মা যখন তাঁর সন্তানকে আদর করে এবং পাশে দাঁড়ানো আমি এতিমের দিকে চোখ রাঙ্গিয়ে দেখে তখন গগনস্পর্শী কান্না ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা। কারো বাবা যখন ছেলেকে খাওয়ার মুখে তুলে দেয় আর আমাকে অখাদ্য ভোজন করতে বলে তখন তোমাদের ভালোবাসার কথা মনে পড়ে। তোমাদের ভালবাসা ছিল অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ। কিন্তু অন্যের সামান্য ভালবাসাতে রয়েছে বৃহৎ স্বার্থ। যতদিন বসুধায় রইবো ততদিন তোমাদের রেখে যাওয়া ভালবাসা বুকে নিয়ে কাটাতে চাই। না আর কারো কৃত্রিম ভালবাসার জন্য দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকবো না। বাবা-মা তোমরা ভালো থেকো। অদৃশ্য থেকে আমায় চোখে চোখে রেখো। ও আচ্ছা মা, ঈদের দিন আমার নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়েছে।  মানুষ চিনেছি আজ, মানুষ! কে আপন, কে পর তা আজ দিবালোকের মতো স্পর্শ হয়েগেছে। বিপদে পড়লে মানুষ চেনা যায়। কষ্টে থাকলে আরও বেশী। যাদের আপন করে রাখার কথা বলে গিয়েছিলে তাদের উপযুক্ত সম্মান দিয়েছি মা। তারা আজ আমার পরীক্ষায় ফেল। শতে শূন্য পেয়েছে তারা। তবুও তাদের ভালবেসে যাবো মা। তোমায় কথা দিলাম। বাবা যাওয়ার বেলায় বলেছিলে তুমি, “তুকে মানুষ হতে হবে” হ্যাঁ তোমার ছেলে অমানুষ হয়নি। মানুষ হওয়ার চেষ্টায় আছে। সমাজে তোমার নাম ছড়িয়ে পড়েছে। তুমি সফল অভিভাবক বাবা।  নির্জনতায় তুমি ঘুমাও আর স্বর্গীয় সুধা পান করতে করতে আমার অপেক্ষায় থাকো। দোয়া রেখো তোমার স্বপ্ন বাস্তবায়নে যেন বাঁধার মহাপ্রাচীর ভেঙ্গে সফলতার চূড়ায় আরোহণ করতে পারি বাবা।
এম সাইফুল ইসলাম নেজামী
কবি ও প্রাবন্ধিক
শিক্ষার্থী – চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়