বঙ্গবন্ধু

সিরাজী এম আর মোস্তাক : ৫ই মার্চ। এমন একজন বঙ্গসেনার জন্ম ও মৃত্যু দিবস, যিনি রাজনীতিতে বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অথচ দেশের কেউ তার স্মরণসভা করেনি। তিনি একজন নিগৃহিত বঙ্গসেনা। জনাব খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ১৯৭২ থেকে বঙ্গবন্ধুর বিদ্যুৎ, সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। বাকশালের কার্যকরি কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির কথা শুনে হু হু করে কাঁদছিলেন। আবেগ সংবরণ করতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিয়ে আমেরিকা ও চীনের মাধ্যমে পাকিস্তানের সাথে সন্ধি করতে যাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করাই ছিল তার লক্ষ্য। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখেন। পৃথিবীর সকল পরাশক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনেন এবং বিজয় নিশ্চিত করেন। (মঈদুল হাসান- মূলধারা ‘৭১)। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষন ও কুশলি নেতা। বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে আগলে রাখেন। ১৫ই আগষ্ট (১৯৭৫) কতিপয় সেনা কর্মকর্তার অস্ত্রের মুখে তিনি ক্ষমতায় বসতে বাধ্য হন। যখন শুনতে পান সেনারা জাতীয় চারনেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তৎক্ষণাৎ ক্ষমতা ছেড়ে দেন। এসময় মাত্র ৮৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। তখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে এক চুল সরেননি। (এ্যান্থনী মাসকারেনহাস, দ্য রেপ অব ব্লাড- বাংলা অনুদিত)। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু আদর্শের সর্বশ্রেষ্ঠ ধারক ও বাহক। বর্তমান আওয়ামীলীগের ডিজিটাল নেতারা তাকে মিথ্যা দোষারোপ করে। তাকে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা হত্যার অন্যতম ঘাতক মনে করে। তার স্মরণীয় জীবনী, কর্মকান্ড, মহান ভূমিকা ও অবদান ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।
খন্দকার মোশতাক ১৯১৮ সালে ৫ই মার্চ কুমিল্লা জেলা দাউদকান্দি উপজেলার দশপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা দাউদকান্দির পীর খন্দকার কবিরউদ্দিন আহমদ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ধার্মিক ও অনুগত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রী নিয়ে ১৯৪২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম মহাসচিব। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তিনি ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর সাথে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হন। এরপর তিনবার আটক হন ও বঙ্গবন্ধুর সাহচর্য্য লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে আটটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত আইয়ুব বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদে তিনি পূর্ব পাকিস্তান শাখার আহবায়ক নির্বাচিত হন। তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খান আহুত গোলটেবিল বৈঠকেও আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধুর অধীনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদীয় মন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট ক্ষমতায় বসতে বাধ্য হন। ভয়াবহ পরিণতি সত্তেও ৫নভেম্বর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ৬ নভেম্বর কারাগারে বন্দি হন। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পান। এরপর বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ‘ডেমোক্রেটিক লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এতে ব্যর্থ হন। তারপর একাকী দিন কাটান। ১৯৯৬ সালের ৫ মার্চ ৭৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি বেঁচে থাকতে খুনি বা ষঢ়যন্ত্রকারি তকমা পাননি।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে খন্দকার মোশতাকের ভূমিকা উল্লেখ্য। তাজউদ্দিন আহমেদসহ অনেক নেতা বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে গেলেও তিনি অটল ছিলেন। ১৯৭২ সালে দালাল আইনে প্রচলিত বিচার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সুপরামর্শ দেন। তার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালেই উক্ত বিচার বাতিল করেন। বিচারের সামান্য কাগজও বিনষ্ট করেন। দালালদেরকে মুক্তি দেন। লাখো শহীদ, যোদ্ধা ও দালাল নির্বির্শেষে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেন। শহীদের সংখ্যা ‘ত্রিশ লাখ’ সুনির্দিষ্ট করেন। এভাবে বঙ্গবন্ধু গ্রহণযোগ্য শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতেও খন্দকার মোশতাকের স্মৃতি অম্লান। সেনা কর্মকর্তাদের মনোরঞ্জনে তিনি ‘জয় বাংলা’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ চালু করেন। বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে রেডিও বাংলাদেশ করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ‘ ঘোষণা করেন।
বাংলাদেশে খন্দকার মোশতাকের স্মৃতিচিহ্ন নেই। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী নিয়ে কারো আগ্রহ নেই। তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেই। তার সন্তানদেরও মুক্তিযোদ্ধা কোটাসুবিধা নেই। বর্তমান ডিজিটাল নেতাদের বক্তব্যে মনে হয়, তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চিত খুনি বা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সাজা পেতেন। এতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শও আজ সঠিকরূপে নেই। মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা চালু হয়েছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ আদালত তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানী ঘাতকদের পরিবর্তে বাংলাদেশীরা যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। দেশের ষোল কোটি নাগরিক এখন বীরের জাতি নয়, যুদ্ধাপরাধীদের স্বজন বিবেচিত হয়েছে। এ ডিজিটাল লান্থণা মেনে নেয়া যায়না। খন্দকার মোশতাকের প্রতি অবজ্ঞা এর অন্যতম কারণ।
তাই আসুন, আমরা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সেনা খন্দকার মোশতাককে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। উত্তাল মার্চের ৫ তারিখ তার স্মরণে জাতীয় দিবস পালন করি।

শিক্ষনবিস আইনজীবী, ঢাকা।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এবিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এ