নতুন কলেজ

গত বছর পাঠদান বন্ধ হয়েছে ১৪৩টিতে এ বছর প্রক্রিয়াধীন ২৮০টি

সাব্বির নেওয়াজ:

প্রয়োজন না থাকলেও নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা ও পাঠদানের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে সারাদেশে। প্রভাবশালীদের তদবিরে ও রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব কলেজের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। শিক্ষা বোর্ডগুলোর চেয়ারম্যানরা মনে করছেন, এসব কলেজের বেশিরভাগই মানসম্পম্ন শিক্ষা দিতে পারছে না। পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলও একই তথ্য নির্দেশ করছে। গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠিত নতুন এসব কলেজে শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হতে চাইছে না। কলেজগুলো তাই শিক্ষার্থী সংকটে ধুঁকছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার গত শিক্ষাবর্ষে ১৪৩টি কলেজে পাঠদান বন্ধ করেছে। চলতি বছরেও বন্ধের প্রক্রিয়ায় রয়েছে ২৮০টি কলেজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সারাদেশে চার হাজারের বেশি কলেজ রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক, স্টম্নাতক, স্টম্নাতক সম্মান ও স্টম্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাঠদান করা হয় এসব কলেজে। দেশের আটটি বিভাগে কেবল উচ্চমাধ্যমিক কলেজ রয়েছে প্রায় দুই হাজার ২০০টি। প্রতি বছরই এগুলোর বিভিন্ন শ্রেণিতে বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকছে। চলতি বছর কেবল একাদশ শ্রেণিতেই আসন খালি রয়েছে দেড় লাখের বেশি। ‘সারাদেশে কলেজের সংখ্যা কত এবং কলেজের প্রয়োজন কতটি?’- জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) ড. মোল্লা জালাল উদ্দিন সমকালকে জানান, তাদের হিসাবে সারাদেশে চার হাজার ২০০টির মতো কলেজ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সরকারি কলেজ ৩৩৫টি। সরকারিকরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে আরও ১৯৯টি কলেজ। বাকি সবগুলোই বেসরকারি কলেজ। দেশে প্রয়োজনের চেয়ে কলেজের সংখ্যা বেশি বলেও তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজন না থাকলেও নানা রকম তদবির ও চাপের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়েই মন্ত্রণালয় থেকে কিছু কিছু কলেজকে অনুমোদন দিতে হচ্ছে।

দেশজুড়ে বেসরকারি কলেজ রয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) উপ-পরিচালক (বেসরকারি কলেজ) মেজবাহ উদ্দিন সরকার সমকালকে বলেন, এগুলোর মধ্যে দুই হাজার ৩৬৫টি কলেজ এমপিওভুক্ত। এসব কলেজের প্যাটার্নভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরকার পরিশোধ করে থাকে। এই কলেজগুলোতে ৬৫ হাজার ৬৩৪ জন শিক্ষক এবং ২১ হাজার ৫৯৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। এই ৮৭ হাজার ২৩৩ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারের ব্যয় হয় ২০৬ কোটি সাত লাখ ২৩ হাজার ৯৬০ টাকা। সরকারিভাবে বিপুল অর্থব্যয় করলেও এসব কলেজের হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সবগুলোর শিক্ষামান নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

নতুন আবেদনের ছড়াছড়ি :শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানচিত্র’ অনুযায়ী রাজশাহী বিভাগে নতুন কোনো কলেজের প্রয়োজন নেই। অথচ মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠদানের অনুমতি চেয়েছে রাজশাহীর রাজপাড়ায় নর্থ প্যাসিফিক কলেজ ও বোয়ালিয়া এলাকায় রাজশাহী বিজ্ঞান কলেজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন নামে এ রকম আরও ২৩টি কলেজ শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর জন্য আবেদন করেছে মন্ত্রণালয়ে। পাঠদানের অনুমতি চাওয়া এই ২৩টি কলেজ হচ্ছে- লক্ষ্ণীপুরের রামগঞ্জে ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমি, সদরে লক্ষ্ণীপুর ভিক্টোরিয়া কলেজ, বগুড়া সদরে বগুড়া সিটি কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে মর্নিং জ্ঞ্নোরি কলেজ, ঢাকা মহানগরীতে সামছ্‌ কলেজ, ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পোড়াকান্দুলিয়া কলেজ, গাজীপুরের শ্রীপুরে সাইনবোর্ড মডেল কলেজ, ফরিদপুরের নগরকান্দায় এম এ শাকুর মহিলা কলেজ, দিনাজপুর সদরে দিনাজপুর মডেল কলেজ, দিনাজপুর প্রাইভেট স্টেট কলেজ, রংপুর সদরে উইমেন্স কলেজ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ, কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে মোহনগঞ্জ আদর্শ কলেজ, নীলফামারীর ডিমলা সীমান্ত মহাবিদ্যালয়, জলঢাকার নীলসাগর মডেল মহিলা কলেজ, চট্টগ্রাম মহানগরের রাহাত আরা কলেজ, চান্দগাঁওয়ের হাজেরা তজু সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স কলেজ, পতেঙ্গা আইডিয়াল কলেজ, সীতাকুন্ড ছোট দরগাহ্‌ হাট তাহের-মনজুর কলেজ, বরিশালের বাকেরগঞ্জ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা কলেজ, বরগুনার বেতাগী চান্দখালী পৈরুন্নেছা তোমের উদ্দিন মহিলা কলেজ, পটুয়াখালীর গলাচিপা লামনা মহিলা কলেজ, কলাপাড়ার মাহবুবুল আলম মহাবিদ্যালয়, কুমিল্লার দেবিদ্বারের গঙ্গাম ল মডেল কলেজ, সিলেটের গোলাপগঞ্জের কাওছারাবাদ কলেজ, মৌলভীবাজার সদরের মৌলভীবাজার মডেল কলেজ, কমলগঞ্জের হুরুন্নেছা খাতুন চৌধুরী কলেজ, ঝিনাইদহ পৌর মডেল কলেজ, রাজবাড়ীর কালুখালী মহিলা কলেজ ও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা কুজেন্দ্র মডার্ন কলেজ। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নামসর্বস্ব এসব কলেজ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলছে।

ফল খারাপ, শিক্ষার্থীরাও অনাগ্রহী :নতুন অনুমোদন পাওয়া কলেজগুলো মানহীন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করায় তাদের বোর্ড পরীক্ষার ফল খারাপ হচ্ছে। মানহীন এসব কলেজের প্রতি ছাত্রছাত্রীদেরও আগ্রহ নেই। এসব কলেজে নেই ভালো খেলাধুলার ব্যবস্থা, নেই বিনোদন ও সংস্কৃতিচর্চার জায়গা। রাজধানীতে অনেক কলেজ নিয়ম না মেনে বিভিন্ন ভাড়া বাসায় তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। কোনো কোনো কলেজে রয়েছে ক্লাসরুম সংকট। রয়েছে বেশি অর্থ আদায়, পাঠগ্রহণরত শিক্ষার্থীদের দিয়েই অর্থের লোভ দেখিয়ে নতুন ছাত্র ভর্তি করানোর মতো হাজারো অভিযোগ। গত বছর সারাদেশে শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় সরকার ১৪৩টি কলেজের পাঠদান বন্ধ করেছে। এ বছর একাদশ শ্রেণির ভর্তিতে কোনো শিক্ষার্থীই পায়নি সারাদেশের ২৮০ কলেজ। এগুলোতেও পাঠদান বন্ধের প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেই শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়া কলেজের সংখ্যা বেশি। অনলাইনে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম চালু হওয়ার পর থেকে ভুয়া ও নামসর্বস্ব কলেজগুলোর কার্যকলাপ সামনে চলে আসছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঢাকা বোর্ডের ১৬, চট্টগ্রাম বোর্ডের ৯, যশোর বোর্ডের ৭, কুমিল্লা বোর্ডের ২, বরিশাল বোর্ডের ৩, রাজশাহী বোর্ডের ২৬ ও দিনাজপুর বোর্ডের ১টি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ৭১টি মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৫৪টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, একজনও শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় এসব কলেজের আসল চিত্র উঠে এসেছে। এখন কলেজগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত করা হবে। তদন্তে সন্তোষজনক মনে না হলে এগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘কী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে?’- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কলেজগুলোর পাঠদানের অনুমতি স্থগিত এবং একাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন হবে না কিংবা বাতিল করা হবে। শিক্ষা কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দেওয়া হবে। এর ফলে আগামী বছর থেকে কলেজগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে না।’
মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম ছায়েফ উল্যাহ সমকালকে বলেন, ‘কেন ৭১টি মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি হলো না, তা খতিয়ে দেখা হবে। মাদ্রাসাগুলোকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে একাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন করা হবে না।’
এর আগে গত বছরের ২৪ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে উচ্চমাধ্যমিকে শতভাগ ফেল করায় এবং একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি না হওয়ায় ২১৯টি কলেজ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কলেজগুলোর কোনো কোনোটি এ আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কলেজ উইং জানাচ্ছে, ১৮৪টি কলেজে গত দুই বছর একাদশ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় ২০টি কলেজের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৯৫টি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি এবং তিনটি কলেজের একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। যশোর বোর্ডে পাঁচটি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি এবং একটি কলেজে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। রাজশাহী বোর্ডে ৪২টি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি এবং আটটি কলেজের কেউ পাস করেনি। চট্টগ্রাম বোর্ডের চারটি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। সিলেট এবং বরিশাল বোর্ডে সাতটি করে মোট ১৪টি কলেজে কেউ ভর্তি হয়নি। দিনাজপুর বোর্ডে ২৪টি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি এবং আটটি কলেজ শিক্ষার্থীদের কেউ পাস করেনি। এ ছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি এবং ১০টি মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য :এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, ‘অতীতে মান ও প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করে ঢালাওভাবে অনুমোদন দেওয়াতেই অপ্রয়োজনীয় কলেজের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আমরা গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই নতুন কলেজের অনুমোদন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সব ক্ষেত্রে যে সফল হতে পেরেছি, তা বলব না।’ তিনি বলেন, ‘কেবল সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। শিক্ষার প্রকৃত বিস্তার ও মানসম্পম্ন শিক্ষাদানে আগ্রহী কোনো প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে প্রাপ্যতা অনুসারে আমরা তা বিবেচনা করে দেখব। যেনতেন কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন আর দেওয়া হবে না।’