বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্ব

কোনো একটি বিষয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গড়ে ওঠা অনুমান বা ধারণা ও ধারনাসমষ্টির সারাংশই হল বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্ব।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের থিওরিই বৈজ্ঞানিক থিওরি। থিওরি বা তত্ত্ব কথাটি ভিন্ন কিছুও বুঝাতে পারে, কাকে আপনি জিজ্ঞেস করছেন সেই ভিত্তিতে।

সাধারণ মানুষ থিওরি বা তত্ত্ব শব্দটি দিয়ে যা বুঝায় তার চেয়ে একটু ভিন্নভাবেই শব্দটি ব্যবহার করেন বিজ্ঞানীরা। বেশিরভাগ মানুষই থিওরি বা তত্ত্ব বলতে সাধারণত বিশেষ কোনো ধারণা বা অনুমানকে বুঝান যা কেউ ব্যক্তিগতভাবে মনে পোষণ করেন।

কিন্তু বিজ্ঞানে থিওরি বা তত্ত্ব বলতে বুঝায় বাস্তব কোনো কিছুকে ব্যাখ্যা করার পদ্ধতিকে।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া
প্রতিটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব শুরু হয় একটি অনুমান হিসেবে। বর্তমান গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না এমন অব্যাখ্যাত ঘটনার প্রস্তাবিত সমাধানকে বলা হয় সায়েন্টিফিক হাইপোথিসিস বা বৈজ্ঞানকি অনুমান। অর্থাৎ অনুমান হলো এমন একটি ধারণা যা এখনো প্রমাণিত হয়নি। যদি কোনো অনুমানের স্বপক্ষে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগৃহীত হয় তাহলেই তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরের স্তরে প্রবেশ করে- বৈজ্ঞানিক থিওরি তা তত্ত্বে পরিণত হয়। এবং সেই তত্ত্বটিকে কোনো বাস্তব বিষয়ের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হলো পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব বিষয়ের ফ্রেমওয়ার্ক। তত্ত্ব বদলে যেতে পারে বা যে পদ্ধতিতে তা ব্যাখ্যা করে তাও বদলে যেতে পারে। কিন্তু চোখের দেখা বাস্তব কখনো বদলায় না।

তত্ত্বকে তুলনা করা যেতে পারে এমন একটি ঝুড়ির সঙ্গে যেখানে বিজ্ঞানীরা তাদের দেখা বাস্তব তথ্য এবং পর্যবেক্ষণ জমা করেন। এই ঝুড়ির আকার বদলে যায় বিজ্ঞানীরা যখন আরো জানতে পারেন এবং আরো বাস্তব জড়ো করেন।

উদাহরণত মানুষের মধ্যে বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য একটা সময়ে বেশি ছিল বা আবার একটা সময়ে কম ছিল বা নাই হয়ে গেছে এমনটা দেখা যায়। অর্থাৎ বিবর্তন ঘটেছে। এখানে বিবর্তনটা হলো বাস্তব। যা কখনোই উল্টে যাবে না। কিন্তু এই বাস্তব বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার যেসব তত্ত্ব সেসব হয়তো নতুন কোনো পর্যক্ষেণের মাধ্যমে পাওয়া নতুন বাস্তব তথ্যের কারণে বদলে যেতে পারে।

তত্ত্বের মৌলিক বিষয়গুলো
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে এর মতে, তত্ত্ব হলো ‘ব্যাপক পরিসরের ঘটনাসমুহের বা বাস্তব বিষয়সমুহের বিস্তৃত বা স্পষ্ট ও প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা। ’ তত্ত্বগুলো হয় সংক্ষিপ্ত, সুসঙ্গত, পদ্ধতিগত, পূর্বানুমান বা ভবিষ্যদ্বানীমূলক এবং বিস্তৃতভাবে প্রয়োগযোগ্য। অনেক সময় তা অনেক অনুমানকে সমন্বয় এবং সাধারণীকরণ করে।
যে কোনো বৈজ্ঞানিক থিওরি বা তত্ত্বকেই বাস্তবের যত্নশীল এবং যুক্তিসঙ্গত পরীক্ষণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। বাস্তব এবং তত্ত্ব দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাস্তব হলো তা যা পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপ করা যায়। আর তত্ত্ব হলো বাস্তব সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা ও ভাষ্য।

পর্যবেক্ষণমূলক ফলাফল থেকে গড়ে ওঠা কোনো বক্তব্য, বিবৃতি বা ভাষ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। একটি ভালো তত্ত্ব, যেমন নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব, এর আছে ঐক্য। অর্থাৎ এটি অল্প সীমিত সংখ্যক সমস্যা-সমাধান কৌশল নিয়ে গঠিত যা ব্যাপক পরিসরের বৈজ্ঞানিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা যাবে। ভালো তত্ত্বের আরেকটি গুন হলো তা এমন কয়েকটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে যেগুলো আলাদাভাবে পরীক্ষা করা যায়।

বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিবর্তন
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির চুড়ান্ত ফলাফল নয় কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব। অনুমানের মতোই তত্ত্বও প্রমাণ করা যেতে পারে বা বাতিল হয়ে যেতে পারে। নতুন নতুন বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তত্ত্ব উন্নত হতে বা বদলেও যেতে পারে। যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুমানের সঠিকতা আরো শক্তিশালী হয়।

তত্ত্ব হলো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি। এবং সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তকে বাস্তব ব্যবহারে লাগানোর উপায়। বৈজ্ঞানিকরা তত্ত্ব ব্যবহার করে নতুন নতুন উদ্ভাবন করেন বা কোনো রোগের ওষুধ বানান।

অনেকে ভাবেন তত্ত্ব আইন বা নিয়মে পরিণত হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তত্ত্ব এবং নিয়মের ভিন্ন এবং আলাদা ভুমিকা আছে। আইন বা নিয়ম হলো প্রাকৃতিক জগতে পর্যবেক্ষণে ধরা পড়া কোনো কিছুর বর্ণনা। এটি ব্যাখ্যা করেনা কেন কোনো কিছু সত্য। অন্যদিকে, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত পর্যবেক্ষণগুলোকে ব্যাখা করে তত্ত্ব। অর্থাৎ প্রকৃতিতে কোনো কিছু বাস্তবে যেভাবে আছে বা ঘটে সেটা হলো আইন বা নিয়ম (NATURAL LAW)। আর সেই আইন বা নিয়মকে ব্যাখ্যা করা হয় তত্ত্ব দিয়ে। অর্থাৎ তা কীভাবে ঘটে বা কেন ঘটে সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে যেসব অনুমাণ বা ধারণা গড়ে তোলা হয় তাকেই থিওরি বা তত্ত্ব বলে।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স