আত্মশক্তি, নিজের দোষ, শিক্ষানবিশ

ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্রের শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুবাদে এখানকার স্টাফ মিটিংগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ হয় আমার। ক্যাম্পাস অফিসের সাপ্তাহিক স্টাফ মিটিংয়ের বিশেষত্ব হলো- এতে ক্যাম্পাস কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনা ছাড়াও স্টাফ ও শিক্ষানবিশদের আত্মোন্নয়ন ও জীবন গঠনের নানা বিষয়ে আলোচনা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। একেকদিন নতুন নতুন একেক বিষয়ে আলোচনা করেন সভার সভাপতি, ক্যাম্পাস’র মহাসচিব এবং ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এম হেলাল। তাঁর আলোচনার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে সাফল্য লাভের পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর করে প্রশান্তি আর সমৃদ্ধির পথে নিরাপদ ও নিশ্চিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুস্পষ্ট ধারণা ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
অনুরূপ এক স্টাফ মিটিংয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়, যা আমাদের ব্যক্তিজীবন ও কর্মক্ষেত্রে অনেক ঝামেলা ও মনোমালিন্য থেকে মুক্তি দিতে পারে। বিষয়টি হলো- অন্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে নিজের দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে সচেতন হওয়া। এ বিষয়ে খুব সাবলীল ভাষায় সহজ করে ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় যা আলোচনা করেন, তা সংক্ষেপে নিম্নে উল্লেখ করছি।
যেকোন মানুষেরই ভুল-ত্রুটি হতে পারে। কেউ যদি নিজের ভুল-ত্রুটি বুঝতে পারে এবং নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে -তাহলে তার মনের মুক্তি হয়, নিজের বিবেক-বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি সুদৃঢ় হয়, আত্মশক্তি অটুট থাকে, সাবলীল থাকে স্রষ্টার রহমত ও নৈকট্য লাভ। অন্যদিকে কেউ যদি নিজের ভুল স্বীকার না করে অন্যের ভুল নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকে, তাহলে তার নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ নষ্ট হয়ে যায় বলে কখনোই সে সংশোধন হয় না; পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ছাড়াও অহমিকা ও অনধিকার চর্চার অবক্ষয়ে পড়ে তার নিজের ক্ষতি হতে থাকে বিভিন্নমুখী; মানুষের তিরস্কারের পাশাপাশি স্রষ্টার অভিশাপও হয়ে ওঠে অনিবার্য।
নিজের ভুল স্বীকার না করে অন্যের ভুল ধরায় ব্যস্ত থাকলে নিজের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, তা তাৎক্ষণিক না বুঝলেও পরে ঠিকই টের পাওয়া যায়। অন্যের ভুল ধরতে থাকলে নিজের মধ্যে ঘবমধঃরারঃু’র সৃষ্টি হয় এবং ঘবমধঃরাব চিন্তায় ব্যস্ত থাকার ফলে মনের কলুষতা ও খারাপ চিন্তার প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে সে ব্যক্তি মন্দ চিন্তায় আচ্ছন্ন, উদ্বিগ্নতা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার আশপাশে সব খারাপ বা ঘবমধঃরাব ঘটনা ঘটতে থাকে। এসবই একজন মানুষের উন্নতির পথে বড় বাধা।
মানুষ যদি অন্যের দোষ ধরার আগে নিজের কী দোষ-ত্রুটি আছে তা নিয়ে চিন্তা করে এবং তা শোধরানোর বিষয়ে সিরিয়াস হয়ে যায়, তাহলে সে নিজের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারে; নিজের ভুলগুলো চলে যায় এবং পরবর্তীতে আর সেই ভুলগুলো সে না করার চেষ্টা করে। এভাবে সে ধীরে ধীরে নিজেকে সংশোধন করে এবং আত্মসংশোধন ও আত্মউন্নয়ন করতে করতেই সে একজন বড় মাপের মানুষ হয়ে ওঠে।
কর্মক্ষেত্রে প্রায়শই ঞবধস ড়িৎশ বা দলবদ্ধভাবে কাজ করতে হয়। এরূপ কাজে কিছু ভুল হয়ে যেতে পারে। তখন সে কাজে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকে সাধারণত নিজকে ত্রুটিমুক্ত দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে সে সরাসরি কিংবা ইনিয়ে-বিনিয়ে  বোঝাতে থাকে- সে নয়, অন্যে সে ভুলের জন্য দায়ী। অথচ সে নিজে অনুভব করার চেষ্টাই করে না যে, তার নিজের কী দায়িত্ব ছিল বা নিজের কী ত্রুটি হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সে ব্যক্তিই বড় মানুষ ও বড় কর্মকর্তা হয়ে ওঠে, যে এভাবে চিন্তা করতে পারেÑ দলের সদস্য হিসেবে অন্যের ভুলের দায় কিছুটা হলেও আমার ওপর বর্তায়। আর যে ভুল করেছে, সে যদি ভুল স্বীকার না করে -তাহলে তা বড় ধরনের অন্যায়। এর ফলে সে নিজে কখনও নির্ভুলভাবে কাজ করতে শিখবে না; আবার অন্যায় করতে করতে বা মিথ্যা বলতে বলতে সে হয়ে পড়বে নেতিবাচক চিন্তার অসৎ মানুষ। এমন ব্যক্তির জীবন কখনও সফল কিংবা শান্তির হতে পারে না এবং এ ধরনের মানুষকে সবাই আড়রফ করে চলতে চায়।
তাই কেউ যদি নিজের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে সচেতন হয় এবং অন্যের দোষ না ধরে বরং নিজকে সংশোধন করার চেষ্টা করে, নিজের দায়িত্বের ব্যাপারে সর্বদা সজাগ থাকে তাহলে সে অবশ্যই জীবনে দক্ষ ও সফল হতে পারবে। সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি এভাবে নিজের দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে সচেতন হয়, তাহলে সমাজে সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তির সংখ্যা বাড়বে এবং দুর্নীতিবাজ লোকের সংখ্যা কমবে। ফলে সমাজে ন্যায়-নিষ্ঠা ও সততা প্রতিষ্ঠিত হবে; সমাজ হবে সহনশীল-হানাহানিমুক্ত, দেশ ও জাতি হবে উন্নত।
এভাবেই, অন্যের ওপর দোষ চাপালে এবং অন্যের দোষ ধরতে থাকলে শুধু আরেকজনের নয়, নিজেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নিজের দোষ স্বীকার না করে অন্যের দোষ নিয়ে মাথা ঘামালে রাজনৈতিক অরাজকতা, প্রতিহিংসা ও সন্ত্রাসের সৃষ্টি হয় এবং তা একটি সমাজ তথা রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
ক্যাম্পাস’র উক্ত মিটিং থেকে যা শিখেছি, তা আমার জীবনে কাজে লাগাবো ইন্শাল্লাহ। আশা করি, পাঠকরাও ক্যাম্পাস’র এ দর্শনের সহযাত্রী হবেন। আমাদের সবার অনুরূপ চর্চার ফলে জাতীয় বিভেদ ও সহিংসতা কমে গিয়ে আমরাও অন্যান্য উন্নত ও সভ্য জাতির কাতারে দাঁড়াতে পারব -ইনশাল্লাহ্।

আনতারা রাইসা হেলাল