থার্ড ক্লাস শিক্ষক,ক্লাস শিক্ষক,শিক্ষক

অন্যান্য উপাদান-উপকরণ সঠিক থাকলেও ভাল শিক্ষক না থাকলে ভাল শিক্ষা অসম্ভব। একজন ভাল ছাত্রকেও সুসজ্জিত ক্লাসরুম, বই, খাতা, কলমসহ সকল শিক্ষা উপকরণ দেয়া হলেও; ভাল শিক্ষক দেয়া না হলে তার পক্ষে যথাযথ শিক্ষাগ্রহণ সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীর সুপ্ত চিন্তাকে জাগিয়ে দেয়ার দায়িত্ব পালন করাই শিক্ষকের কাজ। এ কাজ অত্যন্ত জটিল শিক্ষার্থী ভেদে বিচিত্র মন-মানসিকতা ও গ্রহণ ক্ষমতা বুঝে একেকজনকে একেক কৌশলে আয়ত্ত করাতে হয় শিক্ষার বিষয়। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের যোগ্যতা যতবেশি হবে শিক্ষার্থী তত বেশি মনোযোগী হবে- লাভবান হবে। শিক্ষকের থাকা চাই অনুসরণীয়, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। শিক্ষার বৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষক।
অথচ আমাদের দেশে শিক্ষকের আর্থিক সুবিধা কম ও নিয়োগ দুর্নীতির কারণে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মানসম্পন্ন শিক্ষকের খুবই অভাব। ফলে শিক্ষার মানও যে কোন দেশের তুলনায় নিম্ন। শিক্ষক হবার মত ভাল ছাত্র নয়; অর্থাৎ জ্ঞান, মেধা পাঠ অভ্যাস, সততা, ধৈর্য, নীতি-আদর্শ, আচার-আচরণ, চলন-বলন নেই এমন অনেকেই এ দেশে শিক্ষক পদে আসিন। তারা অনেকেই স্বভাবে ও অভাবে যুক্ত শিক্ষাবহির্ভূত কর্মে। ক্লাস ফাঁকি দিতে এদের বিবেকে বাধে না। পরীক্ষায় নকলে সহায়তা করে এরা আনন্দ পান।
এসব শিক্ষকের ছাত্র-জীবনের দিকে তাকালে দেখা যাবে দু’-একজন ব্যতীত প্রায় সবারই ফলাফল তেমন উজ্জ্বল নয়। তিনি যে ক্লাসে পড়তেন সে ক্লাসের ভাল ফলাফলধারী ছাত্র-ছাত্রীরা চলে গেছেন অন্যান্য চাকরিতে অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের নিশ্চয়তা নিয়ে। আর আমার মত মন্দ ফলাফলের অধিকারী অযোগ্যরাই অবশেষে চেষ্টা তদবির করে, নেতা-নেত্রী ধরে বা অর্থ ব্যয় করে নাম লিখিয়েছে শিক্ষকতায় বিশেষ করে বেসরকারি মাদ্রাসা-স্কুল-কলেজে। আন্তরিক অনিচ্ছায় জীবনের তাগিদে আসা এই শিক্ষকতা কর্মে অযোগ্যতা তো আছেই। আমি নিশ্চিত শিক্ষকের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করে ক্লাসের সবচেয়ে ট্যালেন্ট ছাত্রটিকে শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারলে সে আমার চেয়ে ভাল শিক্ষক হবেই। কারণ তার মধা আমার চেয়ে বেশি। প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষমতাও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কোন কোন খারাপ রেজাল্টধারীরও পাঠদান ক্ষমতা ভাল হতে পারে আন্তরিক প্রচেষ্টায়। আবার অত্যন্ত ভাল রেজাল্টধারী শিক্ষকও আছেন (বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে) যিনি ক্লাসে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এই ব্যর্থতার কারণ কম জানা নয়- অন্যান্য অযোগ্যতা, যা নিয়োগের আগে যাচাই করা হয়নি। এসব বিতর্কের পরও একটি সত্য সুস্পষ্ট যে, মন্দ ছাত্র ভাল শিক্ষক হবার সম্ভাবনার চেয়ে ভাল ছাত্র ভাল শিক্ষক হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
এই সত্যের আলোকেই হয়ত গত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, শিক্ষাজীবনে ৩য় বিভাগ/ শ্রেণি প্রাপ্তরা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হতে পারবে না। এ মর্মে শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সঙ্গে সরকারের একটি চুক্তিও সম্পাদিত বাস্তবায়িত হয়েছিল। গত ২ এপ্রিল ২০০৩ তারিখে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতাদের সাক্ষাতে শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক ঐ চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। ফলে বর্তমানে একটি তৃতীয় বিভাগ শ্রেণিপ্রাপ্তরাও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হতে পারবেন। বর্তমান সিদ্ধান্তটি শিক্ষার মান উন্নয়নের অন্তরায় বলে মনে করেন অনেকেই। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিশেষ করে মফস্বলে) তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণীধারী শিক্ষকের সংখ্যা অনেক। আরও তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্তরা ঢোকার সুযোগ পেলে অবস্থা এতই খারাপ হবে যে, প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও বেশির ভাগ শিক্ষকদের কাক্সিক্ষত মানে উন্নতি করা সম্ভব হবে না কোনদিনই। অনেকেই যুক্তি দিচ্ছেন- তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্তরা আবেদন করার সুযোগ পেলে দোষ কী? প্রথম-দ্বিতীয় বিভাগ/ শ্রেণিপ্রাপ্তদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকলে শিক্ষক হবে। না টিকলে হবে না। বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই যুক্তি অযৌক্তিক। যেখানে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য বাছাই সংক্রান্ত তেমন মানসম্পন্ন কোন বিধিমালা তৈরি না করেই নিয়োগের ক্ষমতা দলীয় পরিচালনা কমিটির হাতে ন্যস্ত; সেখানে জ্ঞানের প্রতিযোগিতার সুযোগ কই? যেখানে শিক্ষক বাছাইয়ের জন্য কমিটি প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা ও ডেমোনেস্ট্রেশন ক্লাস টেস্ট গ্রহণে বাধ্য নয় এবং শিক্ষা সনদে প্রাপ্ত নম্বরের তুলনা করতে বাধ্য নয়; এমনকি বয়সসীমা মানতেও বাধ্য নয়, সেখানে সভাপতির দলের কর্মী ক্যাডারের (যতই তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্ত হোক) চেয়ে যোগ্য কে হবে তার দৃষ্টিতে? মোটা অংকের টাকা দিলে তো আর কথাই নেই। একজন থার্ডক্লাসের কর্মসংস্থানের জন্য এলাকার হাজার সন্তানের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার। পুরো এলাকায় পড়বে তার অযোগ্যতার কুপ্রভাব।
এলাকার সাধারণ মানুষ এই পরিণতি বোঝে না বলেই প্রতিরোধ করে না এসব অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগে। শুধু শিক্ষক নয়, প্রতিষ্ঠান প্রধানও হয়ত হবেন তৃতীয় বিভাগ/ শ্রেণিধারীরা এই সুযোগে। যিনি তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি নিয়েই বসে আছেন, মানোন্নয়ন করার যোগ্যতা-মানসিকতা ছিল না- নেই; তাকে শিক্ষক বানানোর পক্ষে যুক্তি কী? এখন তো সব পরীক্ষায় প্রথম-দ্বিতীয় বিভাগ/ শ্রেণীপ্রাপ্ত প্রার্থীরই অভাব নেই।
তৃতীয় বিভাগ/ শ্রেণিপ্রাপ্তদের নিয়োগের সুযোগ না থাকলে নিয়োগ কমিটির দুর্নীতিটাও থার্ডক্লাস পর্যায়ে নামবার সুযোগ থাকত না। ফলে তুলনামূলক ভাল শিক্ষক নিয়োগের সম্ভাবনা বেশি থাকত। যারা এই থার্ডক্লাস শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ দিয়েছেন, তাদের সন্তানরা হয়তো ফার্স্টক্লাস প্রাপ্ত শিক্ষকেরই ছাত্র-ছাত্রী। আমরা যারা হতদরিদ্র মফস্বলবাসী তাদের জন্য এই থার্ডক্লাস শিক্ষক। আমরা কিন্তু সংখ্যায় অনেক বেশি। দেশের বেশিরভাগ শিক্ষক-শিক্ষার্থী অযোগ্য রেখে হাতেগোনা লোক দিয়ে অগ্রগতি অসম্ভব। একজন অযোগ্য শিক্ষক যারা জীবনে তৈরি করে অসংখ্য অযোগ্য নাগরিক- যা দেশের জন্য সীমাহীন অকল্যাণ। যোগ্য নাগরিক কর্মী তৈরির কারখানা-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি অযোগ্য শিক্ষকের কারণে তৈরি হতেই থাকে অযোগ্য নাগরিক; তো অবশ্যই বাধাপ্রাপ্ত হবে সকল অগ্রগতি, আরও বেশি ধেয়ে আসবে দুর্নীতি-বেকারত্ব-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, বিপন্ন হবে জাতীয় অস্তিত্ব। মনে রাখতে হবে, যোগ্য আমলা-নেতা-এমপি-মন্ত্রী-বিজ্ঞানী-ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-আইনবিদ-বিচারক-সাংবাদিক-লেখক-শ্রমিক-কর্মচারী সবই তৈরির পূর্বশর্ত সুযোগ্য শিক্ষক।
আমাদের দেশে যেহেতু বেশিরভাগ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় সেহেতু বেশিরভাগ যোগ্য নাগরিক কর্মী তৈরির প্রয়োজনেই বিশেষ নজর দেয়া উচিত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে। অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা; যাতে ভাল ছাত্রটি সাগ্রহে আসতে চায় শিক্ষকতায়। বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক। প্রশিক্ষণ ব্যতীত কোন কাজেই পূর্ণদক্ষতা প্রয়োগ সম্ভব নয়। তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্তদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া আর কোনক্রমেই উচিত নয়। তদুপরি বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা হওয়া উচিত জাতীয়ভাবে বিশেষ বিসিএস এর মাধ্যমে। পরীক্ষায় নকলের সুযোগ বেশি থাকলে ভাল(?) ফলাফলের জন্য ভাল শিক্ষকের প্রয়োজন পড়ে না। এটি এ দেশে প্রমাণিত। পরীক্ষায় নকলের সুযোগ না থাকলে ভাল ফলাফলের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন ভাল শিক্ষক। বর্তমান দলীয় কমিটির হাতে নিয়োগ ক্ষমতা রেখে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের আশা অর্থহীন। যে জাতির শিক্ষক যত বেশি যোগ্য সে জাতির ভবিষ্যৎ তত বেশি উজ্জ্বল।

আখতার হামিদ খান