ইংরেজির দাপট, বিশ্ব,ইংরেজি

বিটিভি’র কোনও একটি আনুষ্ঠানকে একুশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রসেফর এমাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বলেছিলেন ইংরেজি দাপটে বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভাষা বিলুপ্ত হতে পারে। মাত্র ৪০ কোটি লোকের মুখের ভাষা ইংরেজি হলেও বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ ইংরেজি শেখার জন্য পাগল। বলা বাহুল্য এই পাগলামির কাতার থেকে আমরাও বিযুক্ত নই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি বলেছেন, আমাদের ভাষার জন্য তেমন আশংকা নেই। বাংলা বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা। এই ২৮ কোটি মানুষের ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। দেশে ৫৭টি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কেউ হয় তো বাংলাকে ২য় ভাষার মর্যাদায় টেনে আনতে পারে। বস্তুত বাংলা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা হলেও এ ভাষার অসামান্য জোর আছে। ইংরেজ আসার আগেও এ ভাষার জোর ছিল। ইংরেজরা আসার পর আরো নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। প্রথম স্বাধীন হলে ইংরেজিটাকে বেশি গুরুত্ব দিলাম। পরে অবশ্য ভাষা পরিকল্পনায় সুদূরপ্রসারী হতে পারিনি। ড. এমাজউদ্দীনের বক্তব্য হলো মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা শেখা অপরিহার্য। হয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে স্থান দিতে হবে। পারতপক্ষে ভাষা পরিকল্পনায় আমাদের সংশ্লেষণের পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে হবে। অনুষ্ঠানে প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেছেন, একটা অগ্রসরমান জাতিকে স্রোত এবং প্রতিস্রোতের ভেতর দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। বর্তমান বিশ্বে ১৯১টি জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। ২০০টি ভাষায় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। চিন্তার ক্ষেত্রে বাংলা মোটেই পিছিয়ে নেই। যেকোনও ইউরোপীয় রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা তার মাতৃভাষা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ মাতৃভাষাই হয়েছে। ২য় ভাষা হিসেবে আমরা ইংরেজিকে নিতে পারি। এটমিক এনার্জি সেন্টার বা বাংলা একাডেমি এতে আরও শক্তিশালী হবে। প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক বিটিভিতে একুশের অনুষ্ঠানে অনুবাদ সাহিত্যের কথা বলেছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তবে বাংলা ভাষার অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব সম্পর্কে একই দিনে বা ১৫ সেপ্টেম্বর ভয়েস অব আমেরিকা বেতার কেন্দ্রে তিনজন বাংলা ভাষার পন্ডিত ব্যক্তি যে অভিমত প্রকাশ করেছেন তাতে হতাশ হতে হয়। ভাষার এই অনুষ্ঠানে অনুবাদ সম্পর্কে মূল্যবান মতামত রেখেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিখ্যাত পন্ডিত দীর্ঘদিন কেমব্রিজ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী ড. গোলাম মোরশেদ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযুক্তা দাসগুপ্তা এবং বাংলা ভাষার দক্ষ বিদেশী পন্ডিত ড. সিলি যিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিখেছেন কলকাতায় বসে।
অনুবাদ সম্পর্কে বর্তমান বাংলাদেশের পারফরমেন্স নিয়ে ড. গোলাম মোরশেদ মোটেই আশাবাদী নন। যদিও অনুবাদ ছাড়া বিশ্বদরবারে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতি তুলে ধরার কোনও বিকল্প পথ নেই। ড. মোরশেদ বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ না করলে নোবেল পুরস্কার পেতেন না। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলি অনুবাদ করেছেন ইংরেজি গদ্যে। এক্ষেত্রে তিনি উতরে গেলেও রবীন্দ্রনাথ ‘কবিরের দোহা বাগান যে অনুবাদ করেছেন তা অতি নি¤œমানের। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ড. মোরশেদ বলেছেন, অনুবাদ একটা মহৎ শিল্প। এটা আক্ষরিক তরজমা নয়, ট্রান্সফার অব আইডিয়া। অনুবাদের মাধ্যমে আমাদের আইডিয়া ট্রান্সফার সার্থকতভাবে উঠছে না। ড. মোরশেদ বলেন, কবির চৌধুরী যা অনুবাদ করেছেন তা মোটেই মানসম্মত হয়নি। ড. মোরশেদ স্পষ্টভাবেই বলেছেন, খারাপ অনুবাদের চেয়ে অনুবাদ না করাই ভাল। ভাল অনুবাদ করতে পারলে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয়া যেতো। ড. সংযুক্তা দাসগুপ্তা বলেছেন, কলকাতা সাহিত্য একাডেমি সব নয়, কিছু ভাল অনুবাদ করেছে। সফল অনুবাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য বিভাগকে দায়িত্ব দেয়ার কথা বলেছেন ড. সংযুক্তা দাসগুপ্তা। এ ব্যাপারে ড. সিলি বলেন, দল বেঁধে তরজমা সার্থক হবে না। ড. সিলির বক্তব্য হলো বাংলা ভাষায় ১০ জনের বেশি অনুবাদক আছে বলে আমি মনে করি না। বরং ইংরেজিভাষী বাংলা জেনে পরে ভাল ইংরেজি অনুবাদ সম্ভব হবে। সংযুক্তা দাসগুপ্তা বলেন, ফরাসি বা রুশ উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে সার্থকভাবে। বস্তুত একটা সংস্কৃতির প্রতি যদি কোনও জনগোষ্ঠীর আগ্রহ থাকে তবে টার্গেট পাঠক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। তবে যথার্থ অনুবাদের মাধ্যমে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হয়। পদ্মা নদীর মাঝি এবং তসলিমা নাসরিনের ফরাসি প্রেমিক অনুবাদ হয়েছে অতি নিম্নমানের। অপরদিকে দীর্ঘকাল বিদেশে থাকার সুবাদে মনিকা আলী সার্থক অনুবাদ করতে পেরেছেন। ড. মোরশেদ বলছেন, অনুবাদ হচ্ছে না বলে বিদেশীরা আগ্রহী হচ্ছে না। লুনা রুশদী বড় হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। তিনি কিন্তু জীবনানন্দের সার্থক অনুবাদ করেছেন। মার্কিন কবি কারোলিন রাইট অনুরাধার সাহিত্য অনুবাদ সার্থক হয়েছে। ড. সিলি জীবনানন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বিষাদ সিন্ধু ও রিজিয়া রহমানের উপন্যাসের সার্থক অনুবাদ করেছেন। অথচ কবির চৌধুরীর নজরুলের অনুবাদ পণ্ড শ্রম হয়েছে। সাহিত্যকে অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সব কিছুর মূলে রয়েছে সার্বজজনীন ভাব বিনিময়। যুগকাল পাত্রের ঊর্ধ্বে মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ে নিবিড় যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো সাহিত্য। সাহিত্যের মাধ্যমে জাতির সাথে জাতির, মানুষের সাথে মানুষের হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনুবাদ সাহিত্য এক ভাষার ভাব সম্পদ অন্য ভাষায় সঞ্চারিত করে। মানব জাতি এবং মানব সভ্যতার চলমান ধারা এক এক উন্নত জাতির সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে বিধৃত হয়। প্রাচীন বিশ্বের গ্রীক সভ্যতার ও সংস্কৃতির একটা পরিচয় বিধৃত হয়েছে ইলিয়ড ও ওডেসি নামক মহাকাব্যদ্বয়ে। প্রাচীন ভারতের জীবনব্যবস্থার মহা আলেখ্য হলো রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যদ্বয়। বৃহত্তম অর্থে পৃথিবীর ধর্মগ্রন্থগুলো সাহিত্যেরই নামান্তর। পৃথিবীর প্রতিটি সভ্যজাতির উন্নত ভাষা ও সাহিত্য রয়েছে। একটি ভাষা উন্নতির চরম শিখরে উঠতে পারে তার উন্নত সাহিত্যিক গুণের হিব্রু, আরব, খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, চীনা, পারসিক জাতির রয়েছে উন্নত সাহিত্য। সে সমৃদ্ধ প্রাচীন সাহিত্য ভাষান্তরের মাধ্যমে আধুনিক বিশ্ব সভ্যতার প্রসার লাভ ঘটেছে। তবে আধুনিককালে বিজ্ঞান ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে অনুবাদ, মুদ্রণ ও প্রকাশনার কাজ অনেক সহজ ও সুবিস্তৃত হয়েছে। ভাষা ও সাহিত্যক্ষেত্রে পারস্পরিক লেনদেনের মাধ্যমে অনেক প্রসারিত হয়েছে। উন্নততর ভাষা ভাব ও চেতনার সংস্পর্শে জাতীয় চেতনা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ভাষার শব্দ ভান্ডারও স্ফীত সুসমৃদ্ধ হয়।
সাহিত্যের রস সৌন্দর্য পরম উপভোগ্য বটে তবে সাহিত্যের স্বরূপ প্রকৃতি নির্দেশ করা বেশ কঠিন। মানুষকে ঘিরে আছে এক অখণ্ড জীবনপ্রবাহ আর বিচিত্র সুন্দর বিশ্ব প্রকৃতি। আমরা প্রতিনিয়ত এখানে লাভ করি অজস্র নরনারী ও বহিঃপ্রকৃতির সান্নিধ্য। প্রকৃতির রহস্যের দ্বার উন্মোচন করে তাকে আপনার কাজে লাগাবার জন্য মানুষের বুদ্ধির কত খেলা। এ বুদ্ধির ক্ষেত্রটি যত প্রসারিত হচ্ছে ততই ঘটছে মানুষের জ্ঞানের প্রসার। এ জ্ঞান সার্থক হয়ে ওঠে নিত্য নতুন তথ্য ও তত্ত্বের আবিষ্কারে। মানুষ তাই গড়ে তোলে দর্শন, বিজ্ঞানের বিশাল সৌধ কাব্য ও সাহিত্যের সুবিশাল রাজ্য। দিন যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই বিশ্ব প্রকৃতির রূপ ও জীবনের রহস্য বেশি ধরা পড়ছে।
তবে সাহিত্যের সৃষ্টি শাশ্বত কালের জন্য। Art for art’s sake কথাটির চেয়ে Art is meant for life not art alone কথাটির অধিক গুরুত্ব। বিশেষ প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে বা  সাহিত্য সৃষ্ট তার প্রয়োজন শেষ হবার সাথে সাথে সাহিত্যের মৃত্যু হয়। প্রকৃত শাশ্বত সাহিত্যের মাঝে এমন একটা সঞ্জীবনী ধারা প্রবাহিত হয় যা মরুকেও রূপময় সবুজে পরিণত করে।
হীনতা, দীনতা নিরাশা ও দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার অমোঘ শক্তি সাহিত্য দান করে। ভলটেয়ার, রুশোর সাহিত্য স্বেচ্ছাচারী রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ হয়েছিল। সাহিত্য মানুষকে সৎ পথের সন্ধান দেয়। আবার বিভ্রান্তও করে, যুক্তরাষ্ট্রে বালিকা হত্যার আসামী বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, উপন্যাসের হত্যা রোমাঞ্চকর অনূভূতি, টিভিতে খুনের মোহময় দৃশ্য আমার মনে হত্যার প্রবল আকাক্সক্ষা জাগায়। মানবকল্যাণে সাহিত্যের বিরাট অবদান রয়েছে। মহৎ সাহিত্য কেবল রসাস্বাদন নয় সত্য, সুন্দর ও কল্যাণ আদর্শের পথ দেখাতে পারে। সাহিত্য মানুষকে জাতীয়তা বোধেও উদ্বৃদ্ধ করে। সাহিত্য জীবনের দর্পণ। বাংলা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। ভাষাভাষির দিক থেকে বাংলা বিশ্বে চতুর্থ স্থানীয়। ২৮ কোটি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ ভাষায় রয়েছে উন্নত সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য নোবেল পুরস্কারও পর্যন্ত পেয়েছে। বাংলা একটা স্বাধীন সার্বভৌম জনগোষ্ঠীর ভাষা। তবুও কেন নতুন প্রজন্ম ইংরেজি শিখছে এবং বলছে হিন্দি। তবে একুশ কি আনুষ্ঠানিকতার বাক্সে বন্দি? এ প্রশ্নের উত্তর গবেষণা সাপেক্ষ। বাংলা ভাষার এবং বাঙালি জাতির রয়েছে একটা গর্বিত ইতিহাস। এ ইতিহাস একুশে ফেব্রুয়ারির ভিতর সীমাবদ্ধ নয়। একুশ আমাদের গর্ব। কিন্তু এ গর্বের ধারাবাহিকতাকে বুঝতে হবে। ভাষা আন্দোলন বা স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল ইতিহাসের অমোঘ পরিণতি। কোনও ব্যক্তি বা দল এ পরিণতি লাভে অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উদ্দেশ্য নয়, উপলক্ষ মাত্র। তাই ভাষা আন্দোলনকে একুশের গন্ডির ভিতর কিংবা ফেব্রুয়ারির সীমিত পরিসরে পুরে রাখলে চলবে না। এ ভাষা আন্দোলনের রয়েছে বর্ণাঢ্য অতীত এবং ধারাবাহিক ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পূর্বেই ভারতবর্ষে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সূচিত হয়েছিল বাংলা ভাষার দাবি। যার চূড়ান্ত পর্ব ছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বা ৮ ফাল্গুন। উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাব করেন ১৯১১ সালে রংপুরে সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী এক শিক্ষা সম্মেলনে। ভারতে তখন ভাষার সংখ্যা ২শ’র কাছাকাছি। প্রথম প্রশ্ন তোলেন এম কে গান্ধী। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জবাব দিয়েছিলেন, ‘ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে একমাত্র হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করা সম্ভব।’ নিয়তির কি পরিহাস এই কবি হলেন, বাংলা ভাষার ভক্ত সাধক, বাংলা কাব্যে পেয়েছিলেন তিনি নোবেল পুরস্কার। এ সময় ‘বিশ্ব-ভারতীতে’ কবি রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় হিন্দি ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯২১ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী লিখিত এক প্রস্তাবে বলেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা যাই হোক, বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলা ভাষাকে। এরপর মাওলানা আকরম খাঁ ১৯৩৭ সালে দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয়তে রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলার প্রতি জোর দাবি জানান। ১৯৪০-৪৩ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলা সাহিত্য সংসদে বহুবার রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার কথা আলোচিত হয়েছে। এ সময় রেনেসাঁ সোসাইটির উৎসাহী সমর্থক কবি ফররুখ আহমদ বাংলার সমর্থনে এবং এক শ্রেণির উর্দু প্রেমিক বঙ্গ সন্তানদের তীব্র সমালোচনা করে উর্দু বনাম বাংলা শীর্ষক ব্যঙ্গ সনেট রচনা করেন।
‘দুইশ’ পঁচিশ মুদ্রা সে অবধি হয়েছে বেতন বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকে করিয়াছি নিকা বা পণ্ডশ্রমের ফলে উড়েছে আশার চামচিকা উর্দু নীল আভিজাত্যে (জানে তা নিকট বন্ধু জন)।
এভাবে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার পূর্ব থেকেই হিন্দু এবং উর্দুর তুমুল লড়াইয়ের বৈরী পরিবেশে এ দেশের সচেতন বুদ্ধিজীবী, সংবাদিক ও শিক্ষাবিদগণ সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিকে বলিষ্ঠ এবং যৌক্তিকভাবে তুলে ধরেছিলেন।
১৯৪৭ সালের ৩০ জুন দৈনিক আজাদে ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ নামে প্রবন্ধ ছাপেন আব্দুল হক। উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের পক্ষে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিলে ২৯ জুলাই তার প্রতিবাদে ড. শহীদুল্লাহ প্রবন্ধে লেখেন, ‘কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দির অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদ কামনাই হইবে।’
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৬ দিন পর ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ আবুল কাসেমের নেতৃত্বে ‘পাকিস্তান তমুদ্দুন মজলিস’ গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১১ নভেম্বর তমুদ্দুন মজলিম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৭ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রাণ দিয়ে বাঙালী জাতি যে ইতিহাস গড়েছে তার স্বীকৃতি জাতিসংঘ দিতে কসুর করেনি। তবুও বাংলা ভাষা আজও দৈন্য মুক্ত হতে পারেনি। চিকিৎসা আইন বা প্রকৌশলী বিদ্যার প্রয়োজনীয় শব্দ ভা-ার বাংলা ভাষা আজও মজুত করতে পারেনি।
গত শতাব্দীতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণে যে কাজ হয়েছে, এ শতাব্দীতে তার লক্ষণ মিলছে না কেন? জীবনের প্রয়োজনে, টিকে থাকার জন্য বিশ্বায়নের এক যুগে স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রজন্ম ঝুঁকে পড়েছে ইংরেজির দিকে। অপরদিকে আকাশ সংস্কৃতির আশীর্বাদে তারা হিন্দি বলায় হয়ে উঠেছে অভ্যস্ত- এ অবস্থায় নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা চর্চা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। যার ফলে একুশ এখন অনুষ্ঠান-বিবৃতি, সভা-সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। একুশ চলে গেলেই একুশের চেতনা আর কারো মাঝে লক্ষ্য করা যায় না। তবে সারা বছর একুশের খোঁজ না থাকলেও একুশ এলেই কোনও কোনও মহলের আনুষ্ঠানিকতার আধিক্য বেশ লক্ষ্য করা যায়। আর এ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সচেতন মহলকে মন্তব্য করতে শোনা যায়, ‘সারা বছর ফরজ মানার গরজ নেই অথচ কুরবানির সময় বড় গরুটা কুরবানি দেয়া চাই’।

আখতার হামিদ খান