ইসলামী জ্ঞান ,মুসলিম নারী,উম্মে আইরিন

রসুল মুহম্মদ (সঃ)-এর আবির্ভাব কালে বিশ্বের নারী বিশেষ করে আরবের নারী সমাজ ছিল চরমভাবে অবহেলিত। উপযুক্ত শিক্ষা ও সমাজ চেতনা বোধ বিবর্জিত নারী সমাজ ছিল চরম জাহেলিয়াত ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত।কিন্তু রসুল (সঃ) কর্তৃক একটি সামগ্রিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর পুরুষের সাথে নারী সমাজ নব চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি উত্তম জাতি গঠনে পুরুষের পাশে এস দাঁড়াল। রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সংস্পর্শে এসে বদ্ধ নারী সমাজে শিক্ষা অর্জন বিশেষ করে দ্বীন শেখার চেতনার বহ্নি জ্বলে উঠেছিল। যার ফলে তাঁরা দ্বীনের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানের অধিকারিনী হয়েছিলেন।
দ্বীন শেখার ব্যাপারে গভীর চেতনার অধিকারিনী এক নারী রসুলের খেদমতে হাজির হয়ে বললেন,“হে রসুল(সঃ)!আপনার সমস্ত শিক্ষা দীক্ষা (তালিম ও তরবিয়ত) এ সব পুরুষদের অংশে পড়েছে, আমাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করুন, সে দিন আপনি আমাদেরকে আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তা শিক্ষা দেবেন। রসুল (সঃ) বললেন: অমুক দিন তোমরা সকলে একত্রিত হবে, সুতরাং তারা একত্রিত হয় এবং নবী (সঃ) তাদেরকে আল্লাহর হেদায়াত শিক্ষা দেন এবং এ কথাও বলেন, যে মহিলার তিনটি ছেলে মারা যাবে এবং সে সবর করে থাকে, এ ছেলে তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর মাধ্যম হবে। তখন এক মহিলা জিজ্ঞেস করল, যদি দু’টি ছেলে মারা যায় তা হলে? দ’ুটি ছেলের ব্যাপারে একই কথা। (বোখারী, মুসলিম)
রসুল (সঃ)-এর কালের মহিলারা যে শুধু দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্খাই করেছেন তাই নয়, বরং তাঁরা নবী (সঃ)-এর নির্দেশ মতো জীবন পরিচালনার উদ্দেশ্যে তার কাছে নিজদেরকে পেশ করার জন্য আকাক্সক্ষাও পেশ করেছেন।
যেমন হযরত উমাইমা বিনতে রুকাইকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ আমি মহিলাদের এক সমাবেশে রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট বাইয়াত গ্রহণ করি। তখন নবী করীম (সঃ) আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন , আমি তোমাদের থেকে সে সব বিষয়ের বাইয়াত গ্রহণ করেছি যা তোমাদের সাধ্যে কুলাবে।’ আমি বল্লাম, আমাদের নিজেদের চেয়ে আল্লাহ ও তাঁর রসুল আমাদের প্রতি অধিক দয়াশীল।
আমি আরো বল্লাম, হে আল্লাহর রসুল, আমাদের বাইয়াত অর্থাৎ আমাদের মুসাহাফা গ্রহণ করুন। তিনি বল্লেন, আমার একশত মহিলা হতে বাইয়াত গ্রহণ করা এক জন মহিলা হতে বাইয়াত গ্রহণ করার মতই। (মিশকাত)
হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সঃ)-এর হাত কখনও কোন পরনারীর শরীর স্পর্শ করেনি। তিনি নারীদের নিকট হতে মৌখিক বাইয়াত গ্রহণ করতেন।
বিশ্বনবী মুহম্মদ (সঃ) ফরমাইয়াছেন: “জ্ঞানান্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর উপরে ফরজ” ইসলাম নারী শিক্ষার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। এই উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়ে হযরত আয়েশা (রাঃ) ছয় লক্ষ হাদিস ও গোটা কোরআন শরীফ মুখস্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও মেধাবী শিক্ষয়িত্রী । তিনি শুধু নারীদেরকেই নয়, পুরুষদেরকেও শিক্ষাদান করতেন। হযরত আয়েশা (রাঃ) এত শিক্ষিতা ছিলেন যে হযরত রসুল(সঃ) বলেছেন, “তোমরা হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে তোমাদের ধর্মের এক অর্ধাংশ শিখে নাও।
বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ইসলামের সে যুগে নারীরা শিক্ষা ও জ্ঞান বিজ্ঞানে পন্ডিত ছিলেন। ১৫৪৩ জন মহিলা সাহাবী ছিলেন, যারা শিক্ষা -দীক্ষা, সভ্যতা, চিকিৎসা-বিদ্যা বক্তৃতা কোন অংশেই পুরুষদের চেয়ে কম ছিলেন না। মহানবী (সঃ)-এর মহান যুগেমহিলাগণ ইলমে হাদিসের উন্নতির শুধু কারণই ছিলেন না, বরং পুরুষদেরকে নিজেদের বরাত দিয়ে অজস্র হাদিস পৌঁছে দিয়েছেন। রসুল (সঃ )-এর তিরোধানের পর তাঁর মহিয়সী সহধর্মিনীগণসহ অনেক সাহবিয়াকে হাদিসের সংরক্ষিণী মনে করা হতো। এর মধ্যে হযরত হাফসা, হযরত উম্মে হাবিবা, হযরত উম্মে সালমা (রাঃ) ও হযরত আয়েশা (রাঃ) ছিলেন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশাকে হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।
হযরত আয়েশার প্রিয় ছাত্র উরওয়া ইবনে যোবায়ের তাঁর ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারিনী হওয়ার কথা এভাবে প্রকাশ করেছেন: “আমি কোরআন, ইসলামের ফরজসমূহ, হালাল ও হারাম, কাব্য ও সাহিত্য, আরবদের ইতিহাস ও নসব নামা বিষয়ক জ্ঞানের ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর চাইতে অধিক জ্ঞানী লোক আর দেখিনি। (তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ) আমরা বিনতে আবদুর রহমান হযরত আয়েশা রাঃ)-এর একজন ছাত্রী ইবনেইমাদ হাম্বলী নিম্নোক্ত ভাষায় তার কথা উল্লেখ করেছেন: আমরা বিনতে আবদুর রহমান আনসারী ছিলেন বিজ্ঞ ফিকাহবিদ। তিনি হযরত আয়েশার কোলে লালিত পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন এবং তাঁর নিকট থেকে সর্বাপেক্ষা বেশি সংখ্যক হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি নির্ভরযোগ্য এবং মজবুত স্মৃতিশক্তি ও ধারণ ক্ষমতার অধিকারিনী। তাঁর বর্ণিত হাদিসসমূহ সর্বদা গৃহিত হতো। (শাযারাতুয্ যাহাব)
হাফেজ ইবনে হাজার উম্মে সালামা সম্পর্কে লিখেছেন: উম্মে সালামা পরমা সুন্দরী হওয়ার সাথে সাথে পরিপক্ক জ্ঞান -বুদ্ধি ও সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারিনী ছিলেন। হযরত উম্মে সালামার নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন এরূপ বত্রিশ জন রাবীর নাম ধাম বর্ণনা করার পর হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: এ ছাড়া আরো অনেক লোক তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
উম্মে সালামার কন্যা হযরত যায়নাব (রঃ) সম্পর্কে হযরত ইবনে আবদুল বার (রঃ) বলেন: তিনি তার যুগে সর্বাপেক্ষা বড় ফকীহদের অন্যতম ছিলেন।
আবু রাফে’ সায়েগ বলেন: যখনই আমি ফিকাহ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ মদিনার কোন মহিলার কথা স্মরণ করি তখনই যয়নাব বিনতে আবু সালামার কথা মনে পড়ে যায়।
উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিহা সম্পর্কে ইমাম নববী (রঃ)-এর উক্তি হলো: তিনি অত্যন্ত জ্ঞানবতী ও বুদ্ধি বিবেচনার অধিকারিনী ছিলেন।
হযরত আবু দারদার স্ত্রী উম্মে দারদার জ্ঞান ও মর্যাদা এত উচ্চ পর্যায়ের ছিল যে, ইমাম বুখারী (রঃ) তার আমল বা বাস্তব জীবনের কাজকে সহীহ বুখারী হাদিস গ্রন্থে প্রমাণ ও উদাহরণ হিসেবে পেশ করেছেন।
উম্মে আতিয়া সম্পর্কে ইমাম নববী মন্তব্য করে বলেন: তিনি জ্ঞান ও মর্যাদার অধিকারিনী সাহাবা। তিনি রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর সাথে জিহাদে শরীক হয়েছেন।
যে সব রাবী উম্মে আতিয়া থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন হাফসা বিনতে সিরীন তাদের অন্যতম। তিনি বার বছর বয়সেই কোরআন মজীদ শিক্ষা শেষ করেছিলেন। তিনি ছিলেন বসরার বাসিন্দা। বসরার অধিবাসী বিখ্যাত কাজী এবং ফকীহ ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া বলেন: আমি এমন কোন লোক দেখি নাই যাকে হাফসা বিনতে সিরীনের চেয়ে অধিক মর্যাদা দিতে পারি।
উম্মে আতিয়া সম্পর্কে আল্লামা ইবনে আবদুল বার লিখেছেন, তিনি রসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কন্যার যানাযার গোসলে শরীক ছিলেন এবং এ বিষয়ে তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। মৃতকে গোসল দেয়ারে ব্যাপারে তাঁর বর্ণিত হাদিসই মূল ভিত্তি। সাহাবা এবং বসরার তাবেয়ী উলামাগণ তাঁর নিকট থেকেই মৃতকে গোসল করানোর নিয়ম -কানুন শিখেছিলেন। এ হাদিসটিছাড়াও নবী (সঃ) থেকে তাঁর বর্ণিত আরো হাদিস আছে যা আনাস ইবনে মালেক, মুহাম্মদ ইবনে সিরীর বর্ণনা করেছেন।
রাবী’ বিনতে মু’আওয়েযের কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা সম্পর্কে জানার জন্য কখনো আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হাজির হতেন এবং কখনো হাজির হতেন আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)। তাঁর থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মদীনার খ্যাতনামা ফিকাহবিদ সুলায়মান ইবনে ইয়াসার (রাঃ), আম্মার ইবনে ইয়াসারের নাতি আবু উবায়দা, আব্বাস ইবনে ওয়ালিদ এবং ইবনে উমরের ক্রীতদাস নাফে’র মত জ্ঞানী-গুণী এবং সুধীজনও।
ফাতেমা বিনতে কায়েস থেকে সমকালীন যে সব পন্ডিত ও হাদিস বিশারদ হাদিস বিষয়ক জ্ঞান লাভ করেছেন তারা হলেন আসেম ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ), সাইদ ইবনুল মুসাইয়েব(রাঃ) উরওয়া ইবনে যুবায়ের (রাঃ), আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান (রাঃ) এবং শা’বীর মত পন্ডিতবর্গ।
এ ছাড়াও সে যুগে যে সব মহিলা হাদিস শাস্ত্রে অসাধারণ স্থান লাভ করেছেন ও হাদিস অধ্যাপনায় খ্যাতি লাভ করেছেন তাদের নাম হলো: আ’বিদাহ আল মাদানিয়্যাহ, আবদা বিনতে বিশর উম্মে ওমর আছ্ছাকাফিয়্যাহ, জয়নাব, নফিসা বিনতে হাসান বিন যিয়াদ, খাদীজা উম্মে মুহম্মদ, আবদা বিনতে আবদুর রহমান।
হাবীব দাহ্হুন স্পেনের একজন খ্যাতিমান হাদিস বেত্তা ছিলেন। তিনি হজ্ব সমাপনের সময় মদীনা আসেন এবং এ মহিলার হাদিসে পারদর্শিতার কথা শুনে অনেকে খুবই প্রভাবান্বিত হন।
যয়নাব বিনতে সুলায়মান রাজ বংশের মহিলা ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন আস্সাফ্ফার চাচাতো ভাই। যয়নাব হাদিসের উপরে পূর্ণ দক্ষতা রাখতেন এবং তাকে সে সব নারীদের মধ্যে গণ্য করা হতো যাঁদেরকে মুহাদ্দেসাত বলা হতে।
হাদিসের ইতিহাসে পুরুষের সাথে মহিলাগণ এলমে হাদিসের উন্নতির জন্য অবিরাম খেদমত করে গেছেন।
‘চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতে নিম্ন মহিলাগণ যাঁরা হাদিস শাস্ত্রে সুনাম অর্জন করেছেন, হাদিসের অধ্যাপনার কাজে জড়িত ছিলেন এবং তাদের ক্লাশে অগণিত হাদিসের ছাত্ররা অংশ নিতেনঃ
* ফাতেমা বিনতে আবদুররহমান, ( মৃ৩ ৩১২হিঃ) ইনি তাঁর লেবাস ও খোদাভীতি এবং তাক্বওয়ার দরুন সূফীয়া নামে পরিচিতা ছিলেন। ফাতেমা ইমাম আবু দাউদ (রঃ)-এর নাতনী ছিলেন।
* আমাতুল ওয়াহীদ । (মৃত ৩৭৭হিঃ) প্রসিদ্ধ ফেকাহবিদ আল্লামা মাহামিলীর কন্যা ছিলেন।
* উম্মুল ফাতাহ আমাতুস সালাম, (মৃতঃ ৩৭০ হিঃ) সে যুগের মশহুর কাজী আবু বকর আহমদের কন্যা ছিলেন।
* জুমআ বিনতে আহমদ । এ ছাড়া আরো অনেক মহিলা ছিলেন যাঁরা হাদিসের খেদমতে অসাধারণ মর্যাদা লাভ করেছেন।
পঞ্চম শতাব্দীতেও অনেক মুসলিম মহিলা এলমে হাদিসে কৃতিত্ব দেখান এবং তাদেরকে সে যুগের শ্রেষ্ঠতম হাদিসবেত্তা হিসেবে গণ্য করা হতো তারা হলেন-
* ফাতেমা(মৃতঃ ৪৮০ হিঃ) যিনি প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক সাধক হাসান বিন আলী আদাক্কাকের কন্যা ও ইমাম আবুল কাসেম আল কুশায়রীর সহধর্মিনী ছিলেন। ইনি লিপি শাস্ত্রে যেমন খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তেমনি হাদিস শাস্ত্রেও বড় মর্যাদা হাসিল করে ছিলেন। নিজের সনদে আলীর(উচ্চ সনদের) দরুন সে সময়কার মর্যাদাবান মুহাদ্দিসদের অন্যতম হিসেবে পরিগণিত হতেন।
* কারীমা আলমারওয়াঝিয়্যাহ বিনতে আহমদ (মৃত্যু ৪৬৩ হিঃ) তৎকালীন সময়ে সহীহ বুখারীর ব্যাপারে তাকে প্রমাণ্য হিসেবে মানা হতো। হেরাতের একজন খ্যাতিমান মুহাদ্দিস তাঁকে হাদিস শাস্ত্রে খুবই গুরুত্ব দিতেন এবং হাদিসের ছাত্রদেরকে তাঁর থেকে বুখারী শরীফ পড়ার তাগিদ দিতেন। কেননা, তিনি সহীহ বুখারী আল্লামা হাইছামের বরাত দিয়ে পড়াতেন। একজন মহিলা মুহাদ্দিস হিসেবে নিজের বরাত দিয়ে অজস্র হাদিস অন্যদের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছেন।
সহীহ বুখারীর বর্ণনায় ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ ( মৃত: ৫৩৯ হিঃ,শুহ্দা বিনতে আহমদ আর কুরজ (মৃত ৫৭৪ হিঃ) এবং সিত্তুল ওজারা বিনতে ওমর (মৃত ৭১৬ হিঃ) প্রমুখ বিশেষ ভাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। আর হাদিসের উপর অশেষ পা-িত্য থাকার দরুন তাঁদেরকে মুসনিদাতু আসবাহান বলা হতো। শুহ্দা নিজের যুগের বড় বড় মুহাদ্দেসদের কাছ থেকে এলেম অর্জন করেন। সহীহ বুখারী ও হাদিসের অন্যান্য কিতাবের দরস দেয়ার সময় ছাত্রদের ভিড় লেগে যেত।
ঠিক তদ্রুপ, সিত্তুল ওজারা নিজের সময়কার প্রসিদ্ধ মুসনেদা ছিলেন। তিনি মিসর ও সিরিয়াতে সহীহ বুখারী সহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থের দরস দিতেন। আরও যারা সহীহ বুখারীর দরস দিতেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন উম্মুল খায়ের আমাতুল খালেক ( মৃত ৮১১ হিঃ) , আয়েশা বিনতে আবদুল হাদী এবং মুসলিম শরীফের দরস দিতেন উম্মুল খায়ের ফাতেমা বিনতে আলা ও ফাতেমা শেহ্যোরিয়া।
ফাতেমা জোঝদানিয়া ও হেরানের অধিবাসিনী যয়নবের ক্লাশে বেশুমার ছাত্র অংশ গ্রহণ করতেন। যয়নব মুসনাদে আহমদ ইবনে হাম্বল পড়াতেন।
মহিলা হাদিসবেত্তাগণ হাদিস শিক্ষার জন্য দেশ বিদেশে ভ্রমন করেছেন। জাভিরিয়া বিনতে ওমর (মৃত্যু৭৮৩ হিঃ), এবং যযনব বিনতে আহমদ বিন ওমর (মৃত্যু ৭২২ হিঃ) প্রমুখ হাদিস শিক্ষার জন্য দূর দূরান্ত ভ্রমণ করেন। তারা মিসরও মদিনায় হাদিসের কেন্দ্র স্থাপন করেন। একালের একজন বিখ্যাত মোহাদ্দেসা ছিলেন দাক্বীক্বা বিনতে মুরশিদ (মৃত ৭৪ অহিঃ)। তিনি জাভারিয়া থেকে হাদিস পড়েছিলেন।
যয়নাব বিনতে আহমদ কামেল (মৃত্যু ৭৪০ হিঃ) সত্তরটি হাদিস গ্রন্থের সনদ লাভ করেন। তিনি মুসনাদে ইমাম আবু হানিফা, শামায়েলে তিরমিযি ও ইমাম তাহাভীর শরহে মাআ’নিল আছার পড়াতেন।
যয়নব বিনতে আল মককিয়্যাহ হাদিসে বেশ সুনাম অর্জন করেন। তাঁর হাদিসের ক্লাশে হাদিস শোনার জন্য দূর দূরান্ত এলাকা থেকে ছাত্ররা সফর করে আসতেন।
হাফেজ জালালুদ্দীন সুয়ুতী রেসালায়ে ইমাম শাফেয়ী হাজেরা বিনতে মুহাম্মাদের কাছে পড়েন।
হিজরী অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে হাদিসের পারদর্শিনী প্রচুর মহিলা দেখতে পাওয়া যায়। আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী স্বীয় কিতাব ‘আদদুরুল কামেনাহ’ এর ভিতরে অষ্টম শতাব্দীর বিখ্যাত আলেম ও বিদ্বানদের সম্বন্ধে আলোকপাত করেছেন। এই কিতাবে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী হিজরী অষ্টম শতাব্দীর এক শত সত্তর জন নারীর জীবনী লিখেছেন। তার মধ্যে বেশির ভাগই হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। এদের মধ্যে অনেক মহিলা সে যুগের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দেসদের সমকক্ষ ছিলেন। আয়েশা বিনতে হাদীর( মৃত্যু ৮১৬ হিঃ) কাছ থেকে ইবনে হাজার আসকালানী দীর্ঘকাল পর্যন্ত জ্ঞান আহরণ করেন।
সিত্তুল আরব (মৃত্যু ৭৬০ হিঃ)এর কাছ থেকে প্রসিদ্ধ মুহাদ্দেস আল ইরাকী, আল হাইছামী ও তার সময়কার কিছু সংখ্যক বিদ্বান জ্ঞান অর্জন করেন। ইরাকী তাঁর ছেলেকে হাদিস শিক্ষার জন্য এই মহিলার কাছে প্রেরণ করেছিলেন।
নবম শতাব্দীর মুহাদ্দেসাতের জীবনী মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান সাখাভী স্বীয় কিতাব ‘আদ দৌল লামে’ উল্লেখ করেছেন। আবদুল আজিজ বিন ওমর বিন ফাহাদ স্বলিখিত গ্রন্থ ‘মু’জামুশ শুয়ুখ’এর ভিতরে ঐ যুগের একশত ত্রিশ জনের ঊর্ধ্বে মুহাদ্দেসাদের কথা উল্লেখ করেছেন; যাঁদের কাছ থেকে তিনি স্বয়ং পড়েছেন । এদের মধ্যে ছিলেন উম্মেহানী মরিয়ম বিনতে ফখরুদ্দীন মুহাম্মাদ (মৃত্যু ৮৭১ হিঃ), বাঈখাতুন বিনতে আবুল হাসান (মৃত্যু ,৮৬৪ হিঃ)। তিশাম ও মিশরে,  আয়েশা বিনতে ইব্রাহীম ( মৃত্যু ৮৪২ হিঃ) কায়রো, দামেশক ও বিভিন্ন যায়গায় হাদিস শিক্ষা করেন এবং উম্মুল খায়ের সা’দিয়া মকইকয়াহ তাঁর যুগের বিভিন্ন মুহাদ্দেসদের কাছ থেকে এলেম হাসিল করেন।
দশম শতাব্দীর পর মহিলাদের মধ্যে হাদিস চর্চায় ভাটা পড়ে। তবে একেবারে থেমে থাকেনি। যে শেষ মুহাদ্দেসার ব্যাপারে আমরা জানতে পারি তিনি ছিলেন ফাতেমা আল ফযীলা। “আশ শায়খাতুল ফযীলা” নামে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি হিজরী বারো শতাব্দী সমাপ্ত হওয়ার আগে জন্ম গ্রহণ করেন। নামী গুণী মুহাদ্দেসরা তাঁর দরসে শরীক হতেন এবং তাঁর থেকে সনদ লাভ করতেন। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দেসদের মধ্যে শায়খ ওমর অধর হানাফীও শায়খ মুহাম্মাদ সারেহ অধশ শাফী নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি ১২৪৭ হিজরী সনে ইন্তেকাল করেন। এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, হাদিসের বিদ্যালয়গুলিতে একই শ্রেণীতে ছাত্র ছাত্রীগণ ঊভয়ে শরীক হতেন। তদ্রুপ পুরুষ ও মহিলাগণ উভয়ে অধ্যাপনার কাজ পরিচালনা করতেন। তবে এ ব্যাপারে তাঁরা ইসলামী পর্দা বিধান অবশ্যই মেনে চলতেন।
হাদিস শাস্ত্রে মহিলাগণের মহান সেবা ও তাঁদের বিদ্যা চর্চার ব্যাপারে যে সামান্য আলোচনা করা হলো তা বর্তমান কালের মহিলাদের জন্য দ্বীনি খেদমতের অনুপ্রেরণা যোগাবে ইনশা আল্লাহ।
উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে মুসলিম নারীরা কাব্য সাহিত্য, ও রাজণীতিতে যে অবদান রেখে গেছেন তা সর্বযুগের নারী ও পুরুষের মনে গভীর উৎসাহের প্রেরণা সঞ্চার করবে।
ফতোয়া দানে মহিলা সাহাবীদের দান অতুলনীয়। কম হলেও ফতোয়া দান কারিনী সাহাবীদের মধ্যে ছিলেন হযরত উম্মে আতিয়া (রাঃ), হযরত হাফসা (রাঃ), হযরত উম্মে হাবিবা (রাঃ), হযরত সাফিয়া (রাঃ), লায়লা বিনতে কয়েস (রাঃ), আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ), উম্মে শরীফ (রাঃ), খাওলা বিনতে তওয়ীদ ( রাঃ), উম্মে দারদা (রাঃ), আতেকা বিনতে যায়েদ (রাঃ), সহল বিনতে সুহাইল (রাঃ), হযরত জুয়াইরিয়া, হযরত মায়মুনা (রাঃ), হযরত ফাতেমা (রাঃ) ফাতেমা বিনতে কায়েস (রাঃ), উম্মে সালামা (রাঃ), যয়নাব বিনতে উম্মে সালামা (রাঃ), উম্মে আয়মন (রাঃ), উম্মে ইউসুফ (রাঃ) এবং গামেদিয়া (রাঃ) ও এই দলের অন্তর্ভুক্ত।
তথ্য সূত্র :
১) ইসলামী সমাজে নারী-সাইয়েদ জালালুদ্দিন আনসার উমরী
২) হাদীস শাস্ত্রে মহিলাদের ভূমিকা -ড. যুবায়ের সিদ্দীকী, মাসিক মদীনা, নভেম্বর, ’৯৪