ইসলাম,মানব সেবার গুরুত্ব,মানব সেবা

মানুষ মহান সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক মর্যাদা সম্পন্ন সৃষ্টি। সৃষ্টিলোকে মানুষকে অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় অধিক উত্তম কাঠামোর সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের দৈহিক কাঠামোর কথা বিবেচনা করলে একথা অনস্বীকার্যভাবে প্রমাণিত হয় যে, মানুষের দৈহিক কাঠামো তুলনাহীনভাবে উত্তম। কিন্তু মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের রহস্য মানুষের বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান। এরই ফলে মানুষ সত্যকে চিনতে পারে ও জানতে পারে, বুঝতে পারে কোনটি কল্যাণকর কোনটি অকল্যাণ কর। বিবেক ও জ্ঞাণ প্রয়োগ করে মানুষ যখন ঈমান ও সৎ আমালের পথ অবলম্বন করে তখন মানুষ হয় সৃষ্টির সেরা। আল্লাহর ঘোষণা ‘যে সব লোক ঈমান এনেছে ও নেক আমল করেছে, তারা নিঃসন্দেহে অতীব উত্তম সৃষ্টি।’
কুরআনে তাদেরকে ভাল লোক বলা হয়েছে যারা বিশ্বাস করে ও ভাল কাজ করে। আর ভাল কাজের মধ্যে দানকে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নৈতিক উৎকর্ষ হিসাবে ধরা হয়েছে। দানকে ঐচ্ছিক ও আবশ্যিক এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ঐচ্ছিক দান সম্পর্কে বলা হয়েছে-সৎ লোকেরা তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস ভাগ বণ্টন করে দেন।
মুমিনের উচ্চতর স্তর মোত্তাকীগণের। মোত্তাকীগণ বহু সৎ গুণের অধিকারী হয়ে থাকেন, সে সবের মধ্যে অন্যতম গুণ সৎ ও নেক কাজে ধন-সম্পদ ব্যয় করা। নেক কাজের মধ্যে গরিব দুঃখীদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন ও তাদের কল্যাণে ধন-সম্পদ ব্যয়কে আল্লাহ বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন এবং এ কারনেই কোরআনের অনেক যায়গায় নামাজের পাশাপাশি দরিদ্রকে অন্ন দানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন : যারা প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্য সবর করে, সালাত আদায় করে, আমি যা দিয়েছি তা থেকে গোপণে ও প্রকাশে ব্যয় করে এবং যারা ভাল দিয়ে মন্দ দূরকরে, তাদের জন্য রয়েছে পরকালের শুভ পরিণাম।
সূরা বাকারাতে ইরশাদ হচ্ছে : পূণ্যবান তারা যারা ঈমান এনেছে আল্লহার ওপরে, আখেরাত, ফেরেশতা, ও সকল কিতাবের ওপরে যারা সম্পদের প্রতি ভালবাসা সত্ত্বেও অর্থ দান করে আত্মীয় স্বজন, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্য প্রার্থী ও দাস মুক্তির জন্য এবং সালাত কায়েম করে….। এ আয়াতটিতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে প্রকৃত মোত্তাকীর স্তরে পৌঁছা সম্ভব নয়। যাদের মধ্যে সালাত ও সিয়াম আদায়ের সাথে অসহায় ও দরিদ্রকে খাদ্যদান ও জনসেবা মূলক কাজের সমাবেশ ঘটবে তারাই হবেন বেহেশতে প্রবেশের যোগ্য। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হোরায়রা (রা.) জওয়াব দিলেন, আমি। হুযুর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে আজ কে রোজা রেখেছে? হযরত আবুবকর (রা.) জওয়াব দিলেন, আমি। হুযুর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ জানাজার অনুসরণ করেছে? আবুবকর (রা.) জওয়াব দিলেন, আমি। হুযুর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ দরিদ্রকে খাদ্য দান করেছে? এবারও হযরত আবুবকর জওয়াব দিলেন, হুযুর, আমি। এবার বললেন, এতগুলো নেক কাজের সমাবেশ যার মধ্যে ঘটেছে, সে অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে।
সারারাত জেগে জেগে নফল নামাযে লিপ্ত থাক অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এমনই সওয়াবের কাজ বিধাব মিসকিনদের সাহায্যে এগিয় আসা। কিন্তু আমরা নফল নামাজকে যত গুরুত্ব দিয়ে থাকি জনসেবার কাজকে তত গুরুত্ব দেই না। কিন্তু রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি বিধাবা ও মিসকিনদের সমস্যা নিয়ে ছুটাছুটি করে সে যেন আল্লাহর রাহ জিহাদে লিপ্ত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা হুযুর (সা.) যেন একথাও বলেছেন যে, সে ব্যক্তি ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে সারা রাত নামাযে কাটায় এবং সারা বছরই রোজা রাখে। ক্ষুধর্তকে অন্ন দান একটি অত্যন্ত উঁচু স্তরের মহ কাজ শুধু রোজা পালন ও নামায আদায় জান্নাতের পথ দেখায় না, বরং এ দুই কাজের সাথে ক্ষুধার্তকে খাবার প্রদান জান্নাত অর্জনের জন্য শর্ত করা হয়েছে। রসূল (সা.) এরশাদ করেন, বেহেশতে এখন বালাখানা আছে, যার ভিতর থেকে বাইরে সব কিছু এবং বাইর থেকে ভিতরে সব কিছু দেখা যায়। এসব বালাখানা আল্লাহ তার জন্য তৈরি করে রেখেছেন যিনি (লোকদের সাথে) কথাবার্তায় নম্রতা দেখিয়েছে, ক্ষুদার্তকে খেতে দিয়েছে, রোজা রেখেছে এবং রাতে এমন অংশে নামায পড়েছে, যখন (সাধারণভাবে) লোকজন ঘুমিয়ে ছিল।
দরিদ্র্যকে খাদ্য দান জান্নাতে পৌঁছার অন্যতম সহজ উপায়। রসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘আল্লারহ ইবাদত কর, দরিদ্রকে খাদ্য দান কর এবং উচ্চ শব্দে সালাম কর। নিরাপত্তা সহকারে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এ পথে চলার জন্য প্রাণপণ কষ্ট ও শ্রম করতে হয়। এই পথটি অতীব দুর্গম ও বন্ধুর। এই পথের পথিককে নিজের প্রবৃত্তি কামনা বাসনা ও শয়তানী লোভ লালসার সাথে রীতিমত লড়াই করে চলতে হয়। দারিদ্র প্রপীড়িত ও অসহায় ধুলিমলিন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে খাদ্য দানে, তাদের জন্য অর্থ ব্যয়ে কারো খ্যাতির ঢোল বাজে না। এই দানের কারণে কারো ঐশ্বর্যশীল হওয়া বা দানশীল হওয়ার খ্যতি হয় না। তাই নৈতিক চরিত্রের উত্তম পর্যায়ে উন্নীত হওয়া এই কঠিন পথে চলার ফলেই সম্ভব হতে পারে।
মানুষের সেবায় অর্থ-সম্পদ ব্যয় থেকে বিরত থাকার পরিণাম আল্লাহ বর্ণনা করেছে এক সুন্দর উপমার মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে, আমি তাদেরকে ঐ রকম পরীক্ষায় ফেলেছি যেমন এক বাগানের মালিদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছিলাম, যখন তারা কসম করেছিল যে খুব সকালে তারা অবশ্যই ফল পাড়বে। অন্যকিছু হতে পারে বলে তারা ভাবল না। তারা (রাতে) যখন ঘুমিয়ে ছিল তখন আপনার রবের কাছ থেকে এক বিপদ ঐ বাগানের ওপর এসে পড়ল এবং এর অবস্থা কাটা ফসলের মত হয়ে গেল। খুব সকালে তারা একে অপরকে ডেকে বলল ‘যদি ফল পাড়তে চাও তাহলে সকাল সকাল বাগানে চল।’ তারপর তারা রওয়ানা হল এবং চুপি চুপি একে অপরকে বলতে লাগল ‘আজ বাগানে যেন কোন মিসকিন না আসতে পারে।’
কাকেও কিছু না দেবার ফয়সালা করেই তারা সকাল বেলা সেখানে তাড়াতাড়ি এমনভাবে হাজির হল যেন তারা (ফল পড়ার) ক্ষমতা রাখে। কিন্তু যখন তারা বাগান দেখল তখন বলল, আমরা নিশ্চয়ই রাস্তা ভুলে গেছি, না, আমরা মাহরূম হয়ে গেছি।…’’ (শেষ পর্যন্ত) তারা বলল, আমাদের অবস্থার জন্য আফসোস, নিশ্চয়ই আমরা বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিলাম (সূরা আল কালাম)। এ ঘটনার দিকে খেয়াল করে আমাদের জীবন পরিচালনা করা উচিত যেন পরিণামে আফসোস করতে না হয়।

উম্মে আইরিন