শিক্ষা

তের লাখ ছাত্রছাত্রী কলেজে ভর্তি হওয়ার আনন্দ প্রতিবেদন কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম হয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কেন সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করবে? বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দিবালোকের মত পরিষ্কার সাধারণ শিক্ষা গ্রহণ করে কর্মসংস্থানের কোন সুযোগ নেই। স্নাতক স্নাতকোত্তর পাশ দিয়ে বছরের পর বছর সরকারি চাকরির পিছনে খুরে খুরে করবে। চাকরির আবেদন পত্র ক্রয়, ব্যাংক ড্রাফট প্রেরণ, ইন্টারভিউ দিতে আসা যাওয়া খরচ বহন করতে গিয়ে গরীব অভিভাবককে আরও গরীব করে ফেলছে। জাতি আজ এক কোটি ৫০ লাখ গ্রেজুয়েট বেকার যুবকের ভার বহন করে ক্লান্তিকর দিনযাপন করছে।
ইতিমধ্যে ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে ‘লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে’- এটা সেকেলে কথা। বরং বিএ-এমএ পাস না দিয়েও ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিলে চাকরির সুযোগ বেশি। সৌদি আরব বা কুয়েত-মালয়েশিয়ায় গেলেও ভাগ্য বদলে যেতে পারে। গরীব হটাও ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক স্লোগান। ষাটের দশকের শেষদিকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার এ স্লোগান তখন জনপ্রিয় হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী সহস্র বছরের অধিক প্রাচীন দিল্লীর রাজসিংহাসনে আরোহন করে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যম হতদরিদ্র ভারতবাসীর ভাগ্যের কোনই পরিবর্তন ঘটবে না। শ্লোগান বাস্তবায়নে এসএসসি পাশ তরুণদের থেকে ৬০ শতাংশ ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নীতি গ্রহণ করেছিলেন। শিল্প কারখানা, খামার হাসপাতালগুলোতে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগের মাধ্যমে আধুনিকতম করে গড়ে তুলেছিলেন। হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন উত্তর সুরীদের রেখে যাওয়া শ্লোগান ‘বিদেশি পণ্য হটাও’। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের কাঁধে ভর করে। ইন্দিরা গান্ধী বিশাল ভারতে বিপুল সংখ্যক হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।
সত্তরের দশকের শেষের দিকে চীনের নেতা দেং জিয়াও পিং বলেছিলেন, পঞ্চাশ বছর পর আমরা অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হবো। তার এ ঘোষণায় চীনবিরোধী কেউ কেউ কৌতুকবোধ করে বলেছিল- ‘এত দূরের লক্ষ্য’। কিন্তু এ লক্ষ্য ছিল বাস্তবসম্মত। পাঁচ দশক যেতে না যেতেই চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায় ধরে ফেলেছে। সামরিক ক্ষমতায়ও কাছাকাছি চলে গেছে।
চীনের কর্নধারেরা বিদেশি পর্যটকদের প্রেসক্রিপশনের আশায় না বসে বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সকল শিক্ষা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট চালু করে মাধ্যমিক পাশ তরুণদের ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তির সুযোগ করেছিলেন। ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের মেধা ও শ্রমের বিনিময়ে আজকে চীনের উত্থান। বাংলাদেশ সরকার চাইছে ২০২১ সালে আরও ৬০ লাখ লোককে ‘হতদরিদ্র’ বা দিনে ৯৩ টাকার আয়ের তকমা থেকে মুক্তি দিতে। আর ২০৩০ সালের লক্ষ্য- ‘হতদরিদ্র’ বলে কেউ থাকবে না। নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, ‘অভাব-দারিদ্র্যকে স্থান দিতে হবে জাদুঘরে।’ তার প্রত্যাশা- এমন একদিন আসবে বাংলাদেশে যখন একটি গরিব লোকও থাকবে না। অভাব-কষ্ট কেমন- সেটা জানতে হলে যেতে হবে জাদুঘরে। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার পরিকল্পনায় পিছিয়ে নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছেন-২০৪১ সালের রূপকল্প। তিনি চাইছেন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৭০ বছরে দেশটি যেন উন্নত বিশ্বের কাতারে শামিল হতে পারে। আর স্বাধীনতার ৫০ বছরে (২০২১) লক্ষ্য-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া।
আমরা উন্নত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি বছরে তের লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী সাধারণ কলেজে ভর্তি হওয়ার শিরোনাম লক্ষ্য রেখে। লক্ষ্য অর্জন পরিকল্পনায় এক বিশাল অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। আমাদের দক্ষ মাবসম্পদ চাই। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন পাস করবে, কতজনকে দেব ডিপ্লোমা শিক্ষা। এসব সুনির্দিষ্ট করার সময় এসেছে।
বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই। এ বছর যে তের লক্ষ শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছে তারা বয়সে তরুণ। তাদের ভিতর রয়েছে ত্যাজ, অসাধ্যকে সাধ্য করার শক্তি, ওরা দুরন্ত দুর্বার। তাদেরকে বিমান তৈরি বিমান পরিচালনা সাবমেরিন তৈরি, সাবমেরিন পরিচালনা, নিউক্লিয়াস স্টুডেন্ট মেকিং অ্যান্ড মেনেটেইন, মহাকাশ যান ইনস্ট্রুমেন্ট মেকিং অ্যান্ড মেইনটেইনেন্স প্রযুক্তিবিদ্যায় ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে  দিতে পারলে তারাই একদিন বিশ্ব জয় করতে পারবে। সাধারণ শিক্ষা প্রদান করলে বেকার সমিতির সদস্য হিসাবে অর্ন্তভুক্ত হয়ে পেশা ও ভিশন হবে নেশাখুর হাইজেকার ব্যাপক, সন্ত্রাসী। মেধার এই অপচয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে এসএসসি পাশ তরুণদের শিক্ষা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, চীনের নেতা দেং জিয়া ও সিং এর মত আমাদের সুযোগ্য নেত্রী শেখ হাসিনাকেও ব্রিট্রিশ পাকিদের গড়া ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা সমসাময়িক করতে হবে। পুর্নবিন্যাস করতে হবে এর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো।
ডিপ্লোমা শিক্ষায় শিক্ষার্থী বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে। এ কারণে সরকার ও বিদ্যোৎসাহী মহল, সবার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, মানসম্পন্ন ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো। আর্থসামাজিক পরিকল্পনার সাথে আমাদের মানবিক শিক্ষা চৈতন্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। বর্তমান প্রতিভাদীপ্ত সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবে রূপ দিতে সকল পেশা ও পণ্যভিত্তিক অভিন্ন ডিপ্লোমা কোর্সের মেয়াদ এসএসসি পাশের পর ৪ বছর ও মানের তৃণমূলে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করতে হবে। এই লক্ষ্যে উপনিবেশিক আমলে গড়া ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ যথা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, আয়ুর্বেদীয় বোর্ড, হোমিওপ্যাথিক বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল, ফার্মেসি কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, খুলনা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, সিলেট ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রংপুর ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, ময়মনসিংহ ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আর তা হলেই প্রযুক্তি সক্ষমতার নতুন যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ।
মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এ ।