কাব্য,সমালোচনা, রাসূল স., নীতি, নির্দেশনা

আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ স. ছিলেন নবী। তিনি কবি নন, তিনি নবী। নবী কবি হতে পারেন না, এ-কথা স্বয়ংপ্রকাশ, স্বতঃসিদ্ধ। নবী প্রত্যাদেশবাহক, জীবনব্যবস্থাপক ও মানবসমাজের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। নবী ও কবির মাঝে ঘোরতর বৈপরীত্য ও দ্বনদ্ব রয়েছে। সে-কথা আমরা কুরআন থেকেও পাচ্ছি। কুরআন বলছে, ‘আমি তাঁকে কবিতা শিক্ষা দেইনি এবং তাঁর জন্য তা শোভনীয়ও নয়।’ নবী স. জাগতিক কোনো পাঠ গ্রহণ করেননি- না বিদ্বান থেকে; না বিদ্যালয় থেকে। নবুওয়ত প্রাপ্তির আগে তাঁর শিক্ষক ছিল প্রকৃতি। তাঁর প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, ঔদার্য ও বিবেচনাবোধ সমকালীন সমাজে তাঁকে স্বাতন্ত্র্যমন্ডিত করে তুলেছিল। ভাষার বিশুদ্ধতা, সাংস্কৃতিক পরচ্ছিন্নতা ও মানবিক মূল্যবোধে তিনি ছিলেন মহিমান্বিত মহামানব। তিনি গর্ব করে বলতেন, ‘আমি শুদ্ধতম আরব। কারণ, কুরাইশদের ভেতর আমার জন্ম। কিন্তু আমি আমার শৈশব যাপন করেছি সা‘আদ বিন বকর গোত্রে।’ যে-সমাজ-পরিবেশে তাঁর আবির্ভাব, সেটি ছিল কবিতার শব্দ-ছন্দ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, বাণী ও রূপকল্পে প্লাবিত। আরবদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, জীবন-জীবিকা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্বপ্ন-বাস্তবতা ও দুঃখ-বেদনার বাহন ছিল কবিতা।

নবীত্বের দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে তিনি সাহাবী-কবিদের কবিতার খোঁজ-খবর রাখতেন। ভালো ও সৎ কবিতা সম্পর্কে তাঁর মনোভাব ছিল প্রসন্ন। প্রয়োজনে নিজে কবিতা আবৃত্তি করা, অন্যদের কবিতা শোনা, কবিতা আবৃত্তির নির্দেশ দেয়া, কবিদের প্রশংসা করা, তাদের জন্য দোয়া করা, পুরস্কৃত করা, কবিতার চরণ পাল্টে দেয়া, কবিতার প্রভাব ও আবেদনের স্বীকৃতি, সর্বোপরি কবিতার গঠনমূলক সমালোচনা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন একটি যুগে, যখন সমালোচনা সাহিতের শিল্পরূপ গড়ে ওঠেনি, সমালোচনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের রূপ-রীতি প্রণিত হয় নি, তখনই নবী স. সমালোচনার কিছু নীতি নির্ধারণ করে দিলেন। যে সমালোচনাসাহিত্যের কুঁড়ি এখনো মেলে নি, তাকেই তিনি এক অসাধারণ ফুটন্ত ফুলের রঙ-রূপ দান করলেন। এবং রচনার উৎকৃষ্টতার মানদন্ড নির্ধারণ করলেন শৈলীর জাদুময়তা ও চিন্তার ধর্মমুখিতা। রাসূলের বাণী, রচনা ও কবিতাকে নতুন করে যাচাই-পরখ করার সুযোগ করে দিলেন এবং নতুন আঙ্গিকে সমালোচনার পথ দেখালেন। সেই জাহেলি যুগেই তিনি সমালোচনাসাহিত্যের পরিধি প্রশস্ত করলেন। কাব্য সমালোচনায় যোগ করলেন আধুনিকতা ও নতুন মাত্রা।  শুধু তাই নয়, বরং আমরা তাঁর সমালোচনায় কিছু নতুন পরিভাষাও পাচ্ছি, যেগুলো তিনিই সর্বপ্রথম সাহিত্যের অঙ্গনে ব্যবহার করেছেন। যাতে সমালোচনাসাহিত্য সঠিক পথে চলতে পারে। তিনিই সর্বপ্রথম প্রচলন করলেন, ‘আল-বয়ান’ শব্দটি, যা পরবর্তী যুগে আরবি ভাষার অলঙ্কারশাস্ত্রের নাম হয়ে গেছে। এছাড়াও, তিনি সমালোচনার অঙ্গনে ব্যবহার করেছেন ‘বালীগ’-আলঙ্কারিক, ‘আল-উমূম, আল-ঈজায’- অর্থ সম্প্রসারণ ও অর্থসংকোচন। এছাড়াও শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কার নির্দেশকারী বিভিন্ন পরিভাষা।

বিষয়টি অতলস্পর্শী গবেষণার দাবি রাখে।

\ ২ \

প্রাকপ্লেটো যুগে কাব্যধারা যখন ছিল, বোধহয়, কাব্যতত্ত্বও ছিল নিশ্চয়। তবে তার লিখিত বিবরণ আমরা পাই না। প্লেটো ও এ্যারিস্টটল হয়ে জাহেলি যুগের আরবদের পর্যন্ত কাব্যতত্ত্ব ও কাব্যসমালোচনার শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক রীতি-পদ্ধতি পৌঁছেছে, কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়া যায় না। তবু এ-কথা মানতে হবে যে, সে-যুগে কবিতা যখন ছিল, তা হলে কবিতার সমালোচনাও ছিল কোনো না কোনোভাবে। যুগপারম্পর্যে কবি-সাহিত্যিকগণ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, উন্মেষপর্বে সমালোচনার মূলভিত্তি ছিল স্বভাবরুচি। ফলে জাহেলি যুগের একজন দক্ষ ভাষাবিদ ও কবি নিজের অসাধারণ প্রতিভাগুণেই বিচার করতেন কবিতার ভালো-মন্দ, সৌন্দর্য-অসৌন্দর্য, সাবল্য-দৌর্বল্য। এবং সেই বিচারক্রিয়া তারা তুলে ধরতেন কোনো প্রকার অন্যায়-গোঁড়ামি ছাড়াই। তাই দেখা যাচ্ছে, জাহেলি যুগের অগ্রজ পন্ডিত কবিগণ অন্যদের ভুল-ত্রুটি ধরে দিয়েছেন, এবং তাদেরকে কবিতার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ সম্পর্কে আরো বেশি সজাগ করেছেন। প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে এ-বিষয়ে বহু তথ্য আমরা পাই। দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনার দিকে না গিয়েও বলা যায়, জাহেলি যুগে ওকায বাজার ছিল কবি-সাহিত্যিকদের মিলনকেন্দ্র, আসর ও আড্ডার তীর্থস্থান। সেই যুগের প্রখ্যাত শক্তিমান কবি নাবিগা জা‘দীর (মৃ. ৮০ হি.) জন্য চামড়ার একটি লাল তাঁবু স্থাপন করা হত। সেখানে এসে অন্যান্য কবিরা তাঁর সামনে কবিতা আবৃত্তি করতেন। তিনি তাদের কবিতার সমালোচনা করতেন। সে-আসরে সর্বপ্রথম কবিতা পাঠ করেন আল-আ‘শা মাইমূন বিন কাইস আবূ বাসীর (মৃ. ৬২৯ খ্রি.), অতঃপর হাস্সান বিন ছাবিত আন-আনছারী (মৃ. ৫৪ হি.)। তাঁর কয়েকটি পঙক্তি এরকম :

সুদর্শন পাত্র রয়েছে আমাদের,/ঝলসে ওঠে দুপুরের রৌদ্রে/তরবারিরা আমাদের/বীরত্বের রক্ত ঝরায় অঝোর ধারে।/ জন্ম দিয়েছি আমরা সাহসী বীর সস্তান।

হাস্সান বিন ছাবিতের আবৃত্তিশেষে নাবিগা বললেন, বাহ্! আপনি তো দেখি, বড় শক্তিমান কবি। তবে আপনি এখানে কৃতিত্ব দেখাতে পারেন নি। কারণ, আপনি নিজের পাত্র ও তরবারিকে ছোট করে দেখলেন। নাবিগার এই মন্তব্যের উদ্দেশ্য হলো, হাস্সান পাত্রের বিশেষণ ব্যবহার করেছেন ‘আল-গুররু’-সুদর্শন, অথচ সে-যুগে ‘আল-বীদু’-শ্বেত বলতে পারাটাই ছিল বড় বাহাদুরি। নাবিগা আরো বললেন, আপনি সন্তানদের নিয়ে অহঙ্কার করলেন, কিন্তু পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব করতে পারলেন না।

বোঝা গেল, নাবিগা এখানে প্রথমে বহিরঙ্গের সমালোচনা করলেন- বিশেষণব্যবহারের যথার্থ্য নিয়ে। পরে সমালোচনা করলেন অন্তরঙ্গের- কবিতার মূলার্থের ঔচিত্য নিয়ে। রূপতত্ত্ব ও রসতত্ত্বের এই সমালোচনাকে বলা হয় বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনা (Analytical Criticism)। (যাই হোক, উদাহরণ আরো দেয়া যায়। থাক। সেটা এ-লেখার বিষয় নয়।)

\ ৩ \

ইসলামের আবির্ভাবকালে আরব সমাজের অধিকাংশ মানুষ ছিল গন্ডমূর্খ, অশিক্ষিত, বর্বর। সুতরাং তৎকালীন আরবি সাহিত্য ছিল লোকজ সাহিত্য। আর সেই লোকজ সাহিত্যকথা এতোই উন্নত ছিল যে, আরবি কাসীদাগুলো হোমারের ইলিয়ড সফোক্লিসের ওডেসীকে হার মানাবার উপযোগী। ওকায মেলায় কবিতার লড়াই ছিল আশ্চর্যজনকভাবে বীরত্বপূর্ণ, যা আজ ভাবতেই অবাক লাগে। কবিতার সাহিত্যমান, বাগ্মী-গুণ, স্মৃতিশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব কবিকে সমাজে উচ্চ মর্যাদা পেতে সাহায্য করত। তবে তখন কাব্যের বিষয়বস্তু ছিল প্রেমলীলা, মদ্যপান, জুয়া খেলা, বংশগৌরবগাথা, যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি উসকানির মতো এমন কিছু বিষয়, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য কোনোমতেই শোভনীয় নয়। ইমরুল কায়েসের মতো কবির কবিতার বিষয়বস্তু ছিল নারী ও ঘোড়া। কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠানের রণগীতি, প্রেমগীতি, রঙ্গব্যঙ্গ কবিতা বহু কুখ্যাত ও বিখ্যাত কবিগণ যশ কামাত, যা তৎকালীন সকল কাব্যকলাকে ছেড়ে গিয়েছিল। যদিও তা বল্গাহীন জৈবানুভূতির যৌনরসে উৎসারিত আদিম ও পাশবিক উচ্ছাসের সৃষ্টি করেছিল।

রাসূলের সামনেই ছিল জাহেলি যুগের কাব্যসাহিত্যের চিন্তা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও জীবনের চিত্র। রাসূল স. অবশ্যই ঐশী নির্দেশ ও ফর্মূলার অনুযায়ী জীবনের চিত্র ও মানচিত্র পাল্টে দিয়েছিলেন, কিন্তু কবিতায় জীবনের প্রবাহ ও পরিবেশ বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। যেহেতু জীবনের প্রকৃত নিদর্শন একজন বিশ্বাসী মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু তিনি বিশ্বাসী ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধিকে কবিতার প্রাণসত্তা আখ্যায়িত করেছেন। আর যেহেতু যে কোনো শুদ্ধ শিল্পের জন্য বুদ্ধির সুস্থতা ও চিন্তার সততা অপরিহার্য বিষয়, তাই তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয় কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞাপূর্ণ’। এ-মন্তব্য মানবজাতির শিল্প-জীবনের জন্য এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে এখনো, এবং থাকবেও যতদিন শিল্পচর্চা থাকবে পৃথিবীর বুকে।

রাসূল স. কবিতার বিচার ও মূল্যায়ন করেছেন দু‘টি ভিত্তি ও মানদন্ডের ওপর। এক. ধর্মীয় মানদন্ড, দুই. ভাষাগত (বা অলঙ্কারশাস্ত্রিক) মানদন্ড। রাসূল স.-এর সমালোচনা নিয়ে, যা তিনি কবিতা ও কবিদের সম্পর্কে করেছিলেন, আলোচনা করতে গেলে সর্বপ্রথম যা আমাদের নজরে আসে, সেটা হলো, ধর্মীয় দিকটি তাঁর সমালোচনার অন্যতম মূলভিত্তি ছিল। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর সমালোচনার কয়েকটি উদাহরণ হলো :

ইসলামের আবির্ভাবপূর্বকালীন কবি লাবীদ বিন রবীয়ার (মৃ. ৪১ হি., ৬৬১ খ্রি.) কয়েকটি পঙক্তির সমালোচনা করে রাসূল স. বলেছেন, কবিরা যা বলেছেন, তার মধ্যে লাবীদের কথাটি সর্বাধিক সত্য। পঙক্তিগুলোর অর্থ এই, ধ্বংসশীল যা কিছু আছে পৃথিবীতে, আল্লাহ ছাড়া,/সুখ-ঐশ্বর্য-নেয়ামত ক্ষণস্থায়ী, সবকিছু হবে হাতছাড়া।

নাবিগা জা‘দীর কিছু পঙক্তি শুনে রাসূল স. মুগ্ধ হলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ তোমার মুখ বিনষ্ট না করুন’। (এ দোয়ার বরকতে, তিনি ১৩০ বছর জীবিত ছিলেন, অথচ তাঁর সম্মুখভাগের দাঁত মজবুত ছিল।) পঙক্তিগুলো ছিল এই :

নেই কল্যাণ সে-সহনশীলতায়, /যা দমাতে পারে না প্রিয়তমের রাগ,/কল্যাণ নেই সে-মূর্খতায়,/যদি না থাকে কোনো সহনশীল ব্যক্তি/যে ছাড়ে না কোনো কাজ, যা শুরু করে একবার।

কা‘আব বিন যুহাইর (মৃ. ২৪ হি., ৬৪৪ খ্রি.) রাসূলের প্রশস্তিমূলক এক কবিতায় বললেন,

নিশ্চয় রাসূল আলোক রশ্মি/আলো গ্রহণ করা হয় যার থেকে/তিনি তো তরবারি ভারতের /কোষমুক্ত, ধারালো, ঝকঝকে।

এ পর্যন্ত শুনে রাসূল স. বললেন, ‘ভারতে তরবারি’ বল না, বরং বল, ‘আল্লাহর তরবারি’।

এখানে লক্ষ করতে পারি, রাসূল স. কবিকথিত ঐতিহাসিক সত্য থেকে আরো নিগূঢ় সত্যতম বাস্তবতার দিকে তাকে নিয়ে গেছেন। কারণ, ক্ষণস্থায়ী জীবের তৈরী তরবারি থেকে চিরস্থায়ী সত্তার সৃষ্ট তরবারি যে, সর্বদিক দিয়ে সফল ও উপযোগী, সে কথা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। কা‘আব বিন মালিক যখন রাসূলের সামনে এই পঙক্তিদ্বয় উচ্চারণ করলেন,

প্রতিরোধ করে আমাদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে/এমন সব বীরপুরুষ,/যাদের চকচকে ধনুকগুলো নিক্ষেপ করে তীর/যেন প্রতিপক্ষ কাপুরুষ।

চরণদ্বয় শুনে রাসূল বলে ওঠলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে’ না বলে ‘আমাদের ধর্মের পক্ষ থেকে’ কি বলা যায় না? কবি উত্তর দিলেন, অবশ্যই পড়া যায়। সেই থেকে তিনি এভাবেই পড়তেন। এবং আমরা প্রাচীন উৎসগ্রন্থগুলোতে ওরকমই পাই।

সে যাই হোক, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাসূলের সমালোচনার উদাহরণ অনেক আছে। ধর্মের বাণীবাহক নবী ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করবেন, তাতে তেমন বিস্ময়ের ও কৃতিত্বের কী আছে?-এমনও কেউ মনে করতে পারেন। কিন্তু ভুললে চলবে না যে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমরা সমালোচনা-সাহিত্যের প্রধান দু‘টি ধারা পাই প্রাচ্যরীতি, পাশ্চাত্যরীতি। পাশ্চাত্যরীতির উন্মেষের মূলে ছিল রাজনৈতিক-দার্শনিক অভিব্যক্তি-সেটা প্রমাণিত সত্য। তা হলে, সম্পূর্ণ একটি নতুন আন্দোলন, নতুন ধর্মের আবির্ভাবলগ্নে বিশেষ প্রকারের একটি সমালোচনাপদ্ধতির প্রচলন হলে, তাতে দোষের কী আছে? আমরা বলতে পারি, রাসূলের উপরিউক্ত পর্যায়ের সমালোচনা ছিল জীবনধর্মী, জীবনবাদী ও আদর্শবাদী। তাছাড়াও সাহিত্যিক ও কাব্যিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি সমালোচনা করেছেন। ভাষাগত ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সমালোচনার উদাহরণও আছে কম-বেশি। সেগুলো খুব স্বল্প-সংক্ষিপ্ত হলেও, ‘বিন্দুতে সিন্ধু’র মতো সেগুলো খুবই ব্যাপক, মৌলিক ও নীতিনির্ধারক।

যেসব গুণ থাকলে একটি কবিতা বা কথাকে যথেষ্ট সুন্দর ও উত্তীর্ণ বলা হয়, তার মধ্যে রয়েছে : বক্তব্য ও বর্ণনার বিশুদ্ধতা, সত্যের পক্ষসমর্থন, কৃত্রিম অলঙ্কার বর্জন, উপযুক্ত শব্দচয় ও সুঠাম বাক্যবুনন ইত্যাদি। আর এইসব গুণের আলোকে রাসূল সময়-সময় কিছু কথা ও কবিতার সমালোচনা করেছেন। তাই দেখা যাচ্ছে, এসব গুণসমৃদ্ধ কিছু কথা শুনেই তিনি উপর্যুক্ত দুই নীতিনির্ধারক বক্তব্য পেশ করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছে,  ‘কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞার আধার’ এবং ‘নিশ্চয় কিছু বর্ণনা জাদুময়’।

কবিতা সম্পর্কে রাসূলের সমালোচনা-পর্যালোচনা খুবই সংক্ষিপ্ত, তবে সন্তোষজনক ও সর্বদিকপ্লাবি। যেন ‘পেয়ালায় পৃথিবী’ বা ‘ গোস্পদে সাগর’। তাঁর সমূহ সমালোচনামূলক বক্তব্য নিয়ে পর্যালোচনা করলে সমালোচনা-সাহিত্যের একটি বিশাল গ্রন্থ প্রণিত হতে পারে। কবিতা সম্পর্কে তিনি যেসব প্রজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্য পেশ করেছেন, তার একটি হলো, ‘কিছু কিছু কবিতা প্রজ্ঞার আধার’।

এটি খুবই ছোট একটি বাক্য -সহজ, সরলও। কিন্তু, এতে, কবিতা-বিষয়ে, সমালোচনার সাগর-বিস্তৃতি রয়েছে। রয়েছে পাহাড়প্রমাণ প্রত্যয়ী প্রজ্ঞা। শিল্পদৃষ্টিকোণ থেকে কবিতায় দু‘টি মৌলিক উপাদান থাকে : শব্দ ও অর্থ। কিংবা, বলা যায়, অর্থ ও শৈলী। কবিতাকে, শরীর ও আত্মা উভয় দিক থেকে, প্রকৃত কবিতা হয়ে ওঠতে হয়। রাসূলের উপরিউক্ত বাক্যে কবিতার আত্মিক নিদর্শন ও অন্তর্গুণের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।

মনে রাখতে হবে, অন্তরাবস্থার সম্পর্ক মানুষের জীবনের সঙ্গে। আর মানুষের জীবনের সাফল্য-বৈফল্য, আনন্দ-বেদনার সম্পর্ক মানুষের বৌদ্ধিক ও চৈন্তিক ফলাফলের সঙ্গে। আরবের প্রাচীন কাব্যসাহিত্যের অন্তর্বস্তুও জীবনের চিত্রে চিত্রায়িত, এবং নান্দনিক সুষমায় মন্ডিত। প্রাচীন আরবি কাব্যে বেদুঈন-জীবনের এমন চমৎকার চিত্র ফুটে ওঠেছে, যা প্রাকৃতিক ও স্বভাবানুকূল হওয়ার কারণে আরবদের কাছে খুবই প্রিয় ও সমাদৃত ছিল। প্রাচীন সেই কাব্যসম্ভারে ইমরুল কাইসের আত্ম-ঐশ্চর্যহীন, দেহলাবণ্যসর্বস্ব কবিতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল যুহাইর বিন আবি সালমার কবিতা, যা বুদ্ধি-প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ এবং জীবনময়তায় ঋদ্ধ। সঙ্গত কারণেই, এই আকর্ষণীয় কাব্যশিল্প তাঁর কাছে এত প্রিয় ও চিত্তাকর্ষক ছিল যে, কিছুতেই তিনি এ-শিল্পকে বর্জন বা নষ্ট করতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছেন, ‘আরবরা কবিতাকে ছাড়তে পারে না, যতক্ষণ না উট তার গর্ভস্থ বাচ্চাকে ছাড়ে।’

রাসূল স. সাহিত্যের শরীর বা বাহ্যকাঠামো সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয় কিছু বর্ণনা জাদুময়’। বাক্যটিতে যে কোনো শিল্প বা কবিতার জন্য যে-মানদন্ড নির্ণয় করা হয়েছে, সেটি সমালোচনা-নীতির খুবই উন্নত-সৃষ্টিশীল মানদন্ড। কারণ, যে কোনো শিল্পের মূল্য ও মাহাত্ম্য মূলত তার প্রভাবশক্তিতে, শিল্পের সিদ্ধিতে। আর প্রভাবশক্তির জন্য প্রয়োজন বর্ণে-বর্ণনায় জাদুময়তা। অর্থের সততা ও যথার্থতার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের বাহ্যিক উপাদান ও শৈলী ভাষা ও বর্ণনা, অলঙ্কার, বাহ্যনন্দনশৈলীতে গতি ও সঙ্গতি, সতেজতা, সজীবতা, মাধুর্য ও মিষ্টতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি থাকবে হবে শব্দের সঙ্গে অর্থের সুদৃঢ় সাযুজ্য-বন্ধন, প্রকাশভঙ্গিতে অনুভূতির প্রাখর্য, চিন্তার শক্তিমত্ততা। বর্ণনাশৈলীর মিষ্টি-জাল-টক-তিক্ততা মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও প্রেরণা-প্রকৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করার যোগ্যতা সাহিত্যে থাকতে হবে, যাতে কবিতা বা গদ্য এক জ্বলন্ত জাদু বা জাদুবাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে। তবেই তো একটি শৈল্পিক রচনা সাহিত্যিক কৃতিত্ব এবং শিল্পের উচ্চতম আদর্শিক উদাহরণ হতে পারে।

নবী স.-এর কথায় কৃত্রিমতা বা কৃত্রিম অলঙ্কারে কথার অপসৌন্দর্যবর্ধনকে অনুচিত মনে করা হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে, কঠিন শব্দের ব্যবহার ও বর্ণনাভঙ্গির জাটিল্য ছিল অপ্রাকৃতিক। ইসলাম ধর্মে যেহেতু কৃত্রিমতা বর্জনীয়, সেহেতু জীবনে ও সাহিত্যেও তাকে অশোভন মনে করা হয়েছে। এটাকে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অসুন্দর ও অপরাধ মনে করা হত, তা নয়; বরং সে-যুগে কৃত্রিম ছন্দাশক্তিকে গণকদের কাজ ও তাঁদের অন্ধানুকরণ বলে গণ্য করা হত। এ কারণেও, বা এ কারণেই হয়তো, তিনি কৃত্রিমতা বর্জন করার লক্ষ্যে বলেছেন : ‘কৃত্রিমভাবে বাকচাতুর্যপ্রদর্শন আমাকে বর্জন করতে হবে’। হাদীসের কোনো কোনো বর্ণনা এসেছে ‘তোমাদের দূরে থাকতে হবে’। ভাষার মৌলিক অলঙ্কার ও অধিকার রক্ষা না করে, কৃত্রিমভাবে শুধু ছন্দাশক্তিকে রাসূল স. পছন্দ করতেন না। সেটাকেও তিনি এক ধরনের কৃত্রিমতাই মনে করতেন। কারণ, যারা কৃত্রিম ছন্দমিল ও অন্তমিলে আসক্ত, তারা অর্থের চেয়ে নিছক শাব্দিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে তাদের কথা ও রচনা মূলার্থের প্রাণৈশ্চর্য হারিয়ে শব্দসর্বস্ব বাক্যসমষ্টিতে পরিণত হয়। সেখানে মূলবিষয় বা মূলভাবের স্তর দ্বিতীয় পর্যায়ে পর্যবসিত হয়। অথচ প্রাণবান ভাষার ব্যবহার তো হয়ে থাকে অর্থকে যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য, শুধু শব্দের কঠিন স্তূপ নির্মাণের জন্য নয়। উম্মতের শিরাজ্ঞানী ও সমাজসচেতন হওয়ার কারণে নবী স. নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, মানুষ কৃত্রিমতা ও ছান্দসিকতার আড়ালে সত্যকে গোপন করার অপচেষ্টা চালাবে। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছেও তাঁর যুগে। নবী স. এক ব্যক্তির ওপর এক ঘটনার প্রেক্ষিতে রক্তমূল্য আরোপ করলেন। ওই ব্যক্তি রাসূলের কাছে এসে ঘটনাটি বর্ণনা করল এবং ভাষায় সে ছন্দ সাধল। ইচ্ছা ছিল প্রকৃত ঘটনার ওপর অসত্যের প্রলেপ দেওয়া। রাসূল স. তার বাকচাতুর্যের বদমতলব বুঝে ফেললেন। তিনি বললেন, এ ব্যক্তি কি আমাকে গ্রাম্যদের মতো ছন্দের চমক দেখায়।

\ ৪ \

রাসূলের সমালোচনাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যবহ সমালোচনা হলো তিনটি : ইমরউল কাইস (মৃ. ৫৪০ খ্রি.), আনতারা বিন শদ্দাদ (মৃ. ৬১৫ খ্রি.) ও উমাইয়া বিন সলত (৬২৪ খ্রি.)-এর  কবিতার সমালোচনা। সমকালীন কাব্যধারায় তাদের কবিতা ছিল শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, শোতৃচিত্তচারী। তারা তিনজনই কাফের ছিলেন, পরেও মুসলমান হননি। তা সত্ত্বেও রাসূল স. তাঁদের কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, মত-পথনিরপেক্ষ শুদ্ধ সমালোচনা করেছেন। একজন সৎ সমালোচকের প্রধান গুণ হলো শিক্ষা, সংস্কৃতি, সহৃদয়তা, উদারতা ও রসবোধ। এসব গুণের নিক্তিতে রাসূল স. ছিলেন পুরোপুরি উত্তীর্ণ। কেমন উদার হলে একজন ব্যক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধর্ম-মত-অনুসারী, এমনকি, একজন শত্রুর সৃষ্টিশীল কাজের ভারসাম্যায়িত স্বীকৃতি দিতে পারেন, তা রাসূলকর্তৃক ইমরউল কাইসের কবিতার সমালোচনা দেখলে বোঝা যায়। রাসূল স. ইমরউল কাইসের কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি কবিদের শীর্ষ, তবে জাহান্নামীদেরও নেতা।’ সৃষ্টিজগতের মূল উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য করে তাকে জাহান্নামী বলেছেন ঠিক, কিন্তু আবার তাকে শীর্ষ কবিও আখ্যায়িত করেছেন। উভয় জগতের জ্ঞানভান্ডার মহামানব রাসূল স. কেন তাকে শীর্ষ কবির সম্মান দান করলেন? কী ছিল তার কবিতায়? ইমরউল কাইসের কাব্যসমগ্রের দিকে নজর দিলে আমরা দেখব, তার কবিতায় ভাষার প্রাঞ্জলতা, শব্দ-ব্যবহারের দক্ষতা, অভিনব উপমা-উৎপ্রেক্ষার সমাবেশ, ছন্দের পরিপাট্য ও দিলকাড়া দুলুনি ছিল, ছিল জীবনবোধের এক অপূর্ব দ্যোতনা। ইমরউল কাইস শ্রোতার কল্পনালোকে এক আশ্চর্য জাদুকরী সম্মোহনজাল বিস্তার করতে পারতেন। মহানবী তাঁর পান্ডিত্য ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সমালোচনা দ্বারা শিল্পকলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, শিল্পকলার সৌন্দর্য ও জীবনের সৌন্দর্য এক নাও হতে পারে। কারো শিল্প হয়তো সুন্দর, কিন্তু জীবনবোধ পরিচ্ছন্ন নয়। অপরিচ্ছন্ন জীবনবোধসম্পন্ন শিল্পীর শিল্প যতই মনোহারী হোক, তা জাতির সঙ্কটমুহূর্তে তাদেরকে অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে পারে না।

কবি আনতারা বিন শদ্দাদ (মৃ. ৬১৫ খ্রি.) ছিলেন আরবে অন্যতম সৈনিক কবি। বলতে গেলে আমাদের সিরাজী ও নজরুলের মতো। তাঁর কবিতায় প্রাধান্য বিস্তার করেছে বীরভাব। সহজ শব্দে কঠিন মনোভাব প্রকাশে তিনি পারঙ্গম ছিলেন। তাঁর কবিতায় রয়েছে বাণীভঙ্গির উদ্দীপনা, আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি ও আত্মশ্লাঘার মিশ্রণ। একসময় নবী স.-কে তাঁর কবিতা শুনানো হচ্ছিল। যখন এ পঙক্তি পর্যন্ত পৌঁছল, ‘বিনিদ্র রাত কাটিয়েছি কত/হালাল রিজিকের উপযুক্ত হতে পারি যেন’। এই কবিতা শুনে নবী স. মুগ্ধ হন, অভিভূত হন; হৃদয়ের তলদেশ যেন দুলে ওঠে এক আশ্চর্য আনন্দলহরীতে। তিনি উপস্থিত শ্রোতৃবর্গকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘কোনো আরবীর প্রশংসা শুনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি অনুপ্রাণিত হইনি। কিন্তু সত্য বলতে কি, আমি এই কবিতা রচয়িতার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহবোধ করছি।’ কী ছিল তার কবিতায়? কেন রাসূলের এই মুগ্ধতা? শুধু এ জন্যই যে, আনতারার কবিতাটি একটি সুস্থ জীবনের স্বচ্ছ ছবি আঁকতে সক্ষম হয়েছে। রাসূলের এই সপ্রশংস সমালোচনায় শিল্পের একটি বড় নীতি বিশ্লেষিত হয়েছে। আর তা হলো, শিল্প মানবজীবনের অধীন, মানবজীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ; তার বৈরী বা উর্ধ্বস্থিত কোনো কিছু নয়। অর্থাৎ, শিল্পের খাতিরে শিল্প নয়, জীবনের জন্য শিল্প। কেউ হয়তো বলবে, নিছক মন্তব্য-মুগ্ধতা-প্রতিক্রিয়া কি আর সমালোচনা হয়? তা হলে আমরা বলব, নেহায়েত অসমালোচনাও হয় কি তা হলে? কারণ, তাবৎ সমালোচনা, বলতে গেলে, এই তিনটি জিনিসেরই কাগজে-কলমে লিখিত প্রলম্বিত রূপ, কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণিক চিত্র। বলতে চাচ্ছি, সমালোচনা, একদিক থেকে, যেমন নিছক মন্তব্য-মুগ্ধতা-প্রতিক্রিয়া নয়, তেমনি আবার এ তিনটি জিনিসেরই ব্যাখ্যায়িত ও বিশ্লেষিত রূপ নয় কি? বিশেষ করে, এ-তিনটি কাজ যদি একজন সংস্কৃতিবান, সহৃদয়, উদার ও রসবোধসম্পন্ন ব্যক্তির হয়, তা হলে তো এগুলি সৃষ্টিশীল সমালোচনারই নামান্তর।

কবি উমাইয়া বিন সলত (৬২৪ খ্রি.) প্রশংসাগীতি, গৌরবগাথা ও শোকগাথা- এ শাখাত্রয়ে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য খ্যাত ছিলেন। তিনি কাফের হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কবিতায় আল্লাহর মহিমা ও পরকালের ভয়াবহতা পরিস্ফূটিত হয়েছে। তাঁর কাব্যে প্রকাশ পেয়েছে ধর্ম ও ধার্মিকতার তত্ত্ব। তাঁর একশটি কবিতা সাহাবীদের মুখে শুনার পর রাসূল স. সমালোচনা করেন, ‘তাঁর কবিতা ঈমান এনেছে, কিন্তু তাঁর অন্তর এখনো কাফের’। উমাইয়া শুধু যে কাফের ছিলেন, তা নয়; বরং তিনি রাসূলের ঘোর শত্রুও ছিলেন। রাসূলের নাম শুনলে পর্যন্ত সে হিংসায় জ্বলে ওঠত। তবু রাসূল স. তাঁর একশ‘টি কবিতা শুনলেন এবং প্রশংসায় টইটম্বুর মন্তব্য করলেন। রাসূলের সমালোচনাও সৃষ্টিশীল রচনার মর্যাদা রাখে। কত সুন্দর সমালোচনা! প্রতীকের আশ্রয়ে সমালোচনা। এখানে ‘মুমিন-কাফের’ মূলত প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ঈমান এনেছে’ মানে তার সত্য উচ্চারিত হয়েছে। শিল্পের এমন নিরপেক্ষ সমালোচনা একমাত্র একজন নিাপ সত্তাই করতে পারেন। তা হলে ‘তার অন্তর এখনো কাফের’ কেন? হ্যাঁ, তা হতে পারে। কীভাবে, শিল্পের উদ্দেশ্যের খাতিরে। শিল্প জীবনের জন্য, নিছক শিল্পের জন্য নয়। কারণ, সমালোচনায় একটি সামাজিক দায়িত্ব উদযাপিত হয়। সাহিত্যের সত্য কোনোদিন কোনো চলিষ্ণু সামাজিক সত্যের বিরোধী হতে পারে না- অন্তর্গত অর্থে। হতে পারে আপাত-বিরোধী, কিন্তু স্থায়ী সত্যের উপাদান তার মধ্যে থাকেই থাকে। সমালোচনা তো কোনো জীবনবিচ্যুত জীবনবিদ্বেষী অক্ষিত তাত্ত্বিক রূপ মাত্র নয়। সমালোচনা জীবনশ্লিষ্ট এক ব্যাপার। সুতরাং সমালোচনা ব্যাপারটিই সামাজিক ব্যাপার। সমালোচনা সামাজিক।’’

এ-তিনটি সমালোচনায় কেউ যদি প্রশ্ন করে, এখানে কবিতার শরীরবিচারের চেয়ে আত্মাবিচারের দিকে ঝোঁক বেশি। আমরাও বলি, রাসূলের সমালোচনায় ওটা বেশি। কারণ, আবদুল মান্নান সৈয়দের (১৯৪৩-২০১০) ভাষায় :

নিহিতার্থ সন্ধান সমালোচনার প্রধান কাজ। রূপকে সমালোচনা অগ্রাহ্য করে না, কিন্তু তার অন্তিম গন্তব্য আত্মা। যে সমালোচনা রচনার আত্মাকে আবিষ্কার করতে পারলো না, তা বৃথা। আজকালকার দেহাত্মবাদী সমালোচনারও তীর্থ আত্মাই। আধুনিক সমালোচকের কাছে আধার ও আধেয় তুল্যমূল্য।

আর কেউ যদি প্রশ্ন করে, এসব সমালোচনা ব্যক্তি নিরপেক্ষ বা নৈর্ব্যক্তিক হয়নি, তা হলে আমরা বলব, ‘সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক যিনি, তিনি সমালোচক নন।’ আবারো সৈয়দের ভাষায় :

সমালোচনায় নৈর্ব্যক্তিকতার কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আসলে নৈর্ব্যক্তিকতা একটা অসম্ভব ব্যাপার। সমালোচকও তো আদর্শবান, যে আদর্শ তাঁর পাঠ, প্রস্তুতি, অনুভূতি, অভিজ্ঞতার একটি কেলাসিত রূপ। প্রত্যেক সমালোচক তো অনন্য হয়ে ওঠেন তাঁর এই আদর্শ থেকেই। সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক যিনি, তিনি সমালোচক নন।

রাসূলের সমালোচনাগুচ্ছে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করতে হবে যে, তিনি ‘বাজে’, ‘খারাপ’ বা ‘কিচ্ছু হয় নি’ ধরনের কোনো মন্তব্য বা সমালোচনা করেননি। বরং তিনি বার বার ভালো ও উত্তীর্ণ কবিতাকেই নির্বাচন করেছেন এবং সেটিরই তারিফ করেছেন। কারণ : খারাপ লেখাকে সবসময় চিহ্নিত করার দরকার নেই সমালোচকের, কিন্তু উত্তীর্ণ রচনা মাত্রকেই শনাক্ত করা প্রয়োজন। খারাপ লেখা আপনিই ঝরে যায়। কিন্তু ভালো লেখার তারিফ সাহিত্যের উন্নয়নের জন্যে, দিকনির্দেশের জন্যে দরকার। ভালো লেখা অপ্রশংসিত অবস্থায় পড়ে থাকা মানে সেই সাহিত্যের একটি সম্পদ থেকে বঞ্চিত হওয়া নয় কেবল- পরবর্তী সাহিত্যের অগ্রসরণও তাতে বাধাগ্রস্ত হয়। ভালো লেখা চিহ্নিত করা মানে রুচির নির্মাণ, রুচির উন্নয়ন, রুচির গুঞ্জরণ।

মনে রাখতে হবে, রুচিই হচ্ছে সমালোচনার আদি উৎস। রুচিই নির্বাচনের শক্তি যোগায়। কোনো কোনো সমালোচকের রুচি খারাপ, নির্বাচনের শক্তি নেই তাদের। তাই তাদের সমালোচনা পর্যবসিত হয় নিছক মনগড়া মন্তব্যে, কিংবা পরিণত হয় জাতপরিচয়হীন বক্তব্যে।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এমন একটি যুগে, যখন সমালোচনাসাহিতের শিল্পরূপ গড়ে ওঠেনি, সমালোচনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের রূপ-রীতি প্রণিত হয়নি, তখনই নবী স. সমালোচনার কিছু নীতি নির্ধারণ করে দিলেন। সমালোচনাসাহিত্যের কুঁড়ি-না-মেলা সময়েই তিনি তাকে এক অসাধারণ ফুটন্ত ফুলের রঙ-রূপ দান করলেন। এবং রচনার উৎকৃষ্টতার মানদন্ড নির্ধারণ করলেন শৈলীর জাদুময়তা ও চিন্তার ধর্মমুখিতা। ঠিক সে মুহূর্তে যখন সাহিত্যসমালোচনা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের কোনো স্তরই অতিক্রম করতে পারেনি, তখনই কুরআন ও রাসূলের বাণী রচনা ও কবিতাকে নতুন করে যাচাই-পরখ করার সুযোগ করে দিলেন এবং নতুন আঙ্গিকে সমালোচনার পথ দেখালেন। তাই বলা যায়, সেই জাহেলি যুগে রাসূল স. সমালোচনাসাহিত্যের পরিধি প্রশস্ত করলেন। কাব্যসমালোচনায় যুগ করলেন আধুনিকতা ও নতুন মাত্রা।

রাসূল স. তাত্ত্বিক সমালোচনা করে ক্ষান্ত হননি, যেমনটা আমরা উপরে বর্ণনা করলাম। তিনি আরেক বিশেষ ধরনের সমালোচনারও প্রবর্তন করেন। সেটি হলো পরামর্শ ও নির্দেশনামূলক সমালোচনা, যা কবি-সাহিত্যিকদের হাত ধরে পথ দেখায়, যা অনুসরণ করলে সাহিত্য-কবিতা শিল্পমানে শিখরস্পর্শী হয়। তাদের রচনায় যেন ফুটে ওঠে রূপ-রসের বসস্ত। তিনি এক বাণীতে বলেন, ‘সে-ব্যক্তির চেহারা আল্লাহ সজীব করে দিন, যে-ব্যক্তি প্রয়োজনুপাতে কথাকে সংক্ষেপ করে।’ জারীর বিন আবদিল্লাহ বাজলীকে তিনি বললেন, ‘হে জারীর! তুমি যখন কিছু বল, খুব সংক্ষেপে বল। কথা উদ্দেশ্য যখন পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তুমি কৃত্রিমভাবে কথা বাড়ায়ো না।’ তিনি ঈসা নবীর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘তোমরা মূর্খদের সামনে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বল না, তাতে প্রজ্ঞার মানহানি হবে। আর প্রজ্ঞাকে একেবারে এড়িয়েও চল না, তাতে মূর্খদের ওপর জুলুম হবে।’

এসব বাণীতে তিনি কথায়-কাজে মিল রাখার প্রতি আহবান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে বাড়াবাড়ি-অতিরঞ্জন, কৃত্রিমভাবে পান্ডিত্যপ্রকাশ ও অপ্রয়োজনীয় ছন্দমিল বর্জনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কারণ, এগুলো অর্থকে কলঙ্কিত করে, বাস্তবকে হত্যা করে, এবং সত্য-মিথ্যার মাঝে অন্যায় ঘটকালি করে।

রাসূলের এসব সমালোচনা -তাত্ত্বিক ও দিকনির্দেশনামূলক- যা তিনি কবি-সাহিত্যিকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন, সেগুলো বিদ্যায়তনিক পঠন-পাঠনের ওপর নির্ভর করে নয়; বরং তাঁর স্বভাবরুচি, পরিচ্ছন্ন চিন্তাশক্তি, বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, ধর্মের মূল প্রাণ ও প্রেরণা থেকে উভূত চেতনার ওপরই নির্ভর করে, এবং শব্দ, অর্থ, শৈলী ও উদ্দেশ্যের প্রতি লক্ষ্য করে।

\ ৫ \

সমালোচনার আধুনিক পরিভাষার আলোকে রাসূলের সমালোচনাগুলোর বিচার করা হয়তো অযৌক্তিক হবে, কিংবা ‘আমগাছের কাছে আতা ফল চাওয়া হলে যা হয়’ তাই হবে। কারণ, যে-কালপরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সমালোচনার কুঁড়িফুটন, তার সঙ্গে আজকের সমালোচনাপরিভাষাগুলোর তুলনা হয় কী করে? পরিভাষাপরিপুষ্টির যুগের সঙ্গে পরিভাষাদুর্ভিক্ষের তুলনা হয় কীভাবে? তবুও, কাব্য-সাহিত্য যেহেতু মানুষের জীবনেরই দর্পণ, সেহেতু নানাকৌণিক সাযুজ্য রাখা অস্বাভাবিক নয়। সমালোচনার আধুনিক পরিভাষাগুলো এবং রাসূলের সমালোচনাসমূহ নিবিড়ভাবে পাঠ করলে দেখা যায়, সুদীর্ঘ চৌদ্দশ বছরের আগের বিচারপ্রক্রিয়া আজকের অত্যাধুনিক বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আনুপূর্বিক না হলেও, মোটামুটিভাবে মিলে যায়। বিশদ আলোচনা এখানে সম্ভব নয়। তাই প্রসঙ্গটি আমরা কলমের নিবস্পর্শে ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যেতে চেষ্টা করব।

আগেই বলে নিতে হচ্ছে, সাহিত্য বা অন্যকোনো শিল্পকলার সংজ্ঞাদান গাণিতিক পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। যা সম্ভব, তা হলো- ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে কাছাকাছি ধারণায় পৌঁছা। তাই ‘সাহিত্য ও সাহিত্য সমালোচনাকে বোঝার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ জটিল পথযাত্রা’। সরলীকরণ-অর্থে বলতে পারি, সাহিত্যের ভালো-মন্দ, সৌন্দর্য-অসৌন্দর্য, উৎকর্ষ-অপকর্ষের সম্যক আলোচনা হলো সাহিত্য-সমালোচনা। সম্যক আলোচনা মানে, সাহিত্যের ভাব, বস্তু, রীতি, অলঙ্কার ও স্রষ্টার বিশেষ মানস-দৃষ্টির সামগ্রিক আলোচনা। উপরিউক্ত রাসূলের সমালোচনাগুলোতে এ-কথাগুলি বর্ণে-বর্ণে প্রযোজ্য। স্রষ্টার বিশেষ মানস-দৃষ্টির কথা যে বলা হয়েছে, সেটাও আমরা দেখতে পাই উমাইয়া বিন সলতের কবিতার সমালোচনায়, যেখানে বলা হয়েছে, ‘তার কবিতা মুমিন, কিন্তু কলব কাফের’। কলব কাফের হয়ে কবিতা কীভাবে মুমিন হয়? এখানে রাসূল স. কবির মানস-দৃষ্টির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, তার কবিতায় ধর্ম-ধার্মিকতা, তৌহীদের কথা ও পরকালের বিশ্বাসের কথা রয়েছে, কিন্তু নবীর ব্যক্তিত্বের প্রতি বিদ্বেষবশত সে মুমিন হতে পারল না। এটি ঐতিহাসিকভাবেও সত্য। তবে রাসূলের আলোচনা ‘সম্যক’ ছিল না। ‘সম্যক’ ছিল না এ-অর্থে যে, তাঁর সমালোচনা তো গ্রন্থের পাতায় মুদ্রিত, কিংবা ‘বর্নাঢ্য’ অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ছিল না। এবং তখন এটার প্রয়োজনও ছিল না, সম্ভবও না।

আধুনিক সমালোচনার প্রামাণ্য পুরুষ টি. এস. এলিয়ট বলেছেন, সমালোচনার কাজ দু‘টো : ‘শিল্পকর্মের উদ্ভাসন (the elucidation of a work of art) এবং রুচিবোধের সংশোধন (the correction of taste)।’ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি রচনা সম্পর্কে পাঠকের ধারণা স্পষ্ট হয়। এবং সমালোচনার মধ্যে নিহিত মূল্যবোধ ও যুক্তিতর্কের কারণে সমকালীন রুচির মধ্যে পরিবর্তন আসে। ঠিক এ কাজটি হয়েছিল রাসূলের যুগে। তাঁর সমালোচনার কারণে সমকালীন কবিদের কবিতা সম্পর্কে কাব্যভোক্তাদের ধারণা স্পষ্টতর হয়েছিল এবং সমকালীন এক বিশাল কবিগোষ্ঠির রুচির মধ্যে পরিবর্তন এসেছিল প্রভূত পরিমাণে।

বাংলায় রচিত সাহিত্যতত্ত্বমূলক গ্রন্থসমূহে সাহিত্য-সমালোচনার পদ্ধতির সংখ্যাবিভিন্নতা লক্ষণীয়। গ্রন্থভেদে পাঁচটি, সাতটি, আটটি, নয়টি ও দশটি পদ্ধতির কথা রয়েছে। বিভিন্নতার মাঝে দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। শ্রেণীকরণের স্বাধীনতা প্রত্যেকেরই রয়েছে। তবে সমালোচনায় বস্তুনিষ্ঠতাই কাম্য। সীমাবদ্ধকরণের জন্য নয়, আলোচনার সুবিধার্থে এ কয়টি পদ্ধতি আমরা সামনে রাখতে পারি : ১. ঐতিহাসিক সমালোচনা (Historical Criticism), ২. শাখাভিত্তিক সমালোচনা (Specific Criticism), ৩. পরিসংখ্যানগত সমালোচনা (Statistical Criticism), ৪. তুলনামূলক সমালোচনা (Comparative Criticism), ৫. আলঙ্কারিক (বা বিশ্লেষণাত্মক) সমালোচনা (Analytical Criticism), ৬. সনাতন বিধিসম্মত (বৈধী) সমালোচনা (Classical Criticism), ৭. বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা (Objective Criticism), ৮. যুক্তিপন্থী সমালোচনা (Inductive Criticism), ৯. মনস্তাত্ত্বিক সমালোচনা (Psycho-analytical Criticism), ১০. তত্ত্বসন্ধানী সমালোচনা (Philosophical Criticism), ১১. ব্যক্তিগত সমালোচনা (Personal Criticism), ১২. আপেক্ষিক সমালোচনা (Relativistic Criticism)।

পূর্বোদ্ধৃত রাসূলের সমালোচনাগুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, সমালোচনাপদ্ধতির প্রথম চারটি তাঁর সমালোচনায় দুর্লক্ষ। ঐতিহাসিক সমালোচনা এ অর্থে দুর্লক্ষ যে, তিনি যে কাব্যসমালোচনা করেছেন, তা ইতিহাসভিত্তিক নয়। তবে এ কথা যদি মেনে নেওয়া হয় যে, ‘ইতিহাসের সঙ্গে অতীত অবিচ্ছেদ্য বটে; কিন্তু কেবল অতীতটা ইতিহাস নয়।’ বরং, ‘দেশ ও কালের মধ্যে ঘটমান আবর্তন ইতিহাস নামে পরিচিত, সুতরাং ইতিহাস বলতে দেশের কথা ও কালের কথা-উভয়টার বোঝায়।’ তা হলে তাঁর সমালোচনা যে ঐতিহাসিকও ছিল, তা সুস্পষ্ট। যেহেতু সে যুগে সাহিত্যের শাখাবিভাজন হয়নি, তাই শাখাভিত্তিক সমালোচনা অসম্ভব। পরিসংখ্যানগত সমালোচনা : অর্থাৎ, সমালোচনার অন্যান্য পথ ছেড়ে, শুধু কোনো লেখকের বিচিত্র শব্দ-সম্পদ ও ভাব-কল্পের বিক্ষিপ্ত ব্যবহারের সংখ্যা নির্ধারণ করে, তার সাহায্যে কবি-মানসের ওপর আলোকপাত করা। উল্লেখ্য, সে-যুগে তো দূরের কথা, এ যুগেও যে সাহিত্যাঙ্গনে এধরনের সমালোচনার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ, তা বলাই বাহুল্য। তুলনামূলক সমালোচনার অর্থ যদি এ হয় যে, ‘এক দেশের সাহিত্যের সঙ্গে অপর দেশের অনুরূপ সাহিত্যের তুলনা দিয়ে সাহিত্যসমালোচনা আধুনিক কালে বিশেষ জনপ্রিয় হয়েছে।’ তা হলে বলতে হবে, সে-যুগে যেহেতু যোগাযোগব্যবস্থাহীনতার কারণে দেশ-কালের সীমা ছিল দুর্লঙ্ঘ্য, সেহেতু তুলনামূলক সমালোচনার কথা ওঠতেই পারে না। আর যদি তার অর্থ এই হয় যে, ‘সাহিত্য-বিচারে দুইটি বিভিন্ন লেখকের শব্দ-সম্পদ বা পঙক্তির তুলনামূলক বিচারে উভয়ের কৃতিত্ব নির্ধারণ করা যাইতে পারে।’ তা হলে বলা যায়, রাসূল স. যে একই জাতের ও একই সময়ের অসংখ্য কবিদের থেকে কোনো কোনো কবির কবিতা নিয়ে, একজনের কবিতা সম্পর্কে এক ধরনের মন্তব্য, আবার অন্যজনের কবিতা সম্পর্কে ভিন্ন মন্তব্য উপস্থাপন করেছেন, সেটা কি এক ধরনের তুলনামূলক সমালোচনা নয়?

এগুলি ছাড়া, এবং অন্যান্য সমালোচনাপদ্ধতিগুলোর মধ্য থেকে শুধু ‘আপেক্ষিক সমালোচনা’টা বাদ দিয়ে, অন্যান্য পদ্ধতিগুলো রাসূলের সমালোচনায় সহজলক্ষ্য। উপরিবর্ণিত সমালোচনাসমূহ নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করলে এবং সমালোচনাপদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়। এবং এ কাজটি সচেতন, সন্ধানী ও বোদ্ধা পাঠকদের কাছে সোপর্দ করলাম।

সহযোগিতায়

(ফুটনোটে উল্লিখিত উৎস ছাড়াও আরো যেসব উৎস থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।)

১। http://www.alfaseeh.com/vb/archive/index.php/t-31336.html

২। http://technologie.ahlamontada.com/t1206-topic

৩। http://www.alfaseeh.com/vb/archive/index.php/t-31336.html

৪। কবি ও কবিতা সম্পর্কে রাসূল (সা) ও সাহাবীদের মনোভাব, ড. আবদুল জলীল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৯৫ (প্র. প্র)

৫। সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মহানবী, মুকুল চৌধুরী সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৫

৬। আরবি সাহিত্যের ইতিহাস, আ. ত. ম মুছলেহউদ্দীন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮২ (প্র. প্র)

৭। আরবি তানকীদ : আহদে জাহেলি সে দাওরে ইনহিতাত্ তক (আরবি সাহিত্য-সমালোচনা : জাহেলি যুগ থেকে অবক্ষয়ের যুগ পর্যন্ত), ড. মুহাম্মাদ ইকবাল হোসাইন নাদভী, হায়দরাবাদ, ভারত, ১৯৯০।

-মুহাম্মাদ হাবীবুল্লাহ