কারিগরি শিক্ষা

পৃথিবী তথা আমাদের এই বাংলাদেশে নানাবিধ শিক্ষা রয়েছে। তবে সব শিক্ষাকেই দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে তাত্ত্বিক ও অপরটি ব্যবহারিক। বলা যেতে পারে একটিকে ছাড়া অপরটি প্রায় অচল। অনেক সময় তাত্ত্বিকের চেয়ে ব্যবহারিক বা কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। কারিগরি শিক্ষা মানে শিক্ষক বা প্রশিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া। তবে ব্যবহারিক মানেই কারিগরি নয়। ব্যবহারিক শিক্ষা মানে যন্ত্রপাতিসহ হাতে-কলমেদেয়া। আর কারিগারি শিক্ষা মানে যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন সামগ্রী ইত্যাদির মাধ্যমে বাস্তব শিক্ষা প্রদান করা। অবশ্য আমাদের দেশের উল্লেখিত সব শিক্ষাই তুলনামূলকভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছে। তার মধ্যে আমরা বেশি পিছিয়ে আছি কারিগরি শিক্ষা বা টেকনিক্যাল এডুকেশনে। তাছাড়া কারিগরি শিক্ষার দিক দিয়ে আমরা এখন পর্যন্ত কোন তিমিরে আছি তা কারো জানা থাকার কথা নয়।

সারাবিশ্ব প্রযুক্তিসহ সবদিকে ঈর্ষনীয়ভাবে এগিয়ে গেছে তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টার কারণে। বিভিন্ন দেশের সরকার এক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে এসেছে, সেভাবে এগিয়ে এসেছে দেশের মানুষ। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে উন্নত দেশগুলোতে এসব ব্যাপারে সবাই সচেতন। সচেতন নই কেবল আমরা। এসব ব্যাপারে আমরা সচেতন নই বলে দেশে বেকার বা কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। ফলে দেশে বেকার সমস্যা প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। তাতে আমরা শিক্ষা, অর্থনীতিসহ অনেকক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করতে পারছি না। কবে-নাগাদ কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে তা আমরা বলতেও পারি না। একটি সূত্রে জানা গেছে, আমাদের দেশে অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা (কারিগরি) চার হাজার ৫০০’র কিছু বেশি। আর অননুমোদিত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১১০০টিরও বেশি। অনেকে বলছেন, অননুমোদিত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো বেশি। কারণ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানের অলি-গলিতে কোচিং সেন্টারের মতো ব্যাঙের ছাতার ন্যায় গজিয়ে উঠেছে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা প্রদান নিয়ে রয়েছে হাজারো অভিযোগ। তারপরও কী করে এসবকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলা হয় তা আমাদের মাথায় আসে না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত সমস্যা, সরঞ্জামের অভাব, শিক্ষা বা প্রশিক্ষক সংকট ইত্যাদি অন্যতম সমস্যা। বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করে শিক্ষার্থীরা এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষালাভের জন্য ভর্তি হয় দেশে-বিদেশে চাকরি নামের সোনার হরিণটি ধরতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজেরাই সবদিক দিয়ে স্বাবলম্বী নয় সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের কতটুকু শিক্ষা দিচ্ছে? অথচ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বাহারি যত নাম। এসবের নাম শুনেই সহজ-সরল মানুষ এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি জ্ঞানলাভের জন্য ভর্তি হয়। বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কারিগরি জ্ঞান বা শিক্ষা লাভের পর অনেকেই কাজ বা চাকরি ক্ষেত্রে আরো বিভ্রান্তি বা সমস্যায় পড়ে। কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে যা প্রয়োজন সেই শিক্ষা দেয়া হয় না। এভাবে অনেক মানুষ পরবর্তীতে অন্য ভাল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির চিন্তাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে। অর্থাৎ তখন তারা (প্রতারিতরা) সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিম্নমানের মনে করে। দেশে বেকার সমস্যা বাড়ার পেছনে এটাও কারণ। অনেক সময় প্রশিক্ষণশেষে চাকরি প্রদানের মিথ্যা আশ্বাস দেয়া হয়।

বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষ ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে। আমাদের দেশের অনেকেই কারিগরি শিক্ষা (যথাযথ) গ্রহণ না করে বিদেশে গিয়ে নানা সমস্যায় পড়ে। অনেকে মনের মত কাজ না পেয়ে দেশে ফিরে আসে। তাতে প্রচুর অর্থ ও সময়ের অপচয় হয়। বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানে বিপ্লব ঘটানোর আশাবাদ ব্যক্ত করে। অতীতে বিভিন্ন সময়ের সরকারও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেছিল; কিন্তু তার ছেটাফোঁটা উপকার মানুষ পেয়েছে কিনা সন্দেহ। আসল কথা হলো, যুগের যুগ চলে গেলেও সময় বা যুগোপযোগী কারিগারি শিক্ষার জন্য দেখা যাচ্ছে না প্রয়োজনীয় শিক্ষাক্রম বা সিলেবাস প্রণয়নের কোনো সঠিক উদ্যোগ। বেশিরভাগ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথাযথ শিক্ষা প্রদানের নামে চিহ্নিত হয়েছে সনদপত্র বিক্রির প্রতিষ্ঠানে। এভাবে এসব নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রচুর অর্থ। দুঃখের বিষয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মানুষ যেভাবে চাকরি বা কাজ পায় আমাদের দেশের লোকেরা তা সেভাবে পায় না। এর প্রধান কারণ অভিজ্ঞতার অভাব। বিশেষ করে তরুণ ও যুবকরা এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়। অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠানে ওয়েলডিং, পাইপ ফিটিংস, রড ও কাঠের কাজ, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে থাকে। এসবের ভালমন্দ দিক নিয়ে মাঝেমধ্যেই পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়; কিন্তু মান আর বাড়ছে না কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে। এ ব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত শ্রম মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, এসব স্থানের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশের কারণে এসব নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না মোটেই।

তবে ভাল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যে একেবারেই নেই তা অবশ্য বলা যাবে না। ভাল বা উন্নত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হয়। আর নিম্নমানের কারিগরি প্রতিষ্ঠানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া হয়। তবে নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালমানের প্রতিষ্ঠানে কোর্স ফি একটু বেশিই। কথায় বলে, ‘যত গুড় ততো মিষ্টি। ভাল কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে দেশে-বিদেশে ভাল বেতন বা পারিশ্রমিকে কাজ করছে। নিম্নমানের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিতর্কিত কর্মকান্ডের বদনামের ভাগিদার হচ্ছে উন্নত বা ভাল প্রতিষ্ঠানগুলোও। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের সামগ্রিক কারিগরি শিক্ষার ওপর।

অভিযোগ উঠেছে, দেশের বিভিন্নস্থানের অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-কর্মচারির সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি করার ফলে মাঝেমধ্যে জটিলতা দেখা দেয়। দেশের বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাঝেমধ্যেই নানা সমস্যা ও সংকটের কারণে দেখা দেয় ছাত্র অসন্তোষ ও সহিংস ঘটনা। শুধুমাত্র শিক্ষক স্বল্পতার কারণে অনেক সময় কারিগরি কলেজগুলোতে শত শত শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কারিগরি শিক্ষার বেহাল অবস্থার পেছনে এটিও একটি কারণ। সময়মতো ভর্তি হতে না পেরে অনেকে নানা ক্ষতি বা সমস্যার সম্মুখীন হয়। দেশের যেসব মাধ্যমিক স্কুল-মাদরাসায় ভোকেশনাল বিষয় আছে, ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপরও সরকারের নজর বাড়াতে হবে। সরকারের মনে রাখা জরুরি, এসব ক্ষেত্রে গুরুত্ব যত বাড়ানো হবে, দেশ কারিগরি তথা প্রযুক্তির দিক দিয়ে ততো বেশি এগিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। পোলট্রি শিল্প, মাছ পালন, ফসল চাষ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আমাদের দেশের পাঠ্যসূচিতে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তা তেমন জোরালো নয় বরং দায়সারা। এগুলোকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে, যাতে ব্যবহারিক বা বাস্তব জীবনে এসব শিক্ষা কাজে লাগানো যায়। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। তাই তাত্ত্বিক বিষয়গুলোও যাতে আমাদের উপকারে আসে সেইদিকেও নজর বাড়াতে হবে। শুধু নম্বর বা ভাল পাসের জন্য পড়ালেখা করলেই চলবে না বরং সব সিলেবাসই হতে হবে বাস্তব ও কল্যাণমুখী। এসব বিষয়ে জোর দেয়া গেলে দেশে প্রকৃত শিক্ষিত বা কাজে অভিজ্ঞ লোকের সংখ্যা বাড়বে। ফলে কমবে বেকারের সংখ্যা। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপরও।

আবদুস সালিম