চাকরি, ক্যারিয়ার, ইন্টারভিউ, ভাইবা

চাকরি, নিয়োগ বা ক্যারিয়ার গঠনের ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রার্থীর জন্য এটা অনেক ক্ষেত্রেই আতঙ্কজনক। তবে আতঙ্ক বা উদ্বেগকে দূরে সরিয়ে রেখে ইন্টারভিউতে ভালো ফল করার জন্য মানসিক দৃঢ়তা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে সব সময় মাথা ঠান্ডা রেখে, বিচলিত না হয়ে এবং ধীর-স্থিরভাবে ইন্টারভিউ দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর দিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে—
ভাইভা দিতে আসার পূর্বে
• পরিষ্কার জামাকাপড় পরুন, তবে একেবারে নতুন জামাকাপড় না পরাই ভালো, অনেক সময় নতুন জামা অস্বস্তিকর হয়।
• চুলের স্টাইল বা চেহারায় অন্য কোনো রকম বদল আনার চেষ্টা না করাই ভালো।
• খুব গাঢ় বা উজ্জ্বল রঙের জামাকাপড় না পরলেই ভালো।
• পকেটে একটি কলম রাখুন।
• একটি ফোল্ডারে জরুরি কাগজপত্র নিন।
• কাগজপত্রগুলো পরপর সাজিয়ে রাখুন।
• খামের মধ্যে কাগজপত্র না নেয়াই ভালো, তাতে প্রয়োজনীয় কাগজটি দেখাতে অযথা সময় নষ্ট হয়।
• শুধু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে রাখুন।
• আপনার পাঠানো অ্যাপ্লিকেশন ও বায়োডাটার প্রতিলিপি এবং মার্কশিট ইত্যাদি জরুরি কাগজপত্র সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
• কোনো কাগজপত্র নিজে থেকে দেখাবেন না, চাইলে তবেই কাগজপত্র দেখান।
• ইন্টারভিউ শেষে সকল কাগজপত্র ফেরত নিতে ভুলবেন না।
ইন্টারভিউ রুমে ঢোকা, বসা ও বেড়ানো
• আপনার নাম ডাকা হলেও অনুমতি নিয়ে ঘরে ঢুকবেন। ঘরে ঢুকে প্রথমে ইন্টারভিউ যারা নেবেন তাদের সাধারণ শিষ্টাচার মেনে সম্ভাষণ (সালাম বা সুপ্রভাত ইত্যাদি) করুন।
• বসতে বলা হলে তবেই বসুন, বসার আগে ধন্যবাদ জানান, সোজা হয়ে বসুন, পায়ের ওপর পা তুলে অথবা পা দুটি আড়াআড়ি করে বসবেন না।
• ইন্টারভিউ যারা নেবেন তাদের দিকে সোজাসুজি তাকান, মাটির দিকে বা ঘরের ছাদের দিকে তাকাবেন না।
• কাগজপত্র যা সঙ্গে নিয়ে গেছেন, তা টেবিলে অথবা কোলের ওপর রাখুন।
• প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে উত্তর দিন।
• একজন প্রশ্নকর্তার উত্তর দেয়ার সময় অন্যদের দিকে তাকাতেও ভুলবেন না।
• মুদ্রাদোষগুলো সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন থাকুন, গোঁফে হাত বুলানো, চুল ঠিক করা, নাক চুলকানো এসব একদম করবেন না।
• হাতের মধ্যে কলম বা চাবির গোছা নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে না যাওয়াই ভালো।
• ইন্টারভিউ শেষে উঠে দাঁড়ান, ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তাদের ধন্যবাদ জানান এবং তারপর ঘর ছাড়ুন।
উত্তর দেয়া
• মন দিয়ে প্রশ্ন শুনুন ও বোঝার চেষ্টা করুন। প্রথমবারে যদি প্রশ্নটি বুঝতে না পারেন, তবে নম্রভাবে আর একবার প্রশ্নটি করতে বলুন।
• সংক্ষেপে উত্তর দিন, প্রয়োজন না হলে বড় উত্তর দেবেন না।
• উত্তর দেয়ার সময় খেয়াল রাখুন আপনার আত্নবিশ্বাস যেন প্রতিফলিত হয় কিন্তু সবজান্তা ভাব করবেন না।
• কোনো উত্তর সম্পর্কে স্থির নিশ্চিত না হলে ‘আমার মনে হয়’ বা ‘আমার যতদূর জানা আছে’ বলে উত্তর শুরু করুন। একই উত্তর একাধিকবার আওড়াবেন না।
• প্রত্যেকটি শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করুন এবং সবাই যাতে শুনতে পান সে বিষয়ে খেয়াল রাখুন।
• সময় নষ্ট না করে উত্তর দিন। উত্তর দেয়ার সময় অযথা ঠাট্টা বা মজা করে কোনো কথা বলবেন না।
• উত্তর দেয়ার সময় যারা ইন্টারভিউ নিচ্ছেন তাদের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিন, ঘরের আশপাশে বা বাইরে তাকিয়ে থাকবেন না।
• আপনার বায়োডাটা সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে বিস্তারিত জানানোর থাকলে সে সম্পর্কে শুধু নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো দিন।
• ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তাদের সামনে টেবিল থেকে কোনো কিছু নেয়া অসৌজন্যমূলক।
• কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সময় টাই অথবা জামাকাপড় ঠিক করবেন না।
• উঁচু গলায় প্রশ্ন এলেও উত্তর উঁচু গলায় দেয়া যাবে না, স্বাভাবিক স্বরে উত্তর দিন। ছোট সরল বাক্যে উত্তর দিন।
• জানতে না চাইলে অতিরিক্ত তথ্য জানাবেন না।
• আপনার উত্তরের জন্য বাহবা পেলে ধন্যবাদ জানাতে ভুলবেন না।
আচরণ ও কথোপকথন
• গোমড়া মুখে থাকবেন না, হাসি হাসি মুখ করে থাকুন।
• ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তাদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়বেন না, যদি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তবে নম্রভাবে আপনার মত প্রকাশ করুন। আপনার বিরুদ্ধ মত জানানোর আগে ‘মাফ করবেন’ বা ‘কিছু মনে করবেন না’ বলে নিন।
• একটি উত্তর দেয়ার পরে পরবর্তী প্রশ্নে আগের উত্তরটির বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করা ঠিক নয়।
• আপনার কোনো ভুল চিহ্নিত হলে তা মেনে নিন।
• এমনভাবে কথা বলুন যা সহজে বোঝা যায় অথচ ফরম্যাল।
• নিজে থেকে করমর্দন করার জন্য হাত বাড়াবেন না, ইন্টারভিউ যারা নিচ্ছেন তারা শেকহ্যান্ড করার জন্য হাত বাড়ালে তবেই হাত বাড়ান।

• আপনার আচরণে-কথাবার্তায় যেন আপনার ব্যক্তিত্ব ধরা পড়ে।

• উত্তর দেয়ার সময় আবেগ পরিত্যাগ করার চেষ্টা করবেন। উত্তর দেয়ার সময় খেয়াল রাখবেন যেন কোনো ব্যক্তি, সমষ্টি, জাতি, ধর্ম বা রাষ্ট্র সম্পর্কে অবমাননাকর বেফাঁস কথা বেরিয়ে না যায়।

• আপনার কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে বিনীতভাবে যতটুকু প্রমাণসাপেক্ষ ততটুকুই জানান, অযথা নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করবেন না।
• যারা ইন্টারভিউ নিচ্ছেন তাদেরকে আপনার পছন্দের বিষয় সম্পর্কে জানিয়ে সে বিষয়ে প্রশ্ন করার অনুরোধ জানানো অন্যায় নয়, তবে খেয়াল রাখবেন সেই বিষয়টি সম্পর্কে যেন সত্যিই আপনার দখল থাকে।

• ঠান্ডা মাথায় ইন্টারভিউ দিন। আপনার মুখমন্ডল বা দেহভঙ্গি যেন কাঠ কাঠ হয়ে না থাকে, যতটা সম্ভব সহজ-স্বাভাবিক থাকুন এবং সহজভাবে সবকিছু মোকাবিলা করুন।

• অতি উচ্ছবাস বা ক্রুদ্ধ কোনোটাই হওয়া যাবে না, যদিও প্রশ্নকর্তারা আপনার জন্য সুখকর বা বিব্রতকর কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
এছাড়াও ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়ের দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে—

১. যে কোনোভাবে একটি চাকরি পেতে হবে—এই মানসিকতা নিয়ে অনেকে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে প্রচুর সংখ্যায় আবেদন করতে থাকেন। এটা ঠিক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দরখাস্তকারী ইন্টারভিউতে ডাক পান না। আবার দু্-এক জায়গায় ডাক পেলেও চাকরি পান না। এতে মনে হতাশা জন্মায়, আত্নবিশ্বাস নষ্ট হয়। যে ব্যক্তি যে বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং যিনি যে বিষয়ে পারদর্শী তার সেই বিষয় সম্পর্কিত কোনো কাজের জন্য আবেদন করা উচিত।

২. বিজ্ঞাপন দেখে ভালোভাবে বিচার-বিবেচনা করে আবেদন করার পর ইন্টারভিউতে ডাক পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করা উচিত। অনেকে ভাবেন ইন্টারভিউতে ডাক পেলে তবেই নিজেকে প্রস্তুত করবেন। এটা ঠিক নয়। আত্নবিশ্বাস বাড়াতে হলে নিজেকে ভালোভাবে তৈরি করতে হবে এবং এটা আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গেই।

৩. ইন্টারভিউকে জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা হিসেবে না ধরে স্বাভাবিক পরিণতি মনে করতে হবে। অনেকের মনে এই চিন্তা আসে, ‘এই ইন্টারভিউতে একটা চাকরি পেতেই হবে, না হলে আমার সব শেষ হয়ে যাবে ভবিষ্যতে আর কোনো ইন্টারভিউতে ডাক পাব না, চাকরিও পাব না’ ইত্যাদি। এই ধরনের চিন্তার প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। এতে জীবনে হতাশা বাড়ে।

৬. ইন্টারভিউ দেয়ার সময় কোনো অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা একেবারেই চলবে না। নিজেকে বুদ্ধিমান ও কাজের যোগ্য হিসেবে প্রমাণিত করার জন্য যেটুকু বলা প্রয়োজন সেটুকুই বলবেন।

৭. ইন্টারভিউর ফলাফল কি হলো বা প্রার্থীকে কিভাবে তা জানানো হবে, তা জিজ্ঞাসা করা একেবারেই উচিত নয়।

৮. যাবতীয় বস্তুগত প্রস্তুতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও প্রস্তুতি নিন। কল্পনা করুন আপনি যথাযথভাবে ইন্টারভিউ মোকাবেলা করছেন এবং আপনি সফল হয়েছেন। এ ধরনের কল্পনা আপনার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং নার্ভাসনেস কাটাতে সাহায্য করবে।

আসলে ইন্টারভিউ নিয়ে আমরা যতটা আতঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন হই, ততটা আতঙ্ক বা উদ্বেগের বিষয় এটি একেবারেই নয়। কারণ নিয়োগকর্তা উপযুক্ত ব্যক্তিটিকে নিয়োগদানের জন্যই ইন্টারভিউয়ের আয়োজন করেন, যাতে করে অনেকের মধ্য থেকে যোগ্য লোকটিকে খুঁজে নিতে পারেন। তাই অযথা আতঙ্ক বা উদ্বেগ নয়, বরং আপনার কাজ হবে নিজেকে উপযুক্ত বা যোগ্য করে গড়ে তোলা। আর নিজেকে যোগ্য করে তোলার জন্য যেসব পদ্ধতি বা উপায় গ্রহণ করা দরকার, সেগুলো গ্রহণ বা অনুসরণ করার অর্থই হলো, আপনার প্রতিটি ধাপ সাফল্যের সঙ্গে হাঁটা। তাই বলে সাফল্য যে প্রথমবারেই পাওয়া যাবে, এই কঠিন প্রতিযোগিতার যুগে এমনটি না ভাবাই ভালো। তবে আপনি যদি নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন তাহলে সাফল্য যে আপনার দরজায় কড়া নাড়বেই, এমন প্রত্যাশা আমরা খুব সহজেই করতে পারি।