বজ্রপাত

বাংলাদেশের অবস্থান বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে। তাছাড়া বজ্রপাত বন্ধ বা প্রতিরোধে কোনো উপায় নেই, কারণ এটা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট। তবে বজ্রপাতে প্রাণহানি ও ক্ষতি কমিয়ে আনা কিংবা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা। বজ্রপাতে প্রতিবছর শতাধিক তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এ ছাড়া মূল্যবান ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বুঝতেই পারছেন না এর কারণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক বজ্রপাতে হতাহতের খবরের পর এমনই মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বজ্রপাত কি এবং কেন হয়?
বাতাসে নিহিত শক্তির তারতম্যের কারণে মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে স্থির বিদ্যুৎ মাত্রাতিরিক্ত জমে গেলে নিকটস্থ মেঘ বা ভূমির দিকে ছুটে আসে। এটাই বজ্রপাত। এর তাপমাত্রা থাকে ৪০ হাজার ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেট। ঘণ্টায় প্রায় ২লাখ ২০হাজার কিলোমিটার গতিবেগ থাকে বজ্রপাতে। দৈর্ঘ্যে ১‘শ মিটার থেকে ৮ কিলোমিটার, ব্যসার্ধে ১০ থেকে ২৫০মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে একেকটি বজ্রপাত। এতে ১০ কিলো থেকে ১ কোটি পর্যন্ত ভোল্ট থাকে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি অক্ষুন্ন রাখার জন্য বজ্রপাত প্রাকৃতিক চার্জ হিসেবে কাজ করে। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ৪০ থেকে ১০০ টি বজ্রপাত হয়।

বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ হিমালয়ের পাদদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত বলেই বাংলাদেশকে বজ্রপাতপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চৈত্র-বৈশাখে কালবেশাখীর মওসুম শুরু হলেই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটতে থাকে।

গত এক সপ্তাহে এক ডজনেরও বেশি মানুষ বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন। প্রতি বছরই এই মওসুমে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটে। ২০১৪ সালে সারাদেশে প্রায় শতাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৩ সালে একদিনেই ১০ জেলায় ১৮ জন নিহত হন।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি ঘটে ২০১২ সালে। ওই বছরের ১০ আগস্ট সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের মসজিদে বজ্রপাতে ইমামসহ ১৩ জন মুসল্লির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

আর সারাবিশ্বে বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি ঘটে ১৭৬৯ সালে। ইতালির একটি চার্চে বজ্রপাতে গান পাউডার বিস্ফোরিত হয়। এতে তিন হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বজ্রপাত পুরোপুরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ দুর্যোগ প্রতিহতের উপায় নেই। তবে রয়েছে রক্ষা পাওয়ার কৌশল।

সে বিষয়েই কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। মাটি বা ছনের ঘরকে বজ্রপাত থেকে রক্ষা করতে ঘরের উপর দিয়ে একটি রড টেনে তার সঙ্গে দুই দিকে দুটি রড খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ ঘরকে আক্রান্ত না করে রডের ভেতর দিয়ে মাটিতে চলে যাবে।

ইটের তৈরি অট্টালিকাকেও নিরাপদ করা যায়। তবে এখানে কিছুটা ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। এতে ভবন ও ভেতরে থাকা ইলেট্রনিক পণ্য নিরাপদ করা সম্ভব। এখানে ভবনের উপরে লৌহদণ্ড বসিয়ে দিয়ে পাশ দিয়ে মাটির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

প্রযুক্তিগত ভুলের কারণে পুরোপুরি নিরাপদ হচ্ছে না ভবনগুলো এমন মত দিয়ে বিশেজ্ঞরা জানান, অনেক ভবনেই উপরে লৌহদণ্ড বসানো হচ্ছে কিন্তু এর সঙ্গে একটি তার দিয়ে মাটির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়, যা উচিত নয়। সাধারণ বিদ্যুৎ কোনো পরিবাহীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বেঞ্জমিন ফ্রাঙ্কলিংয়ের তত্ত্বমতে, বজ্রপাত কেন্দ্রস্থল দিয়ে প্রবাহিত না হয়ে ত্বক দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই দেয়ালের ভেতর দিয়ে বজ্রপাত নিরোধক স্থাপন খুব কার্যকর হয় না।

যারা মনে করেন ভবনের ভেতরে অবস্থান করলে বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকা যায় তাদের ধারণাও ভূল বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, প্রত্যেকটি ভবনের ছাদে পানির ট্যাংক বসানো থাকে। এই ট্যাংকের ওপর বজ্রপাত হলে সে সময় কেউ কলে পরিবাহিত পানি ব্যবহার করতে থাকলে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ বজ্রপাতের বিদ্যুৎ পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ভবনের গা বেয়ে যদি বজ্রপাত চলে যায় সেক্ষেত্রে গ্রিলের সংস্পর্শে কেউ থাকলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া ডিসের ক্যাবলসহ অন্যান্য ক্যাবলের মাধ্যমেও ঘরের ভেতরে থাকা যে কেউ এর শিকার হতে পারেন।

তবে ঘরে নয়, ঘরের বাইরে খোলা মাঠেই বজ্রপাতে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটে। বজ্রপাতের সময় কেউ খোলা মাঠে থাকলে কোনো গাছের নিচে আশ্রয় না নিতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বজ্রাহত না হলেও উচ্চশব্দে কানের পর্দা ফেটে যেতে পারে। তাই সম্ভব হলে কানে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাতে ধাতব বস্তু থাকলে (আংটি, চাবি, কাস্তে, কোদাল, মোবাইল) তা অন্তত ৬০ ফুট দূরে ছুঁড়ে দিতে পারলে ঝুকি কমে যায়।

বজ্রপাত বিশেষজ্ঞ নাদিরুজ্জামান বলেন, বজ্রপাত আশপাশের ধাতব পদার্থকে আকর্ষণ করে। সে কারণে হাতে কাস্তে-কোদাল থাকলে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই এগুলো সরিয়ে রাখার পরামর্শ দেন তিনি। কেননা তাপমাত্রার ওঠানামার সঙ্গেও রয়েছে বজ্রপাতের ঝুঁকির সম্পর্ক। তিনি বলেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে বজ্রপাতের ঝূকি ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে প্রতি এক দশকে ০.২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়ছে।

২০১২ সালে জার্মান বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে পৃথিবীর উপরিতলের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এতে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়েছে ৪০ শতাংশ।

বজ্রপাতে হতাহতের সবচেয়ে বড় কারণ সচেতনতার অভাব এমন মন্তব্য করে এই আবহাওয়াবিদ বলেন, একমাত্র সচেতনতাই পারে সুরক্ষা দিতে। নাদিরুজ্জামান বলেন, ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোডে একটি শর্ত রাখা হলেও তা স্পষ্ট বা জোড়ালো নয়। বিষয়টিতে আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।