জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, দেশে চাকরি, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা থেকে অধিকাংশ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা পাচ্ছে মানুষ। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বলতে কিছু নেই। ডাক্তার, নার্সরা হাসপাতালের বালিশ পর্যন্ত চুরি করে নিজের বাসার তোষক তৈরি করছে। এক্সরে মেশিন সব সময় বন্ধ থাকে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে এক্সরে মেশিন সব সময় ভালো থাকে। ডাক্তাররা সেখানে গরীব মানুষদের নিয়ে বাণিজ্য করেন। দেশের আমলাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক অকল্যাণের মূলে দেশের আমলারা। তারা সৎ হলে দেশের চেহারা পাল্টে যেত। গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সামাজিক পরিবেশ ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার উদ্যোগে ‘‘মানবাধিকার ও বাসযোগ্য পরিবেশ সুরক্ষায় পুলিশ গণমাধ্যম ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ভূমিকা’’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সংস্থার চেয়ারম্যান লায়ন এইচএম ইব্রাহীম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংস্থার উপদেষ্টা ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। আরো বক্তব্য রাখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী, পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক আব্দুস সোবহান, দৈনিক ভোরের ডাকের বার্তা সম্পাদক মাহবুবুল আলম, মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট মনজিল মোরসেদ, ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু সালেহ আকন, সিদ্ধিরগঞ্জ পৌর প্রশাসক আব্দুল মতিন প্রধান প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ওশান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার আলী আজম।

ড. মিজানুর রহমান আরো বলেন, গ্রামীণ দরিদ্র জনগণ দেশকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারাই সবচেয়ে বৈষম্যের শিকার। আইল্যা দুর্গত এলাকার মানুষ গত কয়েক বছর ধরে সুপেয় পানি সংকটে রয়েছে। তাদের পানি কিনে এনে ব্যবহার করতে হয়। তাদের দিকে রাষ্ট্রকে দৃষ্টি দিতে হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বাড়ি পর্যন্ত টানেল নেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। আমরা আশা করবো এ টানেল দুর্গত এলাকা পর্যন্ত পৌঁছবে। তিনি বলেন, শিশু সদনগুলোতে ছেলেমেয়েরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের এক মাসের যাবতীয় খরচ বাবদ মাত্র সাড়ে ১১শ’ টাকা দেয়া হয়। সকালের নাস্তা বাবদ খরচ দেয়া হয় মাত্র এক টাকা ৩৮ পয়সা। ছোট মেয়েদের দিয়ে দেড়শ জনের খাবার রান্না করানো হয়। তিনি বলেন, আমরা দেশে বিচার বহির্ভুত হত্যা, পুলিশী হেফাজতে মানুষ হত্যা ও নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করে আসছি। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমলারা দেশের অনেক অকল্যাণের মূলে রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকার দিন বদলের যে আহবান নিয়ে এসেছে সে জন্য প্রগতিশীল লোক দরকার। কিন্তু আমলাদের মধ্যে এর বিরুদ্ধবাদী লোক রয়েছে। তারা থাকলে কাজ হবে না। তাদেরকে সরিয়ে দিতে হবে। না হলে তারা বাধা দেবে। তিনি বলেন, যেসব রাজনীতিকরা দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেন তাদের রাজনীতির সুযোগ থাকা উচিত নয়। সেমিনারে অন্যান্য বক্তারা পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার, হলুদ সাংবাদিকতা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, রিমান্ডে মানুষকে নির্যাতনের তীব্র সমালোচনা করেন। মূল প্রবন্ধে বলা হয় গত এক বছরে দেশে ২৮৯টি ধর্ষণ, ২১৯টি গণধর্ষণ এবং ৯১টি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণ করে হত্যা করেছে ৭৮ জনকে। কারা হেফাজতে মারা গেছে ৫৬ জন। ১৩৩ জন বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফের গুলীতে নিহত হয়েছে ৬৫ জন, আহত ৭১ জন, শারীরিক নির্যাতন ৩৫ জনকে এবং ৩৪ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে ৩৯৪টি। এতে ১১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নির্যাতনে ৪ সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। ২ জন অপহরণের শিকার এবং প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ২৫৯ জন।