চিঠিপত্র,বর্তমান শিক্ষা

প্যাট্রিক মোডিয়ানো ৩০ জুলাই ১৯৪৫ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলবার্ট মোডিয়ানো (১৯১২-১৯৭৭) এবং মাতা লুইসা কলপেইন। আলবার্ট মোডিয়ানো ছিলেন একজন ইটালিয়ান ইহুদি ও লুইসা কলপেইন বেলজিয়ান, পেশায় একজন অভিনেত্রী। অল্প বয়সেই লেখালেখি শুরু করেন মোডিয়ানো। তাঁর প্রথম উপন্যাস মিসিং পারসন প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : নাইট রাউন্ডস (১৯৬৯), রিং রোডস (১৯৭২), ডোরা ব্রুডার (১৯৯৭) লা হরিজন (২০১২), পুয়োর কুয়ে টু নে পার্ডেস  পাস দাঁস লা কোয়ারটিয়ের (২০১৪) প্রভৃতি। তাঁর প্রায় ত্রিশটির মতো প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।
মোডিয়ানো তাঁর মিসিং পারসন উপন্যাসের জন্য ১৯৭৮ ‘প্রিক্স গঁকো’ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১০ সালে তাঁর সারা জীবনের সাহিত্যসাধনার জন্য ইন্সটিটিউট দ্য ফ্রান্স থেকে পান ‘প্রিক্স মনডাল ছিনো ডাল ডুকা’ পুরস্কার এবং ২০১২ সালে পান ইউরোপিয়ান সাহিত্যের জন্য ‘অস্ট্রিয়ান স্টেট প্রাইজ’। ২০১৪ সালের নোবেল প্রাইজ ঘোষণার সময় প্যাট্রিক মোডিয়ানোকে আধুনিক কালের প্রুস্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে।
নোবেল লরেট প্যাট্রিক মোডিয়ানোর সাক্ষাৎকার
এটি মূলত টেলিফোনে ধারণকৃত একটি সাক্ষাৎকার। ৯ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে ২০১৪ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ ঘোষণার পরপরই এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। কথোপকথন হয় ফ্রেঞ্চ ভাষায়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন নোবেল মিডিয়ার হেলেন হেনমার্ক। প্রকাশিত হয় নোবেল প্রাইজ ডট অরগ-এ।
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যালো।
হেলেন হেনমার্ক : ইয়েস, হ্যালো। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন।
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : আপনি খুব দয়ালু এবং আমি অভিভূত।
হেলেন হেনমার্ক : আমার নাম হেলেন। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি নোবেল প্রাইজ ডট অরগ থেকে। আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদের কয়েকটি প্রশ্ন করার সময় দেয়ার জন্য।
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, ঠিক আছে।
হেলেন হেনমার্ক : সংবাদটা যখন পান তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : আসলে আমি রাস্তায় ছিলাম। হ্যাঁ, আমি রাস্তাতেই ছিলাম। আমার কন্যাই প্রথম আমাকে বিষয়টি অবহিত করে।
হেলেন হেনমার্ক : ওহ, আপনার মেয়েই তাহলে আপনাকে মোবাইলে জানিয়েছিল?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি অভিভূত হয়ে পড়ি। এ পুরস্কার আমাকে প্রচুর আনন্দ দিয়েছে কারণ আমার একজন সুইডিশ নাতি আছে।
হেলেন হেনমার্ক :  আপনি ওই সময় ঠিক কোথায় ছিলেন? প্যারিসের প্রাণকেন্দ্রে? ঠিক কোন রাস্তাটিতে, বলবেন কি?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : আমি ছিলাম জার্ডিন দ্য লুক্সেমবার্গের পাশেই।
হেলেন হেনমার্ক : ওহ, চমৎকার। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার ব্যাপারটা আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে? এর গুরুত্ব আপনার কাছে কতখানি?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : প্রথমত,.. একেবারে অপ্রত্যাশিত, এটা এমন একটা কিছু যা আমি পাবো বলে কখনও চিন্তাও করিনি… এটা আসলে আমাকে একেবারে অভিভূত করে। এটা আমাকে আবেগপ্রবণ করে ফেলেছে।
হেলেন হেনমার্ক : আপনি তো অনেক দিন ধরেই লেখালেখি করছেন। আপনি কেন লেখেন?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : বেশ। আমি লেখালেখি শুরু করেছিলাম অনেক আগেই, আমার বয়স তখন বিশের কোটায়। অনেক দিন হয়ে গেছে। এটা একবারে প্রাকৃতিক ব্যাপার। এটা এমন একটা কিছু যা আমার জীবনেরই একটা অংশ।
হেলেন হেনমার্ক : আপনি বিশ থেকে ত্রিশটার মতো বই লিখেছেন। এর মধ্যে এমন কি কোনো বই আছে যেটি আপনাকে অধিক অনন্দ দেয়, যেটা আপনার অন্যান্য বই থেকে বেশি গুরুত্ব বহন করে?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : শুনুন, এটা খুব কঠিন। আমার তো সবসময় এরকমই মনে হয় যে, আমি সারাজীবন ধরে একই বই লিখে চলেছি। আমি বুঝাতে চাচ্ছি যে, ৪৫ বছর হয়ে গেল, আমি বিরতি দিয়ে দিয়ে একই বই লিখে যাচ্ছি। আসলে আপনি আপনার পাঠককে চেনেন না।
হেলেন হেনমার্ক : এখন থেকে আপনি যে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে যাবেন, তো প্রত্যেককে আপনি আপনার কোন বইটা পড়ার পরামর্শ দেবেন?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, আমি সবসময়ই মনে করি, আমার লেখা শেষ বইটা।
হেলেন হেনমার্ক : বইটার নাম কি?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : এর নাম হলো পুয়োর কুয়ে টু নে পার্ডেস পাস দাঁস লা কোয়ারটিয়ের।
হেলেন হেনমার্ক : পুয়োর কুয়ে টু নে পার্ডেস পাস দাঁস লা কোয়ারটিয়ের?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : পুয়োর কুয়ে টু নে পার্ডেস পাস দাঁস লা কোয়ারটিয়ের। এটা আপনার চারপাশের জিনিস নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কে। শেষ বইটাকেই সব সময় আমি সুপারিশ করে যাই কারণ এটা আপনাকে দিয়ে যাবে…
হেলেন হেনমার্ক : আরও বেশি পাওয়ার আকাক্সক্ষা?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, হ্যাঁ।
হেলেন হেনমার্ক : আপনি কি আজকের রাত পুরো পরিবারের সাথে উদযাপন করতে যাচ্ছেন?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি আমার পরিবারের সাথে থাকতে চাই। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি থাকতে চাই আমার সুইডিশ নাতির সাথে, যে আমাকে প্রচুর আনন্দ দেয় এবং আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসে। এই পুরস্কার আমি তাকেই উৎসর্গ করছি। মোটের ওপর এটি তার দেশ থেকেই এসেছে।
হেলেন হেনমার্ক : আপনি কি ডিসেম্বরে সুইডেনে আসছেন?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, অবশ্যই।
হেলেন হেনমার্ক : পুরো পরিবারের সাথে?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : হ্যাঁ, হ্যাঁ। (হাসতে হাসতে)
হেলেন হেনমার্ক : আপনার পরিবার কি খুব বড়?
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : না, একটুও নয়। আমার আছে মাত্র দুটো কন্যা এবং একটা নাতি। সতরাং খুব বড় পরিবার নয় নিশ্চয়ই।
হেলেন হেনমার্ক : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এবং আবারও অনেক অনেক অভিনন্দন।
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : আপনাকেও ধন্যবাদ। আশা করি আপনাকে এমন কিছু আমি বলিনি যা বিভ্রান্তিকর।
হেলেন হেনমার্ক : না, না, একদম নয়। শুভ সন্ধ্যা এবং ঊষ্ণ অভিনন্দন আবারও সুইডেন থেকে এবং নোবেল ডট অরগ-এর পক্ষ থেকে।
প্যাট্রিক মোডিয়ানো : আমি একেবারে অভিভূত।

সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি পিটার ইংলান্ডের সাক্ষাৎকার ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ‘স্পিকইজি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি পিটার ইংলান্ড প্যাট্রিক মোডিয়ানোর সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বর্ণনা করে বলেন কেন নোবেল একাডেমি এই লেখককে এ বছরের নোবেল প্রাইজের জন্য বেছে নেয়। পিটার ইংলান্ড তাঁর প্রেস রিলিজে বলেন : ‘২০১৪ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ প্রদান করা হলো ফরাসি লেখক প্যাট্রিক মোডিয়ানোকে ‘স্মৃতির শিল্পের জন্য, যা দিয়ে তিনি সবচেয়ে অনায়ত্ত মানবঅদৃষ্টকে ও অনাবিষ্কৃত পেশাদার জীবনজগতকে জাগিয়ে তোলেন।’ নিচে তাঁর সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ভেন গ্রান্ডবার্গ ও জেন হেনসগার্ড।
স্পিকইজি : এ বছরও কোনো আমেরিকান নয়। কেন, বলবেন কি?
পিটার ইংলান্ড : এলিস মুনরো ক্যানাডিয়ান এবং আমি বিশ্বাস করি ক্যানাডা উত্তর আমেরিকা মহাদেশের একটি অংশ। একাডেমিতে আমাদের কোনো কোটা নেই। আমরা পুরস্কার দিয়ে থাকি সাহিত্যের মানদন্ডের ওপরে। প্রচুর সাহিত্যিক আছেন যাঁরা নোবেল প্রাইজের যোগ্য এবং এই কারণে এ ব্যাপারে কোনো ন্যায়বিচার কখনোই প্রতিষ্ঠিত হবে না। গাণিতিক হিসাব একেবারেই অসম্ভব; আমাদের হাতে প্রতি বছরের জন্য একটাই মাত্র পুরস্কার আছে এবং এ পুরস্কারের জন্য উপযুক্ত লেখক আছেন অনেক। আমরা কখনোই সক্ষম হবো না, যাঁরা এ পুরস্কারের যোগ্য, তাঁদের প্রত্যেকের হাতে এটি তুলে দিতে। এটাই হলো নির্মম বাস্তবতা।
স্পিকইজি : আপনি কখন মিস্টার মোডিয়ানোকে এ বছরের বিজয়ী হিসেবে স্থির করেন?
পিটার ইংলান্ড : এক সপ্তাহ আগে একাডেমি একটা ট্রায়াল ভোটের আয়োজন করে। সেখানে আমরা একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রতিষ্ঠিত করি। আজকেই এর আনুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হয়। অবশেষে আমরা সিদ্ধান্তে উপনীত হই।
স্পিকইজি : আপনাকে যদি মিস্টার মোডিয়ানোর কোনো বই দিয়ে এ ব্যাপারে কথা বলতে বলা হয়, তাহলে আপনি তাঁর কোন বইটার কথা বলবেন এবং কেন?
পিটার ইংলান্ড : কেন তাঁর মিসিং পারসন দিয়ে নয়? গোয়েন্দাকাহিনী জাতীয় রচনাই মিস্টার মোডিয়ানোর বেশি প্রিয় এবং এই বইটি অনেকটা ফিল্মি প্রেক্ষাপটের মতো। তিনি গোয়েন্দা-উপন্যাসের গতানুগতিক কথাবার্তা নিয়ে খেলা করেন, এবং এটা তাঁর শেষ গোয়েন্দা-অভিযান যেখানে তিনি, তিনি আসলে কে, তা আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এটা আমি পড়েছি সুইডিশ, ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি ভাষায়। এরপর আমি তাঁর ডোরা ব্রুডারের দিকে হাত বাড়াই, যেটা একজন ১৫ বছর বয়সী ফরাসী ইহুদি বালিকাকে নিয়ে রচিত, যে হারিয়ে যায় ১৯৪১ সালে।
স্পিকইজি : আপনি তো নিজেই একজন ঐতিহাসিক। মোডিয়ানোর ঐতিহাসিক বর্ণনাভঙ্গি নিশ্চয়ই আপনার হৃদয় ছুঁয়েছে?
পিটার ইংলান্ড : হ্যাঁ, তবে সত্য কথা হলো, মোডিয়ানো লেখেন উপন্যাস। ঔপন্যাসিক হিসেবে স্মৃতি নিয়ে কাজ করা আর ঐতিহাসিক হিসেবে স্মৃতি নিয়ে কাজ করা এক জিনিস নয়। তাঁর শিল্পকর্ম আপনাকে মাঝেমাঝে থামিয়ে দেবে, আপনাকে এক ধাপ পেছনে নিয়ে যাবে এবং আপনাকে বুঝিয়ে দেবে যে, ইতিহাসে সত্যিকার অর্থে যা ঘটেছিল তা ধরতে পারা খুবই কঠিন কর্ম, বুঝাবে যে, ইতিহাসে আসলে অনেক চোরাগর্ত আছে। এই উপন্যাসের পাঠ আপনার হীনাবস্থাকে আপনার মধ্যে ইতিহাসবিদ হিসেবে অনুপ্রবেশ করিয়ে ছাড়বে এবং আপনাকে বুঝিয়ে দেবে যে, আপনার অতিরিক্ত স্বাধীনতা ভোগ করা উচিত নয়। তাঁর অতীত অনুসন্ধান সবসময়ই শূন্যতার মধ্যদিয়ে শেষ হয়ে যায়, তিনি যা চান তা তিনি পান না এবং এটা নিঃশেষিত কিন্তু সত্য পন্থায় চলমান থাকে। একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে এটা আপনাকে প্রলুব্ধ করে যে, অতীতের সবকিছুই আপনার হাতের মুঠোয়, কিন্তু বাস্তবে তা মোটেও সত্য নয়।

সায়ীদ আবুবকর