আইটি উদ্যোক্তা

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের অবদান অপরিহার্য। মূলত তরুণ প্রযুক্তিবিদদের চৌকস দক্ষতা ও অপরিসীম ধৈর্যে এই খাত এগিয়ে চলছে প্রতিনিয়ত। বেশিরভাগ দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত থাকলেও কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছেন। বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান তরুণ অন্য জায়গায় চাকরি করার বদলে নিজেরাই গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান, চাকরি দিচ্ছেন অন্যদের, আয় করছেন বৈদেশিক মুদ্রা, অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন তাদের নবীনদের মধ্যে।

তেমনি এক তরুণ উদ্যোক্তা হচ্ছেন সফটওয়্যার প্রকৌশলী তামিম শাহ্রিয়ার (সুবিন)।

চলুন তার কাছে তার ভাষায় জানি তার পরিচয়। ‘আমি তামিম শাহ্রিয়ার। তবে পরিচিতজনেরা আমাকে সুবিন নামেই ডাকেন। পেশায় সফটওয়্যার প্রকৌশলী। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে সণাতক সম্পন্ন করি ২০০৬ সালে। বর্তমানে আমি কাজ করছি আমার নিজের প্রতিষ্ঠান মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেডে। মুক্ত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। আমার সাথে সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান, যিনি বর্তমানে মুক্ত সফটের চেয়্যারম্যান ও প্রধান কারিগরি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘আসলে আমার উদ্যোক্তা হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আমার ক্যারিয়ার শুরু হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে। সেখানে দুই সেমিস্টার কাটানোর পর আমি বুঝতে পারি যে আমি আসলে কিছু শিখছি না। তাই চাকরি ছেড়ে দেই। তারপর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথমে দেশের খ্যাতনামা একটি কোম্পানিতে যোগ দিই। সেখানে দেড় বছর কাজ করার পর আরো দেড় বছর কাজ করি প্লেডম বাংলাদেশে (তৎকালীন ট্রিপার্ট ল্যাবস)। চাকরি করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে আমার পুরোপুরি মেধা ও শ্রম আসলে কাজে লাগাতে পারছি না। তাই নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান খুলি, যেখানে আমি আমার মেধা ও শ্রমের পর্যাপ্ত ব্যবহার করতে পারব।’

বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি চাকরির ইন্টারভিউ অফার পেয়েছিলেন। ফেসবুক থেকে তাকে চাকরির ইন্টারভিউর জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় ২০১০ সালের জুন মাসে, আর গুগল থেকে চাকরির ইন্টারভিউ অফার পান ২০১১ সালের ফেব্রম্নয়ারি মাসে। তাদেরকে তিনি তখন ইন্টারভিউ দিতে অপারগতা জানান এবং আরো কয়েক বছর নিজের দেশে কাটানোর ইচ্ছার কথা জানান। কারণ, তিনি দেশে থাকতে চেয়েছিলেন। আর দেশে থাকার অনেক কারণের মধ্যে প্রধান ছিল বাবা-মায়ের সাথে থাকা।

তিনি বলেন, এপিজে আবদুল কালামের ‘উইসং অব ফায়ার’ বইটি তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি যদি ভারতে শিক্ষাগ্রহণ করে ভারতে বসে রকেট বানিয়ে ফেলতে পারেন, আমরা বাংলাদেশে বসে একটি ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি চালাতে পারব না?

এক সময় রেন্টএকোডার ডট কম (rentacoder.com) নামে একটি সাইটে তিনি মাঝে মাঝে কাজ করতেন। সেখানে তার রেটিং বেশ ভালো ছিল। সেটাকেই মূলত তাদের ব্যবসায়ের মূলধন হিসেবে ধরতে পারেন। আর টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে ছয়-সাত লাখের মতো। সেই টাকা এসেছিল তাদের নিজেদের জমানো টাকা থেকে। এ ছাড়া তিনি ব্যাংক থেকে পার্সোনাল লোন নিয়েছিলেন। শুরুর সময় তিনি যেহেতু চাকরি করতেন, মাহমুদই কোম্পানি দেখাশোনা করতেন। ২০১০-এর জুন মাসে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি নিজের প্রতিষ্ঠানে চলে আসেন। ২০০৯ সালে তাদের কোম্পানিতে ফুলটাইম পেশাদার ছিল তিনজন, আর ২০১২ সালে সেটি এসে দাঁড়ায় ১২ জনে।

এরা মূলত কাস্টমাইজ সফটওয়্যার তৈরি করেন। তাদের কাজের পস্নাটফর্মে বেশ বৈচিত্র্য আছে। এরা রিচ ইন্টারনেট অ্যাপিস্নকেশন (RIA–Rich Internet Application), সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক অ্যাপিস্নকেশন এবং মোবাইল অ্যাপিস্নকেশন ও গেমস (আইফোন, অ্যান্ড্রয়িড, বস্নাকবেরি ও জাভা এমই) তৈরি করেন। তবে সম্প্রতি এরা ইআরপি (ERP–Enterprise Resource Planner) সফটওয়্যার তৈরি করছেন এবং সেই সাথে বিগ ডাটা ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করছেন।

শুরুর দিকে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস ওয়েবসাইটগুলো ছিল তাদের ক্লায়েন্ট জোগাড় করার একমাত্র উপায়। তবে এখন রেফারেন্সের মাধ্যমেই বেশি ক্লায়েন্ট আসে।

বর্তমানে কোম্পানিতে ১২ জন সফটওয়্যার প্রকৌশলী কাজ করছেন। দেশের শীর্ষ প্রোগ্রামাররাই মুক্ত সফটে কাজ করে থাকেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত পাঁচজন এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালিস্ট কাজ করেছেন মুক্ত সফটে, তাদের মধ্যে দুইজন এখন গুগলের মাউন্টেন ভিউ অফিসে কর্মরত, আরেকজন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করছেন। এছাড়া গুগল সামার অব কোডে অংশগ্রহণকারী, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণকারী ছেলেরা মুক্ত সফটওয়্যারে কাজ করছেন। এক কথায় বলা যায়, দেশের সেরা মেধাবী ও উদ্যমী তরুণদের আখড়া হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যার লিমিটেড।

ব্যবস্থাপনার কাজ তামিম আর মাহমুদ মিলেই করেন। ভবিষ্যতে আলাদা ব্যবস্থাপনা বিভাগ খোলার পরিকল্পনা আছে।

এ প্রতিষ্ঠানের অর্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা ধরনের অর্জন রয়েছে। সেগুলোর বাইরে প্রতিষ্ঠানের অর্জনও কিছু আছে। vworker.com (পরে freelancer.com এটিকে কিনে নেয়) সাইটে আমরা এক নম্বর বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ইংল্যান্ডের একটি কোম্পানির জন্য আমাদের বানানো একটি মোবাইল অ্যাপিস্নকেশন আন্তর্জাতিক একটি কেস স্টাডি হিসেবে দেখানো হয় ২০১১ সালে। ২০১২ সালের বেসিস কোডওয়ারিয়রে আমাদের কোম্পানির একটি দল অংশ নেয় এবং পিএইচপি ট্র্যাকে এরা চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া ডাটা মাইনিংয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা সেরা ১০ শতাংশে ছিলাম।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ আসলে গ্রহণযোগ্যতার কোনো প্রশ্ন আসে না। যেকোনো কাজ, যেখানে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে সৎপথে উপার্জন করা যায়, তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সরকারি চাকরির গ্রহণযোগ্যতা বেশ কম। কারণ সেখানে ঘুষ-দুর্নীতির সংস্কৃতি বেশ জেঁকে বসেছে। আর তরুণ প্রজন্ম দুর্নীতিবিমুখ বলেই নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ সরকারি চাকরিতে যেতে চায় না। যদিও কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, তবে তা হাতেগোনা।’

এক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা কি পাওয়া যায়? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর জন্য সরকার ট্যাক্স মওকুফ করেছে। আর রয়েছে ইই ফান্ড। তবে এখন পর্যন্ত এর ভালো ব্যবহারের পরিবর্তে লুটপাটের কাহিনীই বেশি শোনা যায়। এ ব্যাপারে আইটি সাংবাদিকদেরই ভালো জানার কথা। এছাড়া অন্য কোনো সরকারি সাহায্য বা সহায়তার কথা আমার জানা নাই। যদিও সরকারের অনেক পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, সেগুলো এখনও কল্পনাতেই আটকে আছে, বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের পাশাপাশি নানা ধরনের রিসার্চ করে মুক্ত সফটওয়্যারকে এরা অন্য উচ্চতায় নিতে চান। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সাথে তাদের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার অধীনে সাস্টের সাথে এরা যৌথভাবে গবেষণা ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজে অংশ নেবে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা শেয়ার করবে। ভবিষ্যতে নিত্যনতুন প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে। এছাড়া দেশের বাইরেও অফিস খোলার পরিকল্পনা আছে। আর দেশের প্রোগ্রামিং সংস্কৃতির বিকাশে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করতে চান। ইতোমধ্যে তিনি ‘কমপিউটার প্রোগ্রামিং’ নামে একটি প্রোগ্রামিংয়ের বই লিখেছেন বাংলা ভাষায়। এটি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

আইটি উদ্যোক্তা হতে কী কী প্রয়োজন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,

* সাহস। যথেষ্ট সাহস না থাকলে কোম্পানি শুরু করা যায় না।
* ধৈর্য। যথেষ্ট ধৈর্য না থাকলে কোম্পানি টিকিয়ে রাখা যায় না।
* প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস। নানা ধরনের বই পড়ার অভ্যাস থাকতে হবে। সেটা যেকোনো ধরনের বই হতে পারে। অন্যের অভিজ্ঞতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় বই।
* পরিশ্রম এবং পরিশ্রম। পরিশ্রম ছাড়া কোনো কিছু অর্জন সম্ভব নয়।
* যোগাযোগে ভালো হতে হবে। বাংলা ও ইংরেজি দুটো ভাষাতেই কথা বলা, পড়া ও লেখার দক্ষতা থাকতে হবে।
* সর্বোপরি নিজের কাজকে উপভোগ করতে হবে।

মুক্ত সফটওয়্যারে বর্তমানে কাজ করছেন ১২ জন সফটওয়্যার প্রকোশলী। এদের বেশিরভাগ বুয়েট, শাবিপ্রবি এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। মুক্ত সফটওয়্যার সমন্ধে আরো জানতে তাদের ওয়েবসাইটে (www.muktosoft.com) ভিজিট করতে পারবেন। মুক্ত সফটওয়্যারে যোগ দিতে চাইলে তাদের কোম্পানির ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে, তবে এক্ষেত্রে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমের বাইরে কোনো না কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের দক্ষতা থাকতে হবে।

* যথেষ্ট পরিমাণ টাকা সঞ্চয় করতে হবে যেনো নতুন প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো আয় ছাড়াই কমপক্ষে এক বছর চলা যায়।

* ব্যক্তিগতভাবে কোনো কিছুর ওপর ভালো দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

* নতুন কোম্পানিতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। কারণ ছোট অবস্থায় অনভিজ্ঞ কাউকে নিয়ে তার দক্ষতা বাড়ানোর পেছনে সময় দেয়া সম্ভব হয় না।

* ব্যক্তিজীবনে ও প্রতিষ্ঠানের খরচের ব্যাপারে মিতব্যয়ী হতে হবে।

* কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিকভাবে রাখতে হবে।

* সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার চেষ্টা করতে হবে

মৃণাল কান্তি রায় দীপ