যেখানে আমরা আজ হতাশার সাগরে নিমজ্জিত সেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে কি ভাবতে পারি? তারা কি অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না? সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, হিংসা, অহংকার, ক্রোধ-বিদ্বেষ, ছিনতাই, লোভ, শঠতা, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রবঞ্চনা, স্বার্থপরতা, প্রতারণা, মোনাফেকী, অন্যায়, অবিচার, জুলুম যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে সমাজ তথা দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। আমাদের সমাজ জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে চরম অবক্ষয়ের চিত্র। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাঙ্গন, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ অবক্ষয় বিদ্যমান। এ অবক্ষয় ধীরে ধীরে প্রভাবিত করছে সমাজকে, কুলষিত করছে প্রত্যেকের মন-মানসিকতাকে। আমাদের দেশে আজকের এ পরিস্থিতির জন্যে অনেক কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। তার মধ্যে নৈতিকতার অবক্ষয়কে প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই আমাদের দেশে সুখ, শান্তি, স্বস্তি চাইলে আমাদেরকে নৈতিকতার অবক্ষয় রোধ করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে-নৈতিকার অবক্ষয় রোধ কিভাবে সম্ভব?
কোন দেশের উন্নতি অবনতি বহুলাংশে নির্ভর করে জনগণের নৈতিক শক্তির উপর। কেননা নৈতিক শিক্ষা মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং ভাল কাজে উৎসাহ প্রদান করে। যে দেশের জনগণের নৈতিক অধঃপতন দেখা দেয়, সে দেশ প্রচুর স¤পদের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। আপামর জনসাধারণের উন্নতি ব্যতিত কতিপয় লোকের উন্নতির দ্বারা কোন দেশ উন্নতির বা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে না। অতএব একটি দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নতি ও প্রগতির জন্য প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডহীন কোনো প্রাণী যেমন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না, ঠিক তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি আশা করা যায় না। তবে এ শিক্ষা হতে হবে অবশ্যই সুশিক্ষা, এ প্রসঙ্গে দার্শনিক মিল্টন বলেছেন Education is the harmonious development both soul, body and mind.. সত্যিকারার্থে এ কথার পূর্ণতা মেলে ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে।
সাধারণত : মানুষ গৃহ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে নৈতিক শিক্ষা লাভ করে থাকে। নৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষা। ধর্মের মাধ্যমে মানুষ আদব-কায়দা, আচার-আচরণ ইত্যাদি স¤পর্কে শিক্ষা লাভ করে। বিশ্বনবী (সাঃ) এরশাদ করেছেন প্রত্যেক নর-নারীর পক্ষে জ্ঞান আহরণ করা ফরজ। কারণ, জ্ঞানই মানুষকে ন্যায়-অন্যায়, ভাল-মন্দ, সত্য-অসত্য, পাপ-পুণ্য ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শেখায়।
তাহলে জানা প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা কী? ধর্মীয় শিক্ষা বলতে সাধারণত আমরা বুঝি ধর্মীয় জ্ঞান লাভ করা। যা পরকালীন সফলতা, শাস্তি থেকে পরিত্রাণবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি করে। ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারলে পরকালে সফলতা পাওয়া সম্ভব। প্রতিটি ধর্মের মূল কথা হচ্ছে, সত্য ও ন্যায়কে ধারণ করা। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ যে ধর্মের লোকই হোক যখন সত্য ও ন্যায়কে আঁকড়ে ধরবে তখন তার আত্মা হবে পরিশুদ্ধ। সে মানুষ কখনোই কোনো অন্যায় কাজে জড়িত হতে পারে না।
ধর্ম মানুষকে সব অন্যায়, অবিচার, বিশৃঙ্খলা থেকে বিরত রাখে। ধরা যাক একজন মানুষ ঘুষখোর। যখন তাকে ধর্মীয় জ্ঞান দিয়ে আত্মশুদ্ধ মানুষ করে গড়া যাবে, তখন দুনিয়ার কোনো শাস্তির ভয়ে নয়, শুধু স্রষ্টার ভয়ে সে ঘুষ খাওয়া ছেড়ে দেবে। ধর্মীয় জ্ঞানে উজ্জীবিত তার বিবেকই তাকে বাধা দেবে। আইনবিজ্ঞানের ভাষায়Ñ জৈবিক বৃত্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও বিবেকÑ এই তিন সমন্বয়ে প্রকৃত মানুষ হয়। জৈবিক বৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি যেকোনো প্রাণীর মধ্যেই আছে, কিন্তু বিবেক শুধু মানুষেরই থাকে। ধর্মীয় জ্ঞান বিবেককে বিকশিত করে। আর সেই বিবেকবান মানুষ কোনো অন্যায়ের সাথে জড়িত হতে পারে না। তার বিবেকই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।
পক্ষান্তরে বিবেকহীন মানুষ যেকোনো অন্যায়ের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। তাই তো বলা হয়ে থাকে বিবেকহীন মানুষ পশুর সমান। বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমানের মতো মানুষরূপী পশু হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছে শুধু বিবেকহীনতার কারণেই। বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় দু’টি ধারা বিদ্যমান, একটি সাধারণ শিক্ষা অপরটি ধর্মীয় শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষায় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, আন্তর্জাতিক নীতি, প্রকৌশলী, ডাক্তারিসহ বিভিন্ন শিক্ষা দেয়া হয়। সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে দুনিয়ার ধনসম্পদ অর্জনের যোগ্যতা সৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু পরকালীন সফলতায় বিশ্বাসী আত্মশুদ্ধ মানুষ গড়া সম্ভব হয় না।
ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম ও শিক্ষকমণ্ডলী শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন। সে জন্য ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি সমূলে উচ্ছেদ করতে হলে সব ধর্মের লোকদের সন্তানকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি নিজ নিজ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। তারা যে পেশায়ই থাকুন আইনের শাস্তির ভয়ে নয়, বরং পরকালীন সফলতার জন্য দুনিয়ার বিলাসবহুল জীবনকে বিসর্জন দিয়ে সর্বপ্রকার দুর্নীতি থেকে বিরত থাকবেন। সমাজের এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। তখন সচিবগণ ঘুষ খাবেন না। ডাক্তারগণকে রোগীর জীবন নিয়ে ডাকাতের ভূমিকায় দেখা যাবে না। পুলিশ হবে সাধারণ মানুষের সাহায্যকারী প্রকৃত বন্ধু। এ দেশে সাধারণত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন ধর্মীয় জ্ঞান সম্পর্কে উদাসীন সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ও নিরক্ষর ব্যক্তিরা। সামান্য একটু স্বার্থের জন্য যেকোনো অন্যায় করতে তাদের হাত বিন্দুমাত্র কেঁপে ওঠে না। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবেন আত্মশুদ্ধ খাঁটি মানুষ এবং তাদের দ্বারাই সম্ভব হবে দুর্নীতিমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার।