বাড়ি তৈরির জন্য আমরা বিভিন্ন মানের ইট ব্যবহার করি। মান ভেদে এসব ইটের প্রতি হাজার দাম পড়ে ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। শীতে দাম কিছুটা কম থাকলেও বর্ষায় এই দাম কয়েকগুণ বেশিতে গিয়ে পৌঁছায়। অন্যদিকে ইট তৈরি করতে আমাদের প্রয়োজন হয় প্রচার মাটির। আর এই মাটি সংগ্রহের জন্য আমরা চড়াও হই দেশের পাহাড় আর টিলাগুলোর উপর। ফলে আমাদের চার পাশের পরিবেশ প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ইটের এই খরচ আমরা অর্ধেকের নিচে নামিয়ে আনতে পারি। আমাদের হাতেই রয়েছে সেই প্রযুক্তি। সম্প্রতি আমাদের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) এর বিজ্ঞানীরা ধানের তুষ থেকে ইট তৈরি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। বিসিএসআইআর এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কাজী নাসরিন ফারুক এই উদ্ভাবনের সাথে যুক্ত রয়েছেন। তিনি বলেন, ইট তৈরি করতে ধানের তুষ এবং মাটি প্রয়োজন।
তুষের সাথে মাটি মিশিয়ে এই ইট তৈরি করা হয়। তবে এই ইট এক তলা বাড়ি তৈরিতে কাজে লাগে। বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র  মানুষের জন্য এই ইট উপযোগী।
ইটের প্রকারভেদ : ইনসুলিটিন ব্রিক, বিল্ডিং ব্লক এবং বাড়ি তৈরির জন্য ইট তৈরি করা হয়েছে।
কি কাজে লাগে : তবে ইনসুলিটিন ব্রিক বাড়ি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয় না, রোক ধরনের চুল্লিতে জ্বালানি সঠিকভাবে চারপাশে একটা বেস্টনী তৈরিতে এই ইট ব্যবহার করা হয়। বিল্ডিং ব্লক বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে। তুষ মাটি দিয়ে বাড়ি তৈরির জন্য আরেক ধরনের ইট তৈরি করা হয়েছে। বিল্ডিং ব্লক না পুড়িয়ে এক ধরনের মেশিনের মাধ্যমে তৈরি হয় এবং এই ইট মূলত গ্রামে বাড়ি বানানোর জন্য বেশি উপযোগী। আমাদের দেশে এখন পিলারের উপরই বেশি বাড়ি তৈরি হয় এবং এর ফলে ইটে উপর তেমন কোন চাপ পড়ে না। ফলে এই বিল্ডিং ব্লকটা বাড়ি বানানোর জন্য বেশ উপযোগী।
সাধারণ ইটের সাথে পার্থক্য : সাধারণ ইট শুধু মাটি দিয়ে তৈরি কিন্তু এই ইট মাটির সাথে তুষ মিশিয়ে তৈরি। ফলে মাটির খরচ অনেক কম লাগে এবং এই ইট সাধারণ ইটের তুলনায় হালকা হয়।
সুবিধা : এই ইট তৈরি করতে খরচ সাধারণ ইটের তুলনায় কম। তুষ দিয়ে এই ইট তৈরি হয় বলে ইটের ভিতরে ফাঁকা থাকে। এই ফাকা জায়গায় থাকে বাতাস। এর ফলে বাইরে থেকে গরম ভিতরে কম ঢুকে। ইট তুলনামূলকভাবে হালকা এবং এই ইটের সব থেকে বড় সুবিধা হচ্ছে এই ইট পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না। তবে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এই ইটে তৈরি বাড়ি বসবাসের জন্য হবে আরামদায়ক, এই ইট বেশি তাপ শোষণ করবে না। ফলে গরমে অতিরিক্ত গরম বা শীতকালে অতিরিক্ত শীত লাগার সম্ভাবনা নেই। এই ইট নিয়ে গবেষক নাসরিন ফারুক খুবই আশাবাদী। তিনি বলেন, এই ইট বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসলে বাড়ি তৈরির খরচ অনেক কমে আসবে এবং মাটির অপচয়টাও কম হবে। তুষেরও সঠিক ব্যবহার হবে ফলে পরিবেশও কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাণিজ্যিকভাবে কেউ এই ইট তৈরি করতে চাইলে তাকে বিসিএসআইআর-এ যোগাযোগ করতে হবে ফর্মুলা সংগ্রহের জন্য। তুষ ও মাটি দিয়ে ইট তৈরি গবেষণার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কাজী নাসরিন ফারুক বলেন, ইনসুলিটিন ব্রিক তৈরির কাজ শেষ এবং বিল্ডিং ব্লক ও বাড়ি বানানোর যে ইট তা এক মাসের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে এবং ইট তৈরির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি হয়ে গেছে।
প্ল্যান্ট স্থাপনে খরচ : প্ল্যাট স্থাপনের খরচটা নির্ভর করবে কারখানাটা কোথায় স্থাপন করা হবে এবং সেখানে তুষটা পর্যন্ত পাওয়া যাবে কি না। তবে তুষ যদি পর্যাপ্ত পাওয়া যায় তবে খরচ কম হবে এবং স্থানীয়ভাবে এই ইট তৈরি করা যাবে।
ইটের দাম : ইটের দাম তুলনামূলকভাবে সাধারণ ইটের চেয়ে কম হবে। বিল্ডিং ব্লকটা না পুড়িয়ে তৈরি করা হয়, ফলে জ্বালানি খরচটা বেঁচে যাবে। শুধু মাটি ও তুষ দিয়ে মেশিনের মাধ্যমে এই ইট তৈরির ফলে দাম কম হবে বলে জানান প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
বাজারে কবে আসবে : বাণিজ্যিকভাবে এই ইট তৈরি করার জন্য বিসিএআইআর-এ যোগাযোগ করতে হবে। এই প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে বিসিএসআইআরকে দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। তারপর এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুরু করা যাবে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

আখতার হামিদ খান