নজরুলের বিয়ে

১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে গিরিবালাদেবী ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার (অধুনা জেলা) শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা-মায়ের নাম জানা যায়নি, তবে তাঁর পিতার কুলগত পদবি ছিল দাশগুপ্ত। পিত্রালয়ের নিকট উক্ত গ্রামেরই বসন্তকুমার সেনগুপ্তর সঙ্গে বিবাহসূত্রে তিনি সেনগুপ্ত হয়েছিলেন। হিন্দু অধ্যুষিত তেওতা গ্রামে তখন বৈদ্য ও ব্রাহ্মণদের আধিপত্য বেশি ছিল। একদা অবিভক্ত বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ তথা তেওতা প্রভৃতি গ্রামে গ্রামে শত শত মানিক্যস্বরূপ মানুষের জন্ম হয়েছিল। মানিকগঞ্জের শত মানিক শিরোনামায় বৃহৎ গ্রন্থে (সম্পাদনা মো. আজহারুল ইসলাম) সেখানকার মানবসম্পদ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা গেলেও তেওতা গ্রামের গিরিবালার কথা বিস্তারিত নেই। সম্প্রতি নজরুল প্রমীলা স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে তেওতা গ্রাম গিরিবালাদেবীর মেয়ে-জামাই-এর স্মৃতি সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।
গিরিবালা দেবীর স্বামী বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন তিন ভাই। বসন্তকুমার ছিলেন ত্রিপুরার মহারাজের স্টেটের নায়েব। কেউ বলেন মহারাজের দেওয়ান ছিলেন। পরে তিনি কুমিল্লার জেলাশাসক রায়বাহাদুর উমাকান্তের পেশকার হয়েছিলেন এবং কনিষ্ঠ ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত কুমিল্লা জেলা আদালতে ইন্সপেক্টর ছিলেন আর জ্যেষ্ঠভ্রাতা জগৎকুমার সেনগুপ্ত গ্রামে পৈত্রিক সম্পত্তির তদারকী করতেন।
এইরকম একটি শিক্ষিত সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারের বালিকাবধূ রূপে গিরিবালা দেবীকে আমরা একটি স্থানিক ইতিহাসে প্রথম দেখি কখনো স্বামীর কর্মস্থল ত্রিপুরায় অথবা কুমিল্লায়। ইতোমধ্যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এই কন্যাসন্তানটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয় আশালতা- ডাকনাম দোলন বা দুলী। আশালতার জন্ম হয় তেওতা গ্রামে মাতুলালয়ে (মতান্তরে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় নামক স্থানে একটি ভাড়াবাড়িতে)। এই বাড়িতে দুই ভাইয়ের (বসন্তকুমার ও ইন্দ্রকুমার) যৌথ সংসারে দুলীকে নিয়ে গিরিবালা দেবীর অফুরন্ত সুখের দিন কেটেছে। এখানে ইন্দ্রকুমার ও বিরজাদেবীর পুত্র বীরেন্দ্রনাথ জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু সেই সুখ ও সৌভাগ্য বেশিদিন স্থায়ী হল না গিরিবালা দেবীর জীবনে। হঠাৎ বজ্রাঘাতের মত তীব্র আঘাতে গিরিবালা বিধ্বস্ত হয়ে যান তাঁর স্বামী বসন্তকুমার সেনগুপ্তর অকাল প্রয়াণে। তখন গিরিবালা দেবীর বয়স মাত্র ২৪/২৫ বছর। আর আশালতার বয়স ৭/৮ বছরের মত। তিনি সদ্য বিধবা হয়ে কুমিল্লা শহর ছেড়ে জন্মভূমিতে ফিরে আসেন কিন্তু তাঁর এমন দুর্ভাগ্য যে কয়েক বছরের মধ্যে তিনি প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে পড়েন। স্বামীর বাস্তভিটেয় টিকে থাকার মত আর্থিক সংস্থান ছিল না। তাই তিনি মেয়েকে নিয়ে কুমিল্লায় আসেন এবং দেবর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত এবং বিরজাদেবীর সংসারভুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন থাকেন। কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে সেই ভাড়াবাড়িতে আশালতার পুনরায় লেখাপড়া ও গান শেখা শুরু হয়। তেওতা গ্রামে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হয়েছিল কিন্তু বিদ্যা অর্জন ও সঙ্গীতশিক্ষা কোনটাই ভালভাবে সম্পন্ন হয়নি। কুমিল্লার এই বাড়িতেই সেনগুপ্ত পরিবারের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম পরিচয় ঘটে। তখন নজরুলের বয়স ২০/২১ এর মত। অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর নজরুলকে দেখে সবাই মুগ্ধ হতেন। নজরুলের কবিত্বশক্তি, সঙ্গীতপ্রতিভা এবং তাঁর উন্নত ও বলিষ্ঠ দ্যুতিমান চেহারা দেখে সবাই তাকে আপন করে নেওয়ার জন্য উদগ্রীব হতেন। নজরুল যে মুসলমান, সুদূর বর্ধমান জেলার অচেনা গ্রামের (চুরুলিয়ায়) ছেলে, তা সত্ত্বেও তারা নজরুলকে আপন করে নিতে পেরেছিলেন সহজে। সেনগুপ্ত পরিবারের প্রত্যেকেই তাঁকে ভালবাসতেন। গিরিবালা দেবী, বিরজা দেবীকে তো নজরুল মায়ের মতই মনে করতেন। সারাজীবন মা বলেই ডাকতেন বিরজা দেবীকে।
আশালতা ও বীনেন্দ্রকে নিজের ভাইবোনের মত আপন করে নিয়েছিলেন নজরুল। আশালতা তাঁর কাছে সঙ্গীত শিক্ষাও করতেন। সেনগুপ্ত পরিবারের ভালবাসার টানে নজরুল ঘন ঘন কুমিল্লায় আসতেন। তখন থেকেই নজরুলের সঙ্গে সেনগুপ্ত পরিবারের একটা মধুর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্ভবত তখন থেকেই কিশোরী আশালতা মনে মনে সংগোপনে কবিকে ভালবাসতে শুরু করেন। কবির প্রতি আশালতার গোপন ভালবাসা প্রকাশ পায় যখন কবির সঙ্গে কুমিল্লার দৌলতপুর নিবাসী বিখ্যাত সৈয়দ বংশের পিতৃহীন কন্যা নার্গিস আসার খানমের সাদী সম্পন্ন হয়। নজরুল-নার্গিসের বিয়ের তারিখ ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন শুক্রবার। নার্গিস ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত পুস্তক ব্যবসায়ী আলী আকবর খানের ভাগ্নি এই বিয়ে স্থায়ী হয়নি। নানা কারণে এই বিয়ে ভেঙে যায়। এর ফলে কবি ও নার্গিস উভয়ই নিদারুণ মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন। এই সময় ১৯২২ এর ধূমকেতু পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতা। সরকার বিরোধী এই কবিতা প্রকাশের জন্য বিচারে কবির এক বছর জেল হয়। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কবি কুমিল্লায় আসেন। এ-প্রসঙ্গে সুলেখিকা শৈলদেবীর মন্তব্য; ‘বরং এইবার সেই স্নেহ-সৌহার্দ-ভালবাসা এত নিবিড় হইয়া উঠিল যে তাঁর সহিত আশালতার বিবাহ দেবার জন্য গিরিবালা দেবী উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন।’
কবির মর্মজ্বালা প্রকাশ পায় তাঁর বিভিন্ন লেখায়।  নার্গিসের সঙ্গে বিয়ে ভাঙার ১৬ বছর পর তার অভিমানের উত্তরে কবি লিখেছিলেন, ‘আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম, কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি তা দিয়ে তোমায় কোনদিন বুঝাতে পারতাম না, আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না।’ নার্গিসের উদ্দেশ্যে কবি লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত গান, ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই, কেন মনে রাখ তারে। ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে’।
জেল মুক্তির পর নজরুলের প্রতি ভালবাসা নিবিড় হয়ে ওঠে গিরিবালা দেবীর। গিরিবালা দেবীর ভূমিকা তখন নজরুলের অভিভাবকের। তাঁর দূরদৃষ্টিতে নজরুল তখন ভাবীকালের মহামানব। তাই তাঁর সঙ্গে আত্মিক বন্ধন চিরস্থায়ী করার জন্য নিজের একমাত্র কন্যা আশালতাকে সম্প্রদানের জন্য গিরিবালা দেবী উঠে-পড়ে লাগলেন কিন্তু গিরিবালার সেই প্রস্তাবে ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, বিরজাদেবী এবং তাঁদের পুত্র বীরেন্দ্রকুমার এবং তাদের অন্যান্য জ্ঞাতি-গোত্র-আত্মীয়স্বজন যাঁরাই শুনেছিলেন, সকলেই বিয়ের প্রস্তাবে ঘোর আপত্তি প্রকাশ করলেন। আপত্তির কারণ, হিন্দু-মুসলমান বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কুটুম্বিতে সবই হতে পারে, কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক নৈব নৈব চঃ। দ্বিতীয়ত, নজরুলের বাড়ি সুদূর বর্ধমান জেলায় তাঁর থাকার কোন নিজস্ব জায়গা নেই। নজরুলের নির্দিষ্ট কোন আয়-রোজগার নেই। লেখালেখির যৎসামান্য আয় হলেও সংসার চালাবার মত কোন রোজগার নেই। ব্রিটিশ সরকারবিরোধী উগ্র কাব্যচর্চায় কারাবাস ইত্যাদি নানা কারণে নজরুল তখন ‘চলো মুসাফিরের’ মত ভ্রাম্যমাণ জীবনে। এইসব কারণে গিরিবালা দেবীর আত্মীয়স্বজনেরা এই বিয়ের বিরুদ্ধাচরণ করলেও গিরিবালা দেবী নজরুলকে কন্যাদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তিনি নজরুলের মধ্যে এক বিপুল শক্তির উৎস দেখেছিলেন হয়তো। হয়তো দেখেছিলেন নজরুলের মধ্যে এক অমোঘ শক্তি যার বলে সে একদিন নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে। তাই, তিনি শত বাধার মধ্যেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে তিনি একাই লড়াই করেছিলেন। অবশেষে তিনি কন্যাকে নিয়ে বিহারের সমস্তিপুরে তাঁর ভাইয়ের কাছে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সেই মত তিনি গোপনে মেয়ে নিয়ে কলকাতায় পৌঁছলেন। তখন নজরুল থাকতেন মোসলেম ভারত পত্রিকার অফিসে। এসময় প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন উৎসুক পাঠকের জন্য নিম্নে উদ্ধৃত করা হল: ‘শ্রীযুক্ত আনন্দবাজার পত্রিকা-র সম্পাদক মহাশয় সমীপেষু-মহাশয়,
বিগত ১৯ মার্চ, ১৯২৪ সাল দৈনিক বসুমতীতে প্রকাশিত হইয়াছিল যে, কলকাতা শহরে জোর গুজব উঠিয়াছে যে, ধূমকেতু সম্পাদক সুকবি কাজী নজরুল ইসলামের সহিত যুগান্তর সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ সেনের ভগিনীর বিবাহ হইতেছে। ব্যাপার এতদূর গড়াইয়াছে বলিয়া এই প্রস্তাবিত বিবাহ সম্বন্ধে আমার অভিমত প্রকাশ করা কর্তব্য মনে করিলাম। অসবর্ণ বিবাহ এমনকি আন্তর্জাতিক বিবাহেরও আমি সর্বতোভাবে সমর্থন করিয়া থাকি, কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে কয়েকটি বিশেষ বিবেচনায় আমি এই কার্যে সহায়তা করিতে পারিতেছি না। এবং আমার জ্যেষ্ঠতম ভগিনীর বিবাহে আমার কোন কর্তৃত্বও নাই। আমার পিতা-মাতা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ও বিরজাদেবী এই বিবাহ প্রস্তাবে সম্মতিজ্ঞাপন করেন নাই। নিবেদন-’
এই বিয়েতে সেনগুপ্ত পরিবারের অন্য সদস্যদের অমত হবার বিশেষ কারণ ছিল: তেওতার জমিদারের প্রবল বাধাদান ও আপত্তি। বিরোধিতার আরো একটি কারণ ছিল, নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে ভেঙে যাওয়াটা অনেকেই পছন্দ করেননি। অনেকেই মনে করেছিলেন তাঁদের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার মূলে গিরিবালা দেবীর ইন্ধন ছিল। নজরুল ও নার্গিসের বিয়ে হয় বাংলা ১৩২৮ সালের ৩রা আষাঢ় শুক্রবার অর্থাৎ ইংরেজি ১৭ জুন, ১৯২১।
তেওতার জমিদারের প্রচ্ছন্ন হুমকি, নিজ জ্ঞাতি-গোত্র-আত্মীয়স্বজনের বিরোধিতা, এমন কি খুনের চেষ্টা ও সমালোচনা ইত্যাদি উপেক্ষা করে অসমসাহসিনী গিরিবালা দেবী নজরুলকে কন্যা সম্প্রদানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। তিনি অন্তরে উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর চিন্তা ও চেতনায় বুঝেছিলেন, নজরুল মুসলমান বংশে জন্ম নিলেও সে ছেলে কোনদিন মুসলমানদের একার থাকবে না। নজরুলের প্রতি গিরিবালা দেবীর এমনই বিশ্বাস জন্মেছিল। তাই, নজরুলকে কন্যাদান বিষয়ে দেবীর এমনই বিশ্বাস জন্মেছিল। তাই, নজরুলকে কন্যাদান বিষয়ে মনে মনে তিনি সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন। আত্মীয়স্বজন-জ্ঞাতি-গোত্র এবং স্বজাতিদের প্রবল বাধা সত্ত্বেও। তিনি গৃহহীন, বিত্তহীন, ভবঘুরে নজরুলের সঙ্গে আশালতার বিয়ে দিতে পিছপা হননি।
অবশেষে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল সুকবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কুমারী আশালতার বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হল। এই হিন্দু মুসলিমের বিয়ে নির্বিঘেœ সম্পন্ন করার জন্য নজরুলের কয়েকজন বিশেষ হিতাকাক্সক্ষী অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মুখ্য ছিলেন সুলেখিকা এস রহমান নামে জনৈক উচ্চবংশজাত মহিলা। অলক্ষ্যে সমর্থন ও আশীর্বাদের হস্ত উত্তোলন করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ। এছাড়াও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নজরুলের কয়েকজন হিন্দু ও মুসলমান বন্ধুবান্ধব সমর্থন করেন।
অতঃপর প্রশ্ন উঠল-এই বিয়ে কোন মতে হবে? আশালতার পূর্বপুরুষগণ হিন্দু থেকে ব্রাহ্ম হয়েছেন। ব্রাহ্মরা হিন্দুদের মত জাতের নামে মানুষের মধ্যে শ্রেণি-বিভাজন করে না। বিশ্বসংসারে মানুষের একজাতি হিসাবে তারা বিবেচনা করে।
যুগান্তর সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত যদিও এই বিয়ে থেকে প্রত্যক্ষভাবে দূরে ছিলেন, তবু তাঁর গোপন ইচ্ছে ছিল যে, তাঁর ভগ্নীর সঙ্গে বন্ধু নজরুলের বিয়ে রেজিস্ট্রিকৃত কোর্ট-ম্যারেজ হোক। আন্তর্জাতিক বিয়ের মর্যাদা লাভ করুক। এইমতের সমর্থনে ব্রাহ্ম ও হিন্দুরা এক ছিলেন। স্বয়ং গিরিবালা দেবীও চেয়েছিলেন তাঁর মেয়ের বিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম অর্থাৎ কোর্ট ম্যারেজ হোক। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, জনৈক ধনাঢ্য মাড়োয়ারী নজরুলকে এক লক্ষ টাকা দিতে চেয়েছিলেন যদি তিনি (নজরুল) আর্যধর্মমতে বিয়ে করেন। তাদের কোন মতে বিয়ে হওয়া উচিত- এপ্রশ্নে জোর তর্ক বাধে। মুসলিম বন্ধুরা বলে, হিন্দু ব্রাহ্ম অথবা আর্য মতে বিয়ে হতে পারে না- এক হতে পারে মুসলমানী মতে অথবা সিভিল ম্যারেজ অনুযায়ী। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বর-কনে উভয়কে স্বীকৃতি দিতে হবে যে ‘আমি কোন ধর্ম মানি না।’ এইকথায় নজরুল প্রবল আপত্তি করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মুসলমান, মুসলমানী রক্ত আমার শিরায় শিরায় ধমনীতে ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে, এ আমি অস্বীকার করতে পারব না।’
বিয়ের নিয়মকানুন বিষয়ে তর্কবিতর্কের মধ্যে নজরুলের ধর্মীয় মনোভাব প্রকাশ পাওয়ায় তাঁর কিছু ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক ক্ষুণœ হয়েছিলেন। কারণ, হিন্দু-মুসলিম সকলেই জানতেন নজরুল কোন ধর্মের গ-ির মধ্যে আবদ্ধ নেই। তিনি মানবতাবাদী কবি। তিনি সাম্যের গান গান। তিনি এক নতুন ধর্মবোধের অন্যতম প্রবর্তক হতে চলেছেন। তিনি লিখছেন, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ মুসলিম সমাজের লোক বলে ঘোষণা করেন। অবশেষে ২৫ এপ্রিল ১৯২৪ নজরুলের ইচ্ছামতে মুসলিমরীতি অনুসারে তাঁর সঙ্গে আশালতা দেবীর বিয়ে হয়। বিয়ের আসরে আশালতা দেবীর নাম পরিবর্তন করে নজরুল নাম রাখলেন কাজী প্রমীলা ইসলাম।
এই বিয়ে নিয়ে ঝড় উঠল বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক মহলে। সে অনেক দীর্ঘ ও তিক্ত ইতিহাস। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলে থেকে গিরিবালা দেবী তাঁদের সুখশাস্তি ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য যে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, তার কোন তুলনা হয় না। জামাইমেয়েকে নিয়ে বারবার তাদের ভাড়াবাড়ি পাল্টাতে হয়েছে। কখনো হিন্দুপাড়ায় কখনো মুসলমান পাড়ায়, কখনো কোন অজ্ঞাত জায়গায়, কখনো মফস্বলে, কখনো কলকাতার বিভিন্ন স্থানে থাকতে হয়েছে। তাঁদের সংসার পরিচালনার সমস্ত দায়িত্বভার গিরিবালা দেবী কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। গিরিবালা দেবী মুসলমান জামাইয়ের সংসারে থেকে হিন্দু বিধবার সাত্ত্বিক জীবনযাপন করতেন।
প্রমীলার প্রথম পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে বাংলা ১৩৩১ সালের জন্মাষ্টমীর দিন (শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি)। তাই সম্ভবত গিরিবালা দেবী নবজাতকের নাম রাখেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ এবং নজরুল নাম রাখেন আজাদ কামাল। তাঁদের এই পুত্রের ‘আকিকা’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন ডা. মো. লুৎফর রহমান, মইনুদ্দিন হোসেন, মো. ওয়াজেদ আলী, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, জসীমউদ্দীন, দীনেশ দাস, নলিনীকান্ত সরকার প্রমুখ খ্যাতনামা কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। কিন্তু কৃষ্ণ মোহাম্মদ অকালে চলে গেল। তারপর জন্ম নিল বুলবুল। সেও চলে গেল অকালে। পরে প্রমীলা-নজরুলের আর যে দুই ছেলে হয়েছিল তাঁরাও দীর্ঘায়ু লাভ করেননি। সব্যসাচী পঞ্চাশ এবং অনিরুদ্ধে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাদের প্রত্যেকের সেবাযতœ-পরিচর্যার মুখ্য ভূমিকা ছিল গিরিবালা দেবীর। সংসারের সমস্ত দায়ভার এমনকি দৈনন্দিন হাটবাজার এবং সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর কেনাকাটা ইত্যাদি কাজও গিরিবালা দেবী করতেন। তখন নজরুল প্রায়ই সময় পেতেন না। তিনি সাহিত্যচর্চা, সঙ্গীতচর্চা এবং পত্রিকা সম্পাদনা নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর সংসার পরিচালনা করার মত সময় ছিল না। তাঁকে প্রায়শই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হত। সারা বাংলায় বিশেষত পূর্ব ও  উত্তর বাংলায় তখন তাঁর চাহিদা প্রবল, তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা বিপুল। তাঁর ঘরে থাকা বা সংসার দেখাশোনার সময় খুবই সীমিত হয়ে যায়। তাঁকে প্রায় উল্কার মত ছুটে বেড়াতে হত বাংলার সাংস্কৃতিক আকাশে। এই সব দিনে নজরুলের সংসারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব গিরিবালা দেবী বহন করতেন। তাছাড়াও নজরুলের বার বার বাড়ি পাল্টানোর স্বভাব ছিল। এক বাড়িতে তিনি বেশিদিন থাকতে চাইতেন না; এমন কি এক অঞ্চলেও বেশিদিন থাকতেন না। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ নজরুল-প্রমীলার বিয়ের পর থেকে গিরিবালা দেবীর অন্তর্ধান রহস্য পর্যন্ত কবি কম করেও তের-চৌদ্দবার ভাড়াবাড়ি পাল্টাপাল্টি করেছিলেন। এসব ঝকিঝামেলাও গিরিবালা দেবী সামলেছেন।
এই প্রসঙ্গে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের লেখা থেকে জানা যায়, কোন এক দরবেশের পরামর্শে নজরুল শত বছরের কচুরিপানা ভর্তি এক অতি পুরনো পচা ডোবায় সন্ধ্যা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত শরীর নিমজ্জিত রেখে দরবেশের তাবিজ নিয়ে প্রমীলাকে ধারণ করিয়েছিলেন। প্রমীলাকে সারিয়ে তুলতে নজরুল প্রায় পাগলের মত ছোটাছুটি করতেন। তখন তাঁর সাহিত্য-সঙ্গীতচর্চা এবং আয়-রোজগার ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। অবশেষে ১৯৪১ সালের শেষের দিক থেকে নজরুল ধীরে ধীরে সম্বিতহারা হতে হতে চিরনির্বাক হয়ে গেলেন। তাঁরই লিখিত বাণী তাঁর জীবনে সত্য হয়ে উঠল,
‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু
আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি’ সারা দিনমান
কারো ধ্যান ভাঙিব না
…নিশ্চল, নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী
গন্ধবিধুর ধূপ।’
নজরুল প্রমীলার শরীরে ও সংসারে এক ভয়ংকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মেয়ে, সম্বিতহারা জামাই এবং  দুটি নাবালক নাতি নিয়ে গিরিবালা দেবী যে কী মহাদুর্দিনে পড়েছিলেন, তার কিছু বিবরণ বিভিন্ন জনের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়। তিনি নিজে হিন্দুবিধবা হিসাবে আহারে ও পরিধানে খুবই সংযত ও সাত্ত্বিক ছিলেন। গিরিবালা দেবী সম্পর্কে বিশিষ্ট নজরুলগবেষক আজহারউদ্দিন খান লিখছেন, ‘কবি-পরিবারে গিরিবালা দেবী পক্ষীমাতার মত সকলকে আগলিয়ে রাখতেন, কিন্তু কবির অসুস্থতার পর গিরিবালা দেবী সম্পর্কে নানাজনে নানাকথা বলতে শুরু করেন। তিনি নাকি জামাইয়ের রয়ালটির সব টাকা জমিয়ে রাখেন, জামাইয়ের চিকিৎসা করান না, ভাল খেতে দেন না, কবির নামে যা কিছু সাহায্য আসে তা তিনি আত্মসাৎ করেন ইত্যাদি। এসব কথায় তিনি প্রচ- আঘাত পেতেন। তিনি অতি দুঃখে ক্ষোভের সাথে বলতেন, এভাবে দুর্নামের বোঝা নিয়ে বাঁচতে ইচ্ছে করে না, কোনদিন চলে যাব দু’চোখ যেদিকে যায়।’
অসুস্থ মেয়ে-জামাইয়ের নোংরা জামাকাপড় বিছানাপত্তর তিনি নিজের হাতে পরিষ্কার করতেন। এমনকি তাদের মলমূত্র পর্যন্ত পরিষ্কার করে তাদের পরিচ্ছন্ন রাখতেন। ঘরের সব কাজ সেরে, রান্নাবান্না করে, তাদের খাইয়ে, বিকেলে ¯œানানাদি সেরে পূজার্চনা করে নিজের নিরামিষ আহার তৈরি করে খেতেন।
গিরিবালা দেবী সম্পর্কে মৈত্রেয়ী দেবী লিখেছেন, “যখন কন্যা পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়লেন, যখন জামাতা জ্ঞান হারালেন তখন এই রুগী দু’টির সমস্ত পরিচর্যা এবং সন্তান দু’টির দায়িত্ব তিনিই বহন করে চলতেন। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন দেবীকে খালা আম্মা বলে ডাকতেন। তিনি গিরিবালা দেবী ‘সম্পর্কে লিখলেন, ‘একদিন বেলা একটার সময় কবিগৃহে গমন করিয়া দেখি খালাআম্মা বিষণœ বদনে বসিয়া আছেন। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনর মুখ আজ বেজার কেন?
খালাআম্মা অভিমানে বলিলেন, জসীম তোমরা জানো, সব লোকে আমার নিন্দা করে বেড়াচ্ছে। নুরুর (নজরুল) নামে যেখানে থেকে যত টাকা-পয়সা আসে, আমি নাকি সব টাকা বাক্সে বন্ধ করে রাখি। নুরুকে ভালমত খাওয়াই না। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করি না। তুমি জানো, আমার ছেলে নেই। নুরুকেই আমি ছেলে করে নিয়েছি। আর আমিই বা কে? নুরুর দু’টি ছেলে আছে। তারা বড় হয়ে উঠেছে। আমি যদি নুরুর টাকা লুকিয়ে রাখি, তারা তা সহ্য করবে কেন? তাদের বাপ খেতে পেলে কি না- তারা কি চোখে দেখে না? নিজের ছেলের চাইতে কি কবির প্রতি অপরের দরদ বেশি? আমি তোকে বলে দিলাম জসীম, এই সংসার থেকে একদিন আমি কোথাও চলে যাব। এই নিন্দা আমি সহ্য করতে পারি না।’ এই বলিয়া খালাআম্মা কাঁদিতে লাগিলেন। আমি বলিলাম, ‘খালাআম্মা কাঁদবেন না। একদিন প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবেই।’ খালাআম্মা আমার হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া গেলেন, যে ঘরে নজরুল থাকিতেন সেই ঘরে। দেখিলাম পায়খানা করিয়া কাপড়জামা সমস্ত নোংরা করিয়া বসিয়া আছেন। খালা আম্মা বলিলেন, ‘এইসব পরিষ্কার করে আমি হিন্দু বিধবা তবে রান্না করতে বসব। খেতে খেতে বেলা পাঁচটা বাজবে। রোজ এইভাবে তিন চারবার পরিষ্কার করতে হয়। যারা নিন্দা করে তাদের বল, তারা এসে যেন এই কাজের ভার নেয়। তখন যেখানে চক্ষু যায় আমি চলে যাব।”
সত্যসত্যই একদিন কবি জসীমউদ্দীনের খালাআম্মা (মাসিমা) গিরিবালা সেনগুপ্তা কোথায় চলে গেলেন, কিছুতেই তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না। তখন তাঁরা থাকতেন শ্যামবাজার এলাকায়। সেখানে থেকে তিনি একদিন চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। তখন ১৯৪৬ সাল, কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে প্রচন্ড দাঙ্গা-হাঙ্গামা খুন-খারাবি চলছিল। এইরকম এক ভয়ানক সময় তিনি একবস্ত্রে গৃহত্যাগ করেন। শতচেষ্টায়ও তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

আখতার হামিদ খান