পাঠদান, আধুনিকতা, প্রযুক্তি,প্রয়োগ

বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতার পথে পা বাড়িয়েছে সামাজিক অন্যসব বিষয় ও বস্তু। মার্কেটিং বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মার্কেটিং পলিসি ও প্রোগ্রাম বাজারে নামার পর রাজনীতি, ধর্মপ্রচার, শিক্ষা এবং প্রযুক্তির প্রচার-প্রসারেও যুক্ত হয়েছে নবতর ভাবনা।

আমরা যদি শিক্ষাকে একটি আইটেম বা প্রোডাক্ট রূপেই বিবেচনা করি, তাহলে প্রথমেই ভেবে দেখতে হবে এর বাজার-পরিস্থিতি, মার্কেটিং প্রমোশনের কায়দা-কানুন এবং সর্বোপরি প্রমোশন অফিসারের যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধ। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, বিবিএ এমবিএ-র এই যুগে শিক্ষককে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকতে হয়। আর টিকতে হলে প্রয়োজন যোগ্যতা ও কাজ করার কায়দার আধুনিকতা ও প্রকৌশল প্রয়োগের সামর্থ্য। ঠিক এখানটায় দরকার একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক। আগামীদিনের বিদ্যায়তনে হাজারো তরুণ প্রতিযোগীর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে তাকে তৈরি হতে হবে। শিক্ষায় তার ভুবনটিতে কী তার দায়িত্ব, কতটুকু তার কাজের পরিসর, অগ্রগতির বা উন্নয়নের ধাপ বা সিঁড়িগুলো কোথায়—বাঁকগুলোওবা কেমনতরো, নিজস্বতা প্রকাশের সুযোগ কতটুকু, জানবার ও জানাবার ভুবনের পরিসর কোন পর্যন্ত প্রসারিত, তার তদারককারী কে বা কারা ইত্যাদি জিজ্ঞাসার প্রাথমিক সমাধানে পথ কিংবা পথের আলোকরেখা তাকে জেনে নিতে হবে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষকরা চাকরিতে প্রবেশের পর নিজের দায়িত্বে স্ব-নির্মিত শিক্ষক হয়ে ওঠেন। তার বা তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত উদ্যোগ খুবই সামান্য। আর অল্পসংখ্যক শিক্ষক বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ বা উন্নত পাঠ গ্রহণ করার সুযোগ পান। তবে তরুণ বা শিক্ষানবিশ শিক্ষকদের জন্য দরকার শিক্ষাদানের নৈতিকতা, পাঠদানের কলাকৌশল এবং সাম্প্রতিকতম শিক্ষা-প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রায়োগিক জ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক শিক্ষা-ব্যবস্থার অবিস্মরণীয় উত্কর্ষের সাথে পাল্লা দিতে হলে পরিবর্তিত পদ্ধতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার কোনো বিকল্প আপাতত নেই। আমাদের আগামীদিনের শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করে তোলার প্রশ্নটি তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে প্রযুক্তির এই প্রবল প্রবাহের কালে এবং প্রকৌশল প্রয়োগের পারদর্শিতার খোলা বাজারের প্রশস্ত বারান্দায়।

গতানুগতিক বা প্রথাগত পাঠদানের সময় ফুরিয়েছে বেশ খানিকটা আগে। এখন সময় ক্রম-উন্নয়ন এবং পাঠে নবতর ব্যঞ্জনা সৃষ্টির প্রেরণা জাগাবার। মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনোকালে ফ্যাশন হয়ে আবির্ভূত হয়নি। মানুষ এসবের প্রয়োগে নিজেদের ও অপরের জীবন-অভিজ্ঞান পাল্টে দিয়েছে। তাই প্রযুক্তি আমাদের বন্ধু। শিক্ষাভুবনে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, প্রজেক্টর, ডিজিটাল বোর্ড প্রভৃতির ব্যবহার আজ আর কোনো ফ্যাশনের পর্যায়ে পড়ে না—এটা প্রয়োজন। আধুনিক শিক্ষককে অবশ্যই এসব ব্যবহার করতে জানতে হবে। কেবল জেনে বসে থাকলে হবে না। সার্টিফিকেট হয়তো আমাদেরকে চাকরি পেতে সহায়তা করে কিন্তু কাজটা নিজেকেই করতে হয়। কাজেই শিখে রাখা নয় বরং ক্লাসে, আড্ডায় (পাঠ বিষয়ক নানান আড্ডাই তো হতে পারে), সেমিনারে, মত-বিনিময় সভায়, ওয়ার্কশপে এই আধুনিক প্রযুক্তির যথাসম্ভব প্রয়োগ করতে হবে। ক্লাস-কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায়ও আনতে হবে মাত্রাগত রূপান্তর ও পরিবর্তন। ক্লাসরুম ডেকোরেশনে ইন্টারনেট সংযোগসহ, ডিভিডি-সিডি চালাবার ব্যবস্থাসমেত কম্পিউটার রাখতে পারলে খুব ভালো হয়। আবার বলা-শোনা-লেখা ও পড়া—এই চারটি ধাপের প্রাত্যহিক প্রয়োগ যেন ঠিকমতো অনুষ্ঠিত হয় সেদিকেও প্রশাসক বা ব্যবস্থাপকের নজর রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে বা বসে কিংবা ঝিমুতে ঝিমুতে কেবল বকবক করে যাবার দিন এখন আর নেই। যেমন খড়িমাটি বা চকের জায়গায় হাজির হয়েছে মার্কার। বিষয়ের সাথে বস্তুও পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। কেউ এটা চাপিয়ে দেয়নি। পরিবর্তনটা স্বাভাবিক। তাই অভ্যাস এবং চর্চার পরিবর্তন ঘটাতে হবে সরল-বিশ্বাসে ও দরকারের দায় স্বীকার করে।

পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা পৃথিবীতে এখন অনলাইন লাইফস্কিলস ইনস্ট্রাক্টরগণ তাদের গবেষণা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলাফল প্রকাশ করছেন। নবাগত শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো প্রযুক্তির সাথে নিজেকে পরিচিত করে তোলা, অন্যের অভিজ্ঞতা জেনে নেওয়া, নিজের জানা-ভাবনার জগত্ প্রভৃতি অপরের সাথে শেয়ার করা। কারণ কোয়ালিটি এডুকেশনের জন্য সবার আগে দরকার কোয়ালিফাইড টিচার। ক্লাসরুমে পাঠদানে আধুনিকতা প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষকের অ্যাপ্রোচে ভিন্নতা ও পরিবর্তন আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত উদ্যোগ যেমন থাকতে হবে, তেমনি থাকবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও। টেকনিক ও স্ট্র্যাটেজি প্রয়োগেও সতর্ক থাকতে হয় সর্বদা। বিষয়ের ওপর গভীর জ্ঞান থাকাটা হচ্ছে প্রাথমিক শর্ত; আর ওই জ্ঞান বিতরণে থাকতে হবে আধুনিকমনস্কতা। শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান, চিন্তার সম্প্রসারণ তদারকির পাশাপাশি সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি এবং তার পরিচর্যায় শিক্ষককে দায়িত্বশীল থাকতে হবে। দক্ষতার সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে জানতে হবে—জানাতে হবে; পাঠদান ও গ্রহণকে ফলপ্রসূ করার জন্য, পাঠগ্রহণকারীদেরকে মূলস্রোতে নিমগ্ন রাখার জন্য। উপস্থাপনার প্রকৌশল আয়ত্ত করতে না পারলে, যুক্তি ও প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ না করলে শিক্ষকের মান উন্নয়ন কিছুতেই সম্ভব নয়। চলমান তথ্যের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা, প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে পারার ব্যাপারটিও বর্তমানে পেশাদারিত্বের ভুবনে বিভিন্ন দেশে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। আর ব্যক্তির সৃজনশীলতাও শিক্ষা এবং সংস্কৃতি বিকাশের বাহন রূপে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে যে শিক্ষক যত বেশি ক্রিয়েটিভিটির পরিচয় রাখতে পারবেন, তিনি তত বেশি অগ্রসর থাকবেন। আফ্রিকা, ইউরোপ বর্তমানে এসব বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রজন্মান্তরে দ্রব্য ও সেবার ধারণা পরিবর্তন হচ্ছে। বদলাচ্ছে ভোগ এবং উপভোগের মাত্রাও। বর্তমান প্রজন্মকে ইতিবাচক অর্থে স্বপ্নবাজ করে তুলতে হবে। দুশ্চিন্তা ও দুঃস্বপ্নের বদলে তাদেরকে চিন্তা ও স্বপ্ন দেখাতে শেখাতে হবে। জানাতে হবে জীবনবোধের তাত্পর্য ও সৌন্দর্য। কেবল সিলেবাসের পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়, নানান বিষয়ে উত্সাহ প্রদান করাও একটি শিক্ষা। অভিজ্ঞ ও শিক্ষিত শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা ও আশীর্বাদস্বরূপ। আবার প্রশিক্ষণের পর শিক্ষকদের মূল্যায়নও জরুরি। তারা কী পরিবর্তন আনছেন তাদের পাঠদান পদ্ধতিতে তার ওপর পর্যবেক্ষণ থাকা প্রয়োজন। আধুনিক পৃথিবী চায় পেশাদারিত্ব। সবাই বোধকরি মানবেন যে, শিক্ষকগণ সমাজের ব্যতিক্রমী সমন্বয়কারী। ঐতিহ্য ও সমকালের পাটাতনে তারা আধুনিক মানুষ গড়ার প্রধান প্রশিক্ষক। কাজেই শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন না হলে একটি সমাজ পিছিয়ে পড়ে সবার আগে। গ্লোবাল এডুকেশন এবং বৈশ্বিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারাটা পেশাগত উন্নতির প্রাথমিক পর্যায় মাত্র। আর পরবর্তীকালে নিজের সাথে নিজেকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে তৈরি করতে হবে পেশাগত সাফল্যের অনিবার্য ধাপসমূহ।

ড. ফজলুল হক সৈকত

লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর