প্রকৃতি,বিজ্ঞানী, গোপালচন্দ্র

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে ছেলেটির কলেজে পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেটি যেহেতু তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ম্যাট্রিক পাস করেছে তাই ভাগ্যক্রমে একটা চাকরিও জুটে গেল তার। শিক্ষকতার চাকরি। স্কুলে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে ছেলেটি আপন মনে ঘুরে বেড়াত বনে-জঙ্গলে। এক মনে গভীর আগ্রহ নিয়ে বনে বনে কীটপতঙ্গের গতিবিধি লক্ষ করত। তার খুব ভাল লাগত। গাছপালা নিয়েও তার সমান আগ্রহ।

গাছপালা নিয়েও তার নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা অচেনাকে চেনার আর অজানাকে জানার আগ্রহ আর আকর্ষণই পরবর্তী সময়ে তাকে বিজ্ঞান সাধনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। ফলশ্রুতিতে তিনি পরবর্তীতে এই উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রধান স্বভাববিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। নাম তার গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য।

তার জন্ম ১৮৯৫ সালের পহেলা আগস্ট। জন্মের পাঁচ বছর পর তার বাবা অম্বিকাচরণ মারা গেলে মা শশিমুখী দেবী সংসারের হাল ধরলেন। বাবা ছিলেন গ্রামের জমিদারবাড়ির কুলপুরোহিত। ফলে গোপালচন্দ্রের কাঁধে এসে পড়ল সে কাজের ভার। সংসারের চাপে বাবার যজন-যাজন রক্ষার্থে মাত্র ন’বছর বয়সে গোপালচন্দ্রের উপনয়ন হয়। একদিকে জমিদারবাড়ির যজন-যাজন। অন্যদিকে পড়াশোনা। কঠিন জীবন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে চলল তার যাত্রা।

এভাবে সে ম্যাট্রিক পাস করল প্রথম বিভাগে এবং সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে। তারপর ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে গোপালচন্দ্র জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ব্যয় করেছিলেন কীটপতঙ্গ আর গাছপালা নিয়ে গবেষণা করে। মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে গোপালচন্দ্রের পরিচয় পর্ব ছিল ভারী অদ্ভুত। মজার।

গোপালচন্দ্রের গ্রামের এক মহিলা। সবাই তাকে বলত পাঁচির মা। তো সেই পাঁচির মার ভিটেয় সন্ধ্যার পর এক ভৌতিক আলো বের হত। গোপালচন্দ্র সেই ভৌতিক আলোর রহস্য বের করার জন্য এক সন্ধ্যায় রওনা হলেন সেখানে। পাঁচির মার ভিটে ছিল ঝোপঝাড়ের মধ্যে। সেই ঝোপঝাড়ের ভেতর আগুন জ্বলতে দেখে গ্রামবাসীরা আঁতকে উঠত। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চললেন তিনি ভৌতিক আলোর রহস্য উদঘাটন করতে। চারপাশে বড় বড় গাছের মাথায় জমাট বাঁধা অন্ধকার। তার মাঝে ছোট ছোট ঝোপ। আলোটা বের হচ্ছে ঠিক সেখান থেকে। আলোটা মাঝে মাঝে জ্বলে উঠে নিভে যায় দপ করে। গনগনে আগুনের কুণ্ড। কিন্তু সিগ্ধ নীলাভ আলো আর সেই আলোতে চারদিকের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।  ভালো করে তাকাতে দেখা গেল সম্মুখভাগের একটা কাটা গাছের ভেজা গুঁড়ি থেকে সিগ্ধ নীলাভ আলোটা বেরুচ্ছে। গুঁড়িটা জ্বলতে জ্বলতে একটা অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছিল। গুঁড়ির পাশে একটা কচুগাছের পাতা এমনভাবে হেলে পড়েছিল যে দূর থেকে মনে হচ্ছিল আলোটা জ্বলছে আর নিভছে। এই দৃশ্য কিন্তু গ্রামের মানুষরা দিনের বেলায় দেখতে পেত না।

কিছুদিন পর একই দৃশ্য দেখলেন গোপালচন্দ্র। রাতের বেলা পুকুরের পাশে সেই আলো দেখতে পেলেন তিনি। গোপালচন্দ্র সেই আলোর কিছু অংশ তুলে এনে দেখেন কিছু ভেজা লতাগুল্ম থেকে বের হচ্ছে সিগ্ধ নীলাভ আলো। লতাগুল্ম থেকে আলোর বিকিরণ সম্পর্কে গোপালচন্দ্র একটি বিশ্লেষণধর্মী এবং আকর্ষণীয় লেখা তৈরি করেন এবং তা তখনকার বিখ্যাত বাংলা মাসিক ‘প্রবাসী’তে পাঠান। ‘প্রবাসী’তে লেখাটি প্রকাশিত হলে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আচার্য গোপালচন্দ্রকে ডেকে পাঠালেন বসুর বিজ্ঞান মন্দিরে। ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বসুর বিজ্ঞান মন্দিরে বিজ্ঞানাচার্যের ডাকে শুরু হলো গোপালচন্দ্রের গবেষণা। মূলত তার গবেষণা ছিল উদ্ভিদ নিয়ে। কিন্তু বিশেষ কারণবশত সেই গবেষণা বেশিদূর না এগুলেও উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের কাছে তার লিখিত উদ্ভিদ বিষয়ক গ্রন্থ ‘উদ্ভিদের রাহাজানি’, ‘গাছের আলো’, ‘শিকারী গাছের কথা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বসু মন্দিরে থাকাকালে গোপালচন্দ্র ঝুঁকে পড়েন কীট-পতঙ্গের প্রতি। সেখানে তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ব্যাঙাচি, মাকড়সা, পিঁপড়ে, শুঁয়োপোকা ইত্যাদি কীটপতঙ্গের খাদ্যসংগ্রহ, আচার-আচরণ, বংশবিস্তার প্রণালী সম্পর্কে। তার লেখা থেকে সর্বপ্রথম জানা যায় মাকড়সারা টিকটিকি, চামচিকা, আরশোলা, মাছ এমনকি ছোট সাপও খায়। মাছ-শিকারী মাকড়সা সম্পর্কে গোপালচন্দ্রের গবেষণা থেকে জানা যায়, এরা দিনের বেলায় অনেকটা সময় থাকে জলের ওপর, কখনও বা ভাসমান উদ্ভিদের পাতার নিচে। কাছাকাছি ছোট ছোট মাছ একসঙ্গে জড়ো হলে মাকড়সা প্রথমে তাদের নীরবে দেখে। গতিবিধি লক্ষ্য করে। তারপর সময় আর সুযোগ বুঝে আচমকা মাছের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিষদাঁত ফুটিয়ে হত্যা করে। মাকড়সা পিঁপড়েকে অনুসরণ করে। মাকড়সা সম্পর্কে তার বক্তব্য কীটপতঙ্গরাও ভীষণ অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। এই মাকড়সার শুধু হাঁটাচলা নয়, গায়ের রং, শারীরিক গঠন সবকিছু হুবুহু পিঁপড়ের মত। বলা ভালো আÍরক্ষার জন্যই মাকড়সার এই অনুকরণ। পিঁপড়ের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে গোপালচন্দ্র পিঁপড়েদের বুদ্ধির যে পরিচয় পেয়েছিলেন তা এক কথায় বিস্ময়কর। অভূতপূর্ব। গোপালচন্দ্র একবার একটা মরা আরশোলাসহ এক শিশি আঠা এক জায়গায় ঢেলে ফেললেন।

কয়েকদিন পরের ঘটনা। লাল রঙের ছোট ছোট বিষ-পিঁপড়ে সেই আঠার ভেতর দিয়ে চেষ্টা করছে প্রাণপণ আরশোলার কাছে পৌঁছতে। চলল চেষ্টা। আধা ঘণ্টা। তারপর সেখানে অসংখ্য পিঁপড়েকে দেখা গেল যাদের সবার মুখে ছোট ছোট কাঁকর। পিঁপড়ের দল সেই কাঁকর নিয়ে ফেলছে সম্মুখভাগে যেখানে আরশোলা আটকা পড়ে আছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলল পিঁপড়েদের অক্লান্ত পরিশ্রম যার ফলে একটা সেতুর মতো তৈরি হল আর সেই সেতু দিয়ে আরশোলা নিজেকে মুক্ত করল। এ ঘটনা থেকেই প্রতীয়মান হয় যে কীটপতঙ্গের গবেষণার ব্যাপারে গোপালচন্দ্রের ছিল বিস্ময়কর ধৈর্য, অনসুন্ধিৎসা এবং তথ্য উপস্থাপনার অভিনবত্ব।

গোপালচন্দ্র কীটপতঙ্গের জীবনের বিভিন্ন অদ্ভুত দিক নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শুঁয়োপোকার মৃত্যু অভিযান। এ ছাড়া গোপালচন্দ্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পেনিসিলিন প্রয়োগে ব্যাঙাচির শারীরিক বিকাশকে রোধ করা। এই গবেষণা তাকে আন্তর্জাতিক সম্মান ও খ্যাতি এনে দিয়েছিল। ব্যাঙাচি ব্যাঙে পরিণত হয় যে হরমোনের প্রভাবে তার নাম থাইরসিন। তিনি সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করলেন যে ব্যাঙাচির এই রূপান্তর বন্ধ করা যায় পেনিসিলিনের প্রয়োগের মাধ্যমে। এর ফলে ব্যাঙাচি ব্যাঙাচিই থেকে যায়। তা আর ব্যাঙ হয়ে ওঠে না। গোপালচন্দ্রের গবেষণাধীন ছিল খাদ্যনির্ভর তত্ত্ব। এটা আবার কী?

এটা হল খুব মজার একটা থিয়োরি বা তত্ত্ব। পিঁপড়ে সমাজে রাজা, রানী পুরুষ ও শ্রমিক বা সৈনিক পিঁপড়ের সংখ্যা নির্ধারিত হতে পারে স্রেফ খাদ্যনিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র গবেষণা করে এই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ থিয়োরি বা তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। ভীষণ রকমের প্রচারবিমুখ স্বভাবের ছিলেন বলে তিনি কুমোরে পোকা সম্বন্ধে মূল্যবান গবেষণালব্ধ তথ্য প্রকাশের সময়টিও লিখে রাখেননি।

শহরে প্রায়ই ছেলে-ধরা আতংক প্লেগ রোগের মত হু হু করে ছড়িয়ে পড়ে। সহজ বাংলায় যাকে বলে আদম-সন্তান চুরি হয়ে যাওয়া। মানুষ যেরকম একজনের বাচ্চা অন্যজনে চুরি করে নিয়ে যায় তেমনি কীটপতঙ্গও কিন্তু অন্যের বাচ্চা চুরি করতে ওস্তাদ। গোপালচন্দ্রের গবেষণা থেকে এসব অভিনব ঘটনা জানা যায়। তার লিখিত ‘ভীমরুলের রাহাজানি’ পড়ে জানা যায়, কিভাবে দৈহিক শক্তি ও দুষ্টবুদ্ধি নিয়ে কয়েকটি ভীমরুল শত শত বোলতার সামনে থেকে বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। কিংবা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

উদ্ভিদ আর কীটপতঙ্গ নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণা করে তৎকালীন সময়ে এই উপমহাদেশে গোপালচন্দ্র ছিলেন এক পথিকৃত। কীটপতঙ্গের জীবনযাত্রার ওপর রয়েছে তার একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’। এই বইটির জন্য ১৯৭৫ সালে তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও গোপালচন্দ্র ছোটদের মেধা আর মননকে শাণিত করবার জন্য বিভিন্ন স্বাদের গ্রন্থ রচনা করেছেন যা আজও মূল্যবান আর প্রশংসনীয়। ‘বাংলার গাছপালা’, ‘বিজ্ঞানের আকস্মিক আবিষ্কার’, ‘বিজ্ঞান অমনিবাস’, ‘পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ’, ‘বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান সংবাদ’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো গোপালচন্দ্রের পরিশ্রমলব্ধ গবেষণার ফসল। শিশুদের জন্য তাঁর ভাবনার জগতে অংকুরিত হত নানান বিষয়। বলা যায় তাঁর ভাবনার জগতে শিশুরা অনেকটা জায়গা দখল করেছিল। আর তাই শিশুদের জন্য একটি মজার বই লিখে গেছেন যার নামটা খুব মজার ‘করে দেখ’।

প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য শুধুমাত্র বাংলায় বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করেননি তিনি ইংরেজিতেও সমান দক্ষতায় লিখেছেন যা দেশে-বিদেশে সুনাম অর্জন করতে সমর্থ হয়। ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসের আট তারিখ গোপালচন্দ্র মারা যান।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বাংলারজবের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

লিখেছেন: মাহবুব রেজা

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এ ।