প্রথম শ্রেণি,জ্যামিতি শিক্ষা,জ্যামিতি

বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকে প্রথম শ্রেণি থেকেই জ্যামিতি শিক্ষা পাঠ্য ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, ঘনক, কোনক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আর তৃতীয় শ্রেণি থেকে পুরাদস্তুর জ্যামিতি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে গণিত বইয়ে জ্যামিতি অধ্যায়ে কোণ, বাহু, আয়তন, বর্গ নিয়ে আলোচনা রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণিতে সন্নিহিত কোণ, বিপ্রতীপ কোণ, বিষমবাহু প্রভৃতি বিষয় পাঠ্য ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির গণিত বইয়ে ভগ্নাংশ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ভগ্নাংশের যোগ-বিয়োগ পাঠ্য ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, প্রাইমারি পর্যায়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত যে গণিত বই প্রণয়ন করা হয়েছে তা শিশুদের জন্য বেশ কঠিন। প্রথম শ্রেণি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত প্রথম শ্রেণির গণিত বই থেকে দুটি অংক এখানে তুলে ধরা হলো : তুলির ২৪ টি রং পেন্সিল ছিল। সে তার ছোট ভাইকে ১২টি রং পেন্সিল দিলো। বাবা তুলিকে আরো ১০টি রং পেন্সিল কিনে দিলো। এখন তুলির কয়টি রং পেন্সিল হলো? রেহানার ২৬টি বই ছিল। বইমেলায় আরো ১২টি বই কিনল। তার মোট বই থেকে ছোট বোনকে ৭টি বই দিলো। এখন রেহানার কাছে কয়টি বই রইল।’ দ্বিতীয় শ্রেণি দ্বিতীয় শ্রেণির গণিত বই থেকে কয়েকটি অংক এখানে তুলে ধরা হলো : একটি ৫০ গ্রামের বাটখারা, একটি ২০ গ্রামের বাটখারা ও তিনটি ১০ গ্রামের বাটখারা মিলে কত গ্রামের বাটখারা হবে? মাহতাব প্রতি ওভারে ৮ রান করে করল। সে ৭ ওভার খেলে আউট হয়ে গেল। সে মোট কত রান করল। বইমেলা থেকে বাবা ১৪টি এবং মামা ১০টি বই কিনল।
বইগুলো সুশ্রী ও লাকিকে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া হলো। একজন কয়টি করে বই পেল? একটি কলার দাম ৫ টাকা। ৮টি কলা কিনে ৫০ টাকার নোট দিলে কত টাকা ফেরত পাওয়া যাবে? হালিমা বইমেলা থেকে ৮০ টাকা দিয়ে ১টি বই কিনল। সে দোকানদারকে ২টি ২০ টাকা ও ১টি ৫০ টাকার নোট দিলও। সে কত টাকা ফেরত পেল? দুইটি পেনসিল ও তিনটি বলপেনের দাম একত্রে ৫০ টাকা। একটি পেনসিলের দাম ১০ টাকা। একটি বলপেনের দাম কত? এছাড়া ভগ্নাংশের ধারণা, দৈর্ঘ্য, ওজন, তরল পদার্থ, সময়, পরিমাপ, সেন্টিমিটার, মিটার, গ্রাম, লিটার সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। জ্যামিতি অধ্যায়ে গোলক, ঘনক, কোনক, বেলন, চতুর্ভুজ, ত্রিভুজ, বৃত্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণি দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি বোর্ডের বই পাঠ্য। তৃতীয় শ্রেণিতে মোট ছয়টি বোর্ডের বই পাঠ্য প্রাইমারি স্কুলে। এগুলো হলো বাংলা, অংক, ইংরেজি, বাংলাদেশ ও বিশ্ব, ধর্ম, প্রাথমিক বিজ্ঞান। প্রতিটি বই বেশ ভারি। তৃতীয় শ্রেণির গণিত বইটি মোট ১২০ পৃষ্ঠার। গণিতে সমতুল ভগ্নাংশ, লব, হর, ভগ্নাংশের যোগ- বিয়োগ, কোণ, বাহু, আয়তন, বর্গ, বিষয় পাঠ্য ভুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থ শ্রেণি চতুর্থ শ্রেণির গণিত বই আরো ভারি। মোট ১৩৪ পৃষ্ঠা। চতুর্থ শ্রেণির গণিত বই থেকে কয়েকটি অংক এখানে তুলে ধরা হলো, যা শিশুদের জন্য বেশ কঠিন বলে মনে করেন অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক। একটি সংখ্যা থেকে ৯৮৪ বিয়োগ করা হলো। বিয়োগফলের সাথে ৯৮৮ যোগ করলে যোগফল ৮৭৬৫ হয়। সংখ্যাটি কত? মাতা ও কন্যার বর্তমান বয়স ৯০ বছর। ১০ বছর আগে কন্যার বয়স ছিল ১৫ বছর।
১০ বছর পর মাতার বয়স কত হবে? এছাড়া গসাগু, গুণনীয়ক, দশমিক ভগ্নাংশ, দশমিক ভগ্নাংশকে সাধারণ ভগ্নাংশে রূপান্তর, দশমিক ভগ্নাংশের যোগ-বিয়োগ, ক্ষেত্রফল পরিমাপ, উপাত্ত সংগ্রহ ও বিন্যস্তকরণ, সন্নিহিত কোণ, সমকোণ, পূরক কোণ, সরল কোণ, সম্পূরক কোণ বিপ্রতীপ কোণ, ত্রিভুজ-সমবাহু, সমদ্বিবাহু, বিষমবাহু প্রভৃতি বিষয় পাঠ্য ভুক্ত করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির গণিত বইটি ১৫০ পৃষ্ঠার। শিক্ষকেরা জানিয়েছেন পঞ্চম শ্রেণির গণিত বইটি সবচেয়ে কঠিন। অনেক কঠিন কঠিন অংক রয়েছে, যা কষতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে শিশু এবং তাদের অভিভাবকেরা।
শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা জানান, আগে হাইস্কুল পর্যায়ে যেসব গাণিতিক সমস্যা থাকত তার বেশ কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পঞ্চম শ্রেণিতে। তাদের মতে প্রাইমারি পর্যায়ে গণিতসহ অন্যান্য পাঠ্যবইয়ে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তা একজন সর্বোচ্চ মেধাবী ছাত্রকে লক্ষ্য করে প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু মধ্যম এবং নিম্ন মেধার ছাত্ররা এর বড় একটি অংশ আয়ত্ত করতে পারছে না। একজন অভিভাবক বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব’ বইয়ে ইতিহাস অধ্যায়ে কিছু বিষয়ে এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে মনে হয় ওই বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণিতেই ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করবে। কাছপট্টি এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন জানান, তার এক ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা স্কুলে, ২২ ঘণ্টা বাসায় প্রাইভেট টিউটর এবং ১৬ ঘণ্টা কোচিং সেন্টারে কাটাতে হয় তার ছেলেকে। এ ছাড়া মা-বাবার কাছেও মাঝে মধ্যে পড়তে হয়। এতে করে ছেলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, পঞ্চম শ্রেণির গণিত বইয়ে যেসব অংক রয়েছে তাতে একটি ছেলের পাগল হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আর অন্যান্য বইয়েও অনেক কঠিন এবং বিস্তারিত পড়া রয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে জেনে বুঝে আমরা আমাদের সন্তানদের মাথা নষ্টের ব্যবস্থা করছি। কারণ উপায় নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে। কীভাবে কী প্রশ্ন হবে তার কোনও আগামাথা নেই।
ভালো রেজাল্ট না করলে নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে ভবিষ্যতে। সামাজিকভাবে হেয় হতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই ছেলের ওপর বেশি চাপ দিতে হচ্ছে পড়াশোনার জন্য।

আতিকুর রহমান, ঝালকাঠি