শিক্ষক ও শিক্ষকতা,শিক্ষক ,শিক্ষকতা

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শোষক শোষিত এবং পার্শ্বশ্রেণীর অবস্থান ছাড়াও কিছু গোষ্ঠী অবস্থান করে। সমাজের অগ্রসরতায়, মূল্যবোধ সৃষ্টিতে যাদের অংশীদারিত্ব অবধারিত সত্য হয়ে দেখা দেয় সকল সময়েই। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং শিক্ষকের মধ্যে পড়েন। সমাজে অর্থনৈতিক শ্রেণী বিশ্লেষণে এদের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করেন, তবুও এদের ভিন্নতর একটা জগত আছে, ভিন্নতর একটা বৈশিষ্ট্য আছে।
বাংলাদেশে বহু বছর ধরে ঘটমান দ্বনদ্ব, রাজনৈতিক ঘটনা বিশেষ করে ১৯৭১ সনে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রাচীন সামন্ত প্রভাবিত মূল্যবোধে কঠিন আঘাত হেনেছে। সে মূল্যবোধ সময়ের অগ্রসরতায় প্রায় পরিত্যক্ত হয়েছে কিন্তু প্রয়োজনীয় সামাজিক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার অভাবে এদেশে নতুন মূল্যবোধ গড়ে ওঠেনি। ফলত প্রাচীন মূল্যবোধ, ধার করা ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ এবং নতুন অগ্রসর মূল্যবোধের পাশাপাশি দ্বনদ্বমূলক অবস্থান চলছে বর্তমানকালে। গড়পড়তা একটা শূন্যতা সবচাইতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মূল্যবোধের ক্ষেত্রে। এর শিকার হচ্ছেন যেমনি সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষ তেমনি শিকার হচ্ছেন শিক্ষক। এটা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, শিক্ষক সম্পর্কে প্রাচীন মূল্যবোধের এখন খুব কমই অবশিষ্ট আছে। পরিবর্তন হয়েছে শিক্ষকদের মধ্যেও সনাতন ধারায় তারা নিজেরাও এখন আর বিশ্বাসী নন।
শিক্ষক সম্পর্কিত দু’ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি প্রতিনিয়ত আমরা সকলেই। এর মধ্যে একটি হচ্ছে শিক্ষককে নিয়ে সমস্যা এবং অপরটি হচ্ছে শিক্ষকতার পেশা গ্রহণ করে শিক্ষকদের সমস্যা। অবশ্য সন্দেহ নেই যে, সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টতঃই একটা জিনিস পরিস্কার হয়ে উঠবে যে, এই দু’টি সমস্যাই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং মূলগতভাবে এ সমস্যা সামাজিক মূল্যবোধ তথা সামাজিক কাঠামোর অগ্রসর প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন সীমাহীন। ছাত্র, অভিভাবকসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষই বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিক থেকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ খাড়া করছেন। এ জাতীয় অভিযোগের মধ্যে আছে :
(ক) শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে এখন আর আন্তরিক নন।
(খ) অধিকাংশ শিক্ষকই শিক্ষক হিসেবে অযোগ্য।
(গ) অসামাজিক এবং অবৈধ বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে লিপ্ত হয়ে শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের মানসিকতাকে কলুষিত করছেন।
(ঘ) শিক্ষকদের দুর্বলতা, তাদের অক্ষমতা এবং ব্যর্থতা এবং আন্তরিকতাহীনতা শিক্ষার্থীদের সম্ভাব্য কাঠামোয় গড়ে তুলতে পারছেন না।
(ঙ) শিক্ষকরা অনেকেই শিক্ষকতাকে স্রেফ একটা পেশা হিসেবেই নিয়েছেন, এর প্রতি তাদের বিশেষ কোন আকর্ষণ নেই।
(চ) গ্রামের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক নামীয় ব্যক্তিরা স্বেচ্ছাচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
(ছ) শিক্ষকরা নিজেদের স্বার্থে দলাদলি করে শিক্ষার্থীদেরকে তার অংশীদার করে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীর সর্বনাশ করছেন।
(জ) শিক্ষার বর্তমান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ চরিত্রের জন্য শিক্ষকরা অনেকাংশে দায়ী।
(ঝ) শিক্ষকরা নোট বই-এর দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র।
(ঞ) ইত্যাদি।
এসব অভিযোগ সামগ্রিকভাবে শিক্ষকসমাজের জন্যে সত্য তা নয়, কিংবা এসব অভিযোগ পুরোপুরি সত্য তাও হয়তো নয় কিন্তু এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়।
প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। তিনি নিজে বহুদিন ধরে শিক্ষকতা করছেন, বিদেশেও বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। প্রবীণ এবং শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষক প্রসঙ্গক্রমে বলছিলেন, শিক্ষকতা কখনোই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না, হওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমি দেখছি, এখন শিক্ষকরা নিজেদেরকে ভিন্ন একটা গোষ্ঠীভুক্ত মনে করে বিশেষ কিছু সুবিধা চাইছেন। অন্ততঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এতটুকু আমি জোর গলাতেই বলতে পারি যে, দশ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক বেশী সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন কিন্তু তবুও বার্গেইনিং প্রথাটা এখন তাদের মধ্যে আরও বেশী করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমরা শুধু চাচ্ছি, কি দিতে পারছি-কিসের বিনিময়ে চাচ্ছি সে কথাটা চিন্তা করছি না। প্রডাকটিভিটি বিচার না করে শুধু মাত্র একতরফাভাবে চেয়ে এবং নিয়ে আমরা অর্থাৎ শিক্ষকরা প্রকারান্তরে সমাজকেই ঠকাচ্ছি। শ্রমিক-চাকুরিজীবী-শিক্ষক সকলেরই এখন একই মনোবৃত্তি। বললে বিশ্বাস করবে না, এখন আর এ পেশায় থাকতে বাল লাগে না। কি দিতে পারছি? বার বার মনে হয় ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আমরা ছলনাই করে যাচ্ছি। শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে শিক্ষার্থীদের জড়ানো, শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতার লড়াই, ঘৃণ্য সব কাজকর্ম শিক্ষাঙ্গনকে কে কিভাবে কলুষিত করে যাচ্ছে তা বলার মতো নয়। বিদেশে দেখেছি সেখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের সামাজিক লক্ষ্যের সাথে সম্পৃক্ত। সমাজতান্ত্রিক দেশে স্ট্যাটাস দিয়ে বিচার হয় না, হয় কনট্রিবিউশন দিয়ে। তারা কি দিতে পারছে সেটাই সব চাইতে বড়। আমাদের দেশে সামাজিক অগ্রসরতা মানসিক উন্নয়ন এবং জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষার কোন সম্পর্ক নেই। ৭০০ পৃষ্ঠার একটা শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বেরুলো। ঐ পর্যন্তই। তার কোন বাস্তবায়ন নেই। এর প্রতিক্রিয়া শিক্ষকদের উপর পড়ছে। অন্য আর সবার মতো আমরাও স্ট্যাটাসের পেছনে ঘুরছি সে জন্যেই, ব্যক্তিস্বার্থে জলাঞ্জলি দিচ্ছি শিক্ষার স্বার্থ, সমাজের স্বার্থ। ঘৃণ্য কোন্দলের সৃষ্টি হচ্ছে এতে করে। শিকার হচ্ছি আমরা নিজেরাই, শিকার হচ্ছে আমাদের ছেলে মেয়েরাই।….. সিনিয়র শিক্ষক নেই, বিদেশে গিয়ে আছেন অনেকেই। শিক্ষার মান, উপযোগিতা কমে যাচ্ছে।……কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের ঠকানো অত সহজ নয়।’’ শিক্ষার বর্তমান চরিত্র মোটেই আশাপ্রদ কিংবা কার্যকর নয় এটা অত্যন্ত সত্যি এবং এটা কর্তৃপক্ষীয় মহল থেকেও, বক্তৃতার প্রয়োজন হলেও অনেকবারই বলা হয়ে থাকে। বাস্তবতা আমরা দেখছি স্কুলগুলোর দুরবস্থা। গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক স্কুলের প্রহসন, শিক্ষকরা সেখানে অনেকটা ‘পার্টটাইম’ চাকুরি করেন। স্কুলের কোন নিয়মকানুনের বালাই নেই। পঞ্চম শ্রেণী উত্তীর্ণ হবার পরেও সেখানকার ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজির অক্ষর চিনতে পারে না। প্রবেশিকা উত্তীর্ণ হয়ে একটা কিছু সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা নেই। দেখছি অশিক্ষার চূড়ান্ত আক্রমণে ফেলে পরীক্ষায় সমানে ফেল করিয়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধির চেষ্টা দেখছি কলেজগুলোতে বিদ্যার বহর, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার চরিত্র কোন্দল, বিশ্ববিদ্যালয় বেরুনোর পর শিক্ষার্থীর ‘উন্নতি’।
কিন্তু যে কোন কিছুর মূল্যায়ন ভুল হয় সেখানেই যেখানে তার মূল্যকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যা সামনে থাকে তাই সব নয়- তার পেছনেও আরও অনেক কিছুই থাকতে পারে। সেগুলোই সব কিছুর মূল। সেদিকেও আমাদের দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে আমার বিশ্বাস কারও খুব বেশী মতভেদ নেই। সেখানে কোন্দল ইত্যাদিই শিক্ষার অধিকাংশ স্থান জুড়ে থাকে। এর মধ্যে শিক্ষকরাও নানাভাবে জড়িত থাকেন। কিন্তু এর পেছনে মূল থাকে পরিচালনা কমিটি, থানা শিক্ষা অফিসার প্রমুখ আমলাচক্র। গোষ্ঠীগত স্বার্থে সেখানে শিক্ষার পরিবেশ কলুষিত হয়। যথার্থ শিক্ষকেরা সেখানে টিকতে পারেন না। গোষ্ঠীগত স্বার্থেই সেখানে স্থান পায় শিক্ষক নামীয় অযোগ্য কুটিল ব্যক্তি। বেসরকারি কলেজগুলোতেও একই ঘটনা ঘটে। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও একই কান্ড কোন কোন ক্ষেত্রে ঘটে তবে তা ভিন্ন চরিত্রে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়ে সমস্যা এবং তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের কারণ এবং চরিত্র ভিন্ন। প্রসঙ্গত বলতে হয় জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্থানীয় অস্থানীয় কোন্দলের শিকার। সে জন্যে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষার চাইতে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার প্রশ্নে কোন্দল এখানে এখন সংকট সৃষ্টি করছে এবং তা বাড়ছে। এছাড়া সিনিয়র শিক্ষকরে অভাব, শিক্ষাঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায়ের তাড়নায় দুর্নীতি, কারচুপি ইত্যাদির ঘটনাও এখন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেই সত্য।
প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ঘটনা খুব দুর্লভ নয়। অযোগ্যতা শুধু তার ক্ষমতার দিক থেকে নয়, আন্তরিকতার দিক থেকেও বিবেচ্য। শিক্ষকদের পেশা অনেক সময় অনেক ব্যক্তি কোন পেশা না পেয়ে গ্রহণ করেন, তাদের এই এডহক পেশা গ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষাঙ্গনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায়, কিছু সংখ্যক শিক্ষক নিজেদের ব্যক্তি সুবিধা আদায় ও বিশেষ প্রভাব বজায় রাখবার কিছু কিছু ছাত্রছাত্রীদেরও বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার দুরবস্থার জন্যে শিক্ষকদের সম্পূর্ণ দায়ী করা যায় না। কিন্তু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক দুরবস্থার জন্যে শিক্ষকরা অনেকাংশে দায়ী, এর কারণ হতে পারে রাজনৈতিক, প্রথাগত; হতে পারে তাদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক দুর্বলতার ফলাফল।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনা, অনিয়ম, অশিক্ষা ইত্যাদির জন্যে অনেক দিক দিয়ে শিক্ষকরা দায়ী থাকেন। এসব শিক্ষাপ্রাতিষ্ঠানে বিভিন্ন পরিকল্পনা উদ্যোগ ইত্যাদির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শিক্ষকরা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এবং এখানেই বিভিন্ন শিক্ষক তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। শুধুমাত্র নিজস্ব বস্তুগত স্বার্থে তারা দলাদলি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত করে থাকেন (দৃষ্টান্ত খুব দুর্লভ নয়)। শিক্ষকদের এর জাতীয় কর্মকান্ডের প্রত্যক্ষ শিকারে পরিণত হয় শিক্ষার্থীরা তথা দেশের শিক্ষা। শিক্ষকদের মধ্যে অশিক্ষকসুলভ তৎপরতা ক্রমবর্ধমানহারে যে কোন সচেতন ব্যক্তির ক্ষুব্ধ এবং আতঙ্কিত হবার কথা। কেননা সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষেরা স্বভাবতঃই শিক্ষকদের ওপর অনেক দিক থেকেই নির্ভর করেন। একজন বিদেশগামী শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল, এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমাদের পূর্বসূরীরা আমাদের যে পথ দেখিয়ে গেছেন আমরা সে পথেই যাচ্ছি। বিদেশে যাচ্ছি উচ্চ শিক্ষার নামে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার স্বরূপ হচ্ছে বড় একটা মার্কেটিং নামের ওজন বাড়ান, বেতন বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করা। আপনারা জানেন না হয়তো কিন্তু আমি নিজে দেখেছি যে কোন বিদেশ ফেরত উচ্চ ডিগ্রীধারী ব্যক্তির প্রথম বৈঠকে আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে তিনি বিদেশ থেকে কি কি আনতে পারলেন তাই।
জনগণের অর্থে প্রতিবছর আমাদের দশ থেকে বহু ব্যক্তি বা শিক্ষক উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের সে শিক্ষার ফলাফল সে জনগণ তো দূরের কথা মুষ্ঠিমেয় শিক্ষার্থী সমাজও পায় না। এ জন্যেই একজন শিক্ষকের কণ্ঠেই ক্ষুব্ধ মন্তব্য শুনেছিলাম…. ‘গবেষণার জন্যে বিদেশে পাঠানোর পক্ষে কোন যুক্তি নেই।’ বিদেশে যারা যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই বিদেশেই রয়ে যাচ্ছেন দেশে ফিরলেও আর শিক্ষকতায় আসছেন না। ফলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত: দেশের উচ্চতম শিক্ষাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদিকে শিক্ষক স্বল্পতার ধুঁকছে অন্যদিকে নিচুমানের শিক্ষকদের স্বার্থের তাড়নায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সাথে প্রকৃত শিক্ষকেরাও।
শিক্ষকদের মধ্যেকার এই অনেক এবং পঙ্গু চারিত্রিক প্রবণতার পেছনে যেসব কারণ কাজ করছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি সেগুলো হচ্ছে-
১। সামাজিক অর্থনেতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবর্তনে শিক্ষকদের মধ্যে বিভিন্ন উত্থান পতন সৃষ্ট। মূল্যবোধের পরিবর্তনে নিজেদের যথাযথ দায়িত্ব এবং কর্তব্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট সচেতনতা সৃষ্টিতে তাদের ব্যর্থতা।
২। তাদের পটভূমি, শিক্ষাব্যবস্থার শিকার তারা নিজেরাই হয়ে এসেছেন, অগ্রসর শিক্ষক সুলভ উচ্চচেতনা তাদের মধ্যে থাকা অস্বাভাবিক। সীমাবদ্ধতাই অধিকতর স্বাভাবিক।
৩। শুভ-অশুভ স্বার্থে জাতীয় রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে অশুভের আধিপত্যের সমান্তরাল ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ঘটছে। সেখানে শিক্ষকদের মধ্যে অশিক্ষকরাই নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃত শিক্ষকরা এর ফলে প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় আছেন।
৪। শিক্ষাব্যবস্থার আক্রমণের ফলশ্রুতিতে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে। যে বিষয়ে তারা পড়াচ্ছেন সে বিষয়কে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আপোস করাতে গিয়ে নিজেরা নিজেদের প্রতিভা এবং ক্ষমতা থেকে বিচ্যুত হয়েছেন।
৫। শিক্ষাঙ্গনে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ, শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষীয় ঔদাসীন্য। প্রকৃত শিক্ষকদের সাথে কর্তৃপক্ষের বিচ্ছিন্নতা।
৬। ছাত্রশিক্ষক সম্পর্কে অবনতি এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা।
৭। অর্থনৈতিক বৈষম্য। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অর্থনৈতিক অবরোধ।
৮। বর্তমান ব্যবস্থার শিক্ষার ফলাফলের উপর শিক্ষকদের স্বাভাবিক আস্থানীনতা।
৯। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার লক্ষ্য সম্পর্কে অস্পষ্টতা।
১০। শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার অন্যান্য পেশায় অধিকতর সুযোগ-সুবিধা।
১১। জাতীয় প্রয়োজন থেকে শিক্ষার বিচ্ছিন্নতা।
১২। শিক্ষকতা পেশাকে বাধ্য হয়ে গ্রহণ করা এবং
১৩। শিক্ষা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষীয় ভ্রান্ত নীতি এবং অদূরদর্শী অপরিকল্পিত পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয় অগ্রসরতার পথে একটা বিরাট প্রতিবন্ধক, বাংলাদেশের শিক্ষার মান উঁচু নয়, শিক্ষার পরিবেশ যথাযথ নেই, শিক্ষা সম্পর্কে চক্রান্ত এবং কারচুপির শেষ নেই, শিক্ষাঙ্গনে এবং শিক্ষা সংক্রান্ত দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন অশিক্ষক ব্যক্তিদের আমলাতান্ত্রিক এবং শিক্ষা বিরোধী চরিত্র শিক্ষার অবশেষটুকুকেই ক্ষতবিক্ষত করছে ইত্যাদি অত্যন্ত স্পষ্ট সত্যের পাশাপাশি আরেকটি সত্য হচ্ছে: আমাদের শিক্ষকরা সামাজিক অর্থনৈতিক দিক থেকে একটা অশুভ এবং করুণ অবস্থার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
বেসরকারি যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশে রয়েছে তার সবগুলোতেই শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস তাদের বেতন দেয়া হচ্ছে না। সংবাদপত্রের পাতায় এসবের খবর প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। এমনই একটা খবরে জানা গেছে গ্রামাঞ্চলের একটি হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক আঠারো মাস বেতন না পেয়ে চিংড়ি মাছের ব্যবসা শুরু করেছেন। শিক্ষকদের এ মর্মান্তিক অবস্থা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের অশুভ প্রবণতায় খোরাকও হচ্ছেন শিক্ষকরাই। যেসব ব্যক্তিদের অবৈধ স্বার্থ উদ্ধারে অপারগ কিংবা অনিচ্ছুক শিক্ষকদের নানা দিক থেকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষাসংক্রান্ত আমলা চক্রের আক্রমণ তো রয়েছেই। সরকারি এবং বেসরকারি শিক্ষকদের এই বৈষম্য শিক্ষার পরিবেশকে যথার্থ কারণেই আহত করেছে।
সরকারি অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশের অভাবে ক্ষুব্ধ। গ্রন্থাগার, গবেষণা ইত্যাদি ক্ষেত্রে খুব কম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই নাম উল্লেখ করবার মতো। তাছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ, যোগাযোগ কারচুপি ইত্যাদিও শিক্ষকদের নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন করছে। এসব কারণে শিক্ষকরা একটা অদৃশ্য এবং দৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যতটুকু কাজ করতে পারতেন, সবটুকু আবেগ এবং আশা কিংবা আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা নিয়ে শিক্ষকতার মহান পেশায় এসেছিলেন ততটুকুও কার্যকর করতে পারেন না। তাদের ব্যর্থতায় তারা নিজেরই (অন্তত যারা প্রকৃত শিক্ষক) আত্মগ্লানি আর হতাশায় ভুগে থাকেন)
শিক্ষক এবং শিক্ষকতা এই উভয় সমস্যাই স্পষ্টত বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সরকারি নীতি, পরিকল্পনা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সরকারি-বেসকারি বৈষম্য সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক টানাপোড়নে সৃষ্ট অনগ্রসর মূল্যবোধ, ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে ব্যক্তির লাভলি≈vর বিস্তার, আমলাতান্ত্রিক ক্রিয়াকান্ড ইত্যাদি শিক্ষককে আমাদের সামনে সমস্যা হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে।
এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে শিক্ষককে, শিক্ষার্থীকে। পরিত্রাণ দিতে হবে শিক্ষাকে। কেননা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। ফলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাতীয় অস্তিত্ব। লাভবান হচ্ছে সমাজের সেইসব ব্যক্তি যারা প্রতিক্রিয়াশীলদের সারিতে, যারা শোষকদের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ প্রতিনিধি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী তথা শিক্ষাকে কলুষিত করে যারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তারা। [সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হলো অসচেতনভাবে অনেক শিক্ষক শিক্ষার্থীও তাদের কাজে ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছেন নির্বিকারভাবে]।
এসব প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ধার পেতে হলে, শিক্ষা তথা জাতীয় অগ্রসরতায় গতি সৃষ্টি করতে হবে এবং ঠিক এ মুহূর্তের কর্তব্য হচ্ছে, সকল শিক্ষাঙ্গনে আন্তরিক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে গভীর বোঝাবুঝির সৃষ্টি করা এবং শিক্ষাঙ্গনে তথা শিক্ষা প্রসঙ্গে শিক্ষাবিরোধী সমস্ত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষাবিরোধী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা। জাতীয় চেতনার আছন্নতা কাটাতে শিক্ষার সুদৃঢ় ভিত্তি সৃষ্টি করতে হবে, এ সম্পর্কে আর দ্বিধা দ্বনেদ্বর কোন অবকাশ নেই।

আখতার হামিদ খান
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সাভার, ঢাকা।