ফ্রান্সিস বেকন

১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফটোগ্রাফার ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তি the Art Newspaper নামের পত্রিকার জন্যে ফ্রান্সিস বেকনের ইন্টারভিউ নেন। ওই ইন্টারভিউ ইপ্রকাশের পাঠকদের জন্যে ইপ্রকাশ অনুবাদ ফ্যাক্টরীর করা ভাবানুবাদ প্রকাশিত হল।

ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তিঃ আপনার পেইন্টিংয়ে ঘুরেফিরে সহিংসতা বিষয় হিসেবে এসে পড়ে…

ফ্রান্সিস বেকনঃ এইটা তো খালি আমার পেইন্টিংয়ে না, বরং আমাদের জীবনটাই ভায়োলেন্সে ভরা। আমাকে অনেক শারীরিক আক্রমন সইতে হয়েছিল। এমনকি আমাকে মেরে আমার দাঁত ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। যৌনতায় বলেন, মানবিক বোধে বলেন, দৈনন্দিন জীবনে বলেন-কোথায় নাই ভায়োলেন্স! আপনি খালি টেলিভিশন দেখলেই টের পাবেন এসব, ভায়োলেন্স মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিরাজ করে। এমনকি আপনি খুব সুন্দর একটা প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রতি তাকান, দেখবেন একটা পোকা আরেকটা পোকাকে মেরে খাচ্ছে, এভাবে ভায়োলেন্স জীবনেরই একটা অংশ।

ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তিঃ আপনার কাজে মাংসপিন্ডদিয়ে কি বুঝাতে চান আপনি?

ফ্রান্সিস বেকনঃ কাঁচা মাংস বলেন আর রান্ধা মাংস বলেন, এগুলা ঘুরেফিরে আমাদের জীবনে আছে। আমি কাঁচা মাংস কিংবা মানুষের শরীরের ক্ষতবিক্ষত লাশ আঁকি কারণ এগুলোর মধ্যে আমি সৌন্দর্য্য খুঁজে পাই। আমি ছাড়া আর কেউ এটাতে এত মজা পেয়েছে বলে আমার মনে হয়না। কসাইখানায় শুকরের রান, মাদী শুকরের মাংস, ছেঁড়া জিব্বা, গরুর সিনার মাংস; থরে থরে এসব সাজানো থাকে দোকানে, আমার তো দারুন লাগে। ঝুলিয়ে রাখা এসব মাংস মানুষ খাওয়ার জন্যে কিনে নিয়ে যায় বাসায়, কি অবিশ্বাস্য সুররিয়ালিস্টিক!

ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তিঃ আর আর্তনাদ?

ফ্রান্সিস বেকনঃ শিশু কান্না করেই ভূমিষ্ঠ হয়; মানুষের জীবনের শুরুই হয় কান্না দিয়ে, আর আমার মনে হয় যেন কেবল প্রেম মরা এবং বাঁচার এই সময়টুকুর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। এটাই ছিল মূলত আমার প্রকৃত উপোলব্ধি। যে মানুষগুলো আমার শিল্পকর্মে পাওয়া যায় সবাই ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার ছিল। এবং তাদের যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিতকার আর্তনাদ উঠে আসে আমার কাজে। খালি শীশুরা কেন, প্রকৃতিতে দেখেন, পশুরাও কখনো ভয়ে কখনো ব্যাথায় আর্তনাদ করে। কিন্তু পুরুষের কথা ভিন্ন, আমরা দেখি এসবে এরা খুব সতর্ক আর সহজে নিয়ন্ত্রনও হারায় না। একদম সহ্যতীত না হলে এরা হাউমাউ করে তো দূরে থাক ফুঁপিয়েও কান্না করেনা। একটা মানুষ মায়ের পেট থেকে বের হওয়ার সময় কান্না করতে করতে পৃথিবীতে আসে, এবং জীবনের শেষে সে আবার কাঁদতে কাঁদতেই শ্বেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আমার মনে হয় যেন, কান্না-আর্তনাদ এসব মানবজাতির জন্য একটি মার্কা-মারা বিষয়।

ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তিঃ পৃথিবীকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ফ্রান্সিস বেকনঃ সভ্যতার একদম গোড়ায় গেলে দেখা যায়, মানুষে মানুষে কত যে হানাহানি, কত সহিংসতা। সভ্যতার এই যুগেও আপনি দেখবেন এসব। পৃথিবীকে একহাজার একবার ধ্বংস করতে চাইলেও মানুষ পারবে, ওই পরিমান বোমা সে বানিয়ে রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই এসব একজন শিল্পীর উপর প্রভাব ফেলে। শিল্পী নির্বিকার থাকতে পারেনা। আমি বিংশ শতাব্দির আর্টিস্ট; বৈপ্লবিক আইরিশ মুভমেন্ট দেখলাম, সিন ফেইন, তারপর ধরেন যুদ্ধ, হিরোশিমার ধ্বংস দেখলাম, দেখলাম ঘাতক হিটলারকে; এসব বাদে প্রতিদিনের ঘাত-অপঘাতের ঘষাঘষিতে তো একদম কাহিল। এত এত এত সহিংসতা, এরপর আপনি বলবেন এক ঝুড়ি গোলাপ আঁকতে, তা তো হতে পারেনা! শুধু একটা জিনিসই আমাকে সৃষ্টির প্রেরণা দেয়, তা হল মানুষ, এদের বিভ্রান্তি, এদের চালচলন, এদের সাফারিং; এটা বিশ্বাস হয় না যে একদম এলোমেলো ভাবে পৃথিবী ক্রমাগত গোল্লায় যাচ্ছে এবং এভাবই আমি আপনি একদিন নিঃশেষ হয়ে যাব।

ফ্রান্সিস জিয়াকোবেত্তিঃ আপনার কাজে ফটোগ্রাফির ব্যবহার দেখা যায় প্রচুর, কেন?

ফ্রান্সিস বেকনঃ ফটোগ্রাফির প্রতি আমার আগ্রহ সবসময় ছিল। পেইন্টিংয়ের চেয়েও ফটো আমার নজর কাড়ে বেশি। কারণ এটি চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার চেয়েও বেশি। যখন কোন প্রত্যক্ষদর্শী কোন অপরাধ-ঘটনার চাক্ষুস বর্ননা দেয়, তখন সে ওই ঘটনার পুংখানুপুংখ বলতে পারেনা। পুলিশি জেরাতেও দেখা যায় যে, এক এক জন সাক্ষী আলাদা আলাদা ভাবে একই ঘটনার বর্ণনা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দেয়। অথচ ঐ অপরাধদৃশ্যের একটি ফটো যদি আপনাকে দেখানো হয় তাহলে আপনি ঘটনা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাবেন। ধ্যানচিন্তা আমায় সত্যকে কাল্পনিকরূপে নিয়ে যায় এবং সত্যবর্ণনাকারী কোন ইমেজ আমাকে সত্যের উর্ধ্বে উঠে আরো আরো বিষয় সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। বিভিন্ন ইমেজ দেখে দেখে যে আইডিয়াগুলো আমি পাই, তা একসাথে সন্নিবেশ করেই আমার শিল্পকর্মগুলো হয়ে উঠে। আমি এক ইমেজের সাথে আরেক ইমেজ তুলনা করে নিজের শিল্পকর্মের জন্যে আইডিয়া বের করে আনি। আমার ইমেজ ভালো লাগে, যদিও উদ্দেশ্য হল দৃশ্য থেকে সার ভাবনা বের করা। এজন্য আমাকে ফর্ম এবং স্পেসের কল্পরূপও দেখতে হয়। এটাই আমার চালিকা শক্তি হিসেবে ছিল, তাই বলে আমি এডওয়ার্ড মুইব্রিজের ফটোগ্রাফিগুলো একদম হুবহু ব্যবহার করিনাই তো! শুধু আমার পেইন্টিং যেমন L’Enfant Paralytique অথবা Les Lutteurs এ সন্নিবেশ করেছি। এটা অনেকটা রান্নার মতন, (আমি একটা রেস্টুরেন্টের বাবুর্চিও ছিলাম!)। তরকারিতে জাস্ট বেশ কয়েকপদের সবজি আর মশলা ব্যবহার করবেন, আলাদা আলাদা প্রত্যেকটা সবজি আর মশলার স্বাদ তো আপনার আগে থেকেই জানা আছে। কিন্তু যখন মাংসের সাথে আলু, পটল ইত্যাদি দিবেন, বিভিন্ন মশলার গুঁড়া একসাথে মিশে সম্পূর্ন আলাদা স্বাদের এক মাংসের তরকারি বানাবে। প্রত্যেকটা শিল্প ঘুরেফিরে কোন না কোন ইমেজ থেকেই আসে, শুধুমাত্র মিউজিকের ক্ষেত্রে এটা আমার মনে হয় না। আমার পেইন্টিংয়ের প্রায় সব সাবজেক্ট ঘুরেফিরে আপনি রান্নাঘরের মধ্যে পাবেন, কিন্তু কিচেনে কাজ করার সময় তো ওসব আমি দেখিনা। কেবল যখন স্টুডিওতে কাজ করি তখন কল্পনায় ওই সাবজেক্টগুলো অন্য ইমেজকে বুঝতে সাহায্য করে। এগুলোকে আমি আমার কল্পনা করার অস্ত্র হিসেবে নাম দিতে পারি। এসব জিনিসকে আমার অন্য ফর্মে নিতে হয়, যে ফর্মটাকে আমি শিল্পকর্মে দেখাই, এটা আবার আমাকে অন্য ফর্ম বা সাবজেক্টে নিয়ে যায়। এভাবে ডিটেইলস, ইমেজ এসব আমার রক্তে দৌলা দেয়, আর আমি মূল বিষয়টাকে ভেঙ্গে আরেকটি শিল্পরূপ বিনির্মাণ করি। কোন বই বা সিনেমা দেখলেও আমার এমনটা হয়, সব শিল্পীরই এমনটা হওয়ার কথা আসলে। পিকাসো ছিল জোঁকের মতন, আশেপাশের সব ইমেজ থেকে আইডিয়াকে রক্তের মতন চুষে নিতেন তিনি। আর আমি যেন একটা সামুদ্রিক পাখি, সারাদিন আশেপাশের সব ইমেজকে সমুদ্রের মাছের মতন শিকার করে পেট ভরাই আর দিন শেষে ক্যানভাসে এসে উদগীরন করি।

আমার ভিজুয়াল তথ্যের প্রধান উৎস হল মুইব্রিজ। তিনি উনিশ শতকের শেষদিকের একজন ফটোগ্রাফার যিনি মানুষ ও প্রানীর মুভমেন্ট নিয়ে কাজ করেছিলেন। এটা অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত কাজ। তিনি মূলত ভিজুয়াল মুভমেন্টের উপর ডিকশনারি তৈরি করেন। এটা একটা এনিম্যাটেড ডিকশনারি। এটি প্রানী ও মানুষের মুভমেন্টের বৈচিত্র্যতার উপর একদম পূর্নাঙ্গ, রেকর্ডকৃত, বাহুল্যদোষহীন, চাতুরতা-বিবর্জিত ডিকশনারি। এটা একটা সাজানো-গুছানো এনসাইক্লোপিডিয়া বলা যায়। আমার তো কোন মডেল ছিল না, উনার এই এনসাইক্লোপিডিয়াই ছিল আমার উৎসাহের উৎস। এই ছবিগুলো আমাকে অতটাই ভাবিয়েছে যতটা এটি বানানোর জন্যে আইডিয়ায় ছিল। আমি অসংখ্য ছবি দেখেছি, প্রত্যেকটা ছবি একটা আরেকটার চেয়ে পুরোপুরি আলাদা মনে হয়েছে। এবং এসব ছবির ডেটেইলসকে আমি ক্ষুধার্ত মানুষের মতন গোগ্রাসে নিয়েছিলাম। যখন আমি আঁকতে যাই, তখন আমি যে ইমেজটা কল্পনা করছি ওইটা আঁকার ইচ্ছে হয়। কিন্তু আঁকতে গেলে ওইটা নিজে নিজেই আরেকরকম হয়ে পড়ে। একবার আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধুকে পুরুষে পুরুষে মারামারির দৃশ্য তুলতে বলেছিলাম কাজ করার জন্য, কিন্তু ওটা আসলে পরে ওই ভাবে আর করা হয় নাই। সবাই ভাবে আমি ফটোকে হুবহু কপি করে আঁকায় ব্যবহার করেছি, আসলে তা ডাহা মিথ্যা। আমি যেটা আঁকি তা পুরোপুরি স্বতন্ত্রভাবে নিজের কাজ। তাছাড়া আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, প্রাকৃতিক মুভমেন্টের পুরোপুরি বিপরীতটাই এসেছে আমার শিল্পকর্মে। আমি মুইব্রিজের একটা ইমেজে পুরুষে পুরুষে মারামারির দৃশ্যকে হানাহানির পরিবর্তে ভাতৃত্বের বন্ধন হিসেবেই এঁকেছিলাম। এবং পর্নোগ্রাফিক ইমেজগুলোকেও আমি ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার করেছি। এটা আমাকে খুব আনন্দ দিত। তখন তো এখনকার মতন পর্ন-ওয়েবসাইট, পর্নম্যাগাজিন কিংবা নীল ছবি ছিল না। কিন্তু পর্নোগ্রাফি আমার খুব ভালো লাগত। একজন শিল্পী ক্যানভাসের সামনে একদম একা, কেবল কল্পনাশক্তি তাঁর একমাত্র সঙ্গি। আর এটা করতে গিয়ে আপনি চোখের সামনে বাস্তবে যা দেখেন এবং আপনি যা কল্পনা করেন তার সাথে যৌনতাকেও মিশাতে হয়। যা যা সমাজে নিষিদ্ধ সব সীমা ছাড়ানো কেবল আপনি কল্পনায় পারবেন, এখানে সব সম্ভব। এবং পর্নোগ্রাফি আপনাকে এটা করতে আরো সহজ করে দিবে। আমি রবার্ট থর্পের বইতে দেখেছি। এটা দারুন কিন্তু গ্রাফিকে করা, একদম খোলামেলা। অতি বাস্তবিক ইমেজ আপনার সব উচ্ছ্বাসকে একদম মাটি করে দিবে। সৌন্দর্য যৌনতার পয়লা শত্রু!

সূত্র: ই-প্রকাশ

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এ ।