ভাবিয়া করিও কাজ- করিয়া ভাবিও না ,বহমান সময়,সময়

                                               ভাবিয়া করিও কাজকরিয়া ভাবিও না

কেয়ার হসপিটালে কাজ শেষ। যেতে হবে বান্‌জারা হিল্‌সএ। বিকেল বেলায় বৃক্ষ শোভিত, অনুচ্চ টিলায় ঘেরা বান্‌জারা হিল্‌সকে অদ্ভুদ সুন্দর দেখাচ্ছে। হাসপাতাল ভবনের নীচতলায় নিজ ডেস্কে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে পেশেন্ট কেয়ার নিয়ে কর্মব্যস্ত লেছমি। তার হাতে কেয়ার হাসপাতালের কাগজপত্র দিলাম। সেখানে আছে ডাক্তারদের ফাইন্ডিংস এবং ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট। লেছমি বলে, তোমরা লাউঞ্জে গিয়ে বস, আমি রিপোর্ট নিয়ে ডাঃ সোমার কাছে যাচ্ছি। আমি ঘড়ির দিকে তাকাই। তখন ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে, এতক্ষণ ডাক্তার হাসপাতালে থাকবে? তার ব্যক্তিগত কাজকর্ম নাই? তার স্বামী সন্তান, ঘর সংসার নাই? আমাদের দেশে ডাক্তাররা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে। শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়ায় কোচিং সেন্টারে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা রাজনীতি করে, ভারতীয়রা এসব না করে সকাল সন্ধ্যা অফিসে কাজ করে? একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সকাল সন্ধ্যা তার অফিসে পড়ে থাকে, এটা আমাকে বিস্মিত করেছে।

লেছমি বলে, আপনারা অবাক হচ্ছেন কেন? ইট ইজ নট এ মেটার অফ সারপ্রাইজ। এটা আমাদের কর্মস্থল, এটা আমাদের তীর্থভূমি। এখানে আমরা মানুষের কষ্ট লাঘব করি। রোগীর মুখে হাসি ফোটাই। অন্ধজনে আলো দিই। ঈশ্বর ভাল কাজের উত্তম বিনিময় দেন। তুমি যখন মানুষের কষ্ট লাঘব করো, ঈশ্বর তখন তোমার জন্য উত্তম বিনিময় নির্ধারণ করে। আমরা ঈশ্বরের নিকটবর্তী হতে চাই। সে এক অদ্ভুদ মরীচিকা। যদি তুমি তোমার ভাইয়ের কষ্ট লাঘব করতে না পারো, বোনের বেদনা দূর করতে না পারো, ঈশ্বর তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে। মানব সেবায় কোন খাদ্‌ রাখতে নেই।

আমাকে জানানো হল, হার্ট হসপিটালের রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে আমার অপারেশনের ব্যাপারে কাল সিদ্ধান্ত হবে। কাল জান্‌তে পারব আমার চোখে কর্নিয়া সংযোজন হবে কিনা। লেছমি বল্ল, তুমি তোমার হোটেলে ফিরে যাও। কাল সকালে আবার এসো। আমি লেছমির দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমাকে চলে যেতে বলছে। তার মানে, সে যাবেনা। সে পরে যাবে। তারা রাত সাতটা আটটার আগে ঘরে ফেরে না। পরের দিন সকাল ৭টা, সাড়ে ৭টায় অফিসে চলে আসে। কাজের এত উদ্দীপনা তারা পায় কোথায়? আমাদের দেশে আপনি এটা আশা করতে পারেন?

আমি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকি। আমার জন্ম ১৯৪৯ সালে। বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশের জন্ম আমি দেখেছি। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করেছি। দেশ স্বাধীন করার জন্য এদেশের মানুষ হাসতে হাসতে প্রাণ দিয়েছে। আজ এমন কি হল যে, সে দেশকে নিঃস্বার্থ সেবা দেয়ার মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না? সবাই আজ নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে?

আমি আমাদের দেশের একজন ডাক্তারকে বলেছি, ভারতের একটি হাসপাতালে যদি ডাক্তার নার্স সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে, আমাদের দেশের হাসপাতালে করেনা কেন? তিনি বল্লেন, আপনি যে হাসপাতালে গেছেন সেটি এনজিও পরিচালিত। ভারতের সরকারি হাসপাতালের অবস্থা অনেকটা আমাদেরই মতো। আমি বল্লাম, আমাদের বেসরকারি হাসপাতালেও অনেক সমস্যা আছে। চক্ষু হাসপাতালের একজন ডাক্তার আমাকে বলেছেন, দেখুন, ডাক্তার সোমা আমার জুনিয়র। উনারা যে পরিবেশে কাজ করছেন, তা উন্নত। আমি বল্লাম, ঠিক বলেছেন। আমি ম্যানেজমেন্টের ছাত্র। ম্যানেজমেন্ট পারিপার্শ্বিক পরিবেশের প্রভাবের বাইরে যেতে পারে না। ডাক্তার বল্লেন, এখানে আমি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন পাই। অনেক ডাক্তার পায় বিশ হাজার টাকা। সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত এখানে আমার কাজ। তারপর আমাকে যেতে হয় চেম্বারে। ওরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কর্মস্থলে থাকে। ওটা তাদের তীর্থক্ষেত্র। সে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেনা। তাকে প্র্যাকটিস করতে হয়না। সে হ্যান্ডসাম ননপ্র্যাকটিসিং ভাতা পায়। ডা. সোমা দুই লক্ষ রুপি বেতন পায়। রোগীর বিলের উপর সে কমিশন পায়। একটা মোটিভেশনাল আউটলুক সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্টের থাকা দরকার। আমাদের দেশে তার ঘাটতি আছে। পুলিশে, কাস্টমস হাউসে, আয়কর বিভাগে, জন প্রশাসনে, বেসরকারি বাণিজ্যিক অফিসে অনেক কর্মচারী তিন হাজার টাকা বা পাঁচ হাজার টাকা বেতন স্কেলে চাকরি করে বাড়ি গাড়ির মালিক হয়। এটা দেখে সীমিত বেতনের কর্মচারীরা উৎসাহ হারায়। সৎ কর্মচারীরা হতাশ হয়।

কাজ না করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের দরকার হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার। রাজনীতিবিদদের ভাবতে হবে কিভাবে আমরা কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে পারব। আমাদেরকে পেশাদারিত্বের উপর জোর দিতে হবে। পেশাদারিত্বের কথা মাথায় রেখে আমাদেরকে জাতীয় পর্যায়ে একটি মোটিভেশননীতি গ্রহণ করতে হবে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ হচ্ছে অদক্ষ পরিচালনার প্রজনন ক্ষেত্র। অপেশাদারিত্ব, অদক্ষতাপ্রশাসনিক স্থবিরতা ও গতিহীনতার মূল কারণ।

মানুষের শরীরে অঙ্গ সংযোজনসহজ কোন কাজ নয়। চক্ষু হাসপাতালের ডাক্তাররা আমাকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। অন্যের শরীরের অঙ্গআপনার শরীর গ্রহণ করতে পারে, নাও করতে পারে। অন্যের অঙ্গ আপনার শরীরে সংযোজন করলে, প্রথম যে প্রশ্ন আসবে, তা হচ্ছে, সেটি কি আপনার শরীরে ম্যাচ করবে? প্রত্যেক মানুষের দেহে নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা আছে। আল্লাহ অদ্ভুদ কারিগর। আমাদের শরীরে ইম্যুনাইজেশন ব্যবস্থা আল্লাহ পাক এমনভাবে তৈরি করে দিয়েছেন যে, বাহির থেকে অনুজীব বা ক্ষুদ্র পার্টিকেল শরীরের কোন ক্ষতি করতে পারে না। অনুজীবরা প্রতিক্ষণে আমাদের শরীরকে আক্রমণ করে। শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা কলা ও অনুজীবকে ঠেকিয়ে দেয়।

যখন আপনার দেহে অন্যের অঙ্গ সংযোজিত হয়, অন্যের শরীরের টিস্যুকে আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা বহিরাগত পার্টিকেল মনে করে। সে তখন সংযোজিত টিস্যুকে রিজেক্ট করে। তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে টিস্যু ম্যাচিংয়ের সমস্যা দেখা দেয়। তখন অপারেশন ব্যর্থ হওয়ার উপক্রম হয়। আমার চোখে ষোলটি টিস্যু স্থাপন করা হয়েছে। এজন্য অনেক কাটাছেঁড়া করতে হয়েছে। ক্ষতস্থান হিলিং হতে অন্তত ছয়মাস সময় নেবে। ষোলটি স্থানে সেলাই করা হয়েছে। সেসব সেলাই পর্যায়ক্রমে দেড় বছরের মধ্যে কাটা হবে। আমাকে আরো কয়েকবার হায়দ্রাবাদে যেতে হবে। এটি একটি কষ্টসাধ্য এবং ব্যয় বহুল চিকিৎসা। আমি একজন চাকরিজীবী মানুষ, পেনশনের টাকায় চলি। আমি জানি না শেষ পর্যন্ত আমার কি হবে।

ডা. অনিরুদ্ধ আমাকে বলেছেন, অপারেশনের পর খুব সতর্ক থাকতে হবে। এর উপর নির্ভর করবে অপারেশনের সাকসেস। আবেগপ্রবণ হবেন না, বেশি কাজ করবেন না। যদি ছয় মাস ভালমত কাটাতে পারেন, আপনি ভালো দেখতে পাবেন। কর্নিয়া যাতে রাফ না হয়, সে জন্যে অপারেশনের পর চোখে টিয়ার বা টিয়ার জেল দিতে হয়। দেয়া হয় স্টরয়েড জাতীয় ওষুধ। তার কাজ হলো চোখের ভেতরে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাকে স্থগিত রাখা। যাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা আউট সাইড টিস্যুকে আক্রমণ না করে। যেহেতু চোখে রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা কাজ করে না, তাই অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। ডাক্তারদের সামনে থাকে ঝুঁকি, পুলসেরাতের পুল পার হওয়ার মতো, এদিক ওদিক হলে আপনি পড়ে যাবেন অন্তহীন খাদে।

২০১২ সালের আগস্ট মাসে আমি হায়দ্রাবাদ থেকে দেশে আসি। ঘরে বসে সময় কাটছে না। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করি। দুনিয়ার রূপ নতুন করে দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবী সুন্দর সেটা নতুন করে উপলব্ধি করছি। একদিন আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন ভাইকে দেখতে যাই। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উনার সাথে আমার বন্ধুত্ব বেশি। ছাত্রজীবন থেকে সে বন্ধুত্ব। উনি আমাকে বল্লেন, উনি একটি বই মেলা করতে চান। লালদীঘির মাঠে সে বই মেলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন আমি, অরুণদা, নাসিরভাইসহ কয়েকজনকে। এটা যে একটি গুরু দায়িত্ব হবে তা বুঝতে পারিনি। ১৯ নভেম্বর থেকে কাজ শুরু করি। ধুলোয় ভর্তি লালদীঘির মাঠ। ছাত্রজীবনে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র বিন্দু এই মাঠ। ৭ ডিসেম্বর মেলার উদ্বোধন হয়। ২৩ ডিসেম্বর আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এত বড় দায়িত্ব নেয়ার জন্য আমার শরীর উপযোগী ছিল না। ভুলটা ছিল আমার। আমি ভুলে গিয়েছিলাম, বাল্যকালে মাস্টার সাহেব বলেছিলেন, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।

যত দ্রুত সম্ভব আমাকে হায়দ্রাবাদ যেতে হবে। যেতে টাকা লাগবে। সেখানে কিছুদিন থাকতে হবে। আমি একথাও ভুলে গিয়েছিলাম, সুসময়ে অনেকে বন্ধু বটে হয়, অসময়ে হায়, হায়, কেউ কারো নয়। আল্লাহ একমাত্র ভরসা তিনি মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন। মানুষ নিজে নিজের বিপদ ডেকে আনে। লেছমির সাথে প্রথম যখন দেখা হয়, তখন আমি বলেছিলাম, লেছমি জ্বী, আমি কি অপারেশনের ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারি? সে হাসতে হাসতে বলেছিল, লুজ ইয়োর সেলফ ইন্‌ মি, ইউ উইল গেট্‌ নিউ লাইফ-, তুমি তোমার নিজেকে আমার মধ্যে বিলীন করে দাও, তুমি নতুন জীবন পাবে। দেখনি? শস্য দানা মাটিতে বিলীন হয়? যখন সে মাটিতে একাকার হয় তখন নতুন করে সে অংকুরিত হয়। শুরু হয় বর্নিল উদ্‌গম। দেখনি এসব?

ঈশ্বর বলেছেন, তুমি নিজেকে আমার মধ্যে বিলিয়ে দাও। নিজের সত্তা নিয়ে অহংকার করো না। তোমার সত্তাকে অনন্তের মাঝে বিলীন করে দাও। তুমি নতুন জীবন পাবে। তুমি নিজেকে ঈশ্বরের সাথে তুলনা করো না, তিনি তোমাকে নতুন জীবন দিবেন। ঈশ্বর তোমাকে আলো দেখাবেন, আমরা তো ভাই নিমিত্ত মাত্র। হাসপাতালে দাঁড়িয়ে যখন আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, তখন মনে হচ্ছে দিগন্তের ওপারে এক অদ্ভুদ আলো, আমার পিতা আমাকে বলছেন, কোন ভয় নাই।

ফজলুল হক
লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন অধ্যক্ষ