ফ্রিল্যান্সিং ও ফ্রিল্যানসার,ফ্রিল্যান্সিং , ফ্রিল্যানসার

দেশের আর্থসামাজিক প্রোপটে আত্মনির্ভরশীলতার বিকল্প নেই। ঘরে বসে আয়ের পাশাপাশি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো পেশাগত দতা প্রদর্শন। বর্তমানে আয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেশে সমাদৃত হয়ে উঠেছে আউটসোর্সিং। শুধু পুরুষ নয়, নারীর কাছেও সমান জনপ্রিয় আউটসোর্সিং। এসব নিয়ে লিখেছেন নাজমুল হোসেন
পড়াশোনা, সংসার সব কিছু সামলে সফলভাবে আউটসোর্সিং করছেন দেশের নারীরা। বাংলাদেশে ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পড়ালেখা শেষ করে পূর্ণকালীন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে অনেকেই আত্মপ্রকাশ করছেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে পড়ালেখা শেষ করে একটা চাকরির জন্য বসে থাকতে হয় না।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে স্বল্পপুঁজিতে অনায়াসে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যায়। এ জন্য দরকার কয়েকটি কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ এবং আইটিতে দ জনবল, যা প্রতি বছরই বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হচ্ছে।
সফল ফ্রিল্যান্সার মারজান আহমেদ
ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আলাদা রকমের আগ্রহ রয়েছে দেশের খ্যাতিমান ফ্রিল্যান্সার মারজান আহমেদের। কাজের প্রয়োজনে বিভিন্ন সময়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন মারজান। বর্তমানে যশোর সরকারি এমএম কলেজে স্নাতকপর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। ২০১০ সাল থেকে পেশা হিসেবে জগৎটিকে বেছে নিয়েছেন। শুধু শখের বশেই ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলেন তিনি। শুরুর দুই-তিন মাসের মধ্যে ভালো সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে বেশ উৎসাহ নিয়ে পুরোদমে কাজে নেমে পড়েছিলেন মারজান। প্রবন্ধ লেখা ও ওয়েব ডিজাইনের কাজ দিয়ে শুরু করেন ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমানে অনলাইন মার্কেটিংয়ে নিজেকে দ করে ফ্রিল্যান্সার ডট কমে কাজ করছেন। বর্তমানে ওয়েব ডিজাইন, ছোট ছোট লোগো ডিজাইন তৈরির কাজ করছেন। মারজান ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় ওয়েব কনটেন্ট লেখায় বেশি পারদর্শী। এ ছাড়া ইন্টারনেট বিপণনের ক্ষেত্রেও তার আগ্রহ রয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে সব সময় বায়ারের কাছ থেকে ভালো র‌্যাংকিং পাওয়ার চেষ্টা করেন। ডেডলাইন মেনে চলায় এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যায় পড়েননি। তিনি জানিয়েছেন, দেশের মেয়েদের স্বনির্ভরতার জন্য ফ্রিল্যান্সিং একটা উন্মুক্ত সেক্টর। নিজের মেধা, মনন আর সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে যে কেউ এ জগতে আসতে পারেন। তবে শুরুতেই নতুনদের উদ্দেশে একটা কথা বলব, তা হলো ফ্রিল্যান্স মার্কেট প্লেসে অনেক রকমের কাজ রয়েছে। নিজেকে ঠিক করতে হবে কোন ফিল্ডে কাজ করবেন। ভালো একটি বিষয় পছন্দ করে নিজেকে দ করতে পারলে এখানে কাজের কোনো অভাব হবে না। আর আপনার কাজের সোর্সের ব্যাপারেও অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। যেহেতু এটা ইন্টারন্যাশনালি, তাই ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে আয়ত্ত করা উচিত। প্রথম দিকে কাজ পেতে একটু দেরি হলে নতুনরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন এটা ঠিক নয়। মনে রাখা দরকার এ কাজে ধৈর্য আর দতাই আপনার মূল পুঁজি। এ দু’টিকেই সামনে নিয়ে চলতে হবে। অপো করুন দেখবেন ঠিক কাজ পেয়ে গেছেন।
বর্তমানে মারজানের নিজের ছোট একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেখানে কাজ করছেন ১০ থেকে ১৫ জন ফ্রিল্যান্সার। তিনি আশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তিতিতে বিশ্বের মধ্যে একটি ভালো অবস্থানে যাবে। তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে অনেক। এর পরও নতুনদের নিয়ে অগ্রসর হতে চান তিনি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথমে দেখতে চান। ভবিষ্যতে নতুনদের নিয়ে ভালো কিছু করার ইচ্ছাও রয়েছে।
নতুন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য টিপস
বহির্বিশ্বের কাজ কম্পিউটারের মনিটরে সাজিয়ে দিচ্ছে কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী ওয়েবসাইট, যাদের বলা হচ্ছে মার্কেটপ্লেস। এ মার্কেটপ্লেসই হতে পারে আয়ের নতুন ঠিকানা। মুক্ত পেশা হিসেবে এখানে যে-কেউ সফল হতে পারেন। তবে প্রথম কাজ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে বিড করে যেতে হয়। প্রথম দিকে যত কম মূল্যে বিড করা হবে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। সম্ভব হলে বিড করার আগেই যদি কাজটি সম্পন্ন করে বায়ারকে দেখানো যায়। কাজটি যদি তিনি পছন্দ করেন তাহলে নিশ্চিতভাবে প্রজেক্টটি পাওয়া সম্ভব। সাধারণত যেসব কাজ তুলনামূলক একটু কঠিন এবং যেসব কাজে কম বিড পড়ে, সে ধরনের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার আগে সব ধরনের কাজ একটু পর্যবেণ করে নিয়ে সে অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে ইংরেজিতে পারদর্শী হতেই হবে। অন্তত প্রজেক্টের চাহিদা বোঝা এবং সে অনুযায়ী বায়ারের সাথে সাবলীলভাবে যোগাযোগ করার মতা থাকা প্রয়োজন। একটি প্রজেক্ট সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। এতে বায়ারের চাহিদা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং কাজ করার সময় পরিশ্রম অনেক কমে যায়। ডেডলাইন সময় শেষ হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে কায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে। কায়েন্টের কাছে কাজ পাঠানোর আগে ভালো করে রিকোয়ারমেন্ট আরেকবার দেখে নিয়ে সম্পূর্ণ কাজ ভালো করে পরীা করতে হবে। সব সময় চেষ্টা থাকবে, যাতে কাজ শেষে সর্বোচ্চ রেটিং পাওয়া যায়। ভালো রেটিং পেলে পরবর্তী কাজগুলো খুব সহজেই পাওয়া যায়। ভালো রেটিং পাওয়ার উপায় হচ্ছে সঠিকভাবে কাজটি করা, সময়মতো কাজটি শেষ করা, কায়েন্টের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।
ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস সাইটে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যা ভালোভাবে না জানার কারণে অনেকে সফলভাবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারেন না। এ জন্য জানতে হবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুবিধা-অসুবিধাসহ রেটিং, ডেডলাইট, সম্মানী বা পারিশ্রমিকের বিষয়টি।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে চলছে প্রতারণা
বর্তমানে ইন্টারনেটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করে দেয়ার মাধ্যমে দেশের তরুণ-তরুণীরা অর্জন করছে বৈদেশিক মুদ্রা। কয়েক বছর ধরে আউটসোর্সিং কাজের সাথে দেশের তরুণ প্রজন্ম সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটে ভালো আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লেসের (কাজ পাওয়ার ওয়েবসাইট) পাশাপাশি চালু হয়েছে বেশ কিছু ওয়েবসাইট, যেগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের নামে চলছে প্রতারণা। এ ধরনের সাইটে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংয়ের কাজ শুরু করার আগেই নিবন্ধনের নামে নেয়া হয় বড় অঙ্কের টাকা। পরে বলা হচ্ছে, আগ্রহী পেশাজীবীরা (ফ্রিল্যান্সার) কমিশন প্রথার মাধ্যমে নতুন নতুন ক্রেতা তৈরি করে ফ্রিল্যান্সিং কাজ করতে পারবেন। এসব সাইট পরিচালনা করা হয় বাংলাদেশ থেকেও।
বিশ্বের সেরা মার্কেটপ্লেস
ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য এসব মার্কেটপ্লেস বা ওয়েবসাইটের সাহায্য নেয়া যায়।
www.odesk.com,
www.freelancer.com,
www.elance.com,
www.vworker.com,
www.scriptlance.com,
www.getacoder.com,
www.99designs.com,
www.peopleperhour.com।
এ ছাড়া বেশ কিছু সাইট রয়েছে, যেগুলোতে গ্রাফিক্স, অ্যানিমেশন, স্ক্রিপ্ট, অডিও ও ভিডিও মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সাইটগুলো হলো:
www.themeforest.net,
www.graphicriver.net,
www.codecanyon.net,
www.activeden.net,
www.3docean.net,
www.audiojungle.net,
www.videohive.net
শেষ কথা : বর্তমান আর্থসামাজিক প্রোপটে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তির উপায়। দেশের দ ও বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে জনশক্তিতে পরিণত করতে এটি হতে পারে একটি সহায়ক নিয়ামক। এ েেত্র সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই যথাযথ পদপে নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশেষজ্ঞের মতামত
মূলত প্রতিটি ফ্রিল্যান্সিং সাইটের রয়েছে ব্যবহারবান্ধব নীতিমালা, যা নিবন্ধন পূর্ণাঙ্গ করার আগে ব্যবহারকারী সহজে বুঝতে পারবেন। প্রতারণামূলক সাইটগুলোতে এসব নিয়মের কথা নিজেদের মনের মতো করে দেয়া হয়।

জাবেদ মোর্শেদ
দেশের ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জাবেদ মোর্শেদ জানিয়েছেন, কয়েকটি বিষয়ে লক্ষ রাখলেই প্রতারণামূলক সাইটগুলোকে চিনে নিতে পারা যায় সহজেই। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ফ্রিল্যান্সিং সাইটগুলোতে কখনোই টাকা দিয়ে কোনো প্যাকেজ কেনা বা এ ধরনের বিষয় থাকে না। এ ছাড়া শুরুতে এসব সাইটে নিবন্ধনের জন্য কোনো টাকাও পরিশোধের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো দতার প্রয়োজন নেই, আর অল্প পরিশ্রমের মাধ্যমে বেশি আয় করা যায় এ বিষয়টিই এসব সাইটে বেশি করে তুলে ধরা হয়। ফ্রিল্যান্সিং আউট সোর্সিংয়ের কাজ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়, নিজের কোনো দতার বিনিময়ে স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করে কাজ করা। আর নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট ফি লাগবে তাহলেই বুঝতে হবে, ওই সাইট কিংবা প্রতিষ্ঠান প্রতারণা করছে। এ ছাড়া থাকতে পারে একাধিক ব্যক্তিকে যুক্ত করার মাধ্যমে আয়ের বিষয়টি। আকর্ষণীয় নানা ধরনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনেক েেত্র এসব ওয়েবসাইটে বিশেষ বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়। এ তালিকায় রয়েছে পেইড টু কিক (পিটিসি) ধরনের কিছু ওয়েবসাইট।

এ কে এম ফাহিম মাশরুর
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের সহসভাপতি এ কে এম ফাহিম মাশরুর জানিয়েছেন, অনলাইনে ভালো ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে অনেকেই কাজ করছে। তাই কাজের দতা অর্জন করে সেই সাইটগুলোতেই কাজ করা ভালো। একটা বিষয় মনে রাখা উচিত আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে টাকা পাওয়া যায়, এখানে দেয়ার কোনো বিষয় নেই।

শাহ ইমরুল কায়েস
টেকনোবিডি ওয়েব সলিউশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফ্রিল্যান্সার শাহ ইমরুল কায়েস জানিয়েছেন, ফ্রিল্যান্সিং করতে হলে নিজেকে আগে নির্দিষ্ট কাজে দতা অর্জনের পাশাপাশি কোন সাইট ভালো সে বিষয়ে একটু পর্যালোচনা করতে হবে। তারপর মার্কেটপ্লেসে চেষ্টা করলে কাজ করা সম্ভব। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ভালো মার্কেটপ্লেস সাইট রয়েছে, যার বাইরে কাজ না করাই ভালো। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় এ খাতের কাজ করতে তাই আপনিও সতর্ক থাকুন। প্রতারণামূলক সাইটগুলোকে এড়িয়ে চলুন এবং নিজে কাজ শিখে তারপর ফ্রিল্যান্সিং করুন।

-nurpur-দৈনিক নবযুগ –