বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা , লোকায়ত জ্ঞান, শিক্ষাব্যবস্থা,জ্ঞান

আমার যেতে ইচ্ছে করে/ নদীটির ওই পারে/ যেথায় ধারে ধারে/ বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকো/ বাঁধা সারে সারে।/ মা, যদি হও রাজি,/ বড় হলে আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি।
আজকের আলাপ শুরু করছি ‘রাখঢাকহীন’ প্রশ্ন দিয়ে। আমরা কি পড়ালেখা করে খেয়াঘাটের মাঝি হতে চাই?
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি আমাদের খেয়াঘাটের মাঝি হওয়ার স্বপ্ন দেখায়? পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কি খেয়াঘাটের মাঝি হওয়াকে চলতি বিদ্যায়তনিক কাঠামোতে ‘শিক্ষিত’ মনে করে? বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর ভেতর পড়ালেখা করে একজন কেউ কি কোনোভাবেই ‘খেয়াঘাটের মাঝি’ হওয়ার কথা ভাবতে পারে? বিদ্যমান কাঠামো, কি খেয়াঘাটের মাঝি হওয়াকে উৎসাহিত করে? যদি তাই না করে তবে কেন আমরা আমাদের বিদ্যমান বিদ্যায়তনিক কাঠামোর যাত্রাপথেই এমন কোনো ‘মিথ্যা’ ও ‘আপাত ভুল’ স্বপ্নের টোকা দিয়ে আমাদের কাঠামোগত শিক্ষাজীবনের পরিসরকে বিরাজিত রেখেছি। এই বিরাজমানতা আমাদের বিদ্বান শিক্ষাব্যবস্থার অনিবার্য অধিপতি চরিত্রকেই প্রকাশিত করে তোলে। যেখানে কোনোভাবেই খেয়াঘাটের মাঝি বাস্তবিক অর্থে ‘শিক্ষিত’ হিসেবে বিবেচিত হন না বা খেয়াঘাটের মাঝির জ্ঞানজাগতিক দুনিয়া দিয়ে আমাদের বিদ্যায়তনিক পরিসরও বিরাজিত হওয়ার সাহস করে না। এই করা না বিদ্বান শিক্ষাকাঠামোর ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগকে আরো বেশি স্পষ্ট করে তোলে যেখানে জনগণের আপন জ্ঞান ও বিদ্যায়তনিক সীমানার প্রান্তিকীকরণ ঘটে চলে নিরন্তর। আজকের আলাপে আমরা বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোয় খেয়াঘাটের মাঝি হওয়া না হওয়া এবং কিভাবে খেয়াঘাটের মাঝি হওয়াকে বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোয় আড়াল করে ফেলা হয় সেই বিষয়ে কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের আলাপ তুলতে চাইছি। একভাবে সরাসরি বললে বলা যায়, আমরা বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় লোকায়ত জ্ঞান এবং লোকায়ত জীবনকে প্রান্তিকীকরণের ধরন নিয়ে কথা বলতে চাইছি। আলাপের পদ্ধতি হিসেবে আমরা সমীক্ষার ‘মাঠ’ হিসেবে বেছে নিয়েছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত তৃতীয় শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই : তৃতীয় ভাগ’ পুস্তকটিকে। আলাপের কেন্দ্রীয় ভিত হিসেবে রাষ্ট্রকর্তৃক গৃহীত দেশের প্রথম ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০’- কে পুরোটা সময় বিবেচনায় রাখছি। এই জনপদে বহুল প্রচলিত লোকায়ত বৈঠকী কিসসা বলার ধরনই হচ্ছে আজকের আলাপের বর্ণনার ভঙ্গি।
দেশের ৬৮০০০ গ্রামের ভেতর আমরা এখন হাটখোলা গ্রামে যাচ্ছি। আমরা বিবেচনায় রাখছি পাহাড় ও সমতলের গ্রাম এক নয়। চামকাদের আদাম, সাঁওতালদের আতো, মান্দিদের সঙ, খাসিয়াদের পুঞ্জি, লেঙামদের নং, বেদে বহর বা বাঙালিদের গ্রাম এক নয়। সকল গ্রাম জনপদের ভিন্নতা ও জনগণের দিনযাপনের বৈচিত্র্য মাথায় রেখেই আমরা আলাপে ঢুকেছি। বাংলাদেশের সকল প্রতিবেশ এবং যাপনের ভিন্নতা বিচারে কখনোই কোনো রাষ্ট্রীয় বিদ্যায়তনিক উদ্যোগ গড়ে ওঠেনি এই কথাটিও আমরা কোনো ধরনের রাখঢাক না করে সরাসরিই বলছি। সরকারি হিসেবে দেশে ২ লাখ ৮২ হাজার ৮০৬ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এই গ্রামেরই একটি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে মেঘনা। আমরা মেঘনার লিঙ্গ-বর্ণ-বর্গ-শ্রেণী-জাতিগত পরিচয় আড়াল করতে চাইছি না। কোচ-হাজং-ডালু-বিষ্ণুুপ্রিয়া মণিপুরী-মৈ তৈ মণিপুরী-লালেং-চাকমা-ত্রিপুরা-রাখাইন-ম্রাইনমা-খাসি-মান্দি-বানাই-খাড়িয়া-মাহালি-লুসাই-পাংখো-বম-মুন্ডা-লেঙাম-সাঁওতাল-ওঁরাও-ভূমিজ-দেশোয়ালি-কর্মকার-হদি-রাজবংশী-ক্ষত্রিয়বর্মণ-পাঙখো-চাক-তঞ্চংগ্য-খুমি-খিয়াং-কন্দ, বাঙালিসহ রাষ্ট্রের সকল জাতির সকলের কথাই আমরা মাথায় রাখছি। তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত মেঘনার মা বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে চুলে বিলি কেটে কেটে মেঘনাকে বাংলােেদশর দীর্ঘ নদীপ্রণালী মেঘনা নদী সম্পর্কে বর্ণনা করেন। মেঘনা নদীর বিবরণ মা ও মেয়ের গল্পের মাধ্যমে এখানে উঠে এসেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই লোকায়ত পাঠদান/ জ্ঞানবিনিময় কখনোই নীতিগত কাঠামোয় বিবেচনা করা হয়নি। মেঘনা আজকে আমাদের আলাপের সারেং, ঠিক যেমন একজন সারেং নৌকার হাল ধরে রাখেন অথৈ দরিয়ায় (তার মানে এই নয় যে আলাপখানির আঙ্কিককে আমরা চূড়ান্ত এবং সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি)।
গাঁয়ের নামটি হাটখোলা,/ বিষটি বাদল দেয় দোলা,/ রাখাল ছেলে মেঘ দেখে,/ যায় দাঁড়িয়ে পথ-ভোলা।/ মেঘের আঁধার মন টানে,/ যায় সে ছুটে কোন খানে,/ আউশ ধানের মাঠ ছেড়ে,/ আমন ধানে দেশ পানে।
লাঙল কাঁধে ফেলে,/ জাল টেনে যায় জেলে,/ গরু মহিষ সাঁতরে নিয়ে/ যায় রাখালের ছেলে। শ্রদ্ধেয় পাঠক, দর্শক ও শ্রোতৃমণ্ডলী। আমরা এবার আরো একটি সরাসরি প্রশ্ন করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। বলুন তো রাখালের ছেলে কি করে? জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তুক বোর্ড কর্তৃক রাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পাঠ্য আমাদের জানায় রাখালের সন্তান (আমরা স্বীকার করছি আমাদের পাঠ্যসমূহ পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গীয় আঘাত জিইয়ে রাখে আর সূচি নির্মাণ করে পুরুষের মতাদর্শে। তারপরও আজকের আলাপের হাল যেহেতু ধরেছে মেঘনা তাই আমরা আপাতভাবে ধরে নিচ্ছি মেয়ে ও ছেলের একটি একক পরিসর, অন্ততপক্ষে ‘রাখাল’ এর সাপেক্ষে।) রাখাল ছেলে মেঘ দেখে পথ ভুলে দাঁড়িয়ে যায়, গরু-মহিষ সাঁতরে নিয়ে যায়। আমরা কি এখানে ‘রাখাল শিশু/কিশোরের’ মনস্তাত্ত্বিক পরিসরের স্থানিকতা পাঠ করতে আগ্রহী। আমরা কি এই ‘মেঘ দেখে পথ ভুলে দাঁড়িয়ে যাওয়া’ বা ‘গরু-মহিষ সাঁতরে’ নিয়ে আসাকে রাষ্ট্রের বিদ্যায়তনিক কাঠামোর অংশ মনে করতে পারি? মানে আমরা কি এই জনপদের গণমানুষের নিত্যদিনের জ্ঞান-অভিজ্ঞতাকে আমাদের পাঠ্য এবং শিক্ষামাধ্যমে স্বীকৃতি এবং গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি?
আমরা জানি, আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামো জনগণের লোকায়ত জীবনের শিক্ষা ও জ্ঞানকা-কে স্বীকার করে না, একক জ্ঞান পরিসরের কোনো চলমানতা মনে করে না। বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থার এই অনিবার্য প্রশ্নহীন প্রক্রিয়াই রাষ্ট্রের অধিপতি মতাদর্শকে আমাদের মতাদর্শ করে তুলতে চায়। আমাদের সামনে ‘সবার জন্য শিক্ষার’ বা শিক্ষা কোনো সুযোগ নয়, অধিকার’ এই ধরনের ‘আহামরি দরদী’ মাতম তুলে ক্ষমতাকাঠামোর বৈষম্যমূলক পাঠ্য ও পঠনের মাধ্যমে আমাদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে এক বৈষম্যপূর্ণ ‘শিক্ষিত’ ও ‘স্বাক্ষর’ করে তোলে। ক্ষমতা কাঠামোর প্রশ্নহীন পাঠ্যসূচি আমাদের জন্য মগজ এবং চিন্তার নিয়ন্ত্রিত যে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা তৈরি করে নিরন্তর সেখান থেকে কখনোই ‘রাখালের’ জ্ঞানজাগতিক দুনিয়া দিয়ে আমাদের অধিপতি ব্যবস্থার শিক্ষাপরিসর বর্ণিত হওয়া সম্ভব নয়। এখানে স্পষ্টতই আড়াল থেকে যায় রাখালের জ্ঞান এবং রাখালের জ্ঞানজাগতিক শিক্ষা ও দিন যাপনের পরিসর এবং লোকায়ত পাঠ্য। শিক্ষা কার্যক্রম এবং উন্নয়ন উদ্যোগে লোকায়ত জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করা, লোকায়ত জীবনযাপনের পরিসর দিয়ে কেন বিদ্যায়তনিক পাটাতন নির্মাণ জরুরী এই বাহাস দীর্ঘদিনের। প্রচলিত ইতিহাস যেমন কেবলমাত্র ক্ষমতার ইতিহাস, রক্ত-বারুদ-বন্দুক-বই আর ব্যাটাগিরির ইতিহাস। যেখানে আড়াল রয়ে যায় জনগণের স্বর ও ভঙ্গিমা। জনগণের ঐতিহাসিক স্বর ও ভঙ্গিমাকে যতদিন না পর্যন্ত কাঠামোগত পাঠ ও পঠনের অন্তর্ভূক্ত না করা হবে ততদিন পর্যন্ত কোনোভাবেই কোনোধরনের স্থিতিশীলতা বিরাজ করতে পারে না। তা হোক কোনো রাজনৈতিক গণবিপ্লব বা হোক স্বত:স্ফূর্ত কোনো স্থানিক প্রতিরোধ। এমনকি উন্নয়নবাদী ঘরানা বা রাষ্ট্রের চলতি কাঠামোতেও যখন ‘স্থানীয়ত্বশীল উন্নয়ন’, ‘মানসম্মত শিক্ষা’, ‘অংশীদারিত্বমূলক পরিকল্পনা’ এইসব অন্তর্ভূক্ত হয় সেখানেও জরুরী লোকায়ত জ্ঞানের সংশ্লেষ এবং ইতিবাচক প্রবেশাধিকার। লোকায়ত জ্ঞানের মানা না মানা নিয়ে জ্ঞানপরিসরের নানা রকমের বাহাস ঘাত অভিঘাত আছে। কিন্তু এটি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত ও প্রমাণিত জনগণের বেঁচেবর্তে থাকবার নিত্যদিনের এই ঐতিহাসিক অবাণিজ্যিক স্থানিক পরিবর্তনশীল এই আপন জ্ঞানপরিসর প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় প্রশ্নহীনভাবে অবদমিত এবং একক প্রতিনিয়ত দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। উপরন্তু জনগণের এই আপন জ্ঞান-অভিজ্ঞতাকে নানানভাবে কায়দায় ছিনতাই চুরি ডাকাতি করে আবার আরেক ধরনের কর্পোরেট নিপীড়নও জিইয়ে রাখা হয়। জনগণের কাছ থেকে জনগণের জ্ঞানসম্পদ ডাকাতি করে কোনো না কোনো কোম্পানি নতুন কোনো মোড়কে নতুন কোনোভাবে এই জ্ঞান আবার জনগণের কাছেই বিক্রি করতে আসে। এইভাবে দুনিয়াব্যাপী লোকায়ত জ্ঞানের ডাকাতি চলছে, জনগণের জ্ঞান হয়ে পড়ছে কোম্পানির কোনো না কোনো ‘বাণিজ্যিক গোপনীয়তা’। রাষ্ট্র কাঠামোগত আইনী নীতিমালার মাধ্যমে জনগণের জ্ঞানের এই কর্পোরেট ছিনতাই বৈধ করছে। অথচ কি নিদারুণ। জনগণের এই আপন জ্ঞানসীমার কোনো ধরনের রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপরিসরে স্বীকৃতি নাই, অন্তর্ভূক্তি নাই। বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামোয় লোকায়ত জ্ঞানের প্রান্তিকীকরণ বিষয়ে আলাপ তুলতে যেয়ে আমরা যারপরনাই এই বিষয়কে মাথায় রাখছি। মাথায় রাখছি জ্ঞান, ক্ষমতা ও বিদ্যমান শিক্ষা কাঠামো কিভাবে আন্তঃসম্পর্কিত এইসব বিষয়কেও। অনেকেই মনে করেন দেশীয় জ্ঞানের লেবেল সেঁটে দিলে যেমন এর প্রতি এক ধরনের সমীহ দেখানো হয়, আবার এর ফলে তা নৈতিকভাবে একটি ভুলেও পর্যবসিত হয়। কারণ তখন ‘এটি কোন বিজ্ঞান নয়’ এমন কথা বলার মতো হুমকিও তৈরি হয়। যদি গরীবদের উন্নয়নই লোকায়ত জ্ঞান অন্বেষণের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়, তাহলে লোকায়ত/ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পার্থক্য তৈরি হয়। যদি গরীবদের উন্নয়নই লোকায়ত জ্ঞান অন্বেষণের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়, তাহলে লোকায়ত/ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের পার্থক্য বৃথা সময় নষ্ট না করে এই উদ্দেশ্যকেই সামনে আনা উচিত। আধুনিক জাতি রাষ্ট্র গঠন এবং বিশ্ববাণিজ্যের মদদে বিশ্বব্যাপী আধুনিকীকরণ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যহীনতা তৈরির যে চাপ দেখা যাচ্ছে, তা ক্ষুদ্র কৃষিজীবী-ভাসমান এবং লোকায়ত জনগোষ্ঠীর জীবনধারা এবং সংস্কৃতিচর্চার ব্যাপারে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকায়ত জ্ঞান পদ্ধতি যদি বিলুপ্তির দিকে যায়, তবে এটাই হবে এর কারণ। যারা ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞান পদ্ধতির সংরক্ষণের আগ্রহী, তাদের সঠিক কাজ হয়ে রাষ্ট্রীয় কৌশলের সংস্কার করা যাতে করে লোকায়ত জনগোষ্ঠী নিজেরাই নিজেদের ভবিতব্য নির্ধারণের সুযোগ পান। এটাই হল লোকায়ত জ্ঞান সংরক্ষণের আসল পদ্ধতি।
আমাদের তৃতীয় শ্রেণির মেঘনা রাষ্ট্র নির্ধারিত বাধ্যতামূলক (‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম’ একইসাথে বিদ্যমান ব্যবস্থার পাঠকে মেনে নিতেই কি আমাদের ‘বাধ্য’ করায়।) পঠন থেকে জানতে পারে বা তাকে জানানো হয় গ্রাম মানে কি, কৃষিজীবন মানে কি। কিন্তু মেঘনার পরিবার কি গ্রাম কি বাজার কি রাষ্ট্র কোনো কিছুর সাথেই সেইসব পঠনের মিল খুঁজে পায় না সে। আমাদের পাঠ্য আমাদের যা পাঠ করায় সেখানে সেইসব পাঠ্য দিয়ে যদি একজন কেউ সেভাবেই ‘শিক্ষিত ও স্বাক্ষর’ হয়ে উঠতে চায় সেখানেই বিদ্যমান ব্যবস্থা বাঁধা দেয়, অধিপতি হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের বিদ্যমান নীতিকাঠামো সেইসব বলপ্রয়োগকে চাঙ্গা ও বৈধ করে তুলে। আমরা আলাপের এই পর্যায়ে সরাসরি ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০’ প্রসঙ্গকে টেনে আনছি। রাষ্ট্র নির্ধারিত মেঘনার পাঠ্য দিয়ে আমরা জাতীয় শিক্ষানীতিকে পাঠ করতে আগ্রহী, আগ্রহী মেঘনার ঐতিহাসিক লোকায়ত জীবনের বিদ্যায়তনিক পরিসর দিয়ে শিক্ষানীতিকে ছেনে ছেনে দেখার।
১৯৭৪ সনে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। শিক্ষানীতি বিষয়ে এটিই ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম কোনো সাংগঠনিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। পরবর্তীতে শিক্ষানীতি সংক্রান্ত সুপারিশ তৈরি করার দায়িত্ব দিয়ে ১৯৯৭ সনে সরকার আরও একটি কমিটি গঠন করে। ১৯৯৭ সালের ১৪ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষানীতি সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশের (সূত্র: নং প্রশাঃ ১/বিবিধ-৫/৯৬/১৫৫-শিক্ষা) মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটিকে ৩০ এপ্রিল ১৯৯৭-র ভেতর একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি সরকারের নিকট পেশ করার কথা ঘোষণা করে। সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল হককে চেয়ারম্যান করে মোট ৫৬ সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষাকমিটি ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি শিক্ষানীতির খসড়া সরকারের কাছে দাখিল। করে শিক্ষানীতির খসড়া তৈরি এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনরায় ১৯৯৮ সালে আবারো একটি শিক্ষাকমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি পূর্ববর্তী শিক্ষানীতির প্রস্তাব এবং মতামতসমূহকে সংযোজন-বিয়োজনে মাধ্যমে শিক্ষানীতির খসড়া তৈরি করে, এই খসড়ার মাধ্যমেই দেশের প্রথম ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০’ রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত ও অনুমোদিত হয় শিক্ষানীতির ভূমিকা অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, আজকের পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তনশীল, তীব্র এর ছুটে চলার গতি, প্রবল প্রতিযোগিতাপূর্ণ এর যাবতীয় অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা ও কর্মকাণ্ড। চলমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া এবং ব্জ্ঞিান ও প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য, বৈপ্লবিক বিকাশ বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে বাংলাদেশের মতো একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য আরো কঠিন আরো চ্যালেঞ্জের ব্যাপার করে তুলেছে। এহেন পৃথিবীতে ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’ কথাটা বিজ্ঞানীর কল্পনা নয়, অতি নির্মম, কঠিন, বাস্তব সত্য বটে। আর এই পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেবল টিকে থাকা বা কোনমতে আত্মরক্ষাই নয়, বরং দৃঢ় পদক্ষেপে উন্নত শিরে এগিয়ে যেতে হলে শিক্ষা ও দক্ষতায় বলীয়ান, শক্ত মেরুদণ্ডের অধিকারী হতে হবে। সেই শক্তি, সেই সামর্থ্য, সেই সংকল্প আসবে কোথা থেকে?’ বলাই বাহুল্য, আমাদের জনগণই হবে সেই শক্তির উৎস। এই জনগণই আমাদের সকল সংগ্রামে, ত্যাগে, আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। দেশ গড়ার সংগ্রামে তাদেরই সক্ষম করে তুলতে হবে।
৫টি সংযোজনী, ২৮টি অধ্যয়নসহ মোট ৬০ পৃষ্ঠার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ শিক্ষা পরিসরের বিদ্যমান নানান কাঠামো এবং বিভিন্ন আঙ্কিকের শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করলেও কোথাও জনগণের লোকায়ত শিক্ষা পরিসর নিয়ে কোনো ধরনের বিবেচনা করেনি। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, গণশিক্ষা ও উপানুষ্ঠানিক, মাধ্যমিক, বৃত্তিমূলক (ভোকেশনাল) ও কারিগরি, মাদরাসা, ধর্ম ও নৈতিক, উচ্চ, প্রকৌশল, চিকিৎসা-সেবা ও স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, কারবার  (বিজনেস), কৃষি, ললিতকলা, আইন, নারী, বিশেষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শারীরিক, স্কাউট ও গার্লস গাইড, গ্রন্থাগার বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ পৃথক পৃথক অধ্যায় সংযুক্ত করলেও শারীরিক, স্কাউট ও গার্লস গাইড, গ্রন্থাগার বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ পৃথক পৃথক অধ্যায় সংযুক্ত করলেও লোকায়ত জ্ঞান শিক্ষা বিষয়ে কোনো ধরনের একটি বক্তব্যও হাজির করেনি। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তক বিষয়ক সে পৃথক অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে সেখানেও কোথাও লোকায়ত জ্ঞান ধারা ও স্থানিক শিক্ষাব্যবস্থা বিষয়ে কোনো ধরনের অন্তর্ভূক্তি নেই। অথচ শিক্ষানীতির উল্লেখ করা হয়েছে, জনগণই নাকি শক্তির উৎস। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, জনগণের ঐতিহাসিক জ্ঞানজাগতিক দুনিয়াকে আড়াল করে বিদ্যমান কাঠামো শিক্ষার যেসব ধরন উসকে দেয় সেখানে স্পষ্টতই অধিপতি ঝাঁঝ থাকে, বারুদ বাহাদুরি থাকে, দৃশ্যমান বলপ্রয়োগ থাকে। আঞ্চলিক কৃষি প্রতিবেশের ভিন্নতা অনুযায়ী বাংলাদেশকে ৩০টি প্রধান কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল, ৮৮টি উপকৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল এবং ৫৩৫টি আঞ্চলিক কৃষি প্রতিবেশ ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপন এই স্থানিক প্রতিবেশ এবং পরিবেশকে আগলে নিয়েই বিরাজিত থাকে। আমরা আজ পর্যন্ত এমন কোনো শিক্ষার উদ্যোগ দেখতে পাইনি যেখানে দেশের কৃষিপ্রতিবেশকে বিবেচনা করে শিক্ষাকার্যক্রমের পাঠ্য ও সূচি তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান শিক্ষানীতিও জনগণের জীবনের এই বৈচিত্র্যময় সাড়া ও অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়নি। অথচ এটি কি করে সম্ভব বান্দরবানের একজন শিশু, বরেন্দ্র এলাকার কোনো সাঁওতাল বা উপকূলীয় এলাকার একজন রাখাইন বা হাওর এলাকার একজন বাঙালি বা  মধুপুর গড় এলাকার একজন শিশু সকলেই কিভাবে সকল বৈচিত্র্য এবং দিনযাপনের স্থানিক জ্ঞান কাঠামোকে সরিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত সকলের জন্য একই পঠনপাঠনে ‘শিক্ষিত ও স্বাক্ষর’ হয়ে উঠবে?
‘মাটিতে ফসলের ডাক আসা শুনতে পাওয়ার’ জ্ঞান কি আমাদের শিক্ষা কাঠামোয় জায়গা পাবে না?
বাংলাদেশ আমাদের দেশ। বাংলাদেশ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের দেশ। বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। বাংলাদেশের মাটি সোনার চেয়ে খাঁটি। কবি ও শিল্পীরা এ মাটিকে বলেছেন কাজল মাটি। এ মাটি বড় উর্বর। বর্ষার পানিতে সিক্ত হলে এ মাটি হয় দলদলে। এ মাটিতে ফসলের ডাক আসে। তখন কৃষকেরা ফসল বোনায় মেতে ওঠে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশ তারা সরল জীবনযাপন করে। সাগর ও পাহাড়ের মাঝখানে সমভূমিতে রয়েছে বেশিরভাগ লোকবসতি। পার্বত্য এলাকায় থাকে পাহাড়িরা,
সম্মানিত পাঠক, আলাপের এই পর্যায়ে আপনিও তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইটি আর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ পাঠ করুন। স্মরণে রাখুন বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতা। কর্পোরেট বাজার, পুরুষতান্ত্রিক খবরদারি, উন্নয়নের নামে জবরদখল ও উচ্ছেদ, সশস্ত্র জলপাই বাহাদুরি এবং এক গ্রামের মেয়ে মেঘনার কথা, যে আমাদের আজকের আলাপকে এত দূর টেনে এনেছে। আমরা সরাসরি প্রশ্ন করতে চাই কেন আমাদের জন্য এই পাঠ নির্ধারণ করা হয়েছে, যে, আমাদের মাটি কাজল মাটি, এখানে ফসলের ডাক আসে? আর এই ফসলের ডাক কে শুনতে পায় এটিই আজকের আলাপে আমরা হাজির করতে আগ্রহী। আমাদের মাটির ডাক যদি আমাদের কৃষক-জুমিয়ারা শুনতে বুঝতে পারেন আপন জ্ঞান কাঠামোর ভেতর দিয়ে তবে কেন আবার তাকে ‘ফসলের ডাক বুঝতে পারার জন্য’ আমরা ভিন্ন ভিন্ন পাঠ তৈরি করছি আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। সেইসব পাঠ কি কাউকে মাটিতে ফসলের ডাক শোনা ও বোঝার জন্য প্রস্তুত করতে পারে? আমরা সরাসরি বলছি, পারে না এবং পারে না। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা মাটিতে ফসলের ডাক নয়, আমাদের শেখায় কোন মাটিতে কি পরিমাণে রাসায়নিক সার ঢালতে হয়, কোন মাটির কলিজা থেৎলে দিয়ে মাটির তলার পানি মেশিন দিয়ে তুলতে হয় আর কিভাবে ফসলের জমিতে গাদা গাদা বিষ ঢালতে হয়। বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের অভ্যস্ত করায় কর্পোরেট হাইব্রিড, জিএম ফসলে মতো বাজারনির্ভর ফসল চাষ করার জন্য। আর এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামো আমাদের ফসলের ডাক শোনা ও বোঝার জন্য প্রস্তুত না করে আমাদের করে তুলে ক্রমান্বয়ে এক প্রশ্নহীন কর্পোরেট বাজারের অনুগত দাস। বাধ্যতামূলক কায়দায় এই কর্পোরেট বলপ্রয়োগকে মেনে নেয়ার অর্থ হচ্ছে বিদ্যমান ব্যবস্থায় তথাকথিত কায়দায় ‘শিক্ষিত ও স্বাক্ষর’ হয়ে ওঠা।
ঝুমা, বাংলাদেশে অনেক পিঠা হয় তোমার মা সবই জানেন। অগ্রহায়ণের শেষে কিংবা পৌষের প্রথমে আমন ধান কাটা হয়। তখন ঘরে নতুন চাল আসে। পিঠার জন্য আতপ চাল গুঁড়ো করতে হয়। সেই গুঁড়ো দিয়ে নানা স্বাদের পিঠা তৈরি হয়। কোনো পিঠা ভাপে হয়, কোনো পিঠা তেলে ভাজতে হয়। বাংলাদেশ পিঠা-পুলির দেশ। এক এক জায়গায় পিঠার এক এক নাম। বাংলাদেশে সারা বছরই পিঠা হয়।
আমাদের আজকের আলাপের সারেং মেঘনা এখন পিঠা খাওয়ার বায়না ধরেছে। বইতে সে পড়েছে ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, চন্দ্রপুলি, ক্ষীরপুলি, নারকেলপুলি, নকশি পিঠা, কাজললতা, সজনেপাতা, পদ্মদীঘি, মোরগঝুঁটি, সেমাইপিঠার নাম। দেশের বৈচিত্র্যময় খাদ্য পরিসরকে আড়াল করা রাষ্ট্রের কর্পোরেট উদ্যোগকে মাথায় রেখে আমরা একটি বাস্তবতাকে তুলে ধরছি। আমাদের মেঘনা বড় হতে হতে দেখে তার আশপাশ জুড়ে থাকে পিৎজাহাটের পিৎজা, মুভেনপিকের আইসক্রীম, কেএফসির ফ্রাইড চিকেন, ম্যাকডোনালসের পটেটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, কোকাকোলা, পেপসির বাজার আর হাতছানি। আমরা কেন তবে মেঘনাকে সেই বাস্তবতা দিয়ে তার নিজের মতন পঠন পাঠ করতে উৎসাহিত করি না। আমরা কথা বাড়াচ্ছি না, কেবল সরাসরি বলতে চাইছি বিদ্যমান ব্যবস্থা ও বাজারকে আড়াল করে আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য যে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রেখেছি তাও হয়তো কোনো না কোনো ভাবে ‘নিপীড়ক’ই হয়ে ওঠে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পঠনপাঠন এবং দিনযাপনের বিস্তর ব্যবধান এবং বৈষম্যে আড়াল করে আমরা যেসব পাঠ্য আমাদের শিশুদের জন্য বিরাজিত রেখেছি তা অনেকদিন থেকেই ‘নির্যাতনমূলক’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না কি? আসুন, সবাই একবার গা ঝেরেঝুরে প্রশ্ন করি এমন কোনো পাঠ্য কি আমাদের আছে যা প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের সাথে একই সূতোয় গাঁথা।
তাহলে কেন আমরা বঞ্চিত এবং বাধ্য করছি শিশুদের। এক আপাদমস্তক অন্তঃসারশূণ্য (শব্দটি আমরা খুব ভেবেচিন্তে ব্যবহার করেছি, আমরা জানি ‘সার কিভাবে তৈরি হয়, এটি জীবনযাপনের খুব গভীর থেকে তাড়িত ও বিরাজিত হয়) বাধ্যতামূলক পাঠ্য ও পঠনের মাধ্যমে। আর তাই এই বাধ্যতামূলক ফারাকের শিক্ষাব্যবস্থা ও নীতি আমাদের মনস্তত্ত্বকে আরো বৈষম্যমূলক করে তুলে, জিইয়ে রাখে শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাত। আর তাই মেঘনাকেও আমরা শেখাই, শেখাতে বাধ্য করি পাহাড়ি মানে পাহাড়ে বসবাসকারী লোক। হাড়গিলা পাখি দেখতে বিচ্ছিরি। আর বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয় যে মনস্তত্ত্ব, সেই মনস্তত্ত্ব আর কখনোই লোকায়ত জ্ঞানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। এই শিক্ষাব্যবস্থায় ‘শিক্ষিত হয়ে ওঠা’ কারো পক্ষে তাই সম্ভব হয়ে ওঠে না শিক্ষানীতিতে লোকায়ত জ্ঞানকাণ্ডের অন্তর্ভূক্তিকরণ। কারণ এটিই আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাপদ্ধতি ও ব্যবস্থার প্রশ্নহীন প্রক্রিয়া।
এক হয়ে সব শ্রমিক কিষাণ/ ওড়ায় যাদের বিজয় নিশান/ ইতিহাসের সোনার পাতায়/ ওরাই আগে গণ্য।
আমরা মেঘনার কাছ থেকেই কবিতাটি শুনেছি, তার বাংলা বইতে আছে। আমরা এখন আলাপের শেষের দিকে এসে আমাদের ঝিমুনিকে একটু ধাক্কা দেয়ার জন্য আরো একটা প্রশ্ন রাখছি। আবারো সেই পুরনো প্রশ্ন, আমরা কি মুখস্থ করব না আত্মস্থ করব? জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০০ শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে প্রথমেই বর্ণনা করেছে, ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নৈতিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাকল্পে শিক্ষার্থীদের মননে, কর্মে ও ব্যবহারিক জীবনে উদ্দীপনা সৃষ্টি করার কথা। যদি আমরা জীবনে সত্যিকারের ‘উদ্দীপনা’ তৈরি করতে চাই তবে সেটি কি জনগণের লোকায়ত জ্ঞানজাগতিক আপন দুনিয়াকে ছাড়া কখনোই করা সম্ভব। সম্ভব নয়। তাহলে বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোতে কেন বারবার আমাদের চোখ ভোলানো মন ভোলানো বিজ্ঞাপনের ভাষার মতো শেখানো হয়, শ্রমিক-কিষাণেরাই ইতিহাসের পাতায় সবার আগে গণ্য হবেন? আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় কি আমরা এখনও পর্যন্ত আদৌ সেই জায়গা কৃষক-শ্রমিকদের জন্য তৈরি করতে পেরেছি। তাহলে কৃষক-শ্রমিককে গণ্য করার মতো মানসকিতা কি আদতেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর আছে? যদি সরাসরি বলি নেই, তাহলে ‘ভুল’ হবে না। কারণ এর কোনো কাঠামোগত নজির নেই।
যে শিক্ষাব্যবস্থা কৃষক-শ্রমিকের যুগান্তরের জ্ঞান-অভিজ্ঞতাকে বিদ্যায়তনিক কাঠামোর পাঠ্য ও পঠনের অন্তর্ভূক্ত করতে পারে না, সেই শিক্ষাব্যবস্থা আবার কিভাবে ‘মূল্যবোধের’ সাফাই গায়। এই ‘মূল্যবোধ’, ‘মূল্যবোধ’ নামের আড়ালে শ্রেণিবৈষম্য এবং ধারাবাহিক অধিপতি বলপ্রয়োগ জিইয়ে রাখে। জনগণের নিরন্তর প্রতিরোধ যখন সেই অধিপতি ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে বা রুখে দাঁড়ায়, তখন আমাদের নিপীড়নমূলক শিক্ষাকাঠামোর মতাদর্শ বলে, ‘রাজনীতি শিক্ষার অংশ নয়’।
আমরা আলাপের শেষদিকটায় হাজির হয়েছি। মেঘনাকেও আর এতটা সময় ধরে রাখা সম্ভব না। আমরা আশাবাদী, রাষ্ট্র তার হিসাবনিকাশ পাল্টাবে। জনগণের আপন জ্ঞানজাগতিক পাটাতনের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাকাঠামো গড়ে তুলবে। যেখানে জনগণ নিজেরাই নিজেদের দিনযাপনের ঐতিহাসিক সূত্র ও হিসাব থেকে পাঠ্য ও পঠন প্রক্রিয়া তৈরি করে শিক্ষাকে করে তুলবে সত্যিকার অর্থে জনগণমুখী। জাতীয় শিক্ষানীতির ভূমিকা অংশের শেষ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে কোনো নীতিই চিরকালীন, স্থির, অবিচল ব্যাপার হয় না, হওয়া উচিত নয়। সময় ও অবস্থা বিবেচনায় অন্যান্য নীতির মতো শিক্ষানীতিতেও প্রয়োজনীয় রদবদলের সুযোগ থাকবে, পর্যালোচনার ব্যবস্থা নেয়া হবে সার্বিক ও বৃহত্তর লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই। আমরা স্বপ্ন দেখি, মেঘনার পরিবার, কি গ্রাম কি দেশের মানুষের বৈচিত্র্যময় বিদ্যায়তনিক অনন্য অদ্বিতীয় জ্ঞান অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের শিক্ষানীতিতে অন্তর্ভূক্ত হবে। ‘শিক্ষার’ মাতম তুলে ঔপনিবেশিক বলপ্রয়োগের যে অবধারিত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল একটা সময়, বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার শরীর ও মজ্জা সেই ঔপনিবেশিক বাহাদুরিকেই বারবার আমাদের সামনে উসকে দেয়। জানি, জনগণের সম্মিলিত জ্ঞানজাগতিক প্রতিরোধ এই অধিপতি অনিবার্য প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশ ভাঙবেই, গড়ে তুলবে সত্যিকারের ‘সবার জন্য শিক্ষা’।
বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,/ “কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই,/ আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে/ তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”/ বাবুই হাসিয়া কহে, ‘সন্দেহ কি তায়?/ কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।/ পাকা হোক, তবু ভাই, পরেরও বাসা,/ নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।’

আখতার হামিদ খান