বাঙালি ঐতিহ্যে মেলা , মেলা ,বাঙালি

আবহমান বাংলার পল্লী ঐতিহ্যে মেলা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মনের অনেকখানি স্থান জুড়ে রয়েছে। বাংলাদেশের বাইরে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও মেলা যুগ যুগ ধরেই উদ্যাপিত হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রিস, রোমে, মধ্যযুগের ইউরোপে, প্রাচীন মিসরে ধর্মীয় উৎসবের প্রাসঙ্গিকরূপে মেলা বা স্থানীয় বাজারের প্রথা বিদ্যমান ছিল। ধীরে ধীরে পৃথিবীর সবদেশেই উৎসব অনুষ্ঠানের প্রাণ এই মেলার রেওয়াজ চলে এসেছে। মেলার অর্থ মিলিত হওয়া আর এই মিলনের যোগসূত্র ধরেই আদিমতম মেলার সৃষ্টি। ভোজন, ধর্ম, শস্য উৎপাদন, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, পারস্পরিক ভাববিনিময় করে, জিনিসপত্র ক্রয়-বিক্রয় করে ইত্যাদির ফলে মেলা উদযাপন সম্ভব হয়। কৃষি ও সমাজ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মেলারও প্রসারণ ও উন্নয়ন ঘটে। যাতায়াত ব্যবস্থার সহজতা, ফসল ফলনের প্রাচুর্য, মানুষের আর্থিক সঙ্গতি মেলার সার্থক রূপায়ণে সাহায্য করে। আধুনিক কৃষি, শিল্প, সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে গ্রাম ও শহর উভয় স্থলেই মাঝে মাঝে বাৎসরিক মেলার আয়োজন করা হয়। গ্রাম্য কুটির শিল্প, কারু ও হস্তশিল্পের প্রচার প্রসার ও বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এবং এসব বস্তুর উৎপাদন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে শহর নগর বন্দরে গ্রাম-গঞ্জে সর্বত্র মেলার আয়োজন করা হয়।

মেলার সময় নির্দিষ্ট থাকে এবং তদানুযায়ী মেলায় আগমনকারীরা বৎসরের সেই নির্দিষ্ট সময়টা সঠিক মনে রেখেই মেলা গমনের আয়োজন করে। ঋতু উৎসব, ফসল উৎপাদন ইত্যাদি উপলক্ষে পূর্বনির্ধারিত সময়ে মেলার বন্দোবস্ত অবশ্য কর্তব্য জ্ঞান করা হয়। তদনুযায়ী দূর-দূরান্তের নর-নারী শিশু বালক সবাই মিলে বৎসরের সেই নির্দিষ্ট দিনে বা দিনগুলোতে মেলায় আগমন করে। পুণ্য সঞ্চয়, উৎসব পালন, জিনিসপত্রের ক্রয়-বিক্রয়, রথ দেখা, কলাবেচা মেলায় পরম উৎসাহ উদ্দীপনাসহ সমাধা করা হয়। ঐতিহ্যময় স্থান ও কাল মেলার প্রধান ও পূর্বশর্ত। স্থান হিসেবে মেলার জন্যে নির্বাচন করা হয়। সাগর, নদী-দীঘি-পুষ্করণীর তীর, পুরনো বড় বড় গাছগাছালিপূর্ণ উঁচু স্থান, মাঠ-ঘাট, মন্দির, মঠ, গোরস্থান-মাজার ক্ষেত্র, বড় রাস্তাঘাট, প্রসিদ্ধ গ্রামগঞ্জ ইত্যাদি স্থানকে।

বাংলাদেশে অজস্র মেলা উদযাপিত হয়। এই মেলার স্থায়িত্ব এক-দুই দিন থেকে শুরু করে ষান্মাসিক বা বৎসরব্যাপী মেলার অনুষ্ঠান দেখা যায়। পৌষ মাস, ফাল্গুন-চৈত্র মাস অর্থাৎ শীত ও বসন্তকালই মেলার প্রকৃত সময় জ্ঞান করা হয়। ফসলাদি ঘরে তোলা, তার বিক্রীত অর্থব্যয়ের সুযোগ ঘটান, প্রচুর আনন্দপূর্ণ বল নাগালে পাওয়া যায় ইত্যাদি। দিনগুলো আবহমান বাংলার মেলা উদযাপনে সাহায্য করে। মেলার মানবিকতা নির্মাণে, বাঙালি তার পণ্য মনপ্রাণ তার ধর্মপ্রীতি, পুণ্যের জাগ্রত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মেলার উদযাপনে। বর্ষাকালে বৃষ্টিবাদল, চলাচলের অসুবিধা, উন্মুক্ত স্থানে মিলনের শতবাধার কারণে মেলার আয়োজন অতি অল্প। উত্তরবঙ্গের ক’টি বিশিষ্ট মেলার নাম এরূপ-মাজারের মেলা, কালীপূজার মেলা, নেজাপীরের মেলা, ধলদীঘির মেলা, ঘেরের মেলা, গোপীনাথপুরের মেলা, শাঁচাই মেলা, মধইলের মেলা, পাঁঠাবলীর মেলা, ম্যাড়ের মেলা, গঙ্গাস্নান বা ত্রিমোহিনীর মেলা, অষ্টমী স্নানের মেলা, নোকর্দন আলেয়ার মেলা, শিবরাত্রির মেলা, পীরের মেলা, চড়া গম্ভীরা মেলা, মানিকপীর গাজীর মেলা, রথের মেলা, ময়নামতির মেলা, বিক্ষচর্যার মেলা, চাকমা বিরহরী মেলা, যাঠবের মেলা, কারবালা বা মহররমের মেলা, বৌদ্ধ পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমার মেলা, বারুণী, দোলযাত্রা, দশহরা, নাওমীর মেলা ইত্যাদি।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের পল্লী ও শহরে এমনি হাজারো মেলা অনুষ্ঠিত হয়। যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে কোন ধর্মীয় সামাজিক উৎসব, ঋতু। বড়মাপের লোক, স্বনামধন্য কোন জমিদার বা স্থান কোন পুরনো স্মৃতি।

‘নববর্ষ বা বৈশাখীমেলা’ আবহমান বাংলার অতি উল্লেখ্য ঐতিহ্য। এই মেলায় লাঠিখেলা, সড়কি খেলা, হাডুডু খেলা, যাত্রা, পুতুল নাচ, ম্যাজিক, সার্কাস, জারি সারি, গম্ভীরা গান, কীর্তনভজন ও অন্যান্য আয়োজন অবশ্য কর্তব্য বলে গণ্য। নৃত্যগীত, বাদ্যবাজনা, নানাপ্রকার খেলাধুলা, হৈ চৈ, আনন্দস্ফুর্তি, হাস্যকৌতুকে বৈশাখী বা নববর্ষের মেলা জমজমাট। নতুন নতুন গ্রাম্য খাবার বিচিত্র শিল্পদ্রব্যের বেসাতী ওঠে এইসব মেলায়। পাখা, বাঁশি, পুতুল, তৈজসপত্র, সখের হাঁড়ি, বাঁশ মাটি, কাঠ, টিন, বেত, কাপড়, পাঠশোলা, সুতা ইত্যাদির বিবিধ কারু ও হস্তশিল্পের ব্যাপক আযোজন থাকে এসব মেলায়। ঘোড় দৌড়, গরুদৌড়, ঘুড়ি ওড়ানো, গটপটুয়ার পট বিক্রি, ধর্মীয় ও শাস্ত্রসম্মত ছবির সমারোহ, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও খেলার অপরূপ সমারোহ, কবিতর্জা, বাইচ ও কুস্তির প্রতিযোগিতা, কামার-কুমার চারু শিল্পী ও অন্যান্য কারিগরের গ্রামীণ সহতিজাত দ্রব্যসম্ভারে নববর্ষ মেলা সরগরম। নবনব আবিষ্কার এবং শিল্পদ্রব্যের উৎপাদন সাধারণত মেলায় প্রদর্শিত ও বিক্রীত হয় বলে গ্রাম্য মানুষ সাংসারিক ক্রয়-বিক্রয়ের পরিচালনা করে থাকে পল্লী মেলায়।

লোকমেলা পল্লীর নিরানন্দ পুরনো আটপৌরে জীবনে একঝলক দখিনা বাতাস। নবপরিচয়, নবআলোক ও মিলনের মহালগ্নে সূচিত হয় নবজীবন। নির্দিষ্ট ক্ষণ বা দিনে মানুষ মিলনের ক্ষেত্র পায় এই মেলায়। শিশু-কিশোরের দল গ্রাম্যমেলায় নিজেদের উজাড় করে দেয় আনন্দস্ফূর্তিতে। আটপৌরে বা নিত্যকার জীবনের দুঃখ দারিদ্র্য, মিলনের অবাব মেলায় নতুন রূপ পায়। এখানে এক হয় বহু বহু হয় এক-আমাদের ঐতিহ্য এই পল্লীমেলায় দৈনন্দিন ও ধর্মীয় প্রয়োজন মিটে, তার সঙ্গে আমাদের আচার অনুষ্ঠানের, আমাদের আধ্যাত্মিক মন-মানসের দীপ্ত আভায় বাঙালির সারাটা বৎসর হয় মুখরিত। আমাদের সারাটা বৎসর হয় মুখরিত। আমাদের জীবনেতিহাসে এই মেলার ইতিহাস বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। মেলা বাঙালির আত্মানুসন্ধান, বাঙালির মিলনের সুযোগ সন্ধান।