বিজ্ঞানের টুকিটাকি

মস্তিষ্কের অন্দরমহলে
রোগীর খুলি কেটে মস্তিষ্ককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এখনো কারোর কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দমবার পাত্র নন। তারা ঠিকই বিকল্প পন্থার উদ্ভাবনা করেছেন। খুলির ভেতর দিয়ে ইলেকট্রিক চার্জ ঢোকানোর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের অন্দরমহলে ঢোকার রাস্তা খুঁজে পেয়েছেন। এ পদ্ধতির নাম হচ্ছে ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিম্যুলেশন। সংক্ষেপে একে টিএমএস নামে ডাকা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ৩০ হাজার ডলার দামের যন্ত্র থেকে একটি শক্তিশালী তড়িৎ চৌম্বকীয় চার্জ নিঃসৃত হয়। চার্জটি খুলির ভেতর দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের একটি অংশের স্নায়ুকোষগুলোকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করে তোলে। এভাবে মস্তিষ্ক সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এমনকি তারা মস্তিষ্কের কোনো অংশকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতেও পারছেন। ইতিমধ্যে চিকিৎসকরা টিএমএস পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে বিষণœতা, অতি উত্তেজনা ও অতি নিষ্ক্রিয়তার মতো উপসর্গগুলোর চিকিৎসা করতে পারছেন। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে যে কোনো ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভা জাগিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এমনকি তথাকথিত প্রত্যাদেশ শোনার মতো উপসর্গের উপশমও করা সম্ভব হচ্ছে। একন মার্কিন সামরিক বাহিনী এ পদ্ধতি ব্যবহার করে আমেরিকান সৈন্যদের অবসাদ দূর করার কথা ভাবছে। মানুষের আনন্দ উপভোগের স্নায়ুগুলো মস্তিষ্কের গভীরতম অংশে অবস্থিত। এগুলোকে সক্রিয় করার ক্ষমতা টিএমএস পদ্ধতির নেই।
রিপ ভ্যান উইঙ্কল
প্রাণীদের দীর্ঘনিন্দ্রা সম্পর্কে গবেষণা চালাতে যেয়ে বিজ্ঞানীরা একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য আবিষ্কার করেছেন। দেহকোষে অক্সিজেনের আধিক্য ঘটলে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল নামের ক্ষতিকর কণার উদ্ভব ঘটে। এতে ফুসফুসে অক্সিজেনের অভাব ঘটে। আর মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিজ্ঞানীরা এ প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এ পদ্ধতিতে অজ্ঞান অবস্থায় রোগীর দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহরের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে দীর্ঘনিদ্রা দেবার অভ্যাসহীন একদল ইঁদুরকে একটি আবদ্ধ সেলে রাখা হয়েছিলো। সেলে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে ইঁদুরের দেহকোষ থেকে অক্সিজেনের পরিমাণ কমানো হয়েছিলো। এতে ইঁদুরগুলো অজ্ঞান হয়েছিলো টানা ৬ ঘণ্টা যাবত। এ সময় এগুলোর দেহের তাপমাত্রা শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিমাণ ও হৃদস্পন্দন কমে গিয়েছিলো। ৬ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরে পেয়ে ইঁদুরগুলো সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ করেছে। শিগগিরই মানুষের ওপর এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে। ফলে দুর্ঘটনাকবলিত রোগীদের হাসপাতালে নেবার সময় মস্তিষ্কের ক্ষতি হবার সম্ভাবনাকে এড়ানো যাবে। এছাড়া যারা মৃত্যুর পর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করবেন তাদের দেহের সজীবতাকেও দীর্ঘক্ষণ বজায় রাখা যাবে।
মন বনাম দেহ
মেরুদণ্ড অকেজো হয়ে পড়লে মস্তিষ্কের সাথে হাত-পায়ের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি মস্তিষ্ক মেরুদণ্ডকে এড়িয়ে কাজ করতে পারে? বিজ্ঞানীলা এখন মাইন্ড চিপ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটি মস্তিষ্কের সংকেতকে সরাসরিভাবে হাতে-পায়ে প্রেরণ করতে সক্ষম। আমেরিকার ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জন ডোনাহো পক্ষাঘাতগ্রস্ত ম্যাথু ন্যাগলের ওপর গবেষণা চালাচ্ছেন। ৪ বছর আগে আততায়ীর ছুরিকাঘাতের কারণে ম্যাথুর মেরুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। ডোনাহো ম্যাথুর মস্তিষ্কের যান্ত্রিক অংশে একটি খুদে সিকিকন সেন্সর স্থাপন করেছেন। সেন্সরটি ম্যাথুর মস্তিষ্ক থেকে কম্পিউটারে সংকেত প্রেরণ করে। আর ম্যাথু সংকেত মোতাবেক তার বাম হাতকে ব্যবহার করতে পারছেন। ডোনাহো এখন সেন্সরটির সংকেত যাতে সরাসরিভাবে হাতে ও পায়ে পৌঁছে এগুলোকে পরিচালনা করতে পারে সেজন্য গবেষণা চালাচ্ছেন। একদিন বড় ধরনের অপারেশন ছাড়াই এ সেন্সরটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের মস্তিষ্কে স্থাপন করা সম্ভব হবে। সেদিন এসব ব্যক্তি নতুন জীবনযাপন করতে পারবেন।
নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিস্ফোরণ
অর্ধশতাব্দী যাবত বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন; বিশেষ করে তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে ফ্যাশনকে নিয়ন্ত্রণ করা। এ পারমাণবিক বিক্রিয়ায় দুটি লঘু নিউক্লিয়াস সংযুক্ত হয়ে একটি ভারী নিউক্লিয়াস ও পারমাণবিক শক্তির উদ্ভব ঘটে। এ বিক্রিয়ার কারণে সূর্যসহ সব নক্ষত্র কোটি কোটি বছর ধরে শক্তি বিকিরণ করতে পারছে। এ পর্যন্ত যতগুলো ফ্যুশন টাইপ পারমাণবিক চুল্লী নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোর সবক’টি আকারে ও আয়তনে সুবিশাল। এগুলো প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি হজম করে স্বল্প পরিমাণ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন করে। অতিসম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া এন্ড লস অ্যাঞ্জেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ঝুড়ির সমান আকারের ফ্যুশন চুল্লী বানাতে সক্ষম হয়েছেন। এতে হাইড্রোজেন গ্যাসের একটি আইসোটোপ, ডিউটেরিয়ামে সিক্ত একটি স্ফটিক রয়েছে। তাপশক্তি দ্বারা উৎপন্ন বিদ্যুৎ প্রবাহ ডিউটোরিয়াম গ্যাসের ইলেকট্রনগুলোর এক প্রবল প্রবাহের উদ্ভব ঘটায়। এসব ইলেকট্রন কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সাথে সাথে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হয়। এ চুল্লীটিও প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি হজম করে। কিন্তু সে অনুপাতে পারমাণবিক শক্তি কম উৎপাদন করে। তবে উৎপন্ন শক্তি টিউমার নির্মূল, লাগেজ পরীক্ষা ও মহাকাশযান পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত হয়। চুল্লীটিকে চালু করার জন্য প্রয়োজন স্বল্প পরিমাণ তাপশক্তির। সামান্য পরিমাণ গরম পানি থেকেই এর প্রয়োজনীয় তাপশক্তি আহরণ করা সম্ভব।
নতুন টিকা
প্রায় অর্ধশতাব্দী যাবত গোটা দানের পদ্ধতিতে প্রচলিত। প্রচলিত টিকাগুলোতে মৃত রোগজীবাণুরে প্রোটিন ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এসব টিকা তৈরি, সংরক্ষণ ও প্রদান পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই বৃটিশ বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের টিকা উদ্ভাবন করছেন। এসব টিকায় রোগজীবাণুগুলোর ডিএনএকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব টিকা তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রদান তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল। এছাড়া আগে যেসব রোগের টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি এখন সেসব রোগের টিকা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফ্রি ডিএনএকে মানবদেহে ইনজেক্ট করা হলে তা জেনেটিক প্যাটার্নে হারিয়ে যায়। তাই বিজ্ঞানীরা স্বর্ণরেণুর সাথে ডিএনএ’র মিশ্রণ ঘটাচ্ছেন। এরপর এসব ডিএনএকে টিকা গ্রহণকারীর দেহে পুশ করছেন। পুশকৃত ডিএনএগুলো গিয়ে পৌঁছাচ্ছে সঠিক জেনেটিক প্যাটার্নে। এভাবে বার্ড ফ্লু, জেনিটক প্যাটার্নে। এভাবে বার্ড ফ্লু, জেনিট্যাল হার্পিস, এইচআইভি ও ফুসফুসের ক্যান্সারের মতো রোগগুলোর টিকা উদ্ভাবিত হয়েছে। দেখা যাক, এগুলো ব্যবহৃত স্বর্ণের দাম উলুস করতে পারে কিনা।
মাইক্রোচিপে মানবদেহ
দীর্ঘদিন যাবত নতুন ওষুধের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে পেট্রিডিশে জীবন্ত কোষের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ইঁদুর বা বানরের ওপর ওষুধ প্রয়োগ করা। আর তৃতীয়টি হচ্ছে রোগীর ওপর ওষুধ প্রয়োগ করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পর্যায়ক্রমে তিনটি পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়। তারপরও ওষুধ বাজারজাত করার পর অবাঞ্ছিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করতে হয়। আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল শুলার জানতেন, ওষুধের কার্যকরিতা রোগীর দেহের জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর যতটা নির্ভরশীল তারচেয়ে’ বেশি নির্ভরশীল দেহের বিপাক প্রক্রিয়ার ওপর। একটি ওষুধ লিভার দ্বারা প্রথমে বিশ্লেষিত হয়। এরপর ক্ষুদ্রান্ত্র দ্বারা শোষিত হয়। অবশেষে তা দেহের চর্বি দ্বারা গৃহীত হয়। তাই মাইকেল শুলার একটি কৃত্রিম মানবদেহ নির্মাণ করেছেন। আর তার সহযোগী গবেষক গ্রেড ব্যাক্সটার এ কৃত্রিম দেহকে ডাকটিকিটের সমান আকারবিশিষ্ট মাইক্রোচিপে রূপান্তর করেছেন। এ খুদে দেহে জীবন্ত মানবকোষগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে। নয়া ওষুধকে প্রথমে কৃত্রিম রক্ত প্রবাহের সাথে মেশানো হয়। এরপর তা মাইক্রোচিপে প্রবাহিত করা হয়। এতে অনেক ওষুধের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রথাসিদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে এতদিন জানা যায়নি। কীটনাশক ওষুধের অন্যতম উপাদান ন্যাপতালিন ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে ফুসফুসের ক্যান্সারকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত ওষুধ টেগাফুর কোলন ক্যান্সারকেও নিয়ন্ত্রিত করতে সক্ষম। ওষুধ নির্মাণকারী সংস্থাগুলো এখন নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য শুলার-ব্যাক্সটার পদ্ধতিকে ব্যবহার করছে। এতে এসব সংস্থার ক্লিনিক্যাল টেস্ট বাবদ ব্যয় বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে আমেরিকার এফডিএ সংস্থাটি এখনো এ পদ্ধতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি। কেননা এতে অবাঞ্ছিত বিতর্কের উদ্ভব ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

আখতার হামিদ খান