বাংলাদেশে ইংরেজি শিক্ষা,ইংরেজি শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইংরেজির ভূমিকা আজ অবিসংবাদিত। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ইংরেজি এখন অপ্রতিদ্বনদ্বী ভাষা। উন্নত ও অনুন্নত বিশ্বের সর্বত্রই জনগণ আজ ক্রমশ ইংরেজির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। ইংরেজি জানা শিক্ষার্থীরা আজ সর্বত্রই ভালো ভালো চাকরি হাতিয়ে নেবার সুযোগ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই শোচনীয়। আমরা যদিও দু’শ বছর ইংরেজদের দ্বারা শাসিত হয়েছি। তথাপি ইংরেজিকে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারিনি। সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণা করার মাঝে গৌরব থাকতে পারে। কিন্তু তার ভাষাকে ঘৃণা করার মাঝে কোনও গৌরব নেই। আর যদি সেই ভাষাটি হয়ে থাকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উৎস মূল। তাহলে তাকে অবহেলা করা মানে নিজের অস্তিত্বই বিপন্ন করার শামিল।

স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের নীতিনির্ধারকগণ ইংরেজি বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। স্কুল পর্যায়ে ইংরেজির পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করার বিষয়ে এই ব্যর্থতা যেমন নজরে পড়ে, ঠিক তেমনি এই পর্যায়ে যোগ্য ইংরেজি শিক্ষক নির্বাচনেও ব্যর্থতা সুস্পষ্ট। আরও পরিতাপের বিষয় এই যে, সরকারি ও আধাসরকারি স্কুলগুলোতে ইংরেজির এই নাজুক অবস্থা পরিস্ফুট হলেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো এ বিষয়ে উত্তরোত্তর সাফল্যের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের নীতিনির্ধারণের কাজটির সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের সন্তান-সন্ততিদের বেশিরভাগ আবার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে লেখাপড়া করে থাকে। ফলে নীতিনির্ধারণে তাদের যে ব্যর্থতা তার কুফল দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের অভিভাবকরা ভোগ করলেও দেশের অভিজাত শ্রেণী এই ক্ষতির শিকার নন। শিক্ষাব্যবস্থায় এই যে একটা বৈষম্যমূলক দ্বৈত অবস্থা বিদ্যমান, তার একটা বিষফল, দেশ গড়ার কাজে আমাদের তরুণ সমাজের মাঝে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় না।

এখন আসল কথায় ফিরে আসি। ঔপনিবেশিক শাসনামলে বৃটিশ শাসকগণ শুধুমাত্র শাসন-শোষণের লক্ষ্যেই এতদাঞ্চলের জনগণকে ইংরেজি বুলি শিখানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইংরেজি আজ শুধু ইংল্যান্ডের ভাষা নয়। এটা এখন বিশ্বজনীন ভাষা। পৃথিবীর প্রায় ৫০টি দেশের রাষ্ট্রভাষা অথবা অন্যকোনো ভাষার সঙ্গে ব্যবহৃত রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে ইংরেজি। পৃথিবীতে ইংরেজি ভাষাভাষী জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪২%। আলাস্কা থেকে ওশেনিয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক যোগাযোগের অত্যন্ত প্রভাবশালী ভাষা হলো ইংরেজি। বর্তমানে ইংরেজি চর্চা থেকে দূরে থাকার অর্থ হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব তথা উন্নয়নকে আরো হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া। মেঘমুক্ত দ্বিপ্রহর সূর্যকে কি অস্বীকার করা যায়?

আমাদের এ অঞ্চলের জনগণ বিশেষ করে মুসলমানগণ বৃটিশ শাসনের শুরু থেকেই ইংরেজির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আসছিলেন। ইংরেজির প্রতি তাদের সিদ্ধান্তের মাঝে কিছুটা পরিবর্তন আসে আলীগড় আন্দোলনের পর থেকে। সময়ের আবর্তনে এই ভূখন্ডে ইংরেজির বাস্তবতা ক্রমশ: বড় হয়ে দেখা দেয়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও ইংরেজিতে পাঠ করা হয়। আজকের ভারতে প্রতিদিন ৩০০ ইংরেজি দৈনিক প্রকাশিত হয়। ভারতীয় কিংবা ভারতীয় বংশোদুত বৃটিশ নাগরিকদের অনেকেই ইংরেজি সাহিত্য চর্চায় বিশেষ পারদর্শিতা প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যে নিজেদের আসন অধিকার করে নিয়েছেন। যদিও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনও প্রকার অংশীদারিত্বের কথা জানা যায় না।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণী থেকে স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত ইংরেজি একটি আবশ্যিক বিষয়। আশ্চর্য় হলেও সত্য যে, সুদীর্ঘ ৪০ বছরের ইংরেজি চর্চার দ্বারা কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে আমাদের শিক্ষার্থীগণ ইংরেজি বর্ণমালাগুলোর সঙ্গে পরিচয় আর টেন্স ভিত্তিক কিছু ইংরেজি বাক্য মুখস্থ করা ছাড়া আর কিছুই শিখবে না। ইংরেজি, ভাষার প্রায়োগিক দিকটাকে উপেক্ষা করে কেবল নৈর্বক্তিক প্রশ্নপত্র প্রবর্তনের ফলে ছাত্র-ছাত্রীগণ ইংরেজি গ্রামার চর্চার ঝামেলা থেকে নিজেদের মুক্ত করে নিয়েছে। শুধুমাত্র Essay, Letter, Application Comprehension ইত্যাদি পরীক্ষায় Common ফেলানোর দ্বারা তারা একটির পর একটি পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে চলছে। প্রকৃত প্রস্তাবে ইংরেজি ভাষা শেখা কিংবা এই ভাষায় দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে তাদের পাস করার কোনও সম্পর্ক থাকছে না। আর এভাবে ক্লাসের পর ক্লাস উৎরে যাওয়া শিক্ষার্থীরাই আবার এক সময় স্কুল বা কলেজে ইংরেজি শিখন বকে যাচ্ছেন। ফলে অচলাবস্থা কাটছে না। কোনও বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনের জন্য ভাষা বিজ্ঞানের স্বীকৃত পর্যায়গুলো নিম্নরূপ :
১. শ্রবণ ও অনুধাবন (Listening and Understanding)
২.কথন (Speaking)
৩. পাঠন (Reading)
৪. লিখন (Writing)
আমাদের শিক্ষার্থীগণ ইংরেজি নিজেরা যেমন বলতে পারে না তেমনি আবার অন্যের মুখ থেকে শুনেও বুঝতে পারে না। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় যে, বর্হিবিশ্বে পড়তে যাওয়া আমাদের শিক্ষার্থীগণ TOEFL পরীক্ষায় Listening Comprehension এ ভালো করতে পারে না। এক্ষেত্রে তারা না বুঝে অনুমান নির্ভর উত্তর বাছাই করে থাকে।

আমাদের শিক্ষার্থীগণকে ইংরেজিতে দক্ষ করে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদী এক সর্বসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। বিগত অর্ধশত বছরে ইংরেজি ভাষাকে অনেক পরিবর্তন সঠিক হয়েছে। নতুন করে এতে অনেক কিছু যোগ হয়েছে। কিন্তু আমাদের ইংরেজি পাঠ্যক্রমে এর পরিবর্তনের কোনও ঢেউ লাগেনি। আমরা সেই অবস্থানেই রয়ে গেছি। যেমনি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন।’ ‘‘ভূতের পা পেছনের দিকে, বাংলাদেশের সকল সামাজিক চেষ্টারই পা পেছনের দিকে।

উল্লেখ্য, আমাদের দেশে বর্তমানে যে Grammar Translation নির্ভর ইংরেজি ২য় পত্রের পাঠ্যসূচী চালু আছে, তা ১৮৩৫ সালে ব্যাবিংটন ম্যাকইলে কর্তৃক প্রণীত হয়েছিল। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে যথার্থ ভাষাজ্ঞান হয় না। পিঞ্জরাবদ্ধ ময়নার মতো তারা কেবল কতগুলো শেখানো বুলি আওড়াতে পারে। এর বাইরে নতুন কিছুই না। তাই এ অন্তঃসার শূন্য ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি রসালো সমালোচনা হচ্ছে এভাবে To know everything about something rather than the thing itself ভাবলে হতাশ হতে হয় যেখানে ১৭৪০ সালে ভাষা শিক্ষার বিষয়ে সংঘটিত Reformation Movement এর পর Grammar Translation method যারা ইউরোপ থেকে বিদায় নেয়, সেখানে আমরা আজও সেই বস্তাপচা পদ্ধতিটির অনুরসণ করে যাচ্ছি।

বাংলার ন্যায় ইংরেজি ভাষার ও লিখিত রূপের সঙ্গে উচ্চারণের ভিন্নতা রয়েছে। আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষার যে অভাবিত পুরাতন যে পদ্ধতি চালু আছে। তাতে ইংরেজির শুদ্ধ উচ্চারণের বিষয়টি একেবারেই অনুপস্থিত। এ জন্য দেখা যায় যে, ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স করা ছাত্ররাও শুদ্ধ উচ্চারণে অভ্যস্ত নয়। ইউরোপীয় টেলিভিশনগুলোর কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে ১৯৭০ সাল থেকে বিবিসি ‘Follow me’ নামে একটি ইংরেজি অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে। অনুষ্ঠানটি তার যাত্রালগ্ন থেকেই যারা বিশ্বের ইংরেজি শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়েছে বলে জানা যায় । একমাত্র চীনেই এ অনুষ্ঠানটির ৫০ মিলিয়ন দশক রয়েছে। এহেন চমৎকার ইংরেজি অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের তরুণসমাজের মাঝে তেমন সাড়া জাগাতে সমর্থ হয়নি। তার একমাত্র কারণ হলো অনুষ্ঠানটি বোঝার মতো প্রাথমিক ইংরেজি জ্ঞান আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে নেই।

যে কোনও ভাষার মুল উপাদান তার শব্দভান্ডার। বহু ভাষার সংমিশ্রণে গঠিত ইংরেজি ভাষারও রয়েছে একটা বিশাল শব্দ ভান্ডার British National Census (BNC) এ লিখিত ও কথ্য ইংরেজি থেকে বাছাই করে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ইংরেজি শব্দ বাছাই করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আধুনিক ইংরেজি ব্যাকরনে Deriving Lo lending compounding ইত্যাদি পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদেরকে শব্দ ভান্ডার সমৃদ্ধ করার শিক্ষা দেয়া হয়। এই পদ্ধতিতে ইংরেজি ভাষার গভীরে না গিয়েও শিক্ষার্থী নিত্য নতুন ইংরেজি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের পাঠ্যসূচিতে এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির আদৌ কোন উপস্থিতি নেই। এর চেয়েও কঠিন বাস্তব আরেকটি বিষয় হলো এই যে, আমাদের প্রাথমিক মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক পর্যায়ে যে ইংরেজি পাঠক্রম চালু আছে তার একটির সঙ্গে আরেকটির কোনও সুষম সমন্বয় নেই।

ইংরেজি শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় শিক্ষক প্রশিক্ষণের বিষয়টি মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে সরকারি যে টিচার্স ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু আছে তা ইংরেজি শিক্ষকদের জন্যে যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে আধুনিক ও অগ্রসর চিন্তার এখনই সময়। নতুবা অদক্ষ শিক্ষকের হাতে পড়ে তৈরি হবে আরো অদক্ষ শিক্ষার্থী। আর তারাই পরবর্তীতে আবারো অলংকৃত করবে নতুন শিক্ষকের পদ। এভাবে অচলায়তন না ভেঙ্গে ক্রমশ: তা পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতার করে তুলবে।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করে পশ্চিমের জাতিসমূহ আজ ঈর্ষনীয় অগ্রগতি সাধন করেছে। তাদের উত্তরণের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বর্তমানে পশ্চিমী সভ্যতার একমাত্র বাহন হলো ইংরেজি ভাষা। কাজেই আর অযথা সময় ক্ষেপন নয় আমাদের নীতিনির্ধারকগণের উচিত অবিলম্বে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভাষায় দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্যে একটি বাস্তব সম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করা যাতে আমাদের তরুণরাও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। ইনসেট

ইংরেজি কথোপকথনে পারদর্শী স্বদেশী ব্যক্তিদের ভাড়া করে কোরিয়ান ইংরেজি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কলেজ প্রবেশিকা পরীক্ষায় Listening Comprehensive পরীক্ষা যোগ করা হয়েছে এবং পাঠ্য পুস্তকের বিষয়সূচিতে ইংরেজি কনভারসেশানের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি উৎসাহী ও মেধাবী ছাত্রদেরকে ইংরেজি বিষয়ে পারদর্শী করে তোলার জন্যে দু’তিন বছরব্যাপী ইন্টারভিউ গ্রহণের পরিকল্পনা দিয়েছে। কোরিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ ইউন দে বলেন, ‘‘ইংরেজি হলো একটি গাড়ি চালকের লাইসেন্স বা কম্পিউটার স্কিল এর মতো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটা অপরিহার্য হাতিয়ার। একে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি হুমকি বিবেচনা করা উচিত নয়।

এশিয়ার যে কয়টি দেশ পশ্চিমা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পাল্লা দিয়ে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করতে পেরেছে। তারাও স্ব স্ব দেশে ইংরেজি শিক্ষার ওপর যথাযথ গুরুত্ব দিয়েই এই সফলতার সোপানে পৌঁছেছে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড এই দেশসমূহের মাঝে অন্যতম। দক্ষিণ কোরিয়ায় ইংরেজি শিক্ষা কতটা গুরুত্ব পেয়েছে তা Far Eastern Economic Review পত্রিকার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এতে ‘Lingua Franka’ বা ভবিষ্যতের ভাষা নামে দক্ষিণ কোরিয়ার ইংরেজি শিক্ষার ওপর যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে তা বাংলাদেশী পাঠক-পাঠিকাদের জন্যে অনুবাদের মাধ্যমে নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।

ভবিষ্যতের ভাষা: ‘ইংরেজি শিখ, নচেত পশ্চাতগামী হবে’’ ব্যবসায়ী শিক্ষাবিদগনের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন কোরিয়ান প্রেসিডেন্ট।
এস.কে কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান চোয়ে তায়ে ওন, যিনি আমেরিকায় শিক্ষাপ্রাপ্ত যখন পরামর্শ দেন যে, কোম্পানির সকল কর্মচারীকে তিন বছরের মাঝে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতেও শিখতে হবে। তখন তারা আশ্চর্য হয়েছিলো। বলা যায় একথা তাদের বিশ্বাস হতে চায়নি। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে ছিলেন বদ্ধপরিকর। কোম্পানির এক মিটিংয়ে তিনি এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, যোগাযোগের (ভাষাগত) সমস্যা ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কোম্পানির মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে হলে ইংরেজি ভাষায় ব্যাপক চর্চা আবশ্যক।’’ কর্মচারীগণ ইংরেজি শিক্ষার জন্যে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। ছ’মাস পর এখন অনেক কোম্পানির মিটিং ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইংরেজি ভাষায় যে সকল প্রতিবেদন লেখা হয় তা অতি সাধারণ নিম্নমানের।

চোয়েই কোরিয়ার একমাত্র ব্যক্তি নন। যিনি একুশ শতকে ইংরেজির গুরুত্ব সম্পর্কে আশংকা প্রকাশ করেছেন। জাপান এবং এশিয়ার ইংরেজি শিক্ষিত দেশের তুলনায় আশংকাজনকভাবে পেছনে বাড়ায় কোরিয়ার অনেক অর্থনীতিবিদ। শিক্ষাবিদ ইংরেজি ভাষাকে অফিসের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহারের ওপর জোর দেন এবং এই যুক্তি দেখানো হয় যে, বর্তমান বিশ্বায়নের এই যুগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতির যোগ্যতা প্রমাণে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। প্রেসিডেন্ট কিমের সতর্কবাণী কোরিয়ানদের সঙ্গে বিপুল সাড়া জাগিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। তিনি নববর্ষের প্রেস কনফারেন্সে জনগণের উদ্দেশে ইংরেজি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।

বিলিয়ন ডলার খরচে ভাষা স্কুল গড়ে উঠছে। ছোট শিশু থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী। নির্বাহী সকলেই এই আন্তর্জাতিক ভাষা শিখতে চেষ্টা করছেন। টোফেলে যে সকল বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকধারী ভালো স্কোর করতে পারে না, তারা ভালো কাজ পায় না। কোরিয়াতে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়ে যাওযায় বিদেশী বসদের সঙ্গে কাজ করতে ইংরেজি শিক্ষা করা তাদের জন্যে অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া অর্থনৈতিক সংকট এবং ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহার ইংরেজি শিক্ষাকে পূর্বের তুলনায় আরও অধিক গুরুত্ববহ করে তুলেছে।

‘‘চলমান সাগর তরঙ্গের মতই একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’’- বললেন কোরিয়ান ঔপন্যাসিক বব কোহ ইল। দু’বছর আগে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা বিষয়ক এক বিতর্ক অনুষ্ঠানে তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেন। তার লেখা ‘জাতীয় ভাষা বনাম আন্তর্জাতিক ভাষা’ নামক গ্রন্থে এর ভবিষ্যৎবাণী করেন যে, ইংরেজি ভাষার ব্যাপক ব্যবহারে কোরিয়ান ভাষা কালক্রমে হারিয়ে যাবে। ইংরেজি শিক্ষার এই ব্যাপকতা দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তার এই মতামত জাতীয়তাবাদীদের ক্ষিপ্ত করে তোলে।

কোরিয়ান প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘ডংগা ইলবো’ কর্তৃক পরিচালিত এক অনলাইন জরিপ থেকে দেখা যায় প্রায় ৬৩% উত্তরদাতা ইংরেজি অফিসিয়াল দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী। ইংরেজির গুরুত্ব বিষয়ে রচিত এক নিবন্ধে কোরিয়ার বৃহত্তম ও প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘চোযান ইলবো’ মন্তব্য করে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্বল ইংরেজির কারণে অনেক সময় কূটনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ে কোরিয়াকে ছাড় দিয়ে আসতে হয়েছে।

১৯৯৭ সালে কোরিয়ার উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা আমেরিকায় গেলে তাকে কোরিয়ার অর্থনৈতিক সংকট সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। আইএমএফ এর হস্তক্ষেপ ব্যাপারে যখন ইংরেজিতে তাকে প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি বার বার ‘আমি জানি না’ বলতে থাকেন। পত্রিকাটি লিখেছে, ফলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কোরিয়ার অর্থনীতিতে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। পত্রিকা আরও উল্লেখ করে। যেখানে বিশ্বের ওয়েব সাইটের ৮০% এর অধিক ইংরেজি ভাষায়। যেখানে ইংরেজি না শিখলে এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে তারা যে পিছিয়ে পড়বে। তা বলাই বাহুল্য।

অর্থনৈতিক সংকট কোরিয়াকে ইংরেজির উন্নয়নে বাধ্য করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা এখন ইংরেজি শিখছে। বিভিন্ন কোম্পানি এখন ইংরেজিতে সাক্ষাতকার গ্রহণ করছে এবং কোম্পানির বিভিন্ন মিটিং এ ইংরেজিতে বক্তব্য দেয়ার ব্যাপারে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইংরেজি জানার দক্ষতা চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ করে উচ্চ কারিগরি ও আর্থিক খাতসমূহের বেতন কাঠামোকে প্রভাবিত করে। সিউলের একটি চাকরিদাতা সংস্থা সিএও পার্টনার্থ এর কনসালট্যান্ট চো রোল হিউন বলেন- ‘‘একই পদে চাকরি করেও ইংরেজি জানার কারণে কেউ কেউ উচ্চতর স্কেলে বেতন পাচ্ছেন অর্থাৎ তাদের বেতন কাঠামোর মাঝে বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে।’’

বেতন নির্ধারণে ইংরেজি জানার প্রভাব লক্ষণীয়। ২৭ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক (বর্তমানে একটি শিপিং কোম্পানিতে কর্মরত) তার দুর্বল ইংরেজির কারণে গত জানুয়ারিতে তার পছন্দসই চাকরির সুযোগটি হারান। একটি কোরিয়ান কোম্পানির ওভারসিজ সেলস বিভাগের একটি পদে তিনি আবদেন করেছিলেন। তিনি সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানে যোগদান করতে এসে দেখেন যে উহা ইংরেজি ভাষায় পরিচালিত হচ্ছে। তিনি যেই পরিস্থিতি স্মারণ করে মন্তব্য করেন যে, ‘‘এটা ছিলো এমন অপ্রত্যাশিত ব্যাপার যে আমি অস্পষ্ট উচ্চারণে কেবলমাত্র বিরক্তিই বোধ করেছিলাম।’’ তার বিব্রত হওয়ার কারণও ছিলো। কেননা, তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ে মেজর এবং তিনি পাঁচ মাস আমেরিকায় বসবাস করেছেন।

কেবলমাত্র চাকরি সন্ধানিরাই ইংরেজি শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন তা নয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ পেশাজীবীদেরও ইংরেজি জ্ঞানকে শান দিয়ে নিতে হচ্ছে। কোরিয়ার প্রখ্যাত রবার্ট বয়ড্ কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার দৈনিক কাজ শেষে একটা প্রাইভেট স্কুলে ইংরেজি কনভারসেশন ক্লাসে যোগ দেন। ‘‘আমার নতুন সুপারভাইজার একজন জার্মান। আমি যদি তার সঙ্গে যথাযথভাবে কনভারসেশন করতে ব্যর্থ হই। তবে আমি পদোন্নতির কোনও আশা করতে পারি না।

যারা অল্প বয়সে শুরু করে, তারাও খুব একটা ভালো করতে পারছে না। কোরিয়ানদের কমপক্ষে দশবছর ইংরেজি শিক্ষা করা প্রয়োজন। তদুপরি অনেকেই বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হবে। অনেকটা এ কারণে যে, ইংরেজি ও কোরিয়ান এই দু’ভাষার মাঝে শব্দ, বর্ণ, বাক্য গঠন ও উচ্চারণের ক্ষেত্রে ব্যবধান বিস্তর। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো স্পোকেন ইংরেজির সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের পরিচয়ের অভাব। তাছাড়া ব্যাকরণ ও পঠন সম্বলিত একটা শক্ত কোরীয় শিক্ষাক্রম অনেকাংশে দায়ী বলে ভাবা হয়। স্কুলে আমাদের একটা বিশাল শব্দ তালিকা ও এলোমেলো ব্যাকরণের নিয়ম শিখতে হয়।’’ বললেন সিউলের কোরিয়া ইউনিভার্সিটির ইংরেজির মেজর চিম সিম হাই।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ইংরেজি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলে প্রায় কোনও ছাত্রই প্রাইভেটভাবে শিক্ষা না নিয়ে ইংরেজিতে কথা বলতে পারে না। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইংরেজির প্রফেসর চিম সিয়ংকন বলেন, ইংরেজি বলা পরীক্ষার কোনও অংশ না হওয়ায় এ ব্যাপারে ছাত্ররা উৎসাহবোধ করে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলে কলেজ পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের উপর তিনি জোর দেন।

সাম্প্রতিককালে টোফেল স্কোর অর্জনে কোরিয়ার শিক্ষা ব্যর্থতার একটা প্রমাণ মেলে। শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘চোযান ইলবো’ রিপোর্ট করে যে, জুলাই ২০০৯ এবং জুন ২০১০ সালের মাঝে ২১টি এশিয়ান দেশের মাঝে এক প্রতিযোগিতায় কোরিয়া নবম স্থান দখল করে। ফিলিপাইন সর্বোচ্চ স্কোর অর্জন করে এবং দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে ভারত।

একটা আশার বিষয় হলো এই যে, কর্মকর্তাগণ ইংরেজি শিক্ষার ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে অধিকতর বাস্তবানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা টে বিয়ং গ্যাপ বলেন, যখন আমরা ১৯৯৭ সালে প্রাথমিক স্কুলের ছাত্রদের জন্যে ইংরেজি কনভারসেশান চালু করেছিলাম। তখন জনসাধারণ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো এই ভেবে যে, ছেলেমেয়েরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু আমরা পিছপা হইনি। আমরা কোরিয়ার ইংরেজির উন্নয়ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবো।

ইংরেজি কথোপকথনে পারদর্শী স্বদেশী ব্যক্তিদের ভাড়া করে কোরিয়ান ইংরেজি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কলেজ প্রবেশিকা পরীক্ষায় Listening Comprehensive পরীক্ষা যোগ করা হয়েছে এবং পাঠ্য পুস্তকের বিষয়সূচিতে ইংরেজি কনভারসেশানের বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি উৎসাহী ও মেধাবী ছাত্রদেরকে ইংরেজি বিষয়ে পারদর্শী করে তোলার জন্যে দু’তিন বছরব্যাপী ইন্টারভিউ গ্রহণের পরিকল্পনা দিয়েছে। কোরিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স এর সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউ ইউন দে বলেন, ‘‘ইংরেজি হলো একটি গাড়ি চালকের লাইসেন্স বা কম্পিউটার স্কিল এর মতো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটা অপরিহার্য হাতিয়ার। একে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি হুমকি বিবেচনা করা উচিত নয়।

তবুও কোরিয়ায় ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হলো তাদের ভয়ংকর জাতীয়তাবোধ (গর্ব), যা তাদের ওপর কর্তব্যের নানা আক্রমণ এবং জাপান কর্তৃক উপনিবেশবাদী কালো স্মৃতি থেকে উদ্ভুত হয়েছে। এমনকি যদিও অধিকাংশ কোরিয়াবাসী ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেন। তথাপি অনেকেই এর অফিসিয়াল ভাষা করাকে অভিসম্পাত হিসেবে দেখে থাকেন। হালিউম ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও কূটনীতির প্রফেসর চিম ইয়াং মিয়াং যুক্তি দেখিয়ে বলেন যে, ‘‘যাদের ইংরেজি প্রয়োজন যেমন- ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তা, তারা ইংরেজিতে পটু বক্তা হবেন। কিন্তু সকলের জন্যে তা প্রযোজ্য নয়। যদি আমরা ইংরেজি অফিসের ভাষা করি তবে সবাই এটা শিখতে বাধ্য হবে এবং সেটা অপরিহার্যভাবে আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে দুর্বল করবে।

আখতার হামিদ খান