ভালো ছেলে , মার্কশিট

[ভালো ছেলে কে? সময় ও সমাজ পরিবর্তনের ধারায় সমাজের আপেক্ষিক বিষয়গুলোর ধারণার বদল ঘটে। এক সময়ের সংজ্ঞা পাল্টে যায়। পরিবর্তিত সংজ্ঞা পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে  তৈরি হলেও তা বাস্তব হতে পারে। কিন্তু তা যে সঠিক, তা কি বলা যায়? পরিবর্তিত ব্যবস্থায় ভালো ছাত্রের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। রপান্তরিত সংজ্ঞায় মার্কশিট ও গোন্ডেন জিপিএ-৫ ‘ভালো ছাত্র’ নির্ধারণ করছে। দেশ ও সমাজের জন্যে তার ফল কি ইতিবাচক না নেতিবাচক? এ প্রশ্ন নিয়ে আমরা ভাবছি না। দিকহীন ম্যারাথনে আমরা শরিক হচ্ছি ব্যক্তি ও নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। সমাজ ও দেশ থাকছে উহ্য। সমসাময়িক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি নতুন করে ভাববার সময় এসে গেছে; আর বিলম্ব নয়।]

কুয়শার উত্তরীয় পৃথিবী থেকে উবে যাবার অনেক আগেই যার ঘুম ভাঙে। অথবা ভোরে উঠে যে মানব সন্তান তার সফল কাঁধে জোঁয়াল ফেলে বেরিয়ে পড়ে ক্ষেতের উদ্দেশে ফসলের ঠিকানা খুঁজতে। যে শরীরের পেশিতে ধরে পিতার যৌবনের উত্তরাধিকার। যে পরে পিতামহের ষষ্ঠ ইন্দ্রীয়ের বাহক হয়ে নৈঋতে মেঘের ইশারা দেখে ফসলের ভবিষ্যৎ বলে দিতে। যে পারে প্রথম প্রহরেই দিতে হাল ‘ছয় কাঠা’ জামিতেÑ সেই হয় কাজের ছেলে। ‘বাপের বেটা’- আমাদের গাঁয়ে। কিন্তু এই আলোচনা সেইসব শক্তিধর বাপের বেটাদের নিয়ে নয়। এ আলোচনা এদেশের আশি শতাংশ ছেলেদের নিয়ে নয়, যারা প্রকৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মাটিতে স্বেদেয় প্লাবনে আনে ফসলের ঘ্রাণ, এমনকি তাদের নিয়েও নয়। আমাদের কথা দেশের তাবৎ কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করেন যারা সেই সব মধ্যবিত্তের উচ্চ মধ্যবিত্তের কিংবা উচ্চবিত্তের কিছু নিরেট ভালো ছেলেদের নিয়ে। এদেশের মধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার দুর্লভ সুযোগ পাওয়া মাত্র বিশ শতাংশদের নিয়েই এ আলোচনা।

এদের মধ্যে ‘নিরেট ভালো ছেলেরা’ এসব পরীক্ষায় অবিশ্বাস্য রকমের উচ্চ হারে নম্বর পেয়েছে এবং পাচ্ছে। এরা ‘লেটার’ পেয়ে যাচ্ছে হরহামেশা। এরা জিপিএ-৫ পাচ্ছে ঝটপট। এখন কয় বছর ধরেই ঘরে ঘরে গোল্ডেন জিপিএ-৫ এর বিচ্ছুরণ। বাড়িতে বাড়িতে হালি দেড় হালি জিপিএ-৫। এখন বিজ্ঞান বিভাগ মানেই গোল্ডেন জিপিএ-৫। বোর্ডের প্রথম দিককার স্থান অধিকারীদের আয়ত্তে এখন ৯০% নম্বর। এমনকি সাহিত্যেও শতকরা ৮০ ভাগ নম্বর। যে সাহিত্য তরুণ কোনো নির্দিষ্ট অন্ত নেই। শুরু আছে কেবল। তাতেও মিলেছে ‘অমানবিক’ নম্বর। এইসব চোখ ধাঁধানো ফলের ডামাডোলের মধ্যে যে ছেলের বিজ্ঞান বিভাগ সত্ত্বেও জুটেছে এ-গ্রেড কিংবা এ-মাইনাস তার পিতা-মাতা লজ্জায় মৃয়মান থাকছেন কখনো উল্লেখই করছেন না ছেলে এবার পরীক্ষা দিয়েছে। অমানবিক (!) নম্বর পাওয়া ছেলেমেয়েদের জ্বলজ্বলে উদাহরণ এনে নিজেরা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। কারণ মার্কশিটের একটু এদিক-সেদিক হলেই ফস্কে যাচ্ছে ‘ভালো কলেজ।’ ভেস্তে গেল ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর পরিকল্পনা। হারিয়ে গেল ভবিষ্যৎ জীবনের আর্থিক সচ্ছলতার নিশ্চয়তা! তাই যে করেই হোক কোচিং নিয়ে বাড়িতে টিউটর রেখে, নোট তৈরি করে এ ছেলেকে জিপিএ-৫ পেতেই হয়। এর পাচ্ছেও। দিনে দিনে এদের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকার কলেজগুলো দখল নিচ্ছে ‘ভালো ছেলেরা।’ তাদেরই এ বিশাল উত্থানে সাধারণ ছেলেদের জীবন বিপন্ন। সাধারণ নিজেদের নিয়ে বিভ্রান্ত। তাদের বাবা-মা একে তাকে ধরাধরি করে পরিশ্রান্ত। এদের জীবনের লক্ষ্য স্খলিত। এরা ভবিষ্যতে কী হবে বা হতে চায় কাউকে সঠিক বলতে পারে না। এরা ইপ্সিত গোলপেস্টের দিকে তাকায় আর ফুটো হওয়া বল নিয়ে ব্যর্থ ছেটে, দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

‘ক’ এবার এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছে জিপিএ-৫ নম্বর। বিজ্ঞানের ছাত্র। এ বিভাগ নিয়ে ঢাকায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বিজ্ঞান বিভাগ আছে এমন কলেজে ভর্তি হওয়া মুশকিল। সে কমার্সে ভর্তি হবে। অন্য একটি কলেজে। এ কলেজ কমার্সে ভালো করে। এর পরিচিতি কমার্স এর রেজাল্ট দিয়েই।

‘খ’ মঠবাড়িয়া থেকে পাস করেছে। এ-গ্রেড নিয়ে। বাবা কেরানী। ছেলেটি ঢাকা এসেছে পড়তে। ভর্তি হয়েছে একটি নৈশ কলেজে। তার বাবাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বরিশালের বিএম কলেজ তো দেশজোড়া খ্যাত, তা ছেড়ে ঢাকায় এলেন কেন?

ঢাকায় কত কিছু। এখানে থাকলে মনটা উঁচু হবে। তিনি হয়তো ছেলের উচ্চকাক্সক্ষা জন্ম নেবার কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। ঢাকার বাইরের বাসিন্দারা তাই ভাবেন। এ দুটো ঘটনা দেখে একটি সূত্র বেরিয়ে আছে। পড়ার বিষয়বত্তু নয়, উচ্চ শিক্ষার নিজস্ব ধারা নয়, কলেজ পরিচিতি এই। ঢাকার কলেজ পরিচিতিই প্রধান।

এবার এসএসসির ফল বেরিয়েছে। প্রথম স্তান অধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রেকর্ড মার্ক পেয়েছে। প্রথম কিংবা দশম যে স্থানই হোক। এরা প্রায় সবাই অভাবনীয় নম্বরের অধিকারী। কাগজে কাগজে; বেতারে টিভিতে এদর ইন্টারভিউ। মা-বাবার সাক্ষাৎকার। তাদের  ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পড়ার কাহিনী। গৃহশিক্ষক ছিল কি নেই। লিখে পড়াশেখার অভ্যাস না পড়ে? কেই প্রথম থেকেই নিয়মিত পড়েছে। কেউ আবার অবসরের ফাঁকে ফাঁকে। পড়াশোনা চলেছে শিক্ষক বা বাবা-মার সহায্যে, কারো প্রিয় সত্যজিৎ রায়। কারো হুমায়ূন আহমদ। গর্বিত মা-বাবা পাশে বসে কথা বলেছেন। পুত্র/কন্যার স্কুল ক্যারিয়ার কেমন ছিল বলেছেন। এ বছরই যে এমনটি ঘটল তা নয়। এরা  আমাদের ইতিহাসে নবাগত নয়। এসব চেহারা আমাদের অতি পরিচিত। প্রতি বছর একই আদল দেখা যায় ফল বেরোলেই। দেখি ও পড়ি তাদের ১০ কি ১২ ঘণ্টার পড়া শোনার ফল ও কাহিনী। কিন্তু বিগত দশ বছরের কাগজ ঘাটলে মনে হবে শুধু চেহারা বদলেছে মাত্র। কাহিনী সেই এক। এরা কেউ বলেছে কবিতার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। রাজনীতিতে তাদের অনীহা বিদেশ-কাতর প্রায় সকলেই। এদের পছন্দসই বিভাগ বিজ্ঞান কিংবা মানবিক ছিল এমন নয়। বিজ্ঞানে গেলে কিছু ভালো জায়গায় যাওয়া যায়, তাই বিজ্ঞান পড়েছে। চার/পাঁচজন টিউটর ছিলেন। পরীক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছে নিজেরাই, ‘পরীক্ষা স্মৃতিনির্ভর।’ তাই তাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কত ভালো জানে না। কত ভালো ধীশক্তির অধিকারী। এরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেছে বিদেশ যাবে। কেউ কেউ বিদেশেই অধ্যাপনা করবে। কেউ বলেছে বড় হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হবে। বলেছে এইচএসসির পর সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে। তবে বেশিরভাই ছাত্রই বড় হয়ে ডক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছে। এইসব ছেলেমেয়েই ভালো ছাত্র-ছাত্রী। অথবা এরাই ভালো অন্যদিকে যাসারা ৮-১০ ঘণ্টা পড়তে পারছে না। কিছুতেই মুখস্ত রাখতে পারছে না ফটোস্ট্যাট-নোট কিংবা অঙ্ক আয়ত্তে থাকছে না সে করছে খারাপ। পাচ্ছে বি, সি-গ্রেড। ড্রপ-আউট হয়ে মাস্তান হচ্ছে। ধরছে ড্রাগ। ভালো কলেজে ঢুকতে না পেরে অপছন্দের বিষয়ে পড়ছে।

আরেক দল পারিবারিক চাপে ভালো নম্বর পাবার চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে হতাশার ভুগছে। মা-বাবা টিউটোরিয়াল, টিচারের কাছে ছুটছেন। গড়পড়তা মাপের এই ছাত্রটি ভালো ছাত্র হবার চেষ্টার অপারগ হয়ে মানসিক বিকারগ্রস্ত হচ্ছে। আবার সারা বাংলাদেশের সেরা ছাত্রের সমাবেশ ভরপুর বিশেষ কয়টি কলেজে দেখা যায় আরেক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। এখানে যশোর কুমিল্লা ও ঢাকা সব বোর্ডের মেধাবী ছাত্রে মধ্যে শুরু শেষ লড়াই। এ লড়াই চলে পুরো টিম নিয়ে। ছেলে কিংবা মেয়েটির পুরোদলের লড়াই বাবা-মা, শিক্ষক ও সে নিজে সবাই মিলে এ টিম। এ তো সারা জীবন ফার্স্ট হয়েছে এখন কী করে সেকেন্ড হবে। তার আত্মীয়-স্বজন রেজাল্টের দিকে চেয়ে আছে। সে কী করে এদের নিরাশ করে? শুরু হয় ১০ থেকে ১৮ ঘণ্টা পড়া। স্নায়ুর প্রচ- চাপে এরা নিজের জীবনকে দায় মনে করে। আমাদেরই জানা মতে দুজন ফার্স্টবয় আত্মহত্যা করেছিল। একজন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। পালিয়ে দুজন বিদেশে চলে গেছে পরীক্ষা না দিয়েই। এরা সবাই পালাতে চেয়েছে এই চাপের মুখে। এদের ঘটনা আমাদের জানা। অন্যগুলোর পরিসংখ্যান আপনারাই দিতে পারবেন। ভালো ছাত্র তৈরির অদ্ভুত এই প্রতিযোগিতার সমাজ অভ্যস্তরে শুরু হয়েছে নানা রকমের অন্তঃস্রোত। যে কোনোভাবে ‘সাধারণ’ ছেলে তৈরির চেষ্টা ব্যহত হচ্ছে। স্বাভাবিক সন্তান তৈরির অবস্থাও লোপ পাচ্ছে। আর গুণগত পরিবর্তন ঘটছে কি? এ পরীক্ষা পদ্ধতির ফল হিসেবে ছোট হয়ে এসেছে শিক্ষা প্রেক্ষাপট। বিস্তৃত হবার বদলে তা দাঁড়িয়েছে এসএসসিতে, ঢাকার বাইরে তিনটি ক্যাডেট কলেজ ও ঢাকায় একটি স্কুল। ইন্টারমিডিয়েটে কয়েকটি বিশেষ কলেজ। অর্থাৎ কয়েকটি টিউটোরিয়াল, কয়জন শিক্ষক ও লাইব্রেরির বদলে ছোট্ট পড়ার ঘর।

বিগত দশ বছরের সেরা ছাত্রদের কর্মজীবনের অবস্থান দেখেলে হয়তো দেখা যাবে তারা সত্যি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা ব্যুরোক্র্যাট হয়েছেন। অর্থাৎ তার ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। এদের কয়জন বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ফিরেছেন? তাহলে দেশের কাগজের স্পেস খরচের কি দরকার ছিল? প্রশ্নের তো এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন তো এ-ও যে, একটি সমাজের সবল ধারা কি শুধু এরাই ধরে রাখে? একটি সমাজের অবয়ব পূর্ণাঙ্গ হয় কি কেবল এইসব সাধারণ কর্মজীবীদের নিয়ে? এদের মধ্যে দার্শনিক জন্ম নেবে না? শিল্পী গবেষক? কেউ কী হতে চান তেমন কিছু? লেখক, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ? জয়নুল অথবা ভাসানী? ধরে নেয়া গেল না হয় জয়নুল, ভাসানীকে তৈরি করতে হয় না। এমন ছেলে জন্ম দেয়া যায় না। এরা জন্মে যায় এটা উচ্চাভিলাষ নয়, দুর্ঘটনা। তাহলে যে সমাজে, যে সময়ে, যে জাতির জীবনে দুর্ঘটনা ঘটবে না, সে জাতির চালিকাশক্তি কে হবে? দুর্ভাগা সে জাতির মেধাবী সব ছাত্ররা হয়ে আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, ম্যাজিস্ট্রেট সৈনিক। কিছু পেশাজীবী একটি স্বনির্ভর সুন্দর জাতি গঠন করতে পারে কি? ওপরের এ প্রশ্নটি আরো স্পষ্টতর হবার প্রয়োজন আছে। কারণ বর্তমানের ভাবনা এখানেই নিহিত।

নিবন্ধের প্রস্তাবনায় দুটো মাঝারি ছাত্রের উল্লেখ আছে। প্রথমজন বিজ্ঞানের ছাত্র হতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন পড়বে কমার্স। অর্থাৎ কোনোরকম একটা কলেজ বেছে নিয়ে কিছু একটা পড়লেই হলো। এ ছেলে একা নয়, সহস্র উদাহরণের এ একটা মাত্র। এরা পড়বার জন্যই পড়ছে। হতে হবে বিএ। হতে হবে এম-কম। একটা কিছু পাস দিলেই হলো। ঐ বিষয়ের সম্ভাবনা কী! জাতীয় জীবনে এর আদৌ গুরুত্ব বাড়বে কি কমবে জানার দরকার নেই। জেনে লাভ নেই। তাকে টিকে থাকতে হবে। এবং সে জানে চাকরি জীবনে পেশা নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা কত গৌণ। ইন্টারন্যাশনাল রিলেসন্সে পড়ে মৎস্য বিভাগের দায়িত্ব পাওয়া যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। পদার্থবিজ্ঞান পড়ে বন বিভাগে। বাংলায় পড়ে পাবলিক রিলেশন্সে। কমার্সে পড়ে সং¯ৃ‹তি মন্ত্রণালয়ে। তাই শিক্ষা নয়, একটি ডিগ্রি চাই। চাই সার্টিফিকেট। দ্বিতীয়জনও একটি ডিগ্রি চায় এবং সেক্ষেত্রে বরিশালের বিএম কলেজ না হয়ে ঢাকার একটি নৈশ কলেজে কেন (ঢাকার ঐ নৈশ কলেজের চেয়ে বিএম কলেজ ভালো হওয়া সত্ত্বেও)? এখানে ডিগ্রির অনুসঙ্গে যোগ হবে : ‘ছেলে ঢাকায় থেকে লেখাপড়া করে’Ñ এ বাক্যটি। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক উত্তরণের প্রেক্ষাপট রচিত করছে এ পড়া বা ডিগ্রি।

এ দুজন প্রাপ্ত মার্কশিট অনুসরে ‘এভারেজ’ ছাত্র। এখানে আরো কয়েকটি এভারেজ ছাত্রের কথা উল্লেখ করা  হচ্ছে :

ক) সিলেট থেকে পাস করেছে। মেয়েটির অবস্থান বি-গ্রেড বিভাগে। বিজ্ঞান ছিল।

খ) ঢাকার জয়দেবপুরে থেকে বিজ্ঞান বিভাগেই। পেয়েছে এ-মাইনাস

গ) জামালপুর থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পেয়েছে এ-গ্রেড।

ঘ) ঢাকার রামপুরার ছাত্রী। পাস করেছে মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছে এ-মাইনাস।

ঙ) গোপালপুরের ছেলেটি মানবিক বিভাগেই এ-মাইনাস পেয়ে পাস করেছে। সে পরীক্ষার সময়ে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছিল।

এরা সত্যি কি ‘এভারেজ’ ছাত্র? সে প্রশ্ন এখানে অবান্তর হয়ে যাচ্ছে মার্কশিটের কারণে। মার্কশিট তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিচ্ছে, তা তো সত্যি। মার্কশিট তাদের কী বলে প্রতিপন্ন করে তুলছে? অযোগ্য এভারেজ। গড়পড়তা ছাত্র। মার্কশিটের একটু এদিক ওদিক হয়ে যাওয়ায় আজ যেন ওদের স্বর্গচ্যুতি ঘটেছে। স্মৃতির পরীক্ষায় ‘মেমোরি টেস্ট’ পরীক্ষায় পিছিয়ে  পড়া এসব ‘গড়পড়তা ছাত্রদের কেউ আর বলে না ভালো ছাত্র। সে বিশেষণ উঠে গেছে। উঠেছে জিপিএ-৫ এর খোঁচায়। এখনই তাদের জীবন দর্শন বদলে ফেলতে হবে। যে কোথাও ঢুকতে হবে ডিগ্রির জন্য। কিন্তু তারপর? এই তার পরের উত্তর খুঁজতে হবে এখনই। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। বাবা নাম করা ডাক্তার। মা শিক্ষক। তাদের মেয়ে পাস করল এ-গ্রেড নিয়ে। পুরো পরিবারে লেগে গেল তুমুল অশান্তি। একে অন্যকে দোষারোপ এবং মূল ক্রিমিনাল সাব্যস্ত হলো মেয়েটি। কেন সে গোল্ডেন এ-প্লাস পেলো না? এক পর্যায়ে মেয়েটি হয়ে উঠলো বিদ্রোহী। আমি এমনকি করেছি যে তোমরা আমাকে এসব বলছো? বাবা, তুমি তো আইএতে এক বছর ফেল করেছিলে। তাতে কি এফআরসিএস হতে পারোনি? পেরেছেন। পারার কথা। এভারেজ ছাত্ররাই পেশাজীবী হবে। এটাই নিয়ম ছিল। নিয়মটা উঠে গেল কেন?  ‘অলথ্রু’ ফার্স্ট ক্লাস পাবে না তবু ভালো পেশায় স্বাচ্ছন্দ্যে সম্মানে থাকবে। তার সন্তান থাকবে এ বাংলায় দুধে ভাতে। এটাই স্বাভাবিক ছিল। বাবা খ্যাতনামা গায়ক ছিলেন।  মা কোনো এক মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। তাদেরই একমাত্র ছেলে যে অবসরে ছবি আঁকে গান গায়। বরাবর স্কুলে সবকিছুতে ফার্স্ট হয়। এবার এসএসসিতে পেয়েছে এ-গ্রেড। শুরু হলো বাড়িতে কান্নার চাপা অনুরণন। মৃতপুরীর অবস্থা এসে গেল। এ বাড়ির বাবা-মা সন্তানকে কোনো তিরস্কার করছেন না। বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। বাড়ির আবহাওয়া ভারি করে তুলেছেন। ছোট মেয়েটি ভয়ে সেঁটে আছে। কে তাকে খেতে দেয়। কে গোসল করায়। এই ভালো ছাত্রের ‘উচ্চকাক্সক্ষা’ ছিল সে স্থপতি হবে। বাবা-মারও তাই। তাকে শিল্পী হবার জন্য পড়ানো হচ্ছে না। হয়নি। সে ভাবছেও না শিল্পী হবার জন্য তার এমন কঠিন মুখস্থবিদ্যা রপ্ত করতে হবে। চেষ্টা করেছে। তবু কেন ফার্স্ট ডিভিশন ও লেটার ফস্কে গেল নিজেও জানে না। তাহলে এই গড়পড়তা সাধারণ ছাত্রটিও তার বৃত্ত থেকে ছিটকে গেল? ভালো ছাত্র হলো না বলে? মার্কশিট সভ্যতার ক্রীতদাস হয়ে। সে কি গত্যন্তর না পেয়ে শিল্পী হবে? তা কি আদৌ হওয়া উচিত?

মার্কশিটের এই ডামাডোলে ভালো ছাত্রের সংজ্ঞাই পাল্টে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যি কি তাই বিদেশে বা উন্নত বিশ্বে উচ্চ শিক্ষার স্থান নির্ধারণই বড় কথা নয়। বড় কথা ‘গ্রেড’ পাওয়া তাদের গ্রেড পাওয়া নির্ভর করে সারা বছরের ক্লাস ফল, সাময়িক টেস্ট এবং ছাত্রের সামগ্রিক ‘এটিচ্যুডের ওপর। সেখানে উচ্চ শিক্ষা সবার জন্য নয়। ছাত্রের গতি-প্রকৃতিনির্ভর, ইচ্ছানির্ভর বিষয় পছন্দের ওপর। আমাদের এখানে ভালো ছাত্র তারা যারা কমপক্ষে জিপিএ-৫ পায়। আমাদের দেশে শত শত ছেলেমেয়ে এই মার্কের আওতার এসে গেছে। বছরে বছরে এ হার বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। জাতীয় মেধা কি তবে ব্যাপক হারে বেড়ে যাচ্ছে? এতে কি ধরে নিতে হবে দেশের ছেলেরা প্রতিভাবান হয়ে উঠছে। আমাদের শিশু-কিশোরদের মেধা জাতীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে? যেমন :

ক) ধানমন্ডির বাসিন্দা এসএসসিতে নম্বর পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। রোগা পাতলা ছেলেটি। তিন ভাইয়ের মধ্যে মধ্যম। তিনজন টিচারের কাছে কোচিং-এ যেতো। একজন বাসায় এসে অঙ্ক করাতেন। একজন গরীব আশ্রিত বাড়িতে তার নোট তৈরি করে দিতেন। সংগ্রহ করতেন।

খ) হাতিরপুলে থাকে। একটি বিশেষ স্কুলের চারজন স্যার তাকে দেখিয়ে দিয়েছেন পড়া। ফটোস্ট্যাট করেছে সেইসব নোট। ১২ ঘণ্টা পড়েছে। রেজাল্ট আশানুরূপ জিপিএ-৫ হয়নি।

গ) কলাবাগানে কোচিং সেন্টারে ছয় মাস নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। তার বাবার অফিসে সব নোট ফটোস্ট্যাট করেছে। প্র্যাকটিক্যাল ভালো দিয়েছে। সারেরা খুব ভালোবাসেন তাকে। পেয়েছে জিপিএ-৫। কোচিং-এর সময় তার গৃহবধূ মা সবসময় সঙ্গে থেকেছেন। বাইরে বেঞ্চে বসে বসে সেলাই করেছেন বা অন্য মায়ের সঙ্গে গল্প করেছেন।

ঘ) ধানমন্ডির প্রাসাদোপম কোচিং সেন্টার যাদের নিজস্ব বাহন আছে। স্কুলের মতো করে কোচিং করা হয। ব্রেকে টিফিন দেয়া। নিয়মিত বেতনের রসিদ বই আছেÑ এমন একটির সহযোগিতায় পেয়েছে গোল্ডেন এ-প্লাস।

ঙ) প্রথম কুড়িজনের মধ্যের একজন। নিয়মিতভাবে বাসায় ছয়জন শিক্ষক ৬ বিষয়ে পড়াতেন বিকেল ৩টায় খেয়েদেয়ে টেবিলে বসতো। রাত ১০টায় টেবিল ছাড়তো। একই টেবিলে পর্যায়ক্রমে পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিদ্যা, বাংলা, ইংরেজি পড়িয়ে উঠে যেতেন শিক্ষক। তাকে টেবিল ছাড়তে হতো না। রাত ১০টায় ব্রেক নিতো ৪৫ মিনিটে। ব্রেকেই খাওয়া-দাওয়া। তারপর ১২টা। পর্যন্ত সেই টেবিলেই। এরা সবাই ঢাকার ছেলে। ঢাকার প্রায় একই গ্রুপের শিক্ষকদের কাছ তেকে ফটোস্ট্যাট করা নোট নিয়ে পড়েছে। কখনো একই শিক্ষকের কাছে বিভিন্ন মাপের ছাত্ররা ফটোস্ট্যাট নোট পড়ে একটি বিশেষ ধরনের উপস্থাপনায় একই ধরনের নম্বর পেয়ে যাচ্ছে। রেজাল্ট হচ্ছে সেই জিপিএ-৫।

ষাটের দশকেও মা-বাবা মেটামুটি একটা স্কুলে ছেলেমেয়ে কে পাঠিয়ে দিতেন। প্রধানত দেখতেন যোগাযোগের সুযোগ সুবিধা। বাড়িতে এ সময় পড়াশোনাটা মা কিংবা বাবা অনেক সময় বয়জ্যেষ্ঠ ভাই-বোন দেখিয়ে দিতেন। নিজেরা পড়া বুঝে বড় ক্লাসের দু-একটি বই দেখে নিজেদেরই নোট তৈরি করে নিতো। স্কুলে টিফিনের সময় বা ছুটির শেষে প্রিয় শিক্ষক দেখে দিতেন; ক্লাসের দুর্বল ছেলেটির অভিভাবককে ডেকে বিশেষ যতœ নেবার কথা বলা হতো। ভালো রেজাল্ট করা ছেলেটি এসএসসির আগে মাত্র তিন মাস পড়তো কোনো শিক্ষকের কাছে। দেখা যেত এসব ছেলেদের কাছে ডেকে পড়িয়েছেন স্বয়ং হেডমাস্টার। অঙ্কে কাঁচা ছেলেটির বাবার বন্ধুত্বের সুবাদে। কিংবা ছেলেটির একাগ্রতায়। তারা পড়ানো বলতেন না- বলতেন দেখানো। আর দেখতেন নাকের ডগায় চশমা টেনে ছাত্রের মাথায় গাট্টা মেরে। তারা পরীক্ষকের কাছে নিজের ‘অরিজিনালিটি’ দেখানোর কথা বলতেন। বলতেন নিজে কতটা বুঝেছে এবং সে কথা ‘নিজের ভাষায়’ কেমন করে পরীক্ষককে বুঝতে তার ওপরই নম্বর নির্ভর করছে। এসবের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসতো ‘ভালো ছাত্র।’ এ ছাত্র ফার্স্ট ডিভিশন পাবে। তার লক্ষণই আগে ভাগে দেখা যেত। এর অন্যান্য আচরণ নরমাল। সে পেয়ারা গাছে চড়ে। ফুটবল খেলে। স্কাউটিং করে। স্কুলের নাটকেও থাকে। তর বাবা-মা তার পরীক্ষার চিন্তার অধীর হয়ে রাত-দিন একাকার করে ফেলেন না। তাকে সবিশেষ ট্রিটমেন্টে সবার থেকে আলাদা করা হয় না। তার পড়া মা-বাবা মুখস্ত করেন না নোট কমি করেন না। রাত জেগে। সকাল হলেই তার পেছনে পেছনে নিজস্ব গতিবিধি সনচার করেন না। ঘরে বসে প্রতীক্ষা করেন ছেলে কিংবা মেয়ে কখন ফিরবে। রাতে তাকে এক গ্লাস দুধ দিতে হবে। বড়জোর এই মাত্র।

কিন্তু এখন? ঢাকার একটি খ্যাতনামা স্কুলের ভর্তি পরীক্ষার দিন ছেলেরা সব পরীক্ষা দিতে হলে ঢুকে গেছে। স্কুলের বিরাট মাঠ। মাঝে মাঝে দু-একটি বড় গাছ। অপেক্ষমাণ অভিভাবকরা খাবার পানি এমনটি জায়নামাজসহ অবস্থান করছেন। জটলা করে কথা বলছেন তসবি জপছেন। একজন নামায আদায় করছেন। এ নামায ও তসবি তার নিজস্ব প্রার্থনা রীতিও হতে পারে। কিন্তু উদ্বেগ-আকুল অভিভাবকদের আলোচনায় এ প্রার্থনা ছেলের পরীক্ষা পাসের জন্য বলে ভাবলেও অন্যায় করা হবে না। আচ্ছা আপনি কি বারোর নামতা পড়িয়েছেন? আহহা না তো। তাহলে কী হবে। আমি বারোরটা পড়িয়ে দিয়েছি কিন্তু সে কিছুতেই ট্রান্সলেশনের ঐ যে ‘সব কয়টা দোকান খোলা ছিল’ মনে রাখতে পারে না। এবার অন্যজন যোগ দিলেন। আমি তো প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় ফেল্টপেন দিয়ে দাগ দেবার কথা শেখাইনি। অবশ্য ওকে অমুক স্যার পড়িয়েছেন। আরো  অমুক আপাকে দিয়ে পড়ালেন না কেন? তিনি তো বলেও দিয়েছেন কখন এডমিট কার্ড নিতে হবে। বলাবাহুল্য প্রত্যেকেই অত্যন্ত উদ্বেগে স্নায়ুর চাপে পায়চারি করছিলেন। যদি  না হয়। যদি না হয়। অন্য আরো দুটো স্কুলের টেস্টও শেষ। সবাই কোচিং নিয়েছে। কীভাবে যে বাছাই করবে। আরেক স্কুলের গেটে একজন মা জানলেন অমুক স্কুলে এক বছর আগেই দরখাস্ত জমা নেয়। তমুকে টিউটোরিয়ালে মধ্য বছরেই বাচ্চা নিয়ে নেয়। বছর শেষে স্কুল বন্ধ করে গেটে লিখে রাখে ‘ভর্তি শেষ’। ভাই একন সন্তান ধারণ করেই মাকে পড়তে  বসতে হবে। যেন ভেতর থেকেই প্রথম ট্রেনিং হয়ে যায়। এ উক্তি একজন ভুক্তভোগী অথচ রসিক মায়ের। অন্য একজন গৃহবধূ মা, তিন ছেলে এক মেয়ে তার। তার সারা দিনের অন্যতম কাজ হলো চার চারটি স্কুলে বাচ্চা আনানেয়া, টিউটোরিয়ালে দেয়া-নেয়া, স্কুল শিক্ষক ও টিউটোরিয়াল শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ এবং সে অনুসারে নিজেই পড়াশোনা করা। টিউটোরিয়াল তো শুধু কাজ দিয়ে দেয়। বাচ্চা বিরক্ত হয়ে যায় পড়তে পড়তে। তাই সঙ্গে আমিও মুখস্ত করি। বড়টার স্কুল ১০-৪টা। মেয়েটার ৮-১:৩০টা। তিন নম্বরের ৮-২টা এবং সব শেষেরটা নার্সারির তাই তার ৮-১১টা।  ছোটটাকে বয়সের আগেই স্কুলে দিলাম। না হলে ভর্তি পরীক্ষায় টিকবে না। বড় ছেলেমেয়ে দুটো অন্য একজন গৃহবধূ মা। তিন ছেলে এক মেয়ে তার। তার সারা দিনের অন্যতম কাজ হলো চার চারটি স্কুলে বাচ্চা আনানেয়া, টিউটেরিয়ালে দেয়া-নেয়া, স্কুল শিক্ষক ও টিউটোরিয়াল শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা এবং সে অনুসারে নিজেই পড়াশোনা করা। টিউটোরিয়াল তো শুধু কাজ দিয়ে দেয়। বাচ্চা বিরক্ত হয়ে যায় পড়তে পড়তে। তাই সঙ্গে আমিও মুখস্ত করি। বড়টার স্কুল ১০-৪টা। মেয়েটার ৮-১.৩০টা। তিন নম্বরের ৮-২টা এবং সব শেষেরটা নার্সারির তাই তার ৮-১১টা। ছোটটাকে বয়সের আগইে স্কুলে দিলাম। না হলে ভর্তি পরীক্ষায় টিকবে না। বড় ছেলেমেয়ে দুটোর স্কুলে নিয়মিত যাই। ফাঁক পেলেই ওদের টেস্ট নিয়ে কথা বলি টিচারের সঙ্গে অন্য গার্ডিয়ানদের সঙ্গে। আবার বাচ্চাদের পেছনে একটু গোয়েন্দাগিরিও করি! যদি টেস্ট পেপার বাসায় না দেখায় খারাপ করেছে বলে। বাচ্চাদের পরীক্ষায় সময় ঘুম হয় না। মাঝে মাঝে ভাবি তবু তো সত্তরের ওপর নম্বর পাচ্ছে না। আজকাল দেখি এসএসসির রেজাল্টে ভালো ছাত্রের প্রায় সবারই বাব-মা দুজনই চাকরিজীবী। তাহলে কি তাদের বাচ্চারা আত্মনির্ভরশীল হয় বেশি। কিছু বুঝি না তাই। কী যে করি! একটি বাড়ির খাবার টেবিল। ছেলে ও মেয়ে খাচ্ছে। কর্মজীবী বাবা-মা রাতের টেবিলে সন্তানদের সঙ্গে খেতে বসেছেন। কি খবর মা তোমার ইংরেজি নোট পেলে? না মা অমুক নাকি আগেই নিয়ে গেছে। ফটোস্ট্যাট করে তবে ফেরত দিলে আনবো। ছেলেটিকে চুপচাপ দেখে, কি ব্যাপার আজকের টেস্টের ফল দেয়ার কথা, কিছু, বলছো না যে। আবার খারাপ? বাবা, অমুক স্যারের ছাত্র না হলে বেশি পাওয়া যায় না। তুমি আমাকে সেখানে দু’মাসের জন্য পড়ালেও চলবে। তাহলে তো সময় নিয়ে হবে না। বাসার স্যারকে কি বলবে? এসব আলোচনা এখন ঘরে ঘরে। উদ্বিগ্ন বাবা। ব্যাকুল মা। সন্তানরা বিভ্রান্ত। নিজেদের চেহারায় অপরাধী-অপরাধী ভাব নিয়ে ফল ঘরে আনছে। ব্যাপারটি এমন দুঃসহ দুর্ভাবনার হয়ে উঠলো কেন? সবার চিন্তা-ভাবনা এখন ভালো রেজাল্ট কেন্দ্রিক কেন? মুখস্ত করে ফটোস্ট্যাট নোট উদগার’ করা শুরু হলো কেন? পৃথিবীর সব দেশেই কিছু ছেলেমেয়ে ভালো ছাত্র বাকিরা এভারেজ। এবারেজরা সে সব দেশের  বাবা-মার মাথাব্যথা নয়। এখানে প্রথম বিভাগ পেতেই হবে-এক আশ্চর্য প্রবণতা। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল অবাক হবার মতো। দ্বিতীয় বিভাগ কম। প্রথম ও তৃতীয় বিভাগের চেয়ে। এখন একদিকে ভালো রেজাল্টের তোড়। অন্যদিকে নকলের উৎপাত ও প্রাচুর্য। নকল করার অধিকার চেয়ে মিছিল। যে নকল করছে সেও প্রথম বিভাগ পাবার জন্য করছে। আগে শুধু খারাপ ছাত্ররা ভিন্ন চেষ্টা করতো। ঢাকায় এবার কয়েকটি কলেজে ভর্তির ফরম দিতে নিয়ম করেছে-ঢাকার বাইরের ছাত্র হলে নির্ধারিত গ্রেডের চেয়ে তাকে ভালো গ্রেড বেশি পেতে হবে। অর্থাৎ এখানে শুধু জিপিএ-৫ কুলাচ্ছে না। দু-তিন বছর আগে ঢাকার একটি বিখ্যাত কলেজে জিপিএ-৫ পেলে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হবে না। এখন দিতে তো হয়ই। পরীক্ষা দিয়েও অনেকে ইপ্সিত নম্বর পায় না। তখন তাকে আর সে কলেজে ভর্তি করতে পারেন না অভিভাবক। কিন্তু ঢাকায় যে কোনো একটা কলেজে হয়েই যায়। কারণ ভর্তি পরীক্ষা ও বোর্ডের পরীক্ষার গড় করে তবে নির্বাচন করা হয়। যত বিপদ পড় ছাত্রদের। অন্যরা খারাপ রেজাল্ট বলে ঢুকে যাবে টেকনিক্যাল ক্ষেত্রে বা ড্রপ আউট হয়ে বাবার ব্যবসা দেখবে। গড়পড়তা ছাত্ররা যেনতেন কলেজে পড়বেই। অপছন্দের বিষয়ে একটা ‘পাস’ দেয়ার নিমিত্তে। আপাতদৃষ্টিতে প্রথম বিভাগের প্রাচুর্যে মনে হতে পারে দেশে এভারেজ ছাত্রের চেয়ে ভালো ছাত্রের সংখ্যা বেশি অন্তত মার্কশিট তাই বলছে। বাংলাদেশ কী তবে পৃথিবীর একটি ব্যতিক্রম দেশ যেখানে মধ্যম শ্রেণির চেয়ে প্রতিভাবানের বেশি জন্ম হয়? (অসমাপ্ত)

আখতার হামিদ খান