আলীয়া মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসা, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা, হাফেজী মাদ্রাসা

মাদ্রাসা শব্দটি আরবী درس (দরস) থেকে এসেছে। درس মানে হল পাঠ। আর মাদ্রাসা মানে হল যেখানে পড়ানো হয় বা বিদ্যালয়।আমাদের দেশে কয়েক ধরনের মাদ্রাসা আছে। প্রথমে একে একে এই মাদ্রাসাগুলোর পরিচয় দেই-


নূরানী/তালিমুল কুরআন/ফোরকানীয়া মাদ্রাসা:

নাম ভিন্ন হলেও এ মাদ্রাসাগুলোর কাজ একই। কুরআন শরীফ শুদ্ধ করে পড়ানো।আধুনিক পদ্ধতিতে শুদ্ধভাবে কুরআন শেখানোর জন্য এ মাদ্রাসাগুলো কাজ করে যাচ্ছে। তাজবীদ (কুরআন শেখার জন্য সহীহ উপায় সমূহ এই বইতে লেখা থাকে) সহকারে এখানে কুরআন শেখানো হয়। প্রতিটি হরফের মাখরাজ (উচ্চারণ স্থান), মদ (কোন জায়গায় টেনে পড়তে হবে, কতটুকু টেনে পড়তে হবে), এদগাম, ক্বলব, এজহার, গুন্নাহ (উচ্চারণের ধরণ সম্পর্কিত বিভিন্ন টার্ম) প্রভৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা সহকারে এখানে কুরআন শেখানো হয়।এই মাদ্রাসাগুলো মূলত ছোটদের জন্য তবে বয়স্ক কেউ শুদ্ধ করে কুরআন পড়ার জন্য তালীমুল কুরআন বা ফোরকানীয়া মাদ্রাসায় যেতে পারে।

হাফেজী মাদ্রাসা
এখানে কুরআন শরীফ মুখস্ত করানো হয়।কুরআন মুখস্থ হলে তাদেরকে হাফেজে কুরআন বলা হয়। কুরআন মুখস্থ শেষ হলে তাদেরকে মাদ্রাসার পক্ষ থেকে পাগড়ী প্রদান করা হয়।

এই দুই ধারার মাদ্রাসা মূলত ছোটদের জন্য। এখানে পড়ার মেয়াদও কম। সাধারণত দুই থেকে চার বছরের মধ্যে এখানকার পড়া শেষ হয়ে যায়। তখন কেউ কেউ স্কুলে পড়াশোনা করে আবার কেউ কেউ আলীয়া বা কওমী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে।

আলীয়া মাদ্রাসা

আধুনিক মাদ্রাসা বলতে আলীয়া মাদ্রাসাকে বোঝায়। এখানকার পড়ুয়ারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পায়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও আছেন যারা আলীয়া থেকে পড়াশোনা করে এসেছেন।

স্কুল কলেজের সাথে মিল রেখে এখানকার সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়।দাখিলকে এসএসসি, আলিমকে এইচএসসি, ফাজিলকে ডিগ্রী এবং কামিলকে মাস্টার্সের মান দেয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০ নম্বরের বাংলা, ইংরেজী না পড়ার কারণে কয়েকটি সাবজেক্টে মাদ্রাসার ছাত্রদের (আলীয়ার) ভর্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে মাদ্রাসার সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হয়। এবছর যারা ক্লাস নাইনে উঠেছে তারা ২০০ নম্বরের বাংলা এবং ২০০ নম্বরের ইংরেজী পড়ছে। অর্থাৎ ২০১৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় তারা ১৩০০ নম্বরের পরীক্ষা দিবে।আর ২০১৭ সালের আলীম পরীক্ষায় তারা ২০০ নম্বরের বাংলা ইংরেজীসহ ১৪০০ নম্বরের পরীক্ষা দিবে।

ফাজিলে ডিগ্রীর মতই তিন বছর মেয়াদী কোর্স। আর কামিল দুই বছর মেয়াদী কোর্স। বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের আওতায় পঞ্চম, অষ্টম, দাখিল এবং আলিমের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফাজিল এবং কামিল আছে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।

এখানে এইচএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান, ইংরেজী সহ অন্যান্য আধুনিক অনেক সাবজেক্ট পড়ানো হয়। ফাজিল এবং কামিলেও আধুনিক কিছু বিষয় পড়ানো হয়। কামিলে চার সাবজেক্টে মাস্টার্স করার সুযোগ থাকে। এগুলো হলো-আরবী, ফিকহ (ইসলামী আইন শাস্ত্র), কুরআন এবং হাদীস।

কওমী মাদ্রাসা
কওম শব্দের অর্থ গোত্র। এই মাদ্রাসাগুলো সরকারের কোন অনুদান না নিয়ে স্থানীয়দের দান-সাদকায় চলে বলে এই নাম হতে পারে। কওমী মাদ্রাসাকে কেউ কেউ খারেজী, দেওবন্দী (ভারতে অবস্থিত বিখ্যাত মাদ্রাসা), দরসে নিজামী ( বাগদাদে এক সময় একটা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল যেটার নাম ছিল নিজামীয়া) ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়। বাংলাদেশে প্রায় ১৫০০০ কওমী মাদ্রাসা আছে বলে জানা যায়। এখানকার শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ । তবে এই সংখ্যা কম বেশী হতে পারে। অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছে।

আমার দেখা অন্তত দুটো মাদ্রাসায় দেখেছি এখানে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলের সিলেবাস অনুযায়ী বাংলা, অংক, ইংরেজী পড়ানো হয়। অন্যান্য মাদ্রাসায় পড়ানো হয় কি না আমার জানা নেই। এর পরের ক্লাসগুলোয় সব আরবী এবং ইসলাম সম্পর্কিত বই পড়ানো হয়। এই ক্লাসগুলোর নামও বিভিন্ন আরবী এবং ইসলামী কিতাবের নামানুসারে।যেমন -মিজান, নাহু মীর,হেদায়াতুন নাহু, কাফিয়া, শরহে জামী (এগুলো সবই আরবী ব্যাকরণ সম্পর্কিত বই), মেশকাত (হাদীসের গ্রন্থ) আর সর্বশেষ ক্লাসকে বলা হয় দাওরা। দাওরা পাশ করে অনেকে আবার আলীয়া থেকে দাখিল, আলিম, ফাজিল, কামিল পাশ করে।আমি অন্তত দুজনকে জানি যারা দাওরা শেষ করে আলীয়া থেকে কামিল দিয়েছেন আবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী এবং মাস্টার্সও করেছেন।

কওমী মাদ্রাসাগুলোর একটি বোর্ড আছে যেটা বেফাকুল মাদারিস নামে পরিচিত। বলাবাহুল্য এটা বেসরকারী। তবে বর্তমানে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষাকে আধুনিক করার জন্য বিভিন্ন সময়ে আলাপ আলোচনার খবর আমরা পেয়েছি। দেশে শিক্ষিত অথচ পিছিয়ে পড়া শ্রেণী বলতে আমি এদেরকেই বুঝি। আধুনিক কোন বিষয়ে পড়াশোনা না করায় তারা চাকরীর ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। মাসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন আর মাদ্রাসার শিক্ষকতা ছাড়া আর কোন কাজ করার মত তাদের থাকে না।

সবগুলো মাদ্রাসাকে একই বোর্ডের আওতায় আনা যায় কি না

অনেক আলীয়া বা কওমী মাদ্রাসার সাথে হাফেজী মাদ্রাসা, তালীমুল কুরআন/ ফোরকানীয়া /নূরানী মাদ্রাসাও আছে। আবার স্বতন্ত্র অনেক হাফেজিয়া বা ফোরকানীয়া মাদ্রাসাও আছে। এগুলো আলাদা থাকায় খুব একটা সমস্যা নেই। এগুলো অনেকটা প্রি-স্কুলিং এর মত।

আলীয়া এবং কওমীকে এক করা যায় কিনা সেটা নিয়ে আলাপ হতে পারে। আলীয়ায় কওমী মাদ্রাসার অনেক কিতাব পড়ানো হয় তবে তা আংশিক। এবং পড়ানোয় বাঙলার প্রাধান্য থাকে কওমীতে উর্দু এবং ফার্সির প্রাধান্য থাকে (আরবী দুই জায়গায়ই পড়তে হয়)। তবে যতদূর শুনেছি কওমী মাদ্রাসার সিলেবাস আধুনিক করা হচ্ছে। তাতে আধুনিক সাবজেক্টগুলো কতটা ঢুকানো হবে সেটা আমার জানা নেই।

হয়তো কার্যকর পদক্ষেপ নিলে এই দুই ধারার শিক্ষাকে একই বোর্ডের আওতায় আনা সম্ভব হবে। সে জন্য আলীয়া এবং কওমী দুই ধারার শিক্ষিত এবং কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী সাবজেক্টগুলো বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী সাবজেক্টের শিক্ষকদের নিয়ে একটা কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তারা হয়তো একটা আধুনিক যুগোপযোগী ইসলামী সিলেবাস প্রণয়ন করতে পারবেন। যেটার আওতায় আলীয়া এবং কওমী দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকেই আনা সম্ভব হবে।


নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা জনগোষ্ঠির মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়

আমাদের দেশে এত ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যে ভবিষ্যতে হয়তো আরো অনেক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্ম হবে। আগে ইংলিশ মিডিয়াম আর বাংলা মিডিয়ামের কথা জানতাম। এখন ইংলিশ ভার্সন শুরু হয়েছে।

আমার মনে হয় ক্লাস এইট পর্যন্ত সবার জন্য একই সিলেবাস থাকা উচিত। এখানে পড়ার মিডিয়াম বিভিন্ন ভাষার হতে পারে (বাংলা, ইংরেজি, আরবী) তবে বাংলা, ইংরেজী, বিজ্ঞান ইত্যাদির উপর আবশ্যিক কোর্স থাকবে। আর কিছু সাবজেক্ট থাকবে ঐচ্ছিক। যে ভবিষ্যতে যে ধরনের পড়াশোনা করতে চায় সেগুলো বাছাই করে নিবে।

যেমন ভবিষ্যতে ইসলামী কোন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চাইলে সে আরবী গ্রামার পড়বে। যা অন্যদের জন্য দরকার নেই। তেমনি টেকনিক্যাল অনেক সাবজেক্ট থাকতে পারে। যেগুলো রিলেটেড বিষয়ে উচ্চতর পড়াশোনা যারা করবে তারাই শূধু পড়বে।

আমার ব্যক্তিগত অবজার্বেশন হল, বিভিন্ন বিষয়ে পড়লেও সবাই যদি একই ক্যাম্পাস ব্যবহার করে তাহলে তাদের মধ্যে অত বেশি দূরত্ব থাকে না। যতটা দূরত্ব বর্তমানের নানা ধরনের শিক্ষাপদ্ধতির কারণে গড়ে উঠেছে। পরস্পরের আবেগ, অনুভূতি, ভালবাসা, শ্রদ্ধা, ঘৃণা এগুলো সম্পর্কে জানা যায়। এ জন্য দেশে আলাদা আলাদা শিক্ষাবোর্ডের আওতায় আলাদা আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থার চেয়ে সবগুলোকে একই ধরনের শিক্ষা বোর্ডের আওতায় আনতে পারলে জনগোষ্ঠীর মানসিক দূরত্ব কমে যেত।

তবে যতদিন এটা সম্ভব হবে না (আদৌ হবে না কোনদিন এই দেশে) ততদিন বিভিন্ন মাধ্যমের শিক্ষাব্যবস্থার ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে দূরত্ব কমানোর পদক্ষেপ নেয়া যাতে পারে। যেমন- এক ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার ছাত্ররা অন্য ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা্ ভিজিট করা, তাদের মধ্যে কালচারাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, শিক্ষামেলার আয়োজন করা (যেখানে সব ধরনের শিক্ষা পদ্ধতির ছাত্র শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষা পদ্ধতি এবং বিষয় সম্পর্কে অন্যদের ধারনা দিবে) সহ এমন পদক্ষেপ নেয়া যাতে সব মাধ্যমের লোকজনই উপস্থিত থাকবে এবং পরস্পর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবে।

(পুনশ্চ: সাইদ ভাইর স্ট্যাটাসে দেয়া কমেন্টসকে সাইদ ভাইর পরামর্শে একটু মোডিফাই করে পোস্টটি তৈরি করা হল)

মৃন্ময় মিজান