মানসম্মত শিক্ষক
২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি শিক্ষা ও উন্নয়ন পেশার সঙ্গে জড়িত। শিক্ষার সংকট নিয়ে  তিনি কথা বলেছেন সম্প্রতি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন নূরুর রহমান
প্রতিবছর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পাসের হার ও ভালো ফলাফল। কিন্তু পড়ালেখার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবিরা বলছেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার মান অনেক কমে গেছে। বাবা-মায়েরাও বলছেন ছেলেমেয়েরা জিপিএ-৫ পাচ্ছে, কিন্তু গণিত বা ইংরেজিতে দুর্বল। আমরা দেখছি, বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাতেও শিক্ষার্থীরা খারাপ ফল করছে। গণহারে ইংরেজি কিংবা গণিতে ফেল করছে। অথচ উচ্চমাধ্যমিকে তারা জিপিএ-৫ পেয়েছে। মান নির্ণয় করার জন্য পরীক্ষা একমাত্র নির্ণায়ক হতে পারে না। আমাদের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে অধিকাংশই শিক্ষার্থীই লেখাপড়া করে, সেটা পরীক্ষানির্ভর মান নির্ধারণের মাপকাঠি হয়ে পড়েছে। এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের পরীক্ষাপদ্ধতির উন্নয়ন করতে হবে। কোচিং ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। গাইড বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। প্রয়োজনীয় লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রায়ই বেতন-ভাতা কিংবা জাতীয়করণ বা এমপিওভুক্তির জন্য আন্দোলন করতে দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়টির সঙ্গে কি শিক্ষার মানের বিষয়টি জড়িত?
অবশ্যই জড়িত। কারণ মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্মত শিক্ষকের প্রয়োজন। আবার মানসম্মত শিক্ষক পেতে হলে তাদের মানসম্মত বেতনের ব্যবস্থা করতে হবে। এখনো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের বেতন রীতিমতো অমানবিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। প্রকৃত মেধাবীদের আমরা এই পেশায় আকৃষ্ট করতে পারছি না। যারা কিনা মানুষ গড়ার কারিগর, তারাই যদি বাঁচতে না পারেন, তাহলে শিক্ষা দেবেন কীভাবে? মানসম্মত শিক্ষা তো অনেক পরের ব্যাপার। যদিও সরকার প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। আরও হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের মানোন্নয়ন করতে হবে। শিক্ষকদের সামাজিক সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কীভাবে বন্ধ করা যায়?
শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন বাণিজ্যিক হয়ে পড়ছে। কোচিং ব্যবসা গাইড ব্যবসা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সরকার অনেক চেষ্টা করছে এটা বন্ধ করতে, কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী বললেন, এই খাতে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হচ্ছে। এই বিশাল ব্যবসার সঙ্গে কোনো গ্যাং বা চক্র জড়িত আছে বলে আমি মনে করি। এটা বন্ধ করতে হলে আমাদের একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব হবে না। প্রতিটি স্কুলকে ভালো করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলেই কেবল  শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা যাবে।
সম্প্রতি সরকার প্রাথমিক শ্রেণীতে ভর্তির ক্ষেত্রে স্থানীয়দের জন্য ৪০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা করেছে। এই পদ্ধতি কতটুকু যুক্তিসংগত?
সরকার এলাকাভিত্তিক ভর্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রতিটি প্রাথমিক স্কুলের জন্য ৪০ শতাংশ ‘এলাকা কোটা’ নির্ধারণ করেছে, আমরা এটা সমর্থন করি। তবে এটাও মনে করি, এই পদ্ধতি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এর সমাধান করতে হলে স্কুলগুলোর মানোন্নয়ন করতে হবে।
আপনি কি মনে করেন সরকার শিক্ষা খাতে যথেষ্ট বরাদ্দ দিচ্ছে?
শিক্ষা খাতে উন্নতি করতে হলে অবশ্যই এই খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আমাদের সমাজে কিন্তু শিক্ষার জন্য চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। যেটা ভারতেও হয়নি। এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে যদি মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে একটা শিক্ষিত বাংলাদেশ আর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপাল, শ্রীলংকা, ভারত যে হারে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করছে, আমরা সেটা করতে পারছি না বরং বরাদ্দ দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছি। গত কয়েক বছর ধরেই দেখছি শুধু জ্বালানি খাতেই বাজেটের একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে। কৃষিতে তো দিতেই হবে। সামরিক খাতে ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো যেতে পারে। শুধু যে বাজেট থেকেই শিক্ষার জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে, এমন নয়। শিক্ষার জন্য আরও বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করা যেতে পারে। যেমন মাল্টিন্যাশনাল ও ন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে সরকার ট্যাক্স ছাড়সহ অনেক ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। তাদের উৎসাহ দেওয়া যায় যে এর বিনিময়ে তোমরা সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ করো। ভারতের কাছ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা শিখেছি, সেটা হলো, তারা নাগরিকদের কাছ থেকে শিক্ষার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছে। যেমন আমরা দীর্ঘ সময় ধরে যমুনা সেতুর জন্য অর্থ দিয়েছি, ব্যাপারটা সেই রকমই। ভারত এভাবে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন অর্থ সংগ্রহ করেছে। আমরাও এই উদ্যোগ নিতে পারি।
সরকারের উদ্যোগের পরও শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা যাচ্ছে না। কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়?
শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি একটা গবেষণা করেছে, সেখানে তারা দেখেছে, প্রথম শ্রেণীতে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হলে দ্বাদশ শ্রেণীতে গিয়ে থাকছে মাত্র ৩০ জন। অর্থাৎ প্রায় ৭০ জন ঝরে পড়ছে। এটাই বাস্তবতা। শিক্ষার্থীদের আর্থিক অসচ্ছলতা ঝরে পড়ার একটা বড় কারণ।