বেসরকারি মেডিকেল কলেজে

সম্প্রতি নতুন করে আরও ১১টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। দেশে এখন মোট মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৮৭ (সরকারি ২২টি, বেসরকারি ৬৫টি)। বিগত শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল কলেজগুলোতে ৭ হাজার ৬১২ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল (২২টি সরকারি কলেজে ২ হাজার ৮১২ জন এবং ৫৪টি বেসরকারি কলেজে ৪ হাজার ৮০০ জন)। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে এই বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে পড়ার সুযোগ পাবেন ৫৪৫০ শিক্ষার্থী (কতগুলোর আসন সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে), যারা অতি নিকট ভবিষ্যতে দেশের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেবেন। খবরটি শুনে হয়তো অনেকেই আশায় বুক বাঁধছেন এই ভেবে যে, ভবিষ্যতে অন্তত স্বাস্থ্যসেবাটুকু পাব। কিন্তু পরক্ষণেই আবার নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে বলবেন_ ভালো মানের হবে তো, নির্ভর করা যাবে তো তাদের ওপর? এই প্রশ্ন জাগার সুনির্দিষ্ট কারণও আছে। প্রতিনিয়তই অসংখ্য রোগী ডাক্তারের কাছে গিয়ে বিড়ম্বনার স্বীকার হচ্ছেন, ভুয়া ডাক্তারের কবলে পড়ে জীবন পর্যন্ত হারাচ্ছেন। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকা আর মিডিয়ার বদৌলতে দেখা যায়, একদিনও মেডিকেল কলেজে পড়ার প্রয়োজন পড়েনি বা সুযোগ পায়নি অথচ এমবিবিএস, এফআরসিএস, এমনকি পিএইচডি ডিগ্রি উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানিয়ে বছরের পর বছর রোগী দেখার নামে প্রতারণা করে আসছে (সম্প্রতি গাজীপুর, হাটাহাজারী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে কয়েকজনকে আটক ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে)। এত কিছুর পরও যখন দেখা যায়, আবারও নতুন করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিচ্ছে সরকার, তখন সচেতন জনগণকে বিষয়টি কিছুটা ভাবিয়ে তোলাই স্বাভাবিক।

বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে দেখা যায়, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হওয়া ২৩ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ভর্তি পরীক্ষায় ৩০ নম্বরের কম পেয়েছিল। যারা ভর্তি পরীক্ষায় ৬০ শতাংশ নম্বরের বেশি পেয়েছিল তারা সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি হতে পেরেছেন। বেসরকারি মেডিকেলগুলোর ভর্তির জন্য নিয়মানুযায়ী ৬০ নম্বরের নিচ থেকে নিম্নক্রম অনুযায়ী বাকিদের বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি করার কথা। কিন্তু বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো সে নিয়ম মানেনি। আরও অবাক করার মতো যে তথ্যটি দেখা গেছে সেটি হলো, ভর্তির জন্য লিখিত পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মধ্যে মাত্র সাড়ে ১০ নম্বর পেয়েও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পেরেছে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ তো বটেই, চিকিৎসকরাই অনেকটা বিব্রতকর হয়েছেন এই ভেবে যে, এ ধরনের মেধাবী (!) ছাত্ররা কীভাবে চিকিৎসাশাস্ত্র আয়ত্ত করবেন? আর করলেই-বা তার মানটুকুই-বা কেমন হবে? কিন্তু এত অনিয়ম করার পরও কলেজগুলোর ব্যাপারে সরকারের কোনোই নজরদারি নেই, কারও বিরুদ্ধে কোনোরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্বাস্থ্য অধিদফতর বা মন্ত্রণালয় নিয়েছে বলে জানা নেই। নেবেই-বা কীভাবে_ এখানেই যে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য লুকায়িত আছে। কিছু নামকরা চিকিৎসক, চিকিৎসক সংগঠনের নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেই কি
কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা হয়নি বা করা যাবে না?
শোনা যায়, সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতেই নাকি শিক্ষক সংকট প্রকট। তারপরও কোনোমতে চলছে বা চালানোর চেষ্টা করছে সরকার। আর বেসরকারি কলেজগুলোর নাকি দু’একটি বাদে বাকিগুলোতেই প্রচণ্ড শিক্ষক সংকট। কোনো কোনো কলেজ নাকি ১০ জন শিক্ষক নিয়েও শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে! বিষয়টি অবাক করার মতোই নয় কি? কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষক ও চিকিৎসক বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কলেজ চালানো হচ্ছে। আবার কিছু শিক্ষক আছেন, যারা ওইসব কলেজ থেকে সদ্য পাস করেই লেকচারার হিসেবে যোগদান করেছেন (তারা কি আসলেই মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছেন? আমরা অনেকেই জানি, সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক হতে গেলে কতটুকু দক্ষতা অর্জন করতে হয়_ যা অনেকটাই কঠিন এবং অনেকে সারা জীবন চেষ্টা করেও সফল হতে পারেন না)। তাহলে কি এটা বোঝার বাকি থাকে যে, কলেজগুলো কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে বা গোঁজামিল দিয়ে চলছে বা চালানো হচ্ছে? চিকিৎসা শিক্ষাটা কি তাহলে পণ্য হয়ে যাচ্ছে? সাধারণ বিষয়ের পড়াশোনার চেয়ে এখানে একটু ভিন্নতা বা জটিলতা আছে বলেই তো এখানে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করার বিধান রাখা হয়েছে। অথচ এখানেই কি-না সবচেয়ে কম মেধাবীরা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে! এর পেছনে কারণ কী_ এখানেও কি ভর্তিবাণিজ্য? ভর্তির সময় হলেই তাড়াহুড়া করে নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়। আবার এই কলেজগুলোতে ভর্তির ফি এত বেশি থাকে যে, অনেকে ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় সরকারি কলেজের জন্য বিবেচিত যোগ্যতার (যেমন- গত বছর ছিল ৬০ শতাংশ নম্বর) একটু বা অল্প নিচে (যেমন_ ৫৯ শতাংশ নম্বর) থাকার পরও ভর্তি ফির জন্য (যা গত বছর ছিল কলেজভেদে ১০-১৫ লাখ টাকা) বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে পড়ার সুযোগ পায় না। আর সেই স্থানগুলোতে ভর্তি হয় স্বাভাবিকভাবেই বড়লোকের অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী ছেলেমেয়েরা, যাদের মা-বাবারা যে কোনোভাবেই হোক তাদের ছেলেমেয়েকে তথাকথিত ‘ডাক্তার’ বানানোর স্বপ্ন দেখে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে! নতুন করে আরও ১১টি মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে কি সরকার এই চলমান খোঁড়া বা জীর্ণ ব্যবস্থাটিকে আরও পাকাপোক্ত করছে?
আবার কোনো মেডিকেল কলেজে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হলে নাকি ২৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান। কিন্তু সব বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কি তা আছে (নতুন অনুমোদিতগুলোর কথা বাদই দেওয়া হোক, পুরনোগুলোরই কি তা আছে)? অধিকাংশ কলেজের ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নেই। তা ছাড়া একটি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতি আছে কি-না তা কি পর্যালোচনা করা হয়েছে? নাকি শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তি পরিচয়ে, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কেবল নিজস্ব জমি আর কলেজ করার মতো উপযুক্ত অবকাঠামো আছে দেখেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে?
আমাদের দেশে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এগুলোর কয়েকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর কোনো কোনোটির সার্টিফিকেট নিয়ে নাকি প্রশ্ন উঠেছে_ এগুলোর ডিগ্রি নাকি অনেক সময় মূল্যায়নও করা হয় না! আমাদের মেডিকেল কলেজগুলোর অবস্থা তেমন হবে না তো? কিংবা তখন আবার রোগী বা সাধারণ মানুষরা এই দাবিতে আন্দোলনে নামবে না তো ‘কোন মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা তা সাইনবোর্ডে লেখা থাকতে হবে?’ আর নামলেই-বা কী? মেডিকেল কলেজে না পড়েও যদি এমবিবিএস, এফআরসিএস, এমনকি পিএইচডির কথা লিখতে পারে তাহলে তখন তো আরও পারবে। তবে যাই হোক না কেন, সবকিছু যেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে আসে সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্বটুকু সরকারকেই নিতে হবে। আইন-কানুন মানাতে বাধ্য করার জন্য সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। ভর্তিসহ সব নিয়মকানুন না মানলে প্রয়োজনে যে কোনো সময় এগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকদের চিন্তাভাবনা করতে হবে, কীভাবে সরকারিভাবে মেডিকেল শিক্ষাকে সম্প্রসারিত করা যায় (নতুন নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে)।
ড. আবদুল্লাহ ইকবাল

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ