মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা

কোথা হতে শুরু করব বুঝতে পারছিনা। এক কথায় মেডিকেল শিক্ষা আজ ধ্বংসের পথে। কি আন্ডারগ্রাজুয়েট কিবা পোস্টগ্রাজুয়েট! মানব শরীর নিয়ে যাদের কাজ তাঁরা যদি যেন তেন হয় তাহলে কি হবে? সৃষ্টির সেরা মানুষ আর এই মানুষের যারা চিকিৎসা দিবে তাঁদের হওয়া উচিৎ সবচেয়ে মেধাবী ও চৌকশ। পৃথিবীর সব দেশেই মেডিকেল শিক্ষা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে। এখানে কোন ছাড় নেই । কারন এর ব্যাত্তয় ঘটলে জাতির ধ্বংস অনিবার্য, সকলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়বে কখন না ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে । আমাদের দেশে মেডিকেল শিক্ষার বেহাল অবস্থা। যার যা খুশী তাই করছে। ইচ্ছামত প্রাইভেট মেডিকেল খুলতেছে, এটা দারুন একটা বেবসা। এর প্রোডাক্ট যে কি বের হচ্ছে তার কোন খবর কারো নাই। আমার বন্ধু কোন এক প্রাইভেট মেডিকেল এর লেকচারার থাকার সময় তাঁর প্রফেসর এক স্টুডেন্ট কে অনাস’ মার্ক দেয়;আমার বন্ধু অবাক হয়ে তাঁর স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিল স্যার একই ছাত্র একই পরীক্ষা ঢাকা মেডিকেল এ বসে দিলে তাঁকে পাস করাতেন কিনা? প্রফেসর বললেন কি করব বল এ তো কিছু পেরেছে, অন্নরা ত কিছুই পারেনি। চিন্তা করেন আমরা কি সর্বনাশ করছি এ জাতীর! প্রাইভেট মেডিকেল এর অগ্রযাত্রা কেউ বন্ধ করতে পারবেনা। কারন এখানে বেবসা আছে; মন্ত্রী,সচিব,প্রফেসর থেকে শুরু করে অনেক হোমরা চোমরাদের ছেলে-মেয়েরা আছে। আরও আছে সরকারী মেডিকেল কলেজ এর স্যারদের অবসর গ্রহনের পর প্রাইভেট মেডিকেল এ যোগদানের খায়েশ। তাইত তাঁরা প্রাইভেট মেডিকেল এ পরীক্ষা নিতে গেলে তাঁদের প্রতি অনেক বেশি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে ।
দেশের সেরা সন্তানদেরই মেডিকেল পড়তে আসা উচিৎ। সেরা ছাত্ররাই মেডিকেল এ পড়ার বাসনা ও যোগ্যতা রাখে, ও চেষ্টা করে। কিন্তু হায়রে নিয়তি পড়াশুনা করে কি আর মেডিকেল এ চান্স পাওয়া যায়! চান্স পেতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে পরীক্ষা দিতে হয়। কি বিচিত্র এই দেশ!!! অত্যন্ত লজ্জা ও উৎকণ্ঠার বিষয় এই যে প্রায় প্রতি-বারই ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে ও অযোগ্য ছাত্ররা মেডিকেল এ এসে স্বাস্থ্য শিক্ষার বারটা বাজাচ্ছে। এর প্রভাব সমাজে ইতোমধ্যে পরতে শুরু করেছে, অদুর ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ তা মহামারি রূপ ধারণ করবে। আমাদের কর্তা বেক্তিরা নিজেদের আখের গুছানোর জন্য দেশ ও জাতীর যে অপূরণীয় ক্ষতি করছেন তার হাত থেকে ইনশাল্লাহ তারাও রেহাই পাবেন না। এই চিকিৎসকরাই ভবিষ্যতে আমাদের সবার চিকিৎসা করবে। তাঁদের হাত হতে কেউ বাঁচতে পারবেন না।
বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এ পোস্ট-গ্রাজুয়েট কোর্স চালু করে অভূতপূর্ব এক অধ্যায় এর সূচনা করে। এরকম দৃষ্টান্ত অতীতে কেউ দেখাতে পারেনি। ভর্তি পরীক্ষায় এমন দুর্নীতি কেউ কল্পনাও করতে পারবেনা। একশত ভাগ দুর্নীতি বললেও ভুল হবে। যে বিষয়ের কোন সার্কুলার হয়নি বা কেউ পরীক্ষাও দেয়নি সে বিষয়েও দলীয় ক্যাডাররা চান্স পেয়েছে। যতরকম দুর্নীতি হওয়া সম্ভব সব ধরনের দুর্নীতিই এখানে হয়েছে, আজও তাঁর ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এরা অনেকেই পোস্ট-গ্রাজুয়েশান শেষ করে ফেলেছে ক্ষমতার জোরে। এরাই দেশের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সেবার কর্ণধার। চিন্তার বিষয় কি বলেন?
যে জাতি তাঁর মেধাবী সন্তানদের মূল্যায়ন করে না সে জাতীর ধ্বংস অনিবার্য। বর্তমানে এদেশে পয়সা আর রাজনৈতিক বিবেচনায় সব হচ্ছে, মেধার কোনই মূল্য নাই। ভর্তি ,চাকুরি ,পোস্টিং ,প্রোমোশন কোন কিছুতেই মেধার অনু পরিমাণ মূল্যায়নও নেই। যে যত বেশি খমতাবান তাঁর পোস্টিং তত ভাল যায়গায়। তাই দেশের শীর্ষ মেডিকেল প্রতিষঠান গুলো আজ দলীয় লোকের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এখানে পড়াশুনা বাদ দিয়ে অসুস্থ রাজনীতির পরিচর্যা চলছে। এমবিবিএস শিক্ষার অবস্থা খুবই খারাপ; ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ ও পোস্টিং ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া একই শিক্ষক এমবিবিএস ও পোস্ট-গ্রাজুয়েট এর ক্লাস নেন বলে এমবিবিএস এর ক্লাস নেয়ার সময় পান না তাঁরা। যে এমবিবিএস হল মেডিকেল শিক্ষা এর ভিত্তি সেই এমবিবিএস আজ চরম অবহেলিত। ফলে যেসব ডাক্তার বের হচ্ছে তাঁদের অবস্থা খুবই নাজুক। তাঁদের দোষ সামান্যই,তাঁরা সব সিস্টেম এর শিকার।
আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে ,”মরার উপর খাড়ার ঘা।” মেডিকেল শিক্ষার উপর এমনি এক ঘা বসানোর পাঁয়তারা করছে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল। মেডিকেল ইউনিভার্সিটি এর ধুয়া তুলে ধ্বংস করতে চাইছে এদেশের সর্বজন স্বীকৃত , সকলের সমাদৃত,সারা-বিশ্ব সমাদৃত, সময় উত্তীর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী কিছু মেডিকেল কলেজকে। এমনিতেই এইগুলার অবস্থা শোচনীয় তার উপর ইউনিভার্সিটি নাম দিয়ে এগুলার ধারাবাহিকতা নষ্ট করে এমবিবিএস কোর্সকে আরও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়ার হোলি খেলায় মত্ত হতে চাইছে গুটি কয়েক স্বার্থান্বেষী মহল। এইসব স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানকে ইউনিভার্সিটি করে এদের ধারাবাহিকতাকে ধ্বংস করে মেডিকেল শিক্ষার মুল-উৎপাটন করার উদ্দেশ্য কি তা জাতি নিশ্চয়ই জানতে চায়। দলীয় লোকের নিয়োগ, বদলিহীন চাকুরির নিশ্চয়তা, নিয়োগ বাণিজ্য, এমবিবিএস কে বেসরকারি খাতে নিয়ে গিয়ে ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেয়া ছাড়া ভাল কোন উদ্দেশ্য তাঁদের নেই। এইসব ধ্বংসাত্মক চিন্তা এখনি বন্ধ করতে হবে; নাহলে জাতিকে অনেক খেসারত দিতে হবে। ইউনিভার্সিটি করতে চাইলে আলাদা জায়গা জমি নিয়ে নুতন ভাবে করুন; কোন আপত্তি নাই। একটা ঐতিহ্য কে কেন ধ্বংস করতে চাইছেন? সবাই তার বাড়িতে বাড়িতে একটা করে মেডিকেল ইউনিভার্সিটি করে বাহাবা নিতে চাইছে ।কিন্তু অগ্রপশ্চাৎ কিছুই চিন্তা করছে না। এমন তারল্য চিন্তা দেশের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকারক। চিন্তা করে বলুন সারা দুনিয়ায় কয়টা মেডিকেল ইউনিভার্সিটি আছে? খুজে দেখুন তারপর উত্তর দিন। মেডিকেল এর অনেক শিক্ষকই ইউনিভার্সিটি এর পক্ষে কাজ করছেন ;অনেক সাফাই গাইছেন। কিন্তু ওঁদের যদি আপনি বলেন যে ইউনিভার্সিটি এর শিক্ষকরা প্রাকটিস করতে পারবেনা; তাহলে আপনি ওঁদের কাউকেই ইউনিভার্সিটি এর পক্ষে পাবেন না। প্রাইভেট প্রাকটিস জমানো, বদলি বন্ধ করা, চাকুরির মেয়াদ বাড়ানো, বিভিন্ন পোস্ট বাগানোর ধাঁদায় আজ তাঁরা ইউনিভার্সিটি এর পক্ষ নিয়েছে। সাধারন ছাত্রছাত্রীরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তোমাদের কেউ যেন বলির পাঁঠা না বানাতে পারে।
এই ধ্বংসের হাত হতে মেডিকেল শিক্ষা বেবস্থাকে রক্ষা করা আমাদের সকলের জাতীয় দায়িত্ব। মেডিকেল শিক্ষার মান এর নিয়ন্ত্রণে আপোষহীন হতে হবে। কারন এটা জাতির বাঁচা মরার ব্যাপার। এখানে কমপ্রমাইজ করা চলে না; কোনভাবেই না। জাতির কর্ণধাররা চিন্তা করুণ, বিবেককে জাগ্রত করুণ, দেশের কথা ভাবুন, দেশের মানুষের কথা ভাবুন; আর তা না পারলে নিজের সন্তানদের কথা ভাবুন। কার হাতে তুলে দিবেন আপনার সন্তানদের চিকিৎসার ভার। এটা ভাববেন না বিদেশে চিকিৎসা করাবেন বা বিদেশে পাড়ি জমাবেন। মনে রাখবেন পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এক দিন না এক দিন ধরা খাবেনই। আসুন সবাই মিলে দেশের কথা ভাবি; নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবি। মেডিকেল শিক্ষাকে দল,মত,বেক্তি-সারথের উরধে রেখে সকলে মিলে দেশের জন্য কাজ করে যাই।

তানভীর জালাল