শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংকট,শিক্ষাব্যবস্থা,সংকট

শব্দের বুৎপত্তি বিজ্ঞান অনুযায়ী ‘Education’ শব্দটি ল্যাটিন e, ex এবং ducere due শব্দগুলো থেকে এসেছে। শাব্দিকভাবে এর অর্থ দাঁড়ায় “Pack the information in and draw talents out” অর্থাৎ অবগতি ও জ্ঞানপ্রদান এবং জ্ঞেয় বিষয়ে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন।
শিক্ষা বলতে কি বোঝায়? দার্শনিক John Duwery শিক্ষা সম্পর্কে বলেন, ‘‘প্রকৃতি এবং মানুষের অতি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগগত মৌলিক মেজাজ প্রবণতা বিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শিক্ষা।’’ এছাড়াও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক Herman H. Horne বলেন, ‘‘শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক, মানসিক দিক দিয়ে বিকশিত মুক্ত সচেতন মানব সত্তাকে আল্লাহর সঙ্গে উন্নতভাবে সমন্বিত করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া যেমনটি প্রকাশিত রয়েছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক। আবেগগত এবং ইচ্ছাশক্তি সম্বন্ধীয় পরিবেশের মধ্যদিয়ে।’’ সুতরাং শিক্ষা হচ্ছে একটি সর্বব্যাপক প্রক্রিয়া এবং তা শিক্ষার্থীর সামগ্রিক জীবনকে প্রভাবিত করে।
শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এবং শিক্ষাব্যবস্থাই হচ্ছে মানুষ গড়ার সর্বোত্তম কারখানা। আর জাতি ও দেশ গড়ার একমাত্র হাতিয়ার। শিক্ষার এই অপরিসীম গুরুত্বের ক্ষেত্রে চীন দেশীয় একটা প্রবাদ বাক্যের স্মরণ করা যেতে পারে- ‘‘তুমি যদি এক বছরের পরিকল্পনা নিয়ে থাক। তাহলে শস্য দানা বপন কর। তুমি যদি দশ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে থাক। তাহলে বৃক্ষরোপণ কর এবং তুমি যদি এক হাজার বছরের পরিকল্পনা নিয়ে থাক। তাহলে মানুষ তৈরির ব্যবস্থা কর। এই যে, হাজার বছরের পরিকল্পনা নেয়া তথা মানুষ তৈরির ব্যবস্থা করা- এটা নির্ভর করে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই।
শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা মানুষ তৈরির এ ব্যবস্থা তখনি সম্ভব যখন আমরা শিক্ষার সঠিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে পারব। কেননা উদ্দেশ্যহীন শিক্ষা শিক্ষা নয়। শিক্ষার একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যে থাকা উচিত। শিক্ষার এই উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ Milton বলেছেন, “Education is the harmonius development of body mind and soul.” অর্থাৎ দেহ, মন ও আত্মার সুসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধনই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে- মানুষকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলা- অর্থাৎ মানুষ ও পশুর মাঝে মনুষ্যত্ব ও পশুর পার্থক্য সৃষ্টি করার মাধ্যমে মানুষের স্বীয় স্বাতন্ত্রিক ও ব্যতিক্রমধর্মী পরিচিতি আর বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা। উল্লেখ্য, আমরা সবাই জানি, “Education does not necessarily mean more acquisition of degrees and diplomas. But it means training a man how to live worthily.” অথচ অত্যন্ত বেদনাদায়কভাবে সুস্পষ্ট যে, আজ আমাদের কাছে শিক্ষার প্রকৃত অর্থ লক্ষ্য উদ্দেশ্য দাঁড়িয়েছে অসম্পূর্ণ উল্টো। আমরা বাজেকর্মে প্রমাদ করছি। কেবল ডিগ্রিগুলো হস্তগত করার জন্যই স্কুল, কলেজ, মাদরাসা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া। যেন সংস্কৃতের সেই প্রবাদ বাক্যের মত– ‘দেবা: না জানন্তি কুত্তা নরা।’ কি করব, কি শিখব তা জানি না। তবে আগে পাশটা করা হোক এ হীন মনোবৃত্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি।
আমরা কি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হয়েছি? নিশ্চয় ‘না’। বরং বর্তমানে আমরা ক্রমশ: বহুবিধ শিক্ষা সংকটের কবলে পতিত হয়েছি। যা থেকে মুক্তি লাভের জন্যে ছাত্র-শিক্ষক বুদ্ধিজীবীসহ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিককেই গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। এ পর্যন্ত আমরা বহু শিক্ষা মিশন এক শিক্ষা সফর কমিটির সাথে পরিচিত হয়েছি। ১৮২৩ সালে LORD MACKULAY এর নেতৃত্বে গঠিত “General Committee of Public Instruction” নামক শিক্ষা কমিটি যা পাশ্চাত্য শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেয়। ১৮৩৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষার ওপর ‘LORD ADUM’ এর পেশকৃত রিপোর্ট ১৮৫৮ সালে ALEN BORRAR শিক্ষা কমিশন। ১৮৫৯ সালে STENSHIL DESPASS শিক্ষা কমিশন, ১৮৮০ সালে LORD RIPAN এর সময় WILLIAM HUNTER এর শিক্ষা কমিশন। ১৯০২ সালে SIR TOMAS RALAY শিক্ষা কমিশন, ১৯১৮ সালে PATTEL ACT. পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতেই আতাউর রহমান খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা কমিশন। ১৯৬২ সালে আইয়ুব খানের সময় গঠিত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন। ইয়াহিয়ার সময় নূর খান শিক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সময় ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। জিয়াউর রহমানের সময় কাজী জাফর শিক্ষা কমিটি এবং এরশাদ সাহেব ড. আব্দুল মফিজ শিক্ষা কমিশন গঠন করেন যা পরে বাতিল করা হয়। খালেদা জিয়ার সময় ড. মনিরুজ্জামান মিয়া শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার আবার ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন নিয়ে কাজ করছে। এতসব শিক্ষা কমিশন এক শিক্ষাসফোর কমিটি পেলাম। কিন্তু আজো আমরা কি শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করতে পেরেছি?
অনেক ভদ্রলোক আবার শিক্ষার এই সংকট মোকাবিলা LIBERAL EDUCATION বা SECULAR EDUCATION এর কথা বলে থাকেন। অথচ ওপরোক্ত সকল শিক্ষা কমিশনই পাশ্চাত্যের অনুকরণ করে SECULAR বা LIBERAL EDUCATION এর কথাই বলে এসেছেন। এমনকি আমরা এ পর্যন্ত এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থাই পেয়ে আসছি। যার ফলে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, কলহ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব, নারী কেলেঙ্কারী থেকে শুরু করে ঘটছে সকল অপকর্ম। এর মূলেই রয়েছে। বর্তমান প্রচলিত নৈতিকতাহীন এই LIBERAL বা SECULAR EDUCATION অথচ আমরা জানি যে, A Man without Character. With career is a dangerous man, a lion বস্তুত এ কারণেই আজকের বড় বড় অপরাধ ও দুর্নীতি এসব চরিত্রহীন শিক্ষিত জ্ঞানপাপীদের ধারাই সংঘটিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশিষ্ট কার্টুনিস্টের একটি দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে। তিনি কার্টুনিস্ট এভাবে এঁকেছেন– ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দরজা দিয়ে ছাত্ররা লেখাপড়ার জন্য ঢুকছে- আরো দরজা দিয়ে গরু-ছাগল আর ভেড়া হয়ে বেড়িয়ে আসছে।
এছাড়াও পাশ্চাত্যের ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা তথা secular বা liberal Education-এ শিক্ষিত আমেরিকার Albert Seazer নাম একজন social Philosopher and Educationist তার বিখ্যাত বই “The Teaching of Reverence for life'” এ লিখেছেন Three kinds of progresses and significant progress in Knowledge and Technology, Progress in socialization at man and progress in spiritualist. The last one is the most important.” ‘‘তিনি তার বইতে বর্তমান আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে যেখানে একটা turning point এ শিক্ষাকে ideologicals orient করার চেষ্টা করতে বলেছেন। এক্ষেত্রে তিনি আরো পরামর্শ দিয়েছেন। “Our age must achieve spiriitual renewal. A new renaisseance must come to renaisseance in which mankind discovered that ethical action is the supreme truth and the recpreme utilitariamtion by which mankind will he liberated.” এই spiritual liberation ছাড়া মানবজাতির কোন মুক্তিই হতে পারে না। এ জন্যে ধর্মহীন শিক্ষার কুফল সম্পর্কে জনৈক মনীষী বলেছিলেন If you give to the students the three R’s i.e Reading, Writting and Arithmetic and do not give them the fourth ‘R’, i.e. Religion they will become the 5th ‘R’ i Rascals.” এ আদর্শ বাক্যটি শিকেয় তুলে রেখে আমরা আজ গোড়া কেটে দিয়ে আগায় পানি ঢালছি। সুতরাং ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা বা Secular বা liberal education দ্বারা দেশ ও জাতির নেতৃত্ব তথা আদর্শ নাগরিক তৈরি করা সম্ভব নয়।
অতএব, আমাদের আজকে বের করতে হবে যে, শিক্ষার মৌলিক কোথায়? আমরা মনে করি, কেউ হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক। কেননা আমরা আজ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ideological basis বা আদর্শভিত্তি কি হবে যা নির্ধারণ করতে পারিনি। আমরা জানি যে, শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষেত্রে National Ideolog নির্ধারণ অপরিহার্য। কেননা যে জাতির আদর্শ সে আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রেখেই উক্ত জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তোলা উচিত।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় আদর্শ কি? বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রে এক সময় secularism and socialism কে National ideology বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৭ সালে শাসনতন্ত্রের ৫ম সংশোধনী Reference এর মাধ্যমে পাস হবার পর গণতন্ত্রে secularism এর স্থানে মহান আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও এদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগই মুসলিম। স্বাভাবিকভাবে ইসলাম তাদের National ideology যে মুসলিম জাতীয়তাবোধ অখন্ড ভারতের ধব্জাধারী congress এর secular ideology যে অঙ্গীকার হয়ে এদেশকে ভারত থেকে আলাদা করেছিল। যে জাতীয় চেতনার ভিত্তি ছিল ইসলাম। সুতরাং ইসলাম বাংলাদেশের একমাত্র National ideology.
অতএব ইসলামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যমান এবং বাংলাদেশের আযাদী অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে দৃঢ়তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রেরণা দানকারী ideology হতে পারে। নতুবা আমাদের বর্তমান প্রচলিত আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা অথবা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবে দিশাহারার ন্যায় অনিশ্চিত পথে চলে জাতি ধ্বংসের পথেই যেতে থাকবে। আর এটিই বোধ করি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত সংকট।

আখতার হামিদ খান