সংস্কৃতি কি?, সংস্কৃতি কী?, সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ

ইংরেজি Culture-এর প্রতিশব্দ হিসেবে সংস্কৃতি শব্দটি ১৯২২ সালে বাংলায় প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয়। কোন স্থানের মানুষের আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সঙ্গীত, নৃত্য, সাহিত্য, নাট্যশালা, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয়, তাই সংস্কৃতি। উক্ত বিষয়গুলোকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগ নিত্যদিনকার জীবনযাপনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। আর দ্বিতীয়ভাগ জীবন উপভোগের ব্যবস্থা এবং উপকরণের সাথে সম্পকির্ত।

তথ্যসূত্র

  • রহমান, মুহাম্মদ হাবিবুর (১৯৯৭)। একুশে ফেব্রুয়ারি সকল ভাষার কথা কয়। সময় প্রকাশন। পৃ: ২৬। ISBN 984-458-156-7।
  • বদরুদ্দীন উমর, সংস্কৃতির সংকট, মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৪, ২৭ পৃ:

শাহ্ আবদুল হান্নান লিখেছেন ————

সংস্কৃতির চিত্র ও বৈচিত্র্য

সংস্কৃতি কী
সংস্কৃতি কী এবং কী নয়, এ সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে গত একশ’ বছর ধরে। এ বিতর্ক বৃদ্ধি পায় মার্কসিজমের উত্থানের পরে। মার্কসিজমের উত্থানের পর একটি নতুন দর্শন আসে Art for life sake নামে। তখন এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় যে, Art for Art sake bv Art for life sake—এ বিতর্ক আগে ছিল না। কমিউনিস্টরা এ বিতর্ক তুলে ধরে। এটি করতে গিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করে। আর্ট এখানে সংস্কৃতি অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কৃতির ভেতর যে একটি সৌন্দর্য থাকতে হবে তা তারা হাইলাইট করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। তারা সম্পূর্ণভাবে এটিকে উপেক্ষা করে।
অন্যদিকে যারা ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’-এর পক্ষে তারাও এ ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করে। তারা বলেন, আর্ট আর্টের জন্য। অর্থাত্ এর মধ্যে সৌন্দর্য থাকতে হবে। সৌন্দর্যের চেতনা থাকতে হবে। যা কিছুই সুন্দর করে এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করে জীবনের বিভিন্ন দিককে, সাহিত্যকলায়, তাই সংস্কৃতি।
সংস্কৃতির প্রশ্নে যদি আমরা সুবিচার করতে চাই তাহলে সেখানে আর্ট বা সংস্কৃতিতে দুটি দিকই থাকতে হবে। জীবনের জন্য তা প্রয়োজনীয় হতে হবে। জীবনের জন্যই হবে, জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। তার মাধ্যমে জীবনকেই ধারণ করতে হবে। এটিই সত্য কথা। অন্যদিকে এটিও সত্য যে, যা কিছু সুন্দর নয় তা আর্ট বা সংস্কৃতি হবে না, তা জীবনের জন্য হলেও। কাজেই দুটি উপাদানই প্রয়োজন। দুটিই সত্য। এ বিতর্কের পরিসমাপ্তির প্রয়োজন রয়েছে। তবে আমার মনে হয় বর্তমানে তার পরিসমাপ্তি কিছুটা হয়েও গেছে। মার্কসিজমের পতনের পর এ বিতর্ক আর খুব একটি আছে বলে মনে হয় না।
যে কোনো আদর্শভিত্তিক দলও একথা তুলতে পারে যে আর্ট ফর লাইফ সেক। এটি তারাও নিয়ে নিতে পারে। এটি কেউ কেউ কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়েও নিয়েছে। কিন্তু এটি প্রয়োজনীয় নয়। এ তর্ক ইসলামপন্থীদের দরকার নেই। ইসলামপন্থীদের সংস্কৃতির মধ্যে এ দুটি জিনিসের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
এ তাত্ত্বিক কথার বাইরে বলা যায় সংস্কৃতির বহু দিক রয়েছে। বহু ডাইমেনশন রয়েছে। সাহিত্য, শিল্প, সিনেমা, নাটক, সবই সংস্কৃতির অংশ।
সংস্কৃতির ডাইমেনশনের কথা বলতে গিয়ে তার বিভিন্ন ডাইমেনশনের কথা আসে। গান ও সঙ্গীত, সাহিত্য, সাহিত্য থেকে আরম্ভ করে নাটক, সিনেমা সব কিছুই সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে। আরেকটি দিক থেকে বলতে গেলে বলা যায়, মানুষের জীবনাচারই সংস্কৃতি। মানুষের গোটা জীবনপদ্ধতিই সংস্কৃতি। সে হিসেবে সংস্কৃতির আরও ব্যাপক অর্থ দাঁড়ায়।
সংস্কৃতির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু মৌলিকভাবে আমরা স্বীকার করি, সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। সংস্কৃতি গোটা জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংস্কৃতি প্রতিটি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তার যেমন অনেক দিক বা ডাইমেনশন রয়েছে তেমনি সর্বোপরি এটি জীবনকে সার্ভ করতে হবে। সৌন্দর্যকেও সার্ভ করতে হবে। আবার বলি এটিকে সুন্দরও হতে হবে এবং জীবনের জন্যও হতে হবে।

সংস্কৃতি ও মানুষ
সংস্কৃতি ও মানুষকে আলাদা করা যায় না। তবে এভাবে বলা যায়, সংস্কৃতির জন্য মানুষ নয়। মানুষের জন্য সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ কল্পনা করা যায় না। প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি রয়েছে। ব্যক্তির একটি স্বতন্ত্র সংস্কৃতিও রয়েছে। তার চালচলন আর স্বভাবের মধ্যে সেসব পরস্ফুিটিত হয়ে ওঠে। প্রত্যেক পরিবারের একটি সংস্কৃতি রয়েছে। তার মধ্যেও একটি স্বাতন্ত্র্য থাকতে পারে। তার ধরনে, বলনে, কথনে, বক্তব্যে, চলনে সেটি থাকতে পারে। সমাজের থাকতে পারে। একটি জাতির থাকতে পারে। সুতরাং সংস্কৃতির বাইরে মানুষ নয়। আবার মানুষের বাইরেও সংস্কৃতি নয়।

সংস্কৃতির ভিত্তি
সংস্কৃতিকে কয়েকটি ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। সুস্থ বিশ্বাসের ওপর সংস্কৃতিকে দাঁড়াতে হবে। যদি দুর্নীতিগ্রস্ত চিন্তার (ঈড়ত্ত্ঁঢ়ঃ ঃযড়ঁমযঃ) ওপর সংস্কৃতি দাঁড়ায় সে সংস্কৃতিও দুর্নীতিগ্রস্ত হবে। কারণ বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি হচ্ছে আচরণ। তার পেছনে রয়েছে বিশ্বাস। এ বিশ্বাস আচরণকে প্রভাবিত করে। এ বিশ্বাস দুর্নীতিগ্রস্ত হলে আচরণও তাই হবে। বিশ্বাস সুস্থ হলে সেটিও সুস্থ হবে।
এখানে মুসলিম জাতির কথা বললে তার ভিত্তি অবশ্যই তৌহিদ হতে হবে। তৌহিদ বলতে আমরা বুঝি একজন স্রষ্টা রয়েছেন। সব সৃষ্টির একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আমরা মানুষ। আমরা আল্লাহর প্রতিনিধি। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে তার মিশনকে এ বিশ্ব, আকাশ সর্বত্র কার্যকর করা। এজন্য মুসলিম সংস্কৃতিকে সব সময়ই শিরকমুক্ত হতে হবে। মুসলিম সংস্কৃতি এমন হতে হবে যেন খলিফার মর্যাদা রক্ষা পায়। তার যে প্রতিনিধি মানুষ, তার সঙ্গে খাপ খায়। অর্থাত্ তা ভদ্র হতে হবে। সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে হবে। মার্জিত হতে হবে। অমার্জিত হলে চলবে না। এটি অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। কাজেই সংস্কৃতির প্রথম ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। ইসলামের ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে তৌহিদ। তাহলে তেমনি যদি আমরা ইসলামের বাইরে গিয়ে দেখি তাহলে অমুসলিমদের মধ্যেও সুস্থ বিশ্বাস থাকতে হবে। সেটি তৌহিদ নাও হতে পারে। সেটি আমার দৃষ্টিতে সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু আমার দৃষ্টিতে যাই হোক না কেন, যদি স্রষ্টার ওপর বিশ্বাস থাকে, মানবতাবাদী হয় তাহলে তার ওপরেও যে সংস্কৃতি গড়ে উঠবে সেটিও ভালো হবে। মানবতার একটি অংশ মুসলিম। বাকি অংশ অমুসলিম। তাদের সংস্কৃতি ভালো হবে যদি তা সুস্থ বিশ্বাসের ওপর হয়। তাদের ক্ষেত্রে সেটি স্রষ্টার ওপর হতে হবে। যদি নাস্তিকতার ওপর হয় তাহলে ক্ষতি হবে। যদি স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর ভিত্তিশীল হয় তাহলে তা নাস্তিকতার চেয়ে অনেক ভালো হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সেটি যদি মানবতাবাদী হয় তাহলে অবশ্যই ভালো হবে। কিন্তু সেটি যদি জাতিপূজা বা গোত্রপূজা হয় তাহলে সেটি হবে অসুস্থ সংস্কৃতি। সুতরাং ইসলামের ক্ষেত্রে তৌহিদ বলব। কিন্তু মানবতার যে অন্য অংশ রয়েছে, তারা তৌহিদ মানছে না। তাদের ক্ষেত্রে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলার ভিত্তির জন্য অবশ্যই একটি সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। সেটি হতে পারে মানবতাবাদ এবং স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস। কিন্তু নাস্তিকতার ওপর হতে পারে না। যদি হয় তাহলে তা মারাত্মক হবে। যদি রেসিজম বা গোত্রবাদ হয়, বংশপূজা হয়, জাতিপূজা হয় তাহলেও সেটি মারাত্মক হবে।
তাহলে আমরা বলতে পারি, সংস্কৃতির জন্য সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। দ্বিতীয়ত তা অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। যদিও এটি প্রথমটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যদি সংস্কৃতি সুস্থ বিশ্বাসের ওপর হয় তাহলে তা অশ্লীলতামুক্ত হবেই। কারণ কোনো সুস্থ বিশ্বাসই বলে না অশ্লীলতা ভালো। এ সংস্কৃতি অবশ্যই মানবজাতির জন্য হতে হবে। সংস্কৃতিকে মানবজাতির উদ্দেশ্য পূরণ করতে হবে। মানবতাবাদী হতে হবে। কল্যাণধর্মী হতে হবে।
সংস্কৃতির আরেকটি ভিত্তি হচ্ছে সৌন্দর্য-চেতনা। এখানে সুন্দর চেতনা থাকতে হবে। কোনো কিছুই অসুন্দর করা যাবে না। কাজেই সার্বিকভাবে বলা যায় সংস্কৃতির ভিত্তির জন্য একটি সুস্থ বিশ্বাস লাগবে। মানবতাবাদী ও মানুষের প্রয়োজনে হতে হবে। অশ্লীলতামুক্ত হতে হবে। কল্যাণধর্মী হতে হবে এবং সৌন্দর্য-চেতনামণ্ডিত ও সৌন্দর্য-বুদ্ধিমণ্ডিত হতে হবে।
এজন্য আমাদের বিভিন্ন পার্থক্যকে (চষঁত্ধষরংস) মেনে নেয়া দরকার। বিশ্ব এক রকম নয়। বিশ্ব এক জাতি মিলে হয়নি। আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন, আমি যদি চাইতাম সবাই ইসলামের অনুসারী হয়ে যেত। সবাই সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে থাকত। কিন্তু আমি তো এরকম পরিকল্পনা করিনি। আমি মানুষকে স্বাধীনতা দিয়েছি। অর্থাত্ সবাই এক পথে আসবে না আমার এ দেয়া স্বাধীনতার কারণে। এটিকে সামনে রেখে বলা যায় এ বাস্তবতা আজকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। মানুষ বিভিন্ন মতের হবে, বিভিন্ন ধরনের হবে। সেটিকে সামনে রেখে আমি বলেছি সুস্থ বিশ্বাস ইসলামের ক্ষেত্রে তৌহিদ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে মানবিকতা হতে হবে। স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস থাকতে হবে যদি তা তৌহিদ নাও হয়। তাহলে সেটি সুস্থ সংস্কৃতি হবে। সেটি নাস্তিকতার চেয়ে অনেক অনেক ভালো। নাস্তিকতার ওপরে, রেসিজমের ওপরে কোনো ভালো সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে না।

সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ
সংস্কৃতি কি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? নিয়ন্ত্রিত হলে কতটুকু? এটি আসলে ইয়েস ও নো’র (ণবং ধহফ হড়) প্রশ্ন। এটি ঠিক যে সংস্কৃতি মানুষ নির্মাণ করে। একা এক ব্যক্তিই সংস্কৃতি নির্মাণ করে না। অনেকে মিলে, অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি সংস্কৃতি শত বছরে, হাজার বছরে গড়ে ওঠে। তাই যদি হয় তাহলে এটি কে গড়ল? মানুষ গড়ল। কিন্তু কোনো এক ব্যক্তি বা এক প্রজন্মের বা এক বংশের এর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এ অর্থে বলা যায় এটি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। কিন্তু আবার এটিও তো সত্য যে সংস্কৃতি প্রকৃতপক্ষে মানুষই তৈরি করে এবং এ অর্থে মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু এ অর্থে আবার নিয়ন্ত্রিত নয় যে কোনো একটি জাতি, কোনো একটি (এবহবত্ধঃরড়হ) এ সংস্কৃতি নির্মাণ করেনি। অথচ আমরা তো জেনারেশন ধরে চিন্তা করি, আমরা তো ঐতিহাসিকভাবে একত্রে অবস্থান (বীরংঃ) করছি না। সুতরাং এ অর্থে আবার বলা যায় সংস্কৃতি মানুষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক বিকাশ (ঐরংঃড়ত্রপধষ ওফবহঃরঃু)। এজন্যই আমি বিভিন্ন জায়গায় বলে থাকি যে সংস্কৃতিকে নিয়ে খেলা চলবে না। সংস্কৃতি মানুষের গভীর চেতনা থেকে উত্সারিত। এটি খুব স্পর্শকাতর। সংস্কৃতি নিয়ে সাবধানে এগুতে হবে। যেহেতু আমি একজন ইসলামপন্থী, একথা সেজন্য ইসলামপন্থীদেরও বেশি করে বলি। আমার অনেক কিছুই পছন্দ হবে না, কিন্তু সেটি রাখতে হবে আস্তে আস্তে। ধৈর্য ধরে সরাতে হবে। যেটি রাখলে চলে সেটি রাখতে হবে। কারণ ইসলামের শুরুতেই রাসুল (সা.) সরাসরি ইসলামবিরোধী নয় এমন স্থানীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি আরব কাস্টমসকে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। ইবনে তাইমিয়ার একটি বিখ্যাত ফতোয়া আছে, যে কোনো দেশের স্থানীয় কাস্টমস (রীতিপ্রথা) তা যদি সরাসরি ইসলামবিরোধী না হয়, একেবারে সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না হয়, তাহলে সেটি থাকবে।
আমরা এ ব্যাপারে অনেক সময় কিছুটা হঠকারিতা করে বসি। কিছুটা বাড়াবাড়ি করে বসি। এগুলো থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। ইসলামের যে মহত্ত্ব, সামগ্রিকতা, ব্যাপকতা এবং বহু মত ও পথের সুযোগ আছে সে সুযোগের বিষয়টি মনে রাখতে হবে। যদি এ মত ও পথের সুযোগ না থাকত তাহলে এতগুলো মাজহাব হলো কীভাবে? সুন্নীদের চারটি মাজহাব হলো কীভাবে? শিয়াদের মধ্যে কয়েকটি মাজহাব হলো কী কারণে? এটি হয়েছে এ কারণে যে ইসলামে এ অপশনটি আছে।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের বিভিন্ন মতামতকে মানতে হবে। এখানে বিভিন্ন মত-পথের স্বীকৃতি আমাদের দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের যে সংস্কৃতি তার তো একেক দেশের একেক সংস্করণ। ইন্দোনেশিয়ার ইসলামী সংস্কৃতি রূপে-রসে-রঙে একই সঙ্গে ইসলামিক হবে, ইন্দোনেশিয়ানও হবে এবং তার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব থাকবে না। সংস্কৃতির ভেতর যদি সুস্পষ্ট ইসলামবিরোধী কোনো মৌল উপাদান না থাকে তাহলে তা ইসলামী সংস্কৃতি হতে বাধা নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তেমনিভাবে তা প্রযোজ্য মরক্কো, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। প্রত্যেকের নিজস্ব রঙ হবে। আমার মনে হয় অনেকটা এরকম হবে যে, একই বাগানে ইসলাম তার মধ্যে একশ’টি ফুল গাছ। এ বিষয়গুলো ইসলামী সংস্কৃতি কর্মীদের ভেবে দেখা দরকার। এ বিষয়টি বিচার করে দেখা দরকার।

সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংস্কৃতিই তার অন্যতম পরিচয়। নতুন পরিচয় গড়ে তোলা কঠিন। মানুষ পরিচয় ছাড়া চলতে পারে না। তাই হঠাত্ করে নতুন আইডেনটিটি সে গড়ে তুলবে কীভাবে? তার পুরনো পরিচয় রাখতে হবে, শুধু ততটুকু বাদ দিতে হবে যতটুকু মানবতার জন্য ভালো নয়। যেটুকু সৌন্দর্যের বাইরে, অশ্লীলতায় ভরা এবং ইসলামের ক্ষেত্রে শিরক রয়েছে অথবা ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী, সেটুকু বাদ দিয়ে বাকিটুকু রাখাই তার দায়বদ্ধতা।

বিনোদনের সংস্কৃতি
সংস্কৃতির বাইরে কোনো মানুষ হতে পারে না। সমাজ হতে পারে না। তাই তার পক্ষে সংস্কৃতিবিমুখ হওয়াও সম্ভব নয়। তবে সুশিক্ষার অভাবে, দারিদ্র্যের কারণে কিছু লোক যদি অপরাধী হয়ে যায় তাহলে তার সংস্কৃতি হয়ে যাচ্ছে কুসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি। আবার প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত একটি সংস্কৃতি আছে। কেউ দেশের গান পছন্দ করে, কেউ হামদ-নাত পছন্দ করে। এটি হলো একটি দিক। আর গান-বাজনা হলো কালচারের বাইরের একটি দিক। যদিও এগুলোই বেশি, তারপরও এসব কিছু কালচারের মূল দিক নয়। কালচারের মূল দিক হচ্ছে জীবনাচার, পুরো জীবন। প্রত্যেকটি কথা, প্রত্যেকটি উচ্চারণ, বক্তব্য, চলাচল, ভ্রমণ, কথন সব কিছু হচ্ছে তার কালচার। আমরা খুব গভীরভাবে না দেখার কারণে গান, নাচকেই বড় ভেবে এসব বিষয়কে ছোট ভাবি। কিন্তু এগুলো না থাকলেও একটি জাতির পক্ষে সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব। এগুলো বাদ দিয়েও জাতি সংস্কৃতিবান হতে পারে। অনেক জাতিই আছে যাদের গান খুব পপুলার নয়, যাদের নাচ নেই- তাতে কিছু আসে যায় না।
আমরা বিনোদনের নামে যা খুশি তাই করতে পারি না। জীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিনোদন। বিনোদন প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে বিনোদনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের দৈনিক জীবনের একটি অংশ রাস্তায় চলে যায়। তার সঙ্গে অফিসের সময়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ ব্যস্ত। এ অবস্থায় তার জন্য অবশ্যই একটি সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিনোদনকে সু্স্থ হতে হবে। অসুস্থ হওয়া যাবে না। অশ্লীল হওয়া যাবে না। কুস্বভাব সৃষ্টি করে, অপরাধ ছড়ায় এমন কিছু করা যাবে না। খারাপ যা খুব কম ঘটে তাকে নাটকে এনে জাতিকে জানাতেই হবে তা আসলে জরুরি নয়। সাহিত্যের নামে যেটি করা হয়—একটি পরিবারের দুর্ঘটনাকে গোটা জাতিকে জানানো হয়। কিন্তু তা যদি সুন্দর কিছু হতো তাও কথা ছিল। আসলে বিনোদনের মধ্যে একটি সীমা থাকতেই হবে। সে সীমা থাকতে হবে আইন এবং কাস্টমসের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে স্বাধীনতার নামে আমরা কদাচারকে অনুমোদন করতে পারি না। আমরা এমন স্বাধীনতা চাই না, যে স্বাধীনতা মানুষকে অমানুষ বানায়।