কাজী নজরুল

সমাজের সব শ্রেণীর মানুষ গান ভালোবাসে। গানের জন্য প্রয়োজন হয় না বিদ্যা-বুদ্ধির। সবাই হতে পারে গানের শ্রোতা। আমাদের জাতীয় কবির বেলায় সঙ্গীত-ই ছিল সাধনার মূলমন্ত্র। কবিতা ও গানে সমভাবে প্রতিভার দাবিদার হলেও গান দিয়েই আকৃষ্ট করেছেন মানুষকে। মুজাফর আহমেদ বলেছেন তার স্মৃতিকথায়, ‘নজরুলের জনপ্রিয়তার অন্য একটি কারণ ছিল তার গান। আমার মতে, নজরুল খুব সুকণ্ঠের গায়ক ছিল না। তবে প্রাণের সমস্ত দরদ ঢেলে দিয়ে সে গান গাইত। তাই তার গান সব শ্রেণীর লোককে আকর্ষণ করতো।’ ‘নিমশা’ গ্রামের লেটোর দলের পরিচালক ছিলেন বজলে করিম। নজরুলের গান রচনার হাতেখড়ি এখানেই। সব রকমের মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে জানার সুযোগ পান হিন্দু-মুসলিম দুই সংস্কৃতিকে। দুই সংস্কৃতির গান লিখে মুগ্ধ করেন মানুষকে। দলে দলে লোক আসে তার কাছে গানের বিভিন্ন ফরমাশ নিয়ে। কেউ চায় ঠেস গান, কেউ চায় ‘বন্দনা গান’ সঙের গান, চাপান গানও চায় কেউ কেউ। বহুমুখী প্রতিভার কবি সন্তুষ্ট করেন সবাইকে চাহিদানুযায়ী। এভাবে গান লিখেই পরবর্তীকালে কবি হয়ে যান সঙ্গীতের সাধক। এ ব্যাপারে প্রণব রায় বলেন, ‘কাজী দা ছিলেন একেবারে সত্যিকারের স্বভাব কবি। কাগজ-কলম নিয়ে বসলেই হলো। যেন একেবারে কল খুলে দেয়ার মতো হুড় হুড় করে কলমের ডগা দিয়ে কাব্য রচনা বেরিয়ে আসতো। একবার দেখেছিলাম, গ্রামফোন কোম্পানির রিহের্সাল রুমে ২৭ মিনিটের মধ্যে পাঁচ-ছ’খানা শ্যামা সঙ্গীত তিনি লিখে ফেললেন এবং প্রত্যেকটি অনবদ্য।’ তাকে লিখতে হতো আরবী-ফারসী, বাংলা-ইংরেজি শব্দ ও বাক্য মেশানো গান। বাংলা সঙ্গীতঙ্গের মধ্যে দেশী-বিদেশী সুরের মিশ্রণে নতুন সুর সৃষ্টির প্রয়াস ছিল না তেমন। সার্থকভাবে এ পরিবেশন করেন নজরুলই প্রথম। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের গানের সুর সার্থকভাবে সংযোজিত হয় বাংলা গানে। নজরুলের অধিকাংশ ভালো গানই কবিতা। তার কাব্যসঙ্গীতে বাণী ও সুরের যে ধারা প্রতিষ্ঠা করেন সেটাই আধুনিক বাংলা গানের পথ প্রদর্শক। পরবর্তীকালে আধুনিক কবিরাও প্রভাবিত হয়েছেন এ ধারায়। একসঙ্গে চৌদ্দ-পনেরটি গান লিখে ফেলতেন লেটোর দলে থাকতে। এতে সুর সংযোজন করে ভার নিতেন সকলকে শেখানোর। এর মধ্যে খুঁজে পেতেন তৃপ্তি। আসানসোলের কয়লাখনি অঞ্চলের এক বাগানে আয়োজন করা হয় গানের। এই আসরেই নজরুলের গান শুনে মুগ্ধ হন একজন গার্ড। এই গার্ডসাহেবই তাকে একটা চাকরি দেন খানসামার। ১৯১৭ সালের মাঝামাঝিতে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। সেখান থেকেও তিনি লেখা পাঠাতেন পত্রিকার জন্য। ‘উদ্বোধন’ নামে একটি গান বসন্ত মোহনী রাগে দাদরা তালে রচিত; এ গানটি প্রকাশিত হয় ‘সওগাত’ দ্বিতীয় বর্ষ বৈশাখ ১৩২৭ এ। সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দিন বলেন, এটিই তার প্রথম প্রকাশিত গান। গানটির অংশবিশেষ- ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন বাজাও ভীম বজ্রবিষাণে দুর্জয় মহা আহ্বান তব বাজাও।’
বাউল সুরে রচিত ‘কলঙ্গী প্রিয়া’ গানটি প্রকাশিত হয় ১৩২৭ সংখ্যায় সওগাত পত্রিকায়। সওগাত সম্পাদকের মতে, এটি তার দ্বিতীয় গান। নজরুল শুধু গান রচনা করে ক্ষান্ত ছিলেন না। চেষ্টা করতেন সে গান জিইয়ে রাখতে। দক্ষতা ছিল তার অন্যকে গান শেখানোর। স্মৃতিচারণে সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী আঙ্গুর বালা বলেন, ‘কাজীদা আমাকে গানের ট্রেনিং দিতেন। কাজীদার কাছে তারই লেখা গান তারই সুরে নিত্য নতুন করে শিখতাম। তার গানের ভাষা ও সুর মধুর ও প্রাণবন্ত লাগতো। কাজীদা চাইতেন তার গানের প্রতিটা কথা যেন আমরা তারই মতো উচ্চারণ করি। গানের মর্মার্থ পুরোপুরি বুঝে গান করি।’ গান লিখে নিষ্ঠার সাথে শিখিয়ে দিতেন অন্যকে। তার পরশে গানের কোম্পানির রিহের্সাল রুমে। এ রুমটাই ছিল তার গান রচনার সূতিকাঘর। তার গানের প্রচারক ছিলেন দিলীপ কুমার রায়। নজরুলের দেশাত্মবোধক ও গজল শ্রেণীর গান গাইতেন তিনি। বিস্ময় আনে কবির সঙ্গীত প্রতিভা। তার মতো অন্য কোনো সঙ্গীতজ্ঞ হিন্দুস্তানী সঙ্গীত বা খেয়াল ঠুংরীর ব্যবহারের অমন বৈচিত্র্য আনতে পারেনি বাংলা গানে। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের প্রচলিত লুপ্ত ও অর্ধলুপ্ত রাগ-রাগিণী অবলম্বন করে হিন্দী ভাঙা বাংলা খেয়াল বা রাগ প্রধান গানের ব্যাপক প্রচলন করেন এবং জনপ্রিয়তা পেয়েছে সেসবই। অখিল নিয়োগী তার স্মৃতি কথায় বলেন- ‘কাজীদা যখন গান করতেন কে যেন ভেতর থেকে ঠেলা দিয়ে সুরগুলো আগ্নেয়গিরির লাভার মতো প্রচন্ড আবেগে ঊর্ধাকাশে ছড়িয়ে দিত।’
আর একটা মজার ব্যাপার ছিল গান শেখানোর ব্যাপারে। গানের একঘেয়েমিতা থেকে থাকতেন দূরে। এক রকম গান গাইতেন না রোজ। রাগপ্রধান গান গাইলে পরদিন গাইতেন ঠুংরী। আবার ঠুংরীর পরদিন চলতো গজল। জীবন বোধের গভীরতায়, মানব প্রেমের প্রগাঢ়তায়, প্রকাশভঙ্গির অভিনবত্বে কবি ছিলেন অতুলনীয়। ছন্দ ও সুরের চমৎকারিত্বে ও শব্দ সাজানোর অপূর্ব দক্ষতায় গানের ভুবনে যে সুরের মূর্ছনা এনে দিয়েছেন তার সঙ্গে মিল হয় না অন্য কিছুর। নিজের আকাশে একাই ছিলেন দীপ্যমান। অনেক শিল্পী বিখ্যাত হয়েছেন তার লেখা গান গেয়ে। কোনো গানই চাননি নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে। ক্রমে নজরুল মঞ্চ চলচ্চিত্র ও বেতারের সাথে সংযুক্ত হন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ না লিখে শুধু যদি তিনি গানেই সীমাবদ্ধ থাকতেন তবুও হতেন খ্যাত। আজও তার সব গান গাওয়া হয় না। অল্প কিছু গানেই স্থান করে নিয়েছেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

আখতার হামিদ খান