চাকুরি, ব্যবসায় উদ্যোগ, সফল উদ্যোক্তা

কেন আপনি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না ?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Howard H. Stevenson এর থেকে জেনে নিন কেন ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আপনি নিজস্ব ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না ? Howard H. Stevenson হচ্ছেন আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের Sarofim-Rock Baker Foundation Professor, Senior Associate Dean এবং Harvard Business Publishing Company board এর চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের Senior Associate Dean এবং Director হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত Latin American Faculty Advisory Group এর চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তাছাড়া ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত Harvard University Resources and Planning এর Vice Provost এবং Senior Associate Provost হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে রচিত “A Perspective on Entrepreneurship” আর্টিকেলে তিনি ব্যবসায় উদ্যোগ বিষয়ে গভীর এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধারণা তুলে ধরেছেন। এই আর্টিকেলটি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের কাছেই সারা বিশ্বে আজও খুব সমাদৃত। উদ্যোক্তার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘উদ্যোক্তা হচ্ছে এমন ব্যক্তি যে সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ গ্রহণ করে এবং সেই সুযোগ বাস্তবায়ন করে’। তিনি আরও বলেন, ‘অনেক মানুষই চাকুরি ছেড়ে নিজস্ব ব্যবসার মালিক তথা উদ্যোক্তা হতে চায়। কিন্তু অধিকাংশ চাকুরীজীবী বা অন্য পেশার মানুষ শেষ পর্যন্ত কখনই উদ্যোক্তা হতে পারে না। এর মূল কারণ হল ব্যবসা শুরু না করার পেছনে তারা অসংখ্য অজুহাত তৈরি করে’ তার মধ্যে প্রচলিত কয়েকটি হল :
>> ব্যবসা করতে প্রচুর টাকা লাগে। আমার যথেষ্ট টাকা নেই।
>> আমি কখনই চাকুরি ছাড়তে পারবনা যেহেতু আমার সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আমার।
>> আমার মানুষের সাথে তেমন পরিচয় নেই/আমি খুব আত্মকেন্দ্রিক। আমাকে দিয়ে হবেনা।
>> আমি সফল ব্যক্তিদের মত অতটা স্মার্ট নই।
>> ব্যবসা করার জন্য আমার হাতে একটুও সময় নেই। আমি অন্য কাজে প্রচুর ব্যস্ত থাকি।
>> আমাকে ব্যবসায় সাহায্য করতে পারে এমন একজনকেও আমি খুঁজে পাইনি এবং পাবওনা।
>> একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে প্রচুর সময় দিতে হয়। আমার অত ধৈর্য্য নেই।
>> আমার অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে। এসময় নতুন করে ব্যবসা শুরু করা কঠিন।
>> আমি কর্মচারী নিয়ন্ত্রণ করা পছন্দ করি না/নিয়ন্ত্রণ করতে ভয় পাই। >> ব্যবসা মানেই হচ্ছে ঝুঁকি নেয়া। আমি ঝুঁকি নেয়া মোটেই পছন্দ করি না/ঝুঁকি নিতে ভয় পাই।
>> টাকায় টাকা আনে। যেহেতু আমার এখন টাকা নেই তাই আমি কখনই অনেক টাকার মালিক হতে পারবনা।
>> আমি একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েছি। এখান থেকে কিছুই করা সম্ভব নয়।
>> আমার পরিবার বা গোষ্ঠীতে কেউ ব্যবসা করেনি। তাই আমিও করতে পারব না।
>> ব্যবসা করার মত কোন সুযোগ আমার কাছে নেই।
>> ব্যবসা করার জন্য যেসব যোগ্যতা প্রয়োজন তার কোনটাই আমার মধ্যে নেই।
>> আমার স্ত্রী/স্বামী/পরিবার/আত্মীয়-স্বজন কখনই ব্যবসা করার বিষয়টা সাপোর্ট করবে না।
>> আমি ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ছাত্র নই। তাই ব্যবসার বিষয়াদি সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞান নেই।
>> এখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। এসময় ব্যবসা শুরু করলে নিশ্চিত লোকসান হবে।
>> ব্যবসাতে সফলতার চেয়ে ব্যর্থতার হারই বেশি। আমি ব্যর্থ হতে চাই না।
>> চাকুরির বদলে ব্যবসা করে খুব কম মানুষই ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছে।
>> ব্যবসায়ীদের মত আমি অত ভাগ্যবান নই। আমার ভাগ্য আমাকে কখনই সাহায্য করবে না।
>> আমি ব্যবসা করতে নামলে আমার পরিচিতজনেরা আমাকে নিয়ে সমালোচনা করবে।
>> ব্যবসায়ীরা অসাধু এবং বিবেকহীন মানুষ। তারা মূলত মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন করে।
>> মানুষ ব্যবসায়ীদেরকে সম্মান করেনা। আমার কাছে অর্থের চেয়ে সম্মানের মূল্য বেশি।
>> ব্যবসা বিষয়টাকেই আমার ভাল লাগেনা তা সেটা যে ধরনের ব্যবসাই হোক।
>> ব্যবসায় ঝামেলা বেশি। আমি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করি।
>> ব্যবসা শুরু করার পর লোকসান হলে আমি সেটা কাটিয়ে উঠতে পারব না।
>> অনেক দক্ষ, শিক্ষিত এবং যোগ্য ব্যক্তিও ব্যবসায় লোকসান করেছে। সেখানে আমার মত মানুষ কখনই লাভ করতে পারবে না।
>> ব্যবসার বিষয়টা আমি একটু ভেবে দেখি। যদি মন:পূত হয় তবে শুরু করব।
>> ব্যবসা না করেও হাজার হাজার মানুষ সুখী জীবন-যাপন করছে। সুতরাং ব্যবসা যে করতেই হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
>> আমার জন্ম যদি আজ থেকে ৪০-৫০ বছর পূর্বে হত তাহলে খুব সহজেই ব্যবসা করতে পারতাম।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চিন্তা করে তারা তাদের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে অথবা চাকুরির পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা গড়ে তুলবে। কিন্তু কেবলমাত্র ব্যর্থ হবার ভয়ে তারা শুরু করে না। তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তাদের নিয়মিত চাকুরিতেই পুনরায় মনোনিবেশ করে। এদের মধ্যে প্রচলিত কয়েকটি অজুহাত হল :
>> আমি কিছুদিন পর শুরু করব।
>> যখন সর্বোত্তম সুযোগটি আসবে তখন আমি ব্যবসা শুরু করব। >> যখন আমার হাতে টাকা আসবে আমি তখন শুরু করব।
>> যখন সঠিক সময় আসবে তখন আমি শুরু করব।
>> যখন আমার প্রচুর অবসর সময় থাকবে তখন আমি শুরু করব।
>> যখন আমি সঠিক পার্টনার পাব তখন আমি শুরু করব।
>> যখন আমার সন্তানের পড়াশোনা শেষ হবে তখন আমি শুরু করব।
>> পারিবারিক সূত্রে ব্যবসার মালিকানা পেলেই লাভ করা সম্ভব, অন্যথায় নয়।
>> আমার ইচ্ছে আছে কিন্তু আমার পরিবার/স্বামী/স্ত্রী চায় আমি চাকুরিতেই থেকে যাই।
>> আমি আমার চাকুরিতে পরবর্তী পদোন্নতির জন্য অপেক্ষা করছি। যদি আমি সেটা না পাই তবে আমি শুরু করব।
>> আমার মনে হয় শুরু করার আগে কলেজ/ভার্সিটিতে গিয়ে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় কিছু পড়াশোনা করে আসা উচিৎ।
>> আমি চাকুরিতে কঠোর পরিশ্রম করতে রাজি আছি কিন্তু ব্যবসা গড়ে তোলায় পরিশ্রম করতে পারব না।
>> চাকুরিতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ করা লাগে কিন্তু ব্যবসায় বিভিন্ন ধরনের কাজ করা লাগে যা আমি পারব না।
>> বিক্রির বিষয়টা আমার পছন্দ নয়। চাকুরিতে কোন কিছু বিক্রি না করেও বেতন পাওয়া যায়।
>> যদি আমি ব্যর্থ হই তবে আমার কি হবে?
>> চাকুরিতে বেতনের নিশ্চয়তা আছে কিন্তু ব্যবসায় সেটা নেই। আমি নিশ্চিত বেতন ছেড়ে ব্যবসা করতে পারবনা।
>> ব্যবসা করে অর্থোপার্জন করাটা চাকুরির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং কষ্টকর। শুধু শুধু কষ্ট বাড়িয়ে লাভ নেই।
>> জীবন-যাপন করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং চাকুরির বেতনই যথেষ্ট, ব্যবসা করাটা খুব বেশি জরুরী নয়।
>> আমি ব্যর্থ হলে মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারব না।

অধ্যাপক এ সম্পর্কে বলেন, ‘একটি দুই বছরের শিশুও এসব অজুহাত তথা খোঁড়া যুক্তি তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু যারা সফল ব্যবসায়ী তারা কখনই অজুহাতের আশ্রয় নেয়না। যেসব মানুষের অজুহাতের শক্তি তাদের স্বপ্নের শক্তির চেয়ে বেশি সেসব মানুষ কখনই উদ্যোক্তা হতে পারে না কেননা সাফল্য এবং অজুহাত কখনই একসাথে অবস্থান করে না। তাই অজুহাত বর্জন না করতে পারলে ব্যবসায় এবং ব্যক্তিগত জীবনে সাফল্য অর্জন একেবারেই অসম্ভব’। তিনি আরও বলেন, সফল উদ্যোক্তাদের কাজের ধাপগুলো ভিন্ন। এই ভিন্নতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি নিচের মডেলটি উল্লেখ করেন। এই মডেলে যে ধাপগুলো বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলো একজন সফল উদ্যোক্তার জন্য অবশ্যম্ভাবী বলে তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন :
>> ব্যবসার আইডিয়া পাওয়ার পর সেটা সতকর্তার সাথে পরীক্ষা করা এবং যদি আইডিয়াটি বাস্তবমুখী হয় তবে অবিলম্বে ব্যবসা শুরু করা।
>> ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়া এবং সেই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা গ্র্রহণ করা।
>> একজন পথপ্রদর্শক খুঁজে বের করা এবং তার কাছ থেকে দিক নির্দেশনা গ্রহণ করা।
>> পুনরায় ব্যর্থ হওয়া এবং সেই ব্যর্থতা থেকে পুনরায় শিক্ষা গ্রহণ করা।
>> পথপ্রদর্শকের সান্নিধ্যে এসে অধিক অধিক পরামর্শ গ্রহণ করা।
>> প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হওয়া এবং সেই ব্যর্থতা থেকে প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ করা।
>> সফল হবার আগ পর্যন্ত ১ থেকে ৬ নম্বর ধাপগুলোর পুনরাবৃত্তি করা।
>> সফলতার অনুষ্ঠান আয়োজন করা এবং সেই অনুষ্ঠান উপভোগ করা।
>> ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ হিসেব করা। পাশাপাশি সাফল্য এবং ব্যর্থতার পরিমাণ হিসেব করা।
>> পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরাবৃত্তি করা।

মো: রুবেল খান