চিঠিপত্র,বর্তমান শিক্ষা

বই ও বইমেলা- দুটিই পরম আনন্দের। গর্বের। একটি জ্ঞান অর্জনের অন্যটি বিস্তারের। কিন্তু সব বই কি জ্ঞান অর্জনে সহায়ক? সব মেলাই কি আমাদের চিত্তে সুবাস বইয়ে দেয়? আমরা কি পড়ছি, কী-ই বা পড়া উচিত, বাংলাভাষার সমৃদ্ধি কতটুকু? আর সৃজনশীল বইয়ের শিল্পমান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এসব বিষয় নিয়ে হাজির হই কয়েকজন লেখকের কাছে। ধন্যবাদ লেখকদের যারা আমাদের তাৎক্ষণিক প্রশ্নে জর্জরিত না হয়ে জবাব দিয়েছেন সুন্দর ও গোছালোভাবে। আমরা কৃতজ্ঞ তাদের কাছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও সময় স্বল্পতার কারণে পরিসর সংক্ষিপ্ত করতে হলো। সাক্ষাৎকার গ্রহণে ছিলেন রে দ ও য়া নু ল হ ক
লেখকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন ছিলো-
১. কেমন ধরনের বইমেলা হলে আপনি আনন্দিত হতেন?
২. কোন বিষয়ের বই পড়তে পছন্দ করেন?
৩. বই পড়ার ব্যাপারে পাঠকের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ?
৪. আমাদের গনমাধ্যম ও সমাজজীবনে বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থা কেমন?
৫. সৃজনশীল বইয়ের শিল্পমান সম্পর্কে কিছু বলুন।

আ ল মু জা হি দী
১. বই বা গ্রন্থ এই কথা বললেই বিবেকে একটা নাড়া পড়ে যায়। বই হচ্ছে মানবসমাজের বিবেকের স্বচ্ছ দর্পণ। বই প্রকৃতির মতো জীবনের অভিজ্ঞতা ও পাঠকে লিপিবদ্ধ করে রাখে। আমি বই বলতেই মননশীল, সৃজনশীল এবং পঠনশীল বলে মনে করি। বইমেলায় বিচিত্র ধরনের বই আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কিন্তু সে আত্মপ্রকাশের সম্ভাবনাটা মহত্তর এবং অর্থময় কিছু হওয়া উচিত।
২. বিশ্ব প্রকৃতির রহস্যনিচয়ের দাগ উন্মোচন করে এবং জীবনের বিচিত্র হাসি-কান্না, দুঃখ- আনন্দের মধ্যে প্রবেশ করার সুযোগ ঘটিয়ে দেয়, সে বই আমার অধীত বিষয়। অর্থাৎ পাঠ্য বিষয়। আর সর্বোপরি যে স্রষ্টা আমার প্রভু, জীবনের মালিক, সেই মালিকানাটা আমার জেনে নিতে জীবনের সত্তা ও স্বরূপকে উপলব্ধি করতে হয়। এই অনুভবের নিরীখে আমি বই পড়ে থাকি।
৩. মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে ‘‘পাঠ করো তোমার প্রভুর নামে। এক্ষেত্রে বই পড়তে হবে। ক্রমাগত পড়তে হবে, কিন্তু নির্বাচিতভাবে। অর্থাৎ সিলেকটিভ হবে। এলোমেলোভাবে কোনোকিছু পড়ে সময় কাটানোর পক্ষপাতি নই। মানবজীবন একটি সিরিয়াস বিষয় এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়। অতএব আমি মনে করি জীবনকে নিরন্তর মনুষ্যত্বময় করে গড়ে তোলাই হচ্ছে মানবধর্ম। এটা আমাদের ধর্মেরও শিক্ষা।
৪. আমাদের বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়ে যাওয়ার পরও, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে এর সম্মানজনক সুমার্জিত প্রচার-প্রচলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটা একটি দুর্ভাগ্যজনক বিষয়। আমি তাই মনে করি। আমাদের ভাষার আন্দোলন এখনও শেষ হয় নাই। এটা অসমাপ্য রয়ে গেছে।
৫. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, শহীদের আত্মদান, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতায় আত্মোৎসর্গ অনেকটাই নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে যদি আমরা জাতীয়ভাবে সকলক্ষেত্রে মননশীল, সৃজনশীল এবং নৈতিক হয়ে উঠতে না পারি। এ প্রসঙ্গে– আমাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের ক্রান্তীয় সংকট থেকে আমাদের উত্তরণ না ঘটে।

জু বা ই দা গু ল শা ন আ রা
১. একুশে গ্রন্থমেলা যেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেখানে ঠিকই আছে। বাংলা একাডেমীর সাথে এর একটা ঐতিহ্যিক সম্পর্কও আছে। তবে আরেকটু গোছালো, আরেকটু পরিপাটি হলে ভালো হতো। বিশেষ করে আরো জায়গা নিয়ে, বড় পরিসরে। বাদ পড়া প্রকাশকদের অসন্তোষ থেকে রক্ষা পেতো মেলা। এছাড়া ভিড়-ভাট্টার এরকম ধকলও সইতে হতো না।
২. যে বই মানুষের কথা বলে, জীবনের কথা বলে, সমাজের কথা বলে, সত্যের সন্ধান দেয়, এরকম বই পড়তে পছন্দ করি। অবশ্য আমার পাঠের মধ্যে ইতিহাস, ভ্রমণ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী বইও থাকে।
৩. দেশ ও জাতির প্রতি মানুষকে কমিটেড করে, দেশ সেবায় নিবেদিত করে- এ ধরনের বই পাঠকের পড়া উচিত বলে আমি মনে করি। যে বই পড়লে মানুষের অন্তরের রহস্য জানা যায়, জীবনের রহস্য জানা যায়, যা ব্যক্তিত্বকে আরো বাড়িয়ে তোলে, বিশ্বাসকে মজবুত করে এমন ধরনের বইয়ের প্রতিই আমি ইঙ্গিত দিতে চাই।
৪. আমাদের গণমাধ্যম ও সমাজজীবনে বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থা খুব ভালো না। একরকম দুরবস্থাই বলতে হবে। নাটকে, অভিনয়ে, উপস্থাপনে, উচ্চারণের বাচনভঙ্গিতে ত্রুটি লক্ষণীয়। আমাদের নাটক নিয়ে আমরা সবসময় গর্ববোধ করি। কিন্তু মাঝেমধ্যেই সহজ হতে গিয়ে লঘুরসের ভেতর ঢুকে যাই। এছাড়া জোর করে বিদেশী শব্দ ঢুকানোর চেষ্টা করি। আমরা সতর্ক হলে এখনি তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে বাংলাভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে বাঙালিরা। আমাদের ভাইদের জীবনের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি ভাষার স্বাধীনতা।
৫. আমাদের দেশের সৃজনশীল বইয়ের শিল্পমান খারাপ না। আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছতে হয়তো সময় লাগবে। অবশ্য মেটারিয়ালের সংকট আছে আমাদের দেশে। এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে আরো উন্নতি সম্ভব। প্রকাশকদের চেষ্টা আছে ত্রুটিমুক্ত করার। কিন্তু তাড়াহুড়া একটি বড় অন্তরায়। প্রডাকশন মনের মতো না হলে লেখক কষ্ট পান- এটা প্রকাশককে বুঝতে হবে।

জ য় নু ল আ বে দী ন আ জা দ
১. একুশে বইমেলা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে জড়িত। একুশের বইমেলা আমাদের জাতীয় অহঙ্কারও বটে। আবার আমাদের জাতীয় মননের প্রতীক বাংলা একাডেমীর সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে একুশে বইমেলা। একুশে বইমেলা বাংলা একাডেমীতেই হবে এটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো বাংলাদেশের জনসংখ্যাই শুধু বাড়ছে না বাড়ছে দেশের অর্থনৈতিক ও শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক কর্মকান্ড। ফলে আমাদের পাঠক বাড়ছে। বাড়ছে প্রকাশনা সংস্থাও। এমন বাস্তবতায় বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলা যতো সংখ্যক প্রকাশনা সংস্থা অংশগ্রহণ করতে চায় ততো সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে স্থান দেয়ার সমর্থ নেই। বিষয়টি আসলে ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। এমন অবস্থায় আমি মনে করি বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলার ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালনের পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রকাশনা সংস্থাগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আরো বড় ধরনের কোনো গ্রন্থমেলার আয়োজনের উদ্যোগ নিতে পারে। আর সেটা হবে বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থার বাস্তবতাকে স্বীকার করে এবং প্রয়োজনকে সামনে রেখে।
২. কবিতার বই, ভ্রমণ কাহিনী, তাত্ত্বিক গ্রন্থ এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে ধারণ করে এমন উপন্যাস পড়তে পছন্দ করি।
৩. না, এক্ষেত্রে তেমন কোনো পরামর্শ নেই। তবে কোন বইতে আনন্দ লুকায়িত আছে তা পরখ করে দেখার মতো অনুসন্ধানের দৃষ্টি পাঠকের থাকার প্রয়োজন।
৪. আমাদের গণমাধ্যম ও সমাজজীবনে বর্তমানে বাংলাভাষার ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। তবে বাংলাভাষায় লৈখিকরূপে বানান নিয়ে কিছু দ্বিধা-দ্বনদ্ব লক্ষ্য করার মতো। এ প্রসঙ্গে প্রচলিত বানান, প্রমিত বানান ও রীতির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমি মনে করি বানানরীতি একরকম হলে তা ভাষার ব্যাপক চর্চার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। এক্ষেত্রে স্কুল পাঠ্যসূচিতে যদি প্রমিত বানানরীতির চর্চা বাধ্যতামূলক থাকে তাহলে ভবিষ্যতে একক বানানরীতির অনুসরণ সহজ হবে। আর ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে উচ্চারণের বিষয়টিও খুব প্রাসঙ্গিক। আগে ছিলো আঞ্চলিক উচ্চারণের আপদ আর এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইংলিশ ও হিন্দি চয়নের কৃত্রিম সংশ্লেষ। এ বিষয়টি শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণের জন্য স্বাস্থ্যপ্রদ নয়। আর ব্যাকরণ চর্চার ক্ষেত্রে অমনোযোগিতাও বাংলাভাষা চর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা বিশৃক্মখলার সৃষ্টি করছে। এসব বিষয়ে আমরা আরো সচেতন হলে গণমাধ্যম ও সমাজজীবনে বাংলাভাষার চর্চা আরো অর্থবহ সার্থক হয়ে উঠবে।
৫. সৃজনশীল গ্রন্থের শিল্পমান খুবই প্রাসঙ্গিক বিষয়। এ কথা বলা যাবে না যে সৃজনশীল গ্রন্থের প্রকাশনার শিল্পমান সবক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রক্ষিত হচ্ছে। তবে সৃজনশীল অনেক গ্রন্থের শিল্পমান লক্ষ্য করে আনন্দিত হতে হয়। এটা আমাদের প্রকাশনা জগতের জন্য গর্বের বিষয়।

হা সা ন আ লী ম
১. একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আমাদের দেশে বড় বইমেলা হচ্ছে। অন্য একটি মেলা হয় ডিসেম্বরের শেষ দু’সপ্তাহে। সেটি বেশি প্রাধান্য পায়নি এখনও। ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কাজেই আমাদের বই মেলাটি একুশকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক বইমেলা হতে পারে। এটির স্থান পার্শ্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী ময়দানে হলে বেশ বড় স্থান পাবে।
২. একজন লেখককে সবধরনের বইই পড়তে হয়। লেখার জন্য ধর্মগ্রন্থ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্যসহ বিভিন্ন ধরনের বইপড়া উচিত। আমার পছন্দের বইপত্রের মধ্যে ধর্মগ্রন্থ, বিজ্ঞান, কবিতা, ছড়া, গল্পগ্রন্থ এবং ইতিহাস উল্লেখযোগ্য।
৩. পাঠকবৃন্দ এখন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দিকে বেশি ঝুঁকছেন। বইপড়ার সময় কম পাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে পাঠকদের বই বেশি পড়া উচিত। বই সর্বত্র এবং সবসময় পাঠ করা যায়। শুধু হাতের কাছে বইটি থাকতে হবে।
৪. বাংলাভাষার চর্চা বর্তমানে ভাল নয়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। গণমাধ্যমে বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বাংলার পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের হিন্দিভাষা বেশি ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো আমাদের দেশে প্রচারিত হচ্ছে। ভাষার কোন দোষ নেই। ভাষা শিক্ষা জ্ঞানীর কাজ। সব ভাষাই স্রষ্টার তৈরি। কিন্তু ভাষায় শুধু ভাষা থাকে না- থাকে পরজীবন পদ্ধতি ও পরসংস্কৃতি। এই ভিন্ন সংস্কৃতি আমাদের মনমগজকে পরাধীন করছে। এক সময় আমাদের দৈশিক সীমানাও হুমকিতে পড়বে। যে উর্দুভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম ছিল-আত্মদান ছিল এখন আমরা হিন্দির প্রেমে পরকীয়া করছি। এটা আত্মঘাতী। আমাদের ছোট বাচ্চারা হিন্দিতে কথাবার্তা বলে এবং হিন্দি চাল-চলনে চলতে পছন্দ করে। এটা খুবই দুঃখের বিষয়। আমাদের বাকস্বাধীনতা-দেশ স্বাধীনতা এক সময় শৃক্মখলিত হবে।
৫. বর্তমান সময়ে সৃজনশীল গ্রন্থের সংখ্যা খুব কম। সৃজনশীল বলতে গল্প, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস এবং মৌলিক প্রবন্ধকে বলছি।
সৃজনশীলতা মূলত লেখকের পরিপক্কতা ও লেখকমানের ওপর নির্ভর করে।
অনেকেই চর্বিত চর্বন করেন। বর্তমান সময়ে ভাল ছড়া কবিতার খুবই অভাব। নতুন বিষয়, নতুন বাক্যচয়নে, নতুন কৌশলে, নতুন চিত্রকল্প ও অলঙ্কারে ছড়া, কবিতা ও কথাসাহিত্য হাতেগোনা ২/৪ জনে করছেন।
যেকোন সৃজনশীল গ্রন্থের শিল্পমান তার চিন্তা ও শিল্পকলার মৌলিকত্বের ওপর নির্ভর করে। আমাদের বর্তমান সময়ে নিগূঢ় চিন্তাশীল এবং চিৎপ্রকর্ষ শিল্পীসত্তা খুবই কম। ফলে অধিকাংশের রচনা চর্বিত চর্বন এবং খুবই বাজে। এসবগ্রন্থ পাঠে সময় অপচয় হয়। হাজারের ভিড়ে যে ২/৪ জন সৃষ্টি হচ্ছেন- তাতেই বা কম কি?

সা য়ী দ আ বু ব ক র
১. আনন্দিত হতাম বইমেলাটি যদি খোলামেলা জায়গায় অনুষ্ঠিত হতো; মেলায় মানসম্মত বইয়ের সংখ্যাটা বেশি হতো; মেলাটি হতো শুধু লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের; দলীয় কোনো স্টল না থাকতো; লোকজন কেবল বই দেখতে আসতো না, প্রত্যেকেই অতত এক কপি করে বই কিনে নিয়ে বাসায় ফিরে যেতো; আর স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা সাহিত্যের সবচেয়ে ভালো বইগুলো কেনার সুযোগ পেতো।
২. সবার উপরে কবিতার বই। দ্বিতীয় পছন্দের বিষয়, প্রবন্ধ। তবে সুলিখিত না হলে পারতোপক্ষে কোনো প্রবন্ধের বই আমি পড়ি না। ভালো মানের গল্প-উপন্যাসও আমার প্রিয় পাঠ্য। জীবনীগ্রন্থও পছন্দ করি।
৩. পরামর্শ, বই কিনুন, তবে ভালো বইটি কিনুন, পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে বিভ্রান্ত হবেন না।
৪. আমাদের গণমাধ্যম ও সমাজজীবনে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা ভালো বলেই আমার মনে হয়। বাংলা ভাষার প্রতি সবারই মধ্যে আবেগ-ভালবাসা কম-বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এদেশে এখন মানসম্মত প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, মানুষ প্রচুর বই কিনছে। কোলকাতার বই বাজারে নেই, ওদের বইয়ের প্রতি এদেশের মানুষের কোনো আগ্রহও নেই। ঢাকা এখন যথার্থই বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যের রাজধানী। তবে এটাও ঠিক, মেরুদন্ডহীন কিছু লোক, যাদের উন্নত সাহিত্যরুচি তো দূরের কথা, স্বাভাবিক বোধভাষ্যিও নেই, বেশ কিছু গণমাধ্যমের মালিক হয়ে বসায় তাদের দ্বারা বিকৃত হচ্ছে বাংলা ভাষা, বিভ্রাত হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষ। আরেকটা সমস্যা হলো, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এদেশের ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এরা সমাজের বিত্তবান ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরকে মানসিক প্রতিবন্দী করে গড়ে তুলছে। ফলে এই প্রজাতিটা অচিরেই এ জাতির জন্যে একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং আনন্দে বোগল বাজালে হবে না, গণমাধ্যমে গণসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, হীনমন্যতায় ভুগে কোনো জাতি বড় হতে পারে না। নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিতে যে জাতি যত আত্মিক বলে বলীয়ান, সে জাতিই বিশ্বের তত উন্নত জাতি।
৫. প্রচুর বই হচ্ছে, এটা ভালো। কিন্তু খারাপ হলো, বাজে বই-ই বেশি হচ্ছে। ইঁচড়ে পাকা একজন কিশোরও এদেশে বিশত্রিশটা বইয়ের লেখক বনে গেছে। এতে করে যা হচ্ছে তা হলো, জঞ্জালে ভরে যাচ্ছে বইমেলা, বইয়ের স্টলগুলো। সৃজনশীল বইয়ের ব্যাপারে একটা নীতিমালা থাকা উচিত, কী মানের বই হলে তা প্রকাশ করা যাবে তারও একটা বিধিবিধান থাকা উচিত। তরুণ লেখকদের মনে রাখার দরকার, একটি ভালো বই অনেক সাধনার জিনিস, রাতারাতি এ হয় না, হলেও তা টেকসই হয় না, হয়নি কখনও।

খা লি দ সা ই ফ
১. বাংলা একাডেমী নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, কিন্তু স্থান স্বল্পতার জন্য সেখানে বইমেলা করার আর পরিবেশ নেই। বইমেলার স্থান পরিবর্তনের যে কথা উঠেছে তা খুবই যৌক্তিক। গুরুত্বপূর্ণ ও মানসম্মত বইয়ের প্রকাশকদের অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। সকল সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক যেন স্টল পান তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু প্রকাশককে আনুকূল্য দেখানো ও কিছু প্রকাশককে বঞ্চিত করার নীতি ত্যাগ করা উচিত।
২. নানা বিষয়ে কৌতূহল কাজ করে আমার মধ্যে। কুরআনকে গবেষকের মন নিয়ে ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করতে চাই। সাহিত্যাঙ্গনে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে তরুণ লেখকরা কুরআন পড়তে চায় না। কুরআন না পড়লে পৃথিবীকে তা বোঝাই যাবে না। হঠাৎ করে ইতিহাস পড়ে খুবই আনন্দ পাচ্ছি। বাংলাদেশে ইসলামের আগমন নিয়ে পড়াশুনা করছি; এ বিষয়ে কিছু কাজ করারও ইচ্ছে আছে। জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনভি’ মহাকাব্য থেকে কিছু কাহিনী বাচ্চাদের উপযোগী করে তরজমা করতে গিয়ে রুমি পড়া হচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে পড়ছি ওরহান পামুকের ‘তুষার’ উপন্যাসটি।
৩. অসংখ্য বই লেখা হয়েছে সারা পৃথিবীতে। এক জীবনে সব বই পড়া সম্ভব নয়। এ জন্য যতটা সম্ভব নির্বাচন করে বই পড়াই ভালো। এর বেশি কিছু বলার নেই।
৪. বাংলা ভাষার প্রতি গণমাধ্যমের আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। এখন কোনো কোনো টিভি চ্যানেল আর ‘গুরুত্বপূর্ণ খবর’ দেয় না, দেয় ‘ব্রেকিং নিউজ’। কোনো কোনো রেডিও চ্যানেলের নাগরিক-ভূতেরা যে ভাষায় বাংলা বলে তা খিস্তি-খেউর ছাড়া আর কী। মাতৃভাষার প্রতি ওদের ভালোবাসা যেন বাড়ে এ প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
৫. দীর্ঘদিন থেকে এ অভিযোগ শুনে আসছি যে বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখনও পেশাদার হয়ে উঠল না। ঢালাওভাবে একথা সত্য না হলেও প্রায় অধিকাংশ প্রকাশকের ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য। তবে সদিচ্ছা থাকলে এবং যত্নশীল হলে যে তারাও গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য বই বের করতে পারবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। সবারই চেষ্টা থাকা উচিত, যেনতেনভাবে নয়, যেন নির্ভুলভাবে বের হয় বই।

আ হ ম দ বা সি র
১. আমি এমন একটি বইমেলা দেখতে চাই, যে মেলায় স্থান পাবে না এমন কোন বই, যে বইয়ের আশ্রয়ে বিকশিত হয় মিথ্যা, বিভ্রান্তি আর অপসংস্কৃতি। আমি এমন একটি মেলা দেখলে আনন্দিত হবো, যে মেলায় স্থান পাওয়া সবগুলো বই হবে শুদ্ধ বাংলায় রচিত, যে মেলার প্রতিটি বই উন্মোচন করবে মিথ্যার গ্রন্থি, বিভ্রান্তি ও বিভ্রাটের জট আর পাঠককে তুলে দেবে শুদ্ধতম, পবিত্রতম সংস্কৃতির সিঁড়িতে।
২. এমন কোন বিষয় নেই যে বিষয়ের বই পড়তে আমি পছন্দ করি না। তবে বর্তমান সময়ে আমার পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সেসব বই, যে বইগুলো তাওহীদের প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে আমাকে সাহায্য করে আর যে বইগুলো মানুষ, মানবতা ও সৃষ্টিজগতের শত্রুদের মুখোশ উন্মোচন করে।
৩. পাঠকের নিজের যুক্তি-বুদ্ধি-বিবেচনা রয়েছে, সে অনুযায়ী পাঠক তার পাঠের জন্য বই নির্বাচন করবেন। তবে পাঠক কেন পড়েন বা পড়বেন, এটা আগে তার কাছে পরিষ্কার হতে হবে। যদি তিনি জানার জন্য, বুঝার জন্য, অনুধাবন করার জন্য পড়েন তাহলে বিষয়টা এক রকম আর যদি তিনি শুধু সাহিত্যরস পান করার জন্য পড়েন তাহলে সেটা অন্যরকম। যদি তিনি জানার জন্য পড়তে চান তাহলে তাকে একটি সুন্দর, অর্থপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য সবার আগে যা জানতে হবে তা জেনে নেয়া দরকার। অর্থাৎ তাকে সর্বাগ্রে আল্লাহর কালাম ও তাঁর রাসূলের (সা.) বাণী হৃদয়ঙ্গম করা দরকার আর যদি তিনি সাহিত্যরস পান করার জন্য পড়তে চান তাহলে দুনিয়ার তাবৎ চিরায়ত সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি সমকালের সেরা লেখকদের বই যেমন পড়বেন তেমই পড়বেন অনুসন্ধান করে অখ্যাত, অজ্ঞাত, তরুণ লেখকদের বইও এবং আমি মনে করি পাঠকদেরই উচিত প্রকৃত লেখকদের সনাক্ত করা। এ জন্য পাঠককে অনুসন্ধিৎসু হতে হবে। অনুসন্ধিৎসু হওয়া ছাড়া কেউই প্রকৃত পাঠক বলে বিবেচ্য হতে পারে না।
৪. গণমাধ্যমে যেমন সমাজজীবনেও তেমন, বাংলাভাষার বর্তমান অবস্থা সম্মানজনক নয়। খেয়াল করুন, দেশের সবগুলো টিভি চ্যানেলের দিকে, দেখবেন অসংখ্য ইংরেজি নামের অনুষ্ঠান। এফএম বেতারগুলোতে বাংলাভাষার বিকৃতি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। সামাজিকভাবে ইংরেজিকে শব্দ ব্যবহারকে আভিজাত্যের মোড়ক বানিয়ে নিয়েছি অনেকে। ফলে এ রকম আভিজাত্যের মোড়ক জড়ানো পরিবারগুলোতে থেকে নানা সৃজনশীল মাধ্যমে কাজ করতে আসছে তরুণ প্রজন্মের বাংলা-ইংরেজি মেশানো ভাষা আরও বিরক্তিকর। সমাজজীবনে এর বিরূপ প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। এদিকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো বাংলা কথা পর্যন্ত ভুলিয়ে দিচ্ছে ছেলেমেয়েদের। অথচ বাংলা শব্দের বিশাল ভান্ডার আর আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের ভিতর থেকে রসদ সংগ্রহ করে বাংলা ভাষাকে এারও প্রাণবন্ত, আরও মোহনীয় করে তোলা সম্ভব। ভাষাসৈনিক তথা লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা এ দায় এড়াতে পারেন না।
৫. সৃজনশীলতা যেমন স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার, তেমনি সাধনার ব্যাপারও। সুতরাং যা কিছু সৃষ্টিশীল তা শিল্পমানে উত্তীর্ণ না হয়ে সৃষ্টিশীল হতে পারে না। তবে অনেক সময় সৃষ্টিশীল বইয়ে শুধু স্বতঃস্ফূর্ততার ব্যাপারটি দেখা যায় কিংবা সাধনার ব্যাপারটি দেখা যায় না। ফলে সৃষ্টিশীল কাজ অসম্পাদিত ও অমার্জিতভাবে পরিবেশন করা হয়। এ রকম ব্যাপার সন্দেহাতীতভাবে শিল্পের মানহানির পর্যায়ে পড়ে।