হাম হাম জলপ্রপাত
পর্যটন কেন্দ্র 'হাম হাম জলপ্রপাত

কাঁচের মত স্বচ্ছ পানি পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে আছড়ে পড়ছে বড় বড় পাথরের গায়ে, গুড়ি গুড়ি জলকনা আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে তৈরি করছে কুয়াশার আভা। বুনোপাহাড়ের দেড়শ ফুট উপর হতে গড়িয়ে পড়া স্রোতধারা কলকল শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর কেটে সামনের দিকে তার গন্তব্যে। চারিপাশ গাছ গাছালি আর নাম না জানা হাজারো প্রজাতীর লাত পাতা ও লতা গুল্মে আচ্ছাদিত হয়ে আছে পাহাড়ী শরীর। স্রোতধারা সে লতাগুল্মকে ভেদ করে গড়িয়ে পড়ছে ভুমিতে। তৈরি করছে স্রোতস্বিনী জলধারা। সে যে কি এক বুনোপরিবেশ না দেখলে বিশ্বাস করানো সম্ভব নয়। শ্রাবনের প্রবল বর্ষনে যখন পুরো জঙ্গল ফিরে পায় তার চিরসবুজ, হয়ে উঠে সতেজ আর নবেযৌবনা । হামহাম ঝর্না তখন ফিরে পায় তার আদিরূপ। অপরুপ সৌন্দর্য। ঝর্নার সতেজতায় পাহাড়ী ঝিরিগুলো হয়ে উঠে কর্মচঞ্চল। সাঁই সাঁই করে ধেয়ে চলে ঝিরির জলরাশি। স্বচ্ছ জলস্রোত যখন পা গলিয়ে চলে যায় নদীর দিকে সে জলের কোমল পরশে শরীর জুড়িয়ে যায় মূহুর্তেই।

বলছি হামহাম ঝর্নার কথা। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের কুরমা বনবিটের গহিন অরণ্যঘেরা দুর্গম পাহাড়ী এলাকার রযেছে অপূর্ব এই জলপ্রপাত। স্থানীয় বাসিন্দারা একে হামহাম ঝর্না বা অনেকে হাম্মাম ঝর্না বলে ডাকে। এডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটক যারা চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন কেবল তাদের জন্যই এই ঝর্না দর্শন। সরকারী কোন উদ্যোগ না থাকায় শুধুমাত্র উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রচার প্রচারনার অভাবে বাংলাদেশের অন্যতম এই জলপ্রপাতটি আজও রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। কেবলমাত্র দৃষ্টিনন্দন ঝর্না নয় পথের দুপাশের বুনো গাছের সজ্জা দৃষ্টি কেড়ে নেবে অনায়েসে। জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন ডানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। চশমা বানরের আনাগোনা ডুমুর গাছের শাখায় । চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল। ডলু, মুলি, মিটিংগা, কালি ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এ বাগানগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন একরূপ। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব আপনার মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেবে। দূর থেকে কানে ভেসে আসবে বিপন্ন বনমানুষের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে আপনার দু’চোখের সামনে ভেসে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য। মনে হবে যেন ওই নয়নাভিরাম পাহাড় আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এভাবেই হাটতে হাটতে একসময় আপনি পৌঁছে যাবেন আপনার কাঙ্খিত হামহাম জলপ্রপাতের খুব কাছাকাছি। কিছু দূর এগুলেই শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ। কাছে গিয়ে দেখতে পাবেন প্রায় ১৩০ ফিট ওপর হতে আসা জলপ্রপাতের সেই অপূর্ব দৃশ্য । প্রবল ধারায় উপর হতে গড়িয়ে পরছে ঝর্নার পানি নিচে থাকা পাথরের উপর। পাথরের আঘাতে জলকনা বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে তৈরি করছে কুয়াশা। চারিদিকে এক শীতল শান্ত পরিবেশ। ডানে বামে চোখ ফেরানোর উপায় নেই। কেবলই ইচ্ছে করবে তাকিয়ে থাকি সৃষ্টিকর্তার এই অনন্য সৃষ্টির জন্য। জঙ্গলে উল্লুক, বানর আর হাজার পাখির ডাকাডাকির সাথে ঝর্নার ঝড়ে পড়ার শব্দ মিলে মিশে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ। ক্ষনিকের জন্য ভূলেই যেতে হবে কোথায় আছি, কিভাবে আছি। উপরে আকাশ, চারিদিকে বন, পায়ের নিচে ঝিরির স্বচ্ছ জল আর সম্মুখে অপরূপ ঝর্না। নিজেকে না হারিয়ে আর কি কোন উপায় আছে?

প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর বর্ননা যতটা সুন্দর ও লোভনীয় যাত্রাপথ কিন্তু ততটা নয়। উচু নিচু পাহাড়া আর টিলা, বুনো জঙ্গল, পাথুরে আর কদর্মাক্ত পথ, কোথাও হাটু সমান আবার কোথাও কোমর সমান ঝিরিপানি। শুধু তাই নয় এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আপনার প্রবল শত্রু হিসেবে পেয়ে যাবেন অসংখ্য বন্য মশা মাছি এবং রক্তচোষা জোক। এই পথ পাড়ি দিয়েছে অথচ কেউ জোকের কবলে পড়েনি এমনটি ভাবা স্বপ্নবিলাশ। পাহাড়ী পথ মারাতে গিয়ে আপনাকে ঘাম ঝড়াতে হবে, পরিশ্রান্ত হতে হবে, কখনো পিছুহটতে মন চাইবে। খাদ্য আর পানীয়র অভাব আপনাকে অসহায় করে তুলতে পারে। তারপরও সৌন্দর্য পিপাষুদের অদম্য ইচ্ছার কাছে এইসবের কোন কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনা।
হামহাম যাবার জন্য সাথে একজন গাইড নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক। কারন প্রথমবার যারা যাবেন তাদের জন্য রাস্তা ভুল করাই স্বাভাবিক। কলাবন গিয়ে রামুজি নামে একজন গাইড পাবেন উনাকে সাথে নিয়ে যেতে পারেন। প্রয়োজন লাগলে রামুজির সাথে আরও ২/১ জন গাইড নিতে পারেন ব্যাগ/খাবার বহনের জন্য । গাইডদেরকে প্রতিজনে ১৫০-২০০ টাকা দিলেই হবে । রামুজিকে না পেলে অন্য কারো সাথে কথা বলে চালাক চতুর দেখে কাউকে নিয়ে নবেন। ট্রাকিং করার সময় সবার হাতে একটি বাশ বা লাঠি নিয়ে নিবেন। এটি আপনার ভারসাম্য রক্ষা করতে, হাটত এবং সাপ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী হতে নিরাপদ রাখবে। সাথে সরিষার তেল আর লবণ নিয়ে নিবেন । জোকে ধরলে লবন দিয়ে কোন কিছু দিয়ে ফেলে দিবেন। দুপুরে খাবার জন্য হালকা শুকনা খাবার নিয়ে যাবেন। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ডেটল, নাপা ,তুলা এগুলো নিয়ে নিতে পারেন। থ্রিকোয়াটার্র টাইপের প্যান্ট আর টিশার্ট পরে যাবেন জুতা হিসেবে কেডসের তুলনায় প্লাস্টিকের স্যান্ডেল বেশ কাজে দেয়। নাজুক টাইপের মেয়েদের এই রাস্তাতে না নেওয়াই ভালো। বর্ষাকালে ঝর্নার প্রকৃতরূপ টা দেখা যায়। তবে সেক্ষেত্রে যাবার রাস্তায় কষ্টও বেশী হবে। শীতকালে রাস্তায় তেমন পানি থাকেনা বলে যাওয়াটা একটু সহজ। কিন্তু শীতে অধিকাংশ ঝরনাতেই একদম পানি থাকে না। সেটা দেখাও খুব একটা সুখকর নয়। সুতরাং কষ্ট হলেও বর্ষাকালেই যাওয়া উচিত।

হামহাম ঝর্নাস্থলে পৌছে খুব বেশীক্ষন উপেভাগ করার উপায় নেই। কেননা সেখানে বেশীক্ষন অবস্থানের কারলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে পাহাড়ে ঘনকালো অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনা শতভাগ। অপরদিকে বন্যপ্রাণীদের আক্রমনেরও শিকার হতে পারেন। ঢালু ও পিচ্ছিল পাহাড়ী পথ বেয়ে উপরে ওঠা কষ্ট হলেও সহজ, কিন্তু পাহাড় হতে নিচে নেমে আসা খুবই বিপজ্জনক ও কঠিন। তাই ঝিরি পথে এসে সবাইকে কাছাকাছি থেকে খুবই সন্তর্পনে ট্রেকিং শুরু করতে হবে। প্রায় সাড়ে চারঘন্টা পর আপনি ফিরে আসবেন সেই কলাবনে। অতঃপর সেখানে আদিবাসী বস্তিতে রাত্রিযাপন নতুবা ঘরে ফেরার পালা।

ইতিহাস
এখানকার আদিবাসীরা পানি পতনের জলস্রোতকে হামহাম বলে। সে থেকেই এই ঝর্নাটির নাম হয় হামহাম। অনেকে একে চিতা ঝর্না বলেও ডাকে।
পার্শ্ববর্তী দৃশ্যাবলী
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
এটি শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ বনবিভাগ কতর্ৃক ঘোষিত একটি চমৎকার পর্যটন এলাকা।

যেভাবে যেতে হবে
প্রথমেই আপনাকে যেকোন স্থান হতে গিয়ে পৌছতে হবে সিলেট, শ্রেীমঙ্গল কিংবা সরাসরি মৌলভীবাজার। সেখান হতে কমলগঞ্জ। ট্রেনে করে আপনি যেতে পারেন শ্রীমঙ্গল। সেখান থেকে জিপ রিজার্ভ করে কলাবনপাড়া। মৌলভীবাজার হয়ে যেতে চাইলে প্রথমেই যেতে হবে কমলগঞ্জ। এটি মৌলভীবাজারের একটি উপজেলা। যাই হোক যোকোন ভাবেই আপনি পৌছে যেতে পারেন কমলগঞ্জ। কমলগঞ্জ হতে আদমপুর বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে ১০ টাকা। সেখান থেকে ২০০ থেকে ২৫০টাকা ভাড়ায় সিএনজি যোগে আপনি অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তি পর্যন্ত । সেখান থেকে আরও প্রায় ৮ কিঃমিঃ পথ পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলেই দেখা মিলবে কাংখিত সেই হামহাম জলপ্রপাতের। যেভাবেই যান না কেন গহীন অরন্যে প্রবেশের পূর্বে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তির আদিবাসীদের সাহায্য নিয়ে আপনাকে ট্রেকিং করতে নামতে হবে। প্রায় ৮ কিমি. দুর্গম পাহাড়ের গায়ে হামহাম জলপ্রপাত যাওয়ার সহজ রাস্তাটি স্থানীয় লোকেরা আপনাকে বাতলে দেবে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ঝিরি পথে ট্রেকিং করা খুবই কঠিন এবং কষ্টের। বড় বড় পাথরের খণ্ড খুবই পিচ্ছিল, ডানে-বামে তাকালেই বিপদ। তাই ট্রেকিং করার সময় একটি করে বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে পাহাড়ী এই পথ পাড়ি দিতে হবে।

কোথায় থাকবেন

প্রথমে শ্রীমঙ্গলের কোন একটি হোটেল বা গেষ্ট হাউজে ওঠাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এখানে রাত্রি যাপন করে সকালে চলে যেতে হবে কলাবনপাড়ায়। সেখানে আপনি চাইলে তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন আদিবাসী বস্তিতে আস্তানা গাড়তে পারেন। অথবা আদিবাসীদের ঘরেও থাকতে পারেন। তারা এ ব্যপারে আপনাকে সহায়তা করবে। পর্যটকদের প্রতি তারা খুবই বন্ধুবৎসল। এখানে থাকার জন্য খুব একটা উন্নত ব্যবস্থা নেই। তবে মাথা গোঁজার জন্য একটা জায়গা অন্তত পেয়ে যাবেন।
ঝর্না দেখে ফেরার পর আপনি এতই ক্লান্ত থাকবেন যে ঐ মুহুর্তে আর শ্রীমঙ্গল ফিরতে ইচ্ছে করবে না কিংবা ফেরার হয়তো উপায়ও থাকবে না। সুতরাং কলাবন আদিবাসী বস্থিতে থাকাটাই সবচাইতে উত্তেম হবে।
তাছাড়া জীবন চলার পথে এমন একটি রাত্রিযাপন হয়তো আর কখনো উপভোগ নাও করতে পারেন। সুতরাং এই স্বাদ হতে বঞ্চিত হবেন না।

অনুমিত খরচ
যাতায়াত
কমলগঞ্জ-আদমপুর বাজার পর্যন্ত বাস ভাড়া পড়বে ১০ টাকা। সেখান থেকে ২০০ থেকে ২৫০টাকা ভাড়ায় সিএনজি যোগে আপনি অনায়াসে পৌঁছে যেতে পারেন আদিবাসী বস্তি তৈলংবাড়ী কিংবা কলাবন বস্তি পর্যন্ত ।

গাইড
গাইড বুঝে ভাড়া ভিন্ন ভিন্ন হেয় থাকে। অভিজ্ঞ গাইড হলে ২০০/২৫০ টাকা চাইেব পথ প্রদর্শনের জন্য।