হিজাব আন্দোলন

পক্ষীদের মধ্যে যেমন দেখা যায় যে তাহাদের মিলনের কাল উপস্থিত হইলে তাহাদের ডানাগুলি বিচিত্র রঙে চঙে মন্ডিত হইয়া উঠে, তেমনি হৃদয়বৃত্তির মুকুলিত অবস্থায় একটি স্বপ্নাবেশ আছে- একটি স্বর্ণ আভাময় মোহ তখন নানা বিচিত্র কল্পনার ছবিতে এবং সুরে আপনাকে প্রকাশ করিতে থাকে। এ সম্পূর্ণরূপে বাস্তব নহে এ অনেক পরিমাণে স্বপ্নই। কিন্তু এই “মধুর আলস মধুর আবেশ মধুর মুখের হাসিটি। মধুর স্বপনে প্রাণের মাঝারে বাজিছে মধুর বাঁশিটির রাজ্য বড় মোহময়।”
সেই মোহময় রাজ্যকে সুন্দর সুখের করার জন্য, অশ্লীলতা মুক্ত রাখার জন্য বিশ্বশ্রষ্ঠা হিজাব পরিধান মুসলমান যুবতী নারীর জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। হিজাব পরিধান প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে- “আপনি আপনার বিবিদের, কন্যাদের এবং সাধারণ মোমেন নারীদের বলে দিন তারা যখন বাইরে যায়, তখন যেন তাদের উপর একটা বড় চাদর ঝুলিয়ে দেয়। ফলে তাদেরকে সম্ভ্রান্ত বলে চেনা যাবে। তারা দুষ্ট লোকদের দ্বারা উত্ত্যক্ত হবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।” (আহযাব-৫৯)
এই হুকুম অবতীর্ণ হওয়ার পটভূমি সম্পর্কে ইমাম রাজী বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে সম্ভ্রান্ত মহিলাগণ ও ক্রীতদাসী সকলেই বেপর্দা ঘুরে বেড়াতো এবং অসৎ লোক তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতো। আল্লাহতায়ালা সম্ভ্রান্ত নারীদের প্রতি আদেশ করলেন যেন তারা চাদর দ্বারা নিজেদের আবৃত করে। এই নির্দেশের দু’রকম অর্থ হতে পারে। প্রথমত, এই পোশাক হতে চিনতে পারা যাবে যে এরা সম্ভ্রান্ত মহিলা এবং তাদেরকে অনুসরণ করা হবে না। দ্বিতীয়ত, এর দ্বারা বুঝতে পারা যাবে যে এরা চরিত্রহীন নয়। কারণ যে নারী তার মুখম-ল আবৃত করে রাখে, তার নিকট কেউ এ আশা করতে পারে না যে ‘আওরাত’ অনাবৃত করতে রাজি হবে। অতএব এ পোশাক এটাই প্রমাণ করে যে, সে একজন পর্দানশীলা নারী এবং তার দ্বারা কোন অসৎ কাজের আশা পোষণ করা বৃথা হবে। এ আয়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে নারীদের গৃহ থেকে বের হতে পর্দা করা ও সম্ভ্রমশীলতা প্রদর্শন করা উচিত। কারণ তাতে অসৎ অভিপ্রায় পোষণকারী তার প্রতি প্রলুব্ধ হতে পারে না। কিন্তু বড়ই আফসোসের বিষয় আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই পর্দার এ নির্দেশের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করছে না। যে কারেণে সে সব দেশের নারী সমাজকে হিজাব রক্ষায় সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
পর্দা সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ, “তোমরা গৃহভ্যন্তরে অবস্থান করবে-মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজদের প্রদর্শন করবে না। (আল আহযাব-৩৩)
এ আয়াত দ্বারা নারীদের ঘরে অবস্থান ওয়াজিব করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন ও পরিপ্রেক্ষিতে বের হওয়া নিষিদ্ধ নয়। বরং সৌন্দর্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বের হওয়া নিষিদ্ধ। তবে ঘর থেকে বের হতে হলে কিভাবে বের হবে তার বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, “ওয়া ইউদনিনা আলাইহিন্না মিন জালাবি হিন্না -তারা যখন বাইরে যায়, তখন যেন তাদের উপর একটা বড় চাদর ঝুলিয়ে দেয়।
কুরআনে হুকুম হয়েছে, “ওয়ালা ইয়াদরিবনা বি খুমুরি হিন্না আ’লা জুয়ুুবিহিন্না” -তারা যেন বক্ষদেশে ওড়না ফেলে রাখে। জাহেলিয়াতের যুগে নারীরা ওড়না মাথার উপর ফেলে তার দুই প্রান্ত পৃষ্ঠদেশে ফেলে রাখত। ফলে গলা বক্ষদেশ ও কান অনাবৃত থাকত। তাই মুসলমান নারীকে আদেশ করা হয়েছে তারা যেন এরূপ না করে; বরং ওড়নার উভয় প্রান্ত পরস্পর উল্টিয়ে রাখে, এত সকল অঙ্গ আবৃত হয়ে পড়ে।
রসুলুল্লাহ (স.) এর পরে প্রায় তের  শতক ধরে গোটা মুসলিম বিশ্বের মুসলমান সর্বসম্মতভাবে এ বিধান মেনে আসছিল।  কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ওপর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সার্বজনীনভাবে গৃহিত এসব বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সামান্য প্রবণতাও কারও মধ্যে দেখা যায়নি। কুরআন ও সুন্নাহ নারীর যে মর্যাদা দিয়েছে তাকেই নারীপুরুষ সকলেই সর্বোত্তম মেনে নিয়েছে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় কাসিম আমিন বেগই প্রথম মুসলমান যিনি পর্দার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছেন। কুর্দী বংশোদ্ভূত পশ্চিমী সংস্কৃতি প্রভাবান্বিত কাসিম আমিন বেগ পর্দার বিরুদ্ধে ১৯০১ সালে… এক খানা গ্রন্থ লিখেন। কাসিম আমিনই প্রথম মুসলমান যিনি পশ্চিমী ধারায় মুসলমান পরিবারের সংস্কারে বক্তব্য রেখেছেন। …. খ্রিষ্টান ও মানবিক আদর্শের কাছে একজন নতজানু চিত্ত আধুনিক মুসলমানের অভিব্যক্তি। এ পুস্তকে তিনি মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে যে সব যুক্তি উত্থাপন করেছেন এগুলো ভিত্তিহীন। কাসিম আমিন খ্রিষ্টান মিশনারী ও পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের সমর্থন  নিয়ে পর্দার বিরুদ্ধে এ বইয়ের মাধ্যমে যে অভিযান শুরু করেছিলেন তার প্রচুর সাফল্য এসেছে। তাইতো পাশ্চাত্য প্রাচ্য সর্বত্র পর্দার বিরুদ্ধে তথা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত।
কিন্তু আল্লাহর বিধান পালন ও প্রতিষ্ঠায় শত বাধার মুখেও অবিচল অনড় একদল নারী। মোস্তফা কামাল পাশা ছিলেন পর্দার বিপক্ষে। তিনি লতিফা নাম্নী ইউরোপীয় শিক্ষিতা এক নারীকে বিয়ে করেন। তুরস্কের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কামাল পাশা এই মহিলাকে পুরুষের পোশাক পরিধান এবং মহিলাদের নিরঙ্কুশ সাম্যের দাবি করতে উৎসাহিত করেন। কিন্তু আত্মসম্মান বোধ সম্পন্না হয়ে যখন তিনি সম্মানিত স্ত্রীর মত ব্যবহারের দাবি করেন, রাগান্বিত হয়ে মোস্তফা তাকে তালাক দেন।
তুরস্কের এক সাহসি নারী মার্ভে কাভাকচি। ১৯৯৯ সালে তুরস্কে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর ভার্চু পার্টির নব নির্বাচিত মহিলা এমপি মার্ভে  কাভাকচি ইসলামী বিধান অনুযায়ী  মাথায় স্কার্ফ পরিধান  করে শপথ গ্রহণের জন্য পার্লামেন্টে যান। কিন্তু ইসলাম বিরোধী গ্রুপের বিরোধিতার কারণে শপথ গ্রহণ না করে তিনি বেরিয়ে আসেন এবং পরের দিন পার্লামেন্ট ভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ৩১ বছর বয়সী কাভাকচি বলেন, “আমার জাতি আমাকে মাথায় স্কার্ফ পরিধান করা অবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচিত করেছে।”
প্রাচ্য পাশ্চাত্য সর্বত্র চলছে পর্দার বিরুদ্ধে  অভিযান। যেমন সম্প্রতি  সেন্ট্রাল চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ক্যম্পাসে ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
চীনের জিয়ানে অবস্থিত সানচি নরমাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় মুসলিম ছাত্রীকে গত এপ্রিল মাসে তাদের হিজাব খুলে ফেলতে বলা হয় এবং চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসলামী হিজাব নিষিদ্ধ করে নোটিশ জারি করা হয়। ..চায়না ভিত্তিক ইংরেজি ভাষার দৈনিক গ্লোবাল টাইমসের একটি রিপোর্টে বলা হয়, গত মাসে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের  একটি ক্যাফেটারিয়ায়  কুরআন পড়ার কারণে অন্য একজন ছাত্রের  বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ধর্ম প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। এক ছাত্রী বলেন, ‘হিজাব পরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এখানকার উইগুর, কাজাক এবং হুইসহ বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আরোপ করা হয়েছে। .. শি জিন পিং প্রসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় পোশাকের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। -(দৈনিক সংগ্রাম-১৮ মে ২০১৫)
আফ্রিকার একটি মুসলিম রাষ্ট্র চাদ। সম্প্রতি  চাদে বোমা হামলায় ২৩ জন নিহত হওয়ার পর দেশটিতে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মীয় নেতাদের সাথে বৈঠকের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী কালজেবুয়ে পাহিমি দুবেত এই ঘোষণা দেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত  হয় চাদের রাস্তা ঘাটে প্রকাশ্যে বোরকা পরা যাবে না। এমনকি নিজের বাড়ি ঘরেও বোরকা পরা যাবে না। ধর্মীয় নেতাদের সাথে বৈঠক কালে কালজেবুয়ে পাহিমি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা হামলা চালাতে বোরকা ও নেকাবের আশ্রয় নিচ্ছে। বোরকার ছদ্মবেশে আত্মঘাতী সন্ত্রাসী হামলা চালানো হচ্ছে।  এখন থেকে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী বাজারে যত বোরকা ও নেকাব আছে তা আগুনে পুড়ে ফেলবে।’ চাদের বেশিরভাগ মানুষ মুসলমান এবং প্রধানত ধর্মীয় কারণেই সেখানে বোরকা পরা হয়। সেখানে জঙ্গি হামলার অজুহাতে বোরকা নিষিদ্ধ করলো সরকার। (বিবিসি)
হিজাব পরিহিতাদের প্রায়ই লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ট্রেনের মধ্যে তিন হিজাবী নারীকে সমর্থন করার জন্য বর্ণবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে সে দেশের এক সচেতন নাগরিক।  অস্ট্রেলিয়ার ৩৬ বছর বয়সী ‘জেসন সিয়াসী’ বলেন, আমি ট্রেনে করে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। ট্রেনের মধ্যে দেখলাম এক ব্যক্তি এক নারীর স্কার্ফের প্রতি ইঙ্গিত করে বলল: “অস্ট্রেলিয়ায় এ আবর্জনা ব্যবহার করার কোন প্রয়োজন নেই।”
স্কার্ফ নিয়ে অবমাননাকর উক্তি প্রকাশ করার পর এক মুসলিম নারী তাদের নিকট জিজ্ঞাসা করলো যে, তোমার সমস্যা কি? এ বিষয় নিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং জেনসন সিয়াসী হিজাবী মহিলাদের পক্ষে কিছু বলতে গেলে এক পর্যায়ে বর্ণবাদীদের একজন জেনসন সিয়াসীর উপরে হামলা চালায়। এ তিন নারী যখন ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছিল তখন ঐ দুই বর্ণবাদী চিৎকার করে তাদেরকে অবমাননাকর উক্তি করছিল। (দৈনিক সংগ্রাম- ২৯ মে ২০১৫)
এমন শত বিরোধিতার মুখেও নও মুসলিস নারী সমাজ হিজাবের পক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।  নও মুসলিম মরিয়ম আহদে বলেন, “আমার কর্মক্ষেত্রে আমি প্রায়ই খুব একাকীত্ব বোধ করতাম। কেননা আমি আমার সহকর্মীদের সাথে সেভাবে মিশতে পারি না। আমি আজকাল স্কার্ফ এবং ইসলামী পোশাক পরিধান করি বলে সব জায়গায় খোলামেলা ভাবে মিশতে পারি না। .. .. যারা নও মুসলিম তাদের প্রতি আমার পরামর্শ হচ্ছে তারা যেন ধীরে সুস্থ্যে’ এগিয়ে আসে। .. .. পোশাকের ব্যাপারে পরামর্শ হচ্ছে, যেভাবে আরাম দায়ক মনে হবে সে ভাবেই পোশাক পরুন। আপনি তখনি মাথা ঢেকে পোশাক পরতে পারবেন যখন সময় আসবে।”
এলিজাবেথ ভ্যালেনসিয়া  বলেন, “দিন যেতে লাগল, আমি মুসলমান বোনদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে লাগলাম। ভয়ে আমি ইসলাম গ্রহণের কথা মা-বাবাকে বলিনি। .. .. আমি স্কুলে গিয়ে মুসলমান ছাত্রীর সাক্ষাৎ পেলাম। তাদের অনেকেই মাথায় হেজাব ব্যবহার করতো , কেউ করতো না। .. .. আস্তে আস্তে দৃঢ়তা বাড়তে থাকলো। স্কুলে এবং বাসায় হিজাব ব্যবহার করতে শুরু করলাম। একদিন বাবা বাসায় আমাকে হিজাব পরা দেখে ফেললেন। আমিতো ভয়ে অস্থির। হঠাৎ প্রাণে সাহস সঞ্চার হলো। আমি বাবাকে বললাম- আমি মুসলমান, আল্লাহর হুকুম মানার জন্যই এটা ব্যবহার করছি। বাবাও বললেন- সত্যিই তোমাকে খুব স্মার্ট লাগছে। ”
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু মুসলিম নারীরা তার বিরুদ্ধে আইনী লড়াই করে বিজয়ী হয়েছেন। সম্প্রতি একাটি মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট স্কার্ফ বৈধ করেছে। সামান্তা ইলাউফ নাম্নী নারী এবারকম্বি এন্ড ফিনচ নামের পোশাকের চেইন শপে কাজ করতেন। ১৭ বছর বয়সী এই তরুণীকে ২০০৮ সালে হিজাব পরে কাজ করা যাবে না বলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তার প্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় কারণে রুমালের মাথা ঢাকা ছিল বলে ‘সামান্তা এলাউফ’কে চাকরি দেয়া হয়নি। সামান্তা এলাউফ তার বিরুদ্ধে করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনের স্মরণাপন্ন হলে তাকে হিজাব পরার কারণে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা  অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট।
কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার রক্ষা আইনে, ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচরণের কারণে কোনো ব্যক্তিকে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা অনৈতিক ও অবৈধ। সেই আইনি ধারাটিকে ফের ঊর্ধ্বে তুলে ধরল আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালত। হিজাবের পক্ষে আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে আমেরিকার ইসলামিক রিলেশন্সের ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ। যুক্তরাষ্ট্রে হিজাবসহ ইসলামি পোশাক পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে দেয়ার পক্ষে আন্দোলন করে আসছে মুসলমানরা।
হিজাবধারী এক সংগ্রামী নারী জোহরা সীমা। তার আপসহীন লড়াই মুসলিম নারী সমাজকে উজ্জীবিত করেছে।
আমেরিকাতে যেসব নারী হিজাব পরেন, তাদের অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ দিয়ে চলতে হয়। জোহরা সীমা তাদেরই একজন জোহরা পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত ও আমেরিকা প্রবাসী একজন মুসলিম আইনজীবী। হিজাব পরার কারণে তাকেও অনেক ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয়। কিন্তু হিজাব পরার ব্যাপারে কারো  সঙ্গে কোন আপোষ করেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত জোহরা সফল হয়েছেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, সমস্যা শুরু হয় কোন চাকরির সাক্ষাৎকার বা আদালতে কোন মামলা লড়তে যাওয়ার আগের রাতে। জোহরা তার রঙিন  হিজাব ও লম্বা হাতাওয়ালা জামার দিকে তাকিয়ে ভাবেন এবং নিজেকে প্রশ্ন করেন , চাকরি পেতে আমার কি এই হিজাব পরা ছেড়ে দেয়া উচিত? এই সময়টাতেই আমি খুব চাপের মধে পড়ে যাই’, বলেন জোহরা। তিনি বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় সর্বদা হিজাব পরেন। জোহরার ভাবনা এই একটাই যে, আমেরিকান স্টাইলের লম্বা স্কার্ট নাকি তার পছন্দের অধিক রক্ষণশীল ‘আবায়া’ পরা উচিত? অবশ্য কর্মস্থলে যোগ দেয়া একজন পরহেজগার মুসলিম নারীর জন্য এমন প্রশ্নের কোনো  সহজ উত্তর নেই। ২৫ বছর বয়সী জোহরা বলেন, প্রত্যেকবার যখন আমি কোনো সাক্ষাৎকার দিতে কক্ষের দিকে অগ্রসর হই অথবা আদালতে কোনো মামলা লড়তে যাই, আমার প্রথম চিন্তা হচ্ছে, আমি একজন মুসলিম। আর সব সময় আশঙ্কা হয়, “হিজাব পরার কারণে আমার মেধা ও অন্যসব গুণ না আড়ালে পড়ে যায়।’ জোহরা তার হিজাব পরা নিয়ে বেশ গর্বিত। তিনি মনে করেন, হিজাব মুসলিম নারীদের সামাজিক মর্যাদাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। কেননা নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তারা একটি বিশেষ বিশ্বাসের চিহ্ন হিসেবে তাদের মাথা ও শরীর আবৃত করার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। জোহরাও বিচ্ছিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে অবশেষে সফল হয়েছেন। ল’স্কুল থেকে ল’ফর্মে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করা পর্যন্তই দীর্ঘ যাত্রায় তাকে নানা অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। জোহরা বলেন, ‘এ যাত্রায় নিজেকে খুব মনে হতে পারে।’ তিনি শাদাদের শহর লং আইল্যান্ডের একটি সেক্যুলার পরিবারে বড় হয়েছেন। কলেজে যখন তিনি ভর্তি হন, তখন থেকেই তিনি হিজাব পরার সিদ্ধান্ত নেন। তার সেক্যুলার বাবা-মাও এটাকে ভালোভাবে নেননি। বাবা- মার উদ্বেগও তাদের ভুল প্রমাণ করে দেয়ার নিজের আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে  জোহরা বলেন, ‘আমার বাবা মা এমন রেয তারা বলতেন, কে তোমাকে চাকার দিতে যাচ্ছে?’ জোহরা পড়াশুনা করেছেন সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল’স্কুলে।  তিনি জানান, মুষ্টিমেয় যে কয়জন মেয়ে হিজাব পরতেন, তিনি তাদের একজন ছিলেন।
পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি যখন চাকরি খোঁজা শুরু করলেন, তখন তিনি আবিষ্কার করলেন যে, হিজাব পরা মেয়েরদের পক্ষে চাকরি পাওয়া আসলেই বেশ কঠিন। সামাজিক সংগঠন বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে নিজেকে যুক্ত করতে গেলেও অনেক ভাবতে হতো। মুসলিম ল’ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সদসস্য হবেন কিনা, তা নিয়েও তাকে তার নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়েছিল। তার আশঙ্কা , পরে নিয়োগ কর্তারা তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য আদৌ না ডাকে। আর সামাজিক যোগাযোগের সাইট ফেসবুক বা লিঙ্কডইনেতার হিজাব পরা ছবি দেখে যদি নিয়োগ কর্তারা তাকে সাক্ষাৎকারের জন্য না ডাকে-এ আশঙ্কায় ছবি ছাড়াই চলে তার ফেসবুক ও লিঙ্কউইন। জোহরা দুঃখের সঙ্গে জানান, যখন লিঙ্কউইন ও  ফেসবুক পেজ থেকে ছবি সরিয়ে ফেলরাম, তখন আমি সাক্ষাৎকারের ডাক পেলাম। তা নাহলে আমি ডাক পেতাম না। জোহরার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারিয়ানা ডিক্রিসেনজো যিন জোহরাকে অনেক দিন ধরে চেনেন।  তিনি বলেন, জোহরা এত বাজে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেও কখনো এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ করেননি।
জোহরা বলেন, চাকরির খোঁজ তাকে এক বেদনাদায়ক শিক্ষা দিয়েছে। কিছু নিয়োগ কর্তা আছেন এমন, যারা কেনো হিজাব পর মেয়েকে তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিতে চান না। এমকি এক সময় তিনি তার আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন ত্যাগ করার চিন্তা ভাবনাও করেন। কিন্তু তিনি বলেন, তিনি নিজের বিশ্বাসের মাঝে শান্তি ও সাহস খুঁজে পেয়েছিলেন। অবশেষে গত বছরের আগস্ট মাসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আশিষ কাপুর চালিত একটি ল’ ফার্মে চাকরি পান।
জোহরার হিজাব নিয়ে আশিষের কোন মাথা ব্যথা নেই। তিনি মনে করেন, জোহরা যদি হিজাব পরে ক্লায়েন্টদের সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং আদালতে আসতে পারেন তা হলে কোন সমস্যা নেই। জোহরা দ্রুততম সময়ে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে নিজকে প্রমাণ করেছেন। আশিষ কাপুর বলেন, ‘জোহরা খুব আত্মবিশ্বাসী’। চলতি মাসে জোহরা সীমা বাবা-মা ও আশিষ কাপুরের সহযোগিতায় নিজেই অভিবাসন ও পারিবারিক আইন বিষয়ক একটি ফার্মপ্রতিষ্ঠা করেছেন।
জোহরা জানেন এটা কোন সহজ কাজ নয়। তবে তিনিও ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। ‘হয়তো মাঝে মাঝে এটাকে অশান্তির বলে মনে হবে। কিন্তু আমি ওই ঝুঁকি নিতে যাচ্ছি।’ বলেন আত্মপ্রত্যয়ী জোহরা সীমা। (নিউইয়র্ক টাইম) সংগ্রাম- ১৫ জুন ’১৫।
ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের ফলে নারীদের নিজ নিজ ব্যয়ভার বহন করতে বাধ্য হতে হয়। ফলে নারীগণ অফিস ও কারখানায় চাকরি করার জন্য হাজির হয়। ফলে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এমন একটি ভাবধারা সৃষ্টি করেছে যার ফলে যার ফলে হিজাব প্রথার উপরে আঘাত এসেছে। গজিয়ে উঠেছে দেশে দেশে  নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা ও সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকার আন্দোলন। তা কেবল মাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি কার্যত দ্বীন-ধর্ম, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যিক রীতি নীতির সকল বন্ধন থেকে সম্পূর্ণ রূপে মুক্তি ও নিষ্কৃতি। এ সব কিছ- ঐ সব সমাজে যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা ও স্বেচ্ছাচারিতার অসংখ্য উপায় ও পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে। নৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতা ও বন্ধনহীন যৌন উদারতাই সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে। মানুষকে বানিয়ে দিয়েছে একেবারে পশু।
আধুনিক কৃষ্টিও সভ্যতা নারীদের পুরুষের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে থাকার জন্য আগ্রহশীল করে তুলছে। এর পরিণতিতে সমাজ দেহে অবর্ণনীয় অনাচারের সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয়ানক ব্যাধি থেকে মানব সভ্যতাকে সুরক্ষার জন্য  হিজাব প্রথা অবলম্বন ব্যতীত দ্বিতীয় কোন পন্থা নেই।

উম্মে আইরিন