তারুণ্যের শিক্ষা

আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস দীর্ঘ। ‘কোথাও  আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা মনে মনে / মেলে দিলাম গানের সুরের এই ডানা মনে মনে…..।’ মানুষ স্বপ্ন দেখে। সেটাকে সে বাস্তবে রূপ দিতে চায়। মানুষের আকাশে ওড়ার কল্পনা, সুউচ্চ হিমালয় জয়ের প্রত্যাশা, আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো  কিংবা মেরু অঞ্চলের রহস্য ভেদ করার যে-দুর্দমনীয় প্রতিজ্ঞার স্বপ্ন- সফল করার মানসিকতা থেকেই গড়ে ওঠা।
স্বাধীনতার স্বপ্নও এর ব্যতিক্রম নয়। ভারত ভেঙ্গে ভাগ হয়েছিল একটা স্বপ্নকে মাথায় রেখে। অনেক সংগ্রাম, অনেক মৃত্যুর বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছিলাম একটি দেশ পাকিস্তান। কিন্তু দ্বিজাতিতত্তে¡ গড়া দেশটির চালচিত্র  আমাদের স্বপ্নের সঙ্গে মেলেনি। বাঙালি দেখেছে পদে পদে বঞ্চনা, নিপীড়ন, বৈষম্য এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে সম্পদ পাচারের ক্লান্তিহীন উদ্যোগ। এসব দেখে ফুঁসে উঠেছিল বাঙালিরা এবং স্বপ্ন দেখতে থাকে নতুন একটি দেশের যেটি শাসন করবে নিজেরা-পৃথিবীতে যা হবে একমাত্র দেশ। ১৯৫২ তে সেই স্বপ্ন যাত্রার শুরু। তারপর ধাপে ধাপে শক্তি সঞ্চার করে বাঙালির সংগ্রাম বেগমান হয়েছে একটি শোষণমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে যার সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
নিকট ইতিহাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের ব্যবসা ও শোষণের স্বার্থেই এদেশে আইন-কানুন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করে কোর্টকাচারি। বাতিল করে সুলতানী ও নবাবী আমলের আইন-কানুন। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল শোষণ এবং শাসন ব্যবস্থাও হবে শোষণের সহায়ক। তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সহায়ক বলে বিবেচনা করে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে চালু করে ইংরেজি ভাষা। শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করে  কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, আয়ুর্বেদীয়  বোর্ড, হোমিওপ্যাথিক বোর্ড, নার্সিং  কাউন্সিল, ফার্মেসি কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি ইত্যাদি।
স্বাধীন দেশে আমরা কিন্তু ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন আনি নাই। এর কারণে আজ দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রসার ঘটে চলেছে অনবরত। কিছু নগণ্য সংখ্যক মানুষ আকাশচুম্বি ভবনে সকল নাগরিক সুবিধা নিয়ে বাস করছে, বিপরীত দিকে গ্রামের অধিকাংশ কৃষক, তাঁতী, জেলে, কুমার সম্প্রদায় মানবেতর জীবন যাপন করে।
আমাদের তরুণ সমাজের সংগ্রামের ঐতিহ্য রয়েছে, যুগে যুগে ন্যায় ও সত্যের জন্য সংগ্রাম করে যারা জীবন উৎসর্গ করে, নবজীবনের সঙ্গীত রচনার ভার যাদের উপর, যারা বয়সে নবীন, মন যাদের বিশ্বাসে ভরপুর, যাদের চোখে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন, যারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না, পুরোনোকে ভেঙ্গে নতুন কিছু গড়তে চায়, তারাই তরুণ। তারুণ্য স্থবির নয়, সে সদা চঞ্চল। সে পরাজয় মানতে নারাজ তারাই ছিল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল কাণ্ডারী। আজকের তরুণ-তরুণীরা আগামীদিনের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। এসব তরুণ-তরুণীকে সত্য, সঠিক ও সুন্দরভাবে গড়ে তোলার মধ্যে দেশ ও জাতির কল্যাণ নিহিত। আর এই যুব বা তরুণ সমাজের বিপথগামিতার অর্থ দেশের অনিবার্য বিপদ। যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী সমাজই আমাদের দেশটাকে সোনার বাংলাদেশে গড়বে। অথচ এখন তারা মাদকের নেশায় বুঁদ আর জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে জাতিকে দিকভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত।
তাদেরকে প্রযুক্তি দক্ষ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। গণিত বিজ্ঞান চর্চা শুরু করতে হবে প্রশাসনের নিচের স্তর থেকে ওপরের স্তর পর্যন্ত। যেমন প্রথমে গ্রাম পরে ইউনিয়ন ও তারপর উপজেলা জেলা বিভাগ কেন্দ্রীয়ভাবে। তরুণ সমাজকে জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত করতে হলে বহুমুখী কর্মসূচী নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিতে বিপুল কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষ শ্রমশক্তি সৃষ্টির জোরালো পদক্ষেপও নিতে হবে। দক্ষ জনশক্তি প্রতিটি দেশের জন্যে অমূল্য সম্পদ। আর দক্ষ শ্রমশক্তি এমনি এমনি তৈরি হয় না। এর জন্যে প্রয়োজন ডিপ্লোমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের। প্রশিক্ষিণপ্রাপ্ত শ্রমশক্তি কেবল জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতিতেই ভূমিকা রাখে না, বিদেশে প্রেরণ করেও বিপুল পরিমাণে বৈদেশিকমুদ্রা অর্জন করতে পারে।
২০৪১ সালের উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে স্বাধীনতার চেতনায় দেশে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, খুলনা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, সিলেট ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রংপুর ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, ময়মনসিংহ ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগামী ২৫ নভেম্বর ২০১৬ ৩য় জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস দেশব্যাপী সাড়ম্বরভাবে পালন করতে যাচ্ছে। এই বছরের জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের শ্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে ‘গ্রাম উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস উদ্যাপন পরিষদ প্রত্যাশা করছে ৮ টি বিভাগে ৮টি ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হলে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিটি উপজেলায়।
অর্ধেক তরুণকে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে ১০টি সরকারি/বেসরকারিভাবে কৃষি, ভেটেরিনারি, লেদার, পলিটেকনিক, টেক্সটাইল, মেডিক্যাল টেকনোলজি, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, মেডিকেল ও ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
রাবার, মোবাইল ব্যাংকিং, এয়ারহোস্টেজ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, বিমান, পরিচালনা, সাবমেরিন, মহাকাশযান, নিউক্লিয়াস ইত্যাদি বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সসহ সকল পণ্য ও পেশায় কমপক্ষে ৫০০ (পাঁচ শত) নতুন ডিপ্লোমা কোর্স চালু হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র ভর্তির ক্ষেত্রে বিদেশীদের জন্য উন্মুক্ত হবে।
বাংলাদেশের ছোট বড় মাঝারী ৯৮ হাজার ৭১৪টি গ্রাম থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৪ লক্ষ ছেলে মেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এর অর্ধেক প্রায় ৭ লক্ষ তরুণ নিজ বাড়ীতে বসে ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের ফলে নিজ গ্রামে শিল্প, কারখানা, হাসপাতালে গড়ে উঠবে। এর একটি বড় অংশ উচ্চ বেতনে বিদেশ গমন করবে। জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস উদযাপন পরিষদ আশা করছে আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতিটি গ্রামে
খাদ্য উৎপাদনে                                 ৫২
কৃষি ব্যবস্থাপনায়                               ৩২
প্রকৌশল উন্নয়ন                               ৮৮
চিকিৎসা নিরাপত্তা                             ১১২
যোগাযোগ ক্ষেত্রে                                ৩২
শিক্ষা সম্ভাবনায়                                  ৭২
বস্ত্র খাতে                                          ২১
শিল্প খাতে                                       ১১০
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স           ২০
বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থায়                            ৪০
সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে                               ৯০
ক্রীড়া সাফল্যে                                   ৩০০
জনগুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য পদে                         ৫৫
জননিরাপত্তায়                                      ৫০
অন্যান্য                                             ৫০
মোট                                            ১১২৪ জন
ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী কর্মরত থাকবেন। এতে করে শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়ায় একটি নতুন বাংলাদেশ সৃষ্টি হবে। আর এ কারণেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের ৩য় জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের শ্লোগান ‘গ্রাম উন্নয়নে বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড’ যথার্থতা লাভ করবে।
মো. আবুল হাসান, সভাপতি
খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব
ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ,চাকরি এবং বিজনেস  নিউজ ,টিপস ও তথ্য নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বাংলার জব  এ ।